গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে।
সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা।
এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা হাজার কতক। নইলে দেশ বলতে শ’খানেক ছোট ছোট দ্বীপ। ঘেঁষাঘেঁষি পড়ে আছে উত্তর সাগরের ওপরে। তাদের ওপর দিয়ে সব সময়ে হু-হু বইছে হাড়-কাঁপানো হিমেল হাওয়া। সাগরের জল ফুঁসে উঠে ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে তো পড়ছেই দ্বীপগুলোর ওপর। তার যেন বিরাম নেই। দ্বীপের যে কোন জায়গা থেকে শুনতে পাবে এই জল আছড়ানির শব্দ। আর হু-হু হাওয়ার হাঁক।
দ্বীপগুলো যেন মরুভূমি। বরফের মরুভূমি। ধু-ধু ফাঁকা। কোথাও একটা উঁচু গাছ নেই। যে দিকে চাও কেবল ঢেউ খেলানো ন্যাড়া পাহাড় আর পাহাড়। তাদের আগাগোড়া রূপোলী বরফের রাংতায় মোড়া। মাঝে মাঝে ছড়িয়ে আছে জনমানবহীন মেঠো জায়গা। আর এখানে-ওখানে বড় বড় লেক। আর আছে জলা-হাওড়-বাদা। তা সেগুলোও টের পাওয়া যায় না। সব কিছু ঢাকা বরফের সাদা চাদরে।
সে দেশে বছরে ছ’টা মাস দিনের আলো বাইশ ঘণ্টা। আর বাকি ছ’মাস সূয্যি মামা একদম নিপাত্তা। কখন-সখন হয়তো উঁকি মারে দু’এক ঘণ্টার জন্যে। তবে তার জন্যে যে সবকিছু অন্ধকারে ডোবা তা-নয়। ওঠে উত্তরের আজব আলো অরোরা বোরিয়ালিস। জোছনার মতো আকাশ-মাটি-সুমুদ্দুর সব ছাপানো। তাতে ভোরের আলোর আভা। সব কিছুই পষ্ট দেখা যায়।
পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট শহর। কাঠ পাথরের বাড়িগুলো যেন দেশলাই বাক্সের তৈরী পুতুলের ঘর। পাহাড়ের গায়ে লটকানো। সরু সরু রাস্তা পাহাড়ের গা বেয়ে। কখনও বাঁকা কখনও সোজা। কখনও সাপের মতো জড়িয়ে পেঁচিয়ে। একটা রাস্তার শেষে যেন সাপের মাথায় নীলকান্ত মণি গ্যানগ্যানের ছোট্ট হাল্কা নীল রংয়ের বাড়িটা। তার ভেতরে আগুন-কাঁদায় বসে গ্যানগ্যান। যেন-
চাঁদের মা এক বুড়ী
সাদা শনের নুড়ী
বাতেতে থুথুড়ি।
বয়সের নেই গাছ পাথর
বাতের ব্যথায় বড়ই কাতর।
কিন্তু – গপ্পো বলতে সয় না তর।
বুড়ীর সামনে নিচু টেবিলের ওপর একটা চরকা। আর একরাশ পেঁজা ভেড়ার লোমের পাঁজ।
বুড়ীর কাছে আমাকে নিয়ে সটান হাজির আংকল্ জ্যাক। পুরো নামটা মিস্টার জ্যাকবসেন। আংকল্ বললে, ‘ওই আমার বুড়ী ঠাকমা -‘
শুনে তো আমার চোখ কপালে। আংকল বলে কি। আংকেলের মাথার ওপর দিয়ে ষাট ষাট করতে করতে ষাটটা বছর পগার পার। তা-সেও আজ বেশ ক’বছর। মাথার সমস্ত চুল কটি খুঁটিয়ে তুলে নিয়েছে তার বয়স। মুখের তামাকের ছোপ-ধরা পুরোনো দাঁতের পাটি কবে আবার্ডিনের ডাক্তার উপড়ে তুলে বাঁধিয়ে দিয়েছে নতুন পাটি। তা সেটাতেও তামাকের ছোপ ধরব ধরব। সেই আংকেলের আবার ঠাকমা। বুড়ীর ফোকলা মুখে নি-দন্তের হাসি। ছড়ানো একগাল। আমাকে দু’ হাতে ধরে পাশে বসালো। চাঁদের মা বুড়ীর পাশে আমি কালোমানিক। যেন চাঁদের কলঙ্ক।
‘ও ডিয়ার, ডিয়ার। কোথা থেকে একে নিয়ে এলি জ্যাক। ক্রীসমাসের ঠিক আগে আমার ঘরে কালো মানুষ। ওমা কি সৌভাগ্যি আমার। আমি এ ভাগ্যি রাখি কোথায় গো। তা বাছা এক টুকরো কয়লা হাতে করে এনেছ তো-‘
বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত কোটের পকেটে। আগাগোড়া মুড়ি দেওয়া রোঁয়ালা ভাল্লুকের মতো লম্বা কোট। বার করে ফেলেছি আমাদের কেষ্টনগরের পোড়ামাটির এক কালো হাতি। হাতে পেয়ে বুড়ী কী খুশী। আহ্লাদে গলে যায় আর কি। আদর করে আমার কপালে গালে এন্তার চুমু। আকুলি বিকুলি ডাক ‘ওলো ও স্কুয়া – এই দ্যাখ রে কাকে তোর বাপ সঙ্গে নিয়ে এয়েছে। ভিন দেশের এক ভিন মনিষ্যি। কয়লার খনি থেকে তোলা হীরে রে। কি জ্বলজ্বলে চোখ-মুখ-‘
সামনে হাজির এক পরমাসুন্দরী মেয়ে। ঠিক যেন পরী। দীঘল চেহারা, ঢলঢলে গড়ন। ঢাল দেওয়া একরাশ সোনালী চুল। ‘গ্যানগ্যান, আমায় ডাকছিলে-‘
‘-দেখ, দেখ। গরম দেশের লোক আমার ঘরে কি রকম ওম্ এনেছে। ঠাণ্ডাতে জমে মরি। হাত-পা সব অসাড়। মনটাও তাই। ওম্ পেয়ে আমার বরফ গলা শুরু। এসো গো আমার সাগরপারের অতিথি তোমার সঙ্গে একটু গপ্পো করে বাঁচি-‘
বলতে বলতে বুড়ীর মিষ্টি সুরে কুলকুলিয়ে হাসি। আর তার সাথে ছড়া-
‘চরকা কাটি ঘ্যানর ঘ্যান
পাঁজের সুতোয় লাগাই টান।
মন ঘুড়িটা আকাশ জুড়ে
উড়ে বেড়ায় অনেক দূরে।
গপ্পো কথার রাজ্যি খান,
বাঁধিয়ে সুতোয় লাগাই টান।’
আংকল জ্যাক বলে ওঠে, ‘রূপকথা শোনাতেই তো ওকে নিয়ে এলাম তোমার কাছে গো, ঠাকমা। ওদের দেশে রূপকথার নাকি বড় কদর-‘
‘সেটা কোন্ দেশ রে জ্যাক -‘
‘ইন্ডিয়া ভারতবর্ষ। যেখানে আমার বাবা এক বছর হারিয়ে গিয়েছিল। তুমি তার পাত্তা না পেয়ে -‘
‘ও মা, তা আর মনে নেই! ইণ্ডিয়া নিজেই তো এক রূপকথার রাজত্বি। কতো রাজা মহারাজা। কতো ইয়োগী সন্নিসী। কতো তন্তর-মন্তর। কতো দত্তি-দানা। ভূতের ছানা। কতো ভীষণ ভীষণ জানোয়ার। কতো সোনা-দানা হীরে মানিক। ছেলের আমার তো ফেরার নামই নেই। শেষে ধরল কালাজ্বরে। এক পেট পিলে। ঠি-ঠি করে জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে পালিয়ে এল তোর বাপ। তার কাছে অনেক গপ্পো শুনিচি ইণ্ডিয়ার। সে এক আজব দেশ-‘ বুড়ীর আবার কুলকুলিয়ে হাসি। টেবো-টেবো থলথলে নরম গাল দুটোতে খাঁজ। মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ, তা আমার দেশের রূপকথা শোনাতে পারি। কিন্তু এক কড়ারে। রাজী-‘
‘-শুনি আগে। কড়ারটা শক্ত না নরম। ঠাণ্ডা না গরম’
‘তুমি না নওজোয়ান। তোমার মুখে ওকি কথা। জ্যাকের ঠাকুদ্দার কাছে শক্ত নরম কোন তফাৎ ছিল না। সে আমার হাড় চিবিয়েছে মাস খেয়েছে। তবেই না আজও সে আমার মনের মানুষ। ঠান্ডা গরমের কথা আর যেখানেই বল এখানে না বলাই ভাল। এটা হল হিমের রাজ্যি। বাইরে এর সবটাই হিমে জমাট। কিন্তু-‘ বলেই বুড়ী ছড়া কাটে-
উতোর সাগর উতোরে
জমাট হিমের ভেতরে
লুকিয়ে আছে গরম প্রাণ
গরম রসের বইছে বান।
বাইরে যতো ঠাণ্ডা, ভেতরে ততো গরম। খুঁজে নাও গো ভিনদেশী মানুষ। সে গরমের ওমটুকু পেতে হলে চুপ করতে হবে। এমনি হবে না তা বলে দিচ্ছি -‘। বলেই স্কুয়ার দিকে এক চোখ টিপে বুড়ীর আবার কুলকুল করে হাসি।
হঠাৎ বুড়ী গম্ভীর। গম্ভীর গলায় বলে, ‘কিন্তু এই শূন্যির নিচে থার্মোমিটারের পারাটা যে আটকে। ওটা কিছুতেই তো ওপরে ওঠে না। আমার ডান হাতখানাও ঐ শূন্যিতে আটকে যায়। পারার দাগের মতো। কিছুতেই ওপরে উঠতে চায় না। চরকা ঘুরোতে বড় কষ্ট। গাউটে আমি বিলকুল আউট। তা তুমি যদি রূপকথার গপ্পো শুনতে চাও তো আমার চরকাখানা ঘুরোও। নিত্যি ওটা ঘোরায় স্কুয়া। ওই আমার গল্পের ভাঁড়ারী। আগে ওটা করত ওর বাপ। আমার কাছে রূপকথা শুনে সেগুলোর ওপরে লেখাপড়া করে ও অনেক মান্যি পেয়েছে। এখানকার সোসাইটির লোকেরা ওকে গলায় মালা দিয়ে সভাপতি বানিয়েছে। এখন ওকে দূরে দূরে যেতে হয়। কাছে পাই না। আজ তোমার মতো একজন জোয়ান ছোকরা যখন পেয়েছি তখন আর ছাড়ছি নে। স্কুয়ার আজ ছুটি। ও ছুঁড়ির কাজ আমাদের চা-কফি যোগান-‘
ঘাড় নেড়ে বলি, ‘আমি রাজী-‘
বলতে বলতে স্কুয়া কফির ট্রেটা এগিয়ে ধরেছে সামনে। নজর করিনি কখন চুপচাপ সরে গিয়ে কফিটুকু তৈরি করে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে একরাশ ঘরে তৈরি প্যানকেক। তার সঙ্গে গন্ধে ভুরভুর চমৎকার চীজ। খেতে খেতে আমার জিজ্ঞাসা, ‘স্কুয়া তোমায় গ্যানগ্যান বলে কেন’
‘ও ডিয়ার, ডিয়ার। তাও জান না। আমি হলুম জ্যাকের ঠাকমা – গ্র্যান্ড মা। আর স্কুয়ার গ্রেট গ্র্যান্ড-মা – পো-ঠাকমা। গ্রেট গ্র্যান্ড-মা কথায় কথায় গ্যানগ্যান। কেন খারাপ কোথায়-‘
‘বল কি গো গ্যানগ্যান – এমন মিষ্টি ডাক তো আমি আর শুনিনি-‘
যেমন কড়ার তেমনি কাজ। আমার চরকার ডাঁটি ঘুরোনো শুরু। ভাগ্যিস ছেলেবেলায় অভ্যেসটা রপ্ত ছিল মেজ ঠাকুমার চরকা ঘুরিয়ে। গ্যানগ্যান আমাকে পরখ করে দুটো পাঁজ থেকে সুতো নিলে সাঁ সাঁ করে। খুব খুশী বুড়ী। ‘বাঃ, বেশ হাত-‘
উৎসাহের চোটে আমার চরকা ঘুরোনো। গোঁ গোঁ করে ঘোরে চরকা। তাল বুঝে আমার ছড়া-
‘ঘ্যাঁগর চরকা ঘ্যাঁগর
রাজপুত্তর কাতর
হটর হটর পবনের না
রাজকন্যের দেশে যা।’
‘এ্যাঁ, এ্যাঁ, কি বললে, কি বললে-‘ গ্যানগ্যান কানটা বাড়িয়ে দিলে তক্ষুনি। ‘আহা, আবার একবার বল। ভারী চমৎকার ছড়া তো। মানেটা আমায় বুঝিয়ে দাও-‘
তর্জমা করে বুড়ীকে মানেটা বোঝাই। বলি, ‘এটা আমাদের দেশের রূপকথা-‘
‘বাঃ বাঃ কি সুন্দর রূপকথা গো আমাকে শোনাতে হবে। তার বদলে আমি আমার পো-নাতনীকে তোমার সঙ্গে বে দোব। অবিশ্যি ও যদি রাজী থাকে-‘
পষ্ট গ্যানগ্যানের পাশে বসা স্কুয়ার মুখটা ঝট করে আগুন রাঙা। তাড়াতাড়ি তার কথা, ‘আঃ কি আজেবাজে বকছ গ্যানগ্যান। রূপকথাটা শুরু কর না-‘
আংকল্ জ্যাকের মেয়েকে সান্ত্বনার সুরে কথা, ‘ঠাকুমার একশো পার হয়ে এই সাত বছর চলছে। যদি দু’একটা আজে বাজে কথা বলেই ফেলে তাতে মনে করার কিছু নেই-‘
গ্যানগ্যান বুড়ী ওসব গ্র্যাহ্যের মধ্যেই আনে না। আমার দিকে তার হাসি ভরা চোখের মিটমিটে চাউনী। জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা বল দিকিনি সুমুদ্দুরের জলটা এত নোনা কেন-‘
মনে ভাবি, এটা একটা প্রশ্ন নাকি। বুড়ীর নির্ঘাৎ ভীমরতি ধরেছে। স্কুয়ার দিকে চাই। দেখি, চোখ টিপে তার ইশারা। আমি আর কথাটি না বলে চুপ।
পাঁজ থেকে সুতো টানতে টানতে বুড়ী বলে, ‘শোন তাহলে-‘



























