ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি জলে নিজেকে জাগিয়ে তুলে জেনেছিলো ঘুম তাকে পদ্মপুকুরে এনে ফেলেছে। ইস্কুল মাঠের সবুজ কালো ঘাসের উপর একদিন সে জেগে উঠে নিজের রক্তাক্ত হাত পা দেখে আঁতকে উঠেছিলো। এত রক্ত কোথা হতে এলো? কোন স্বপনের অতল হতে উঠে কারা দিলো জাহান আরার বুক ও পিঠ আঁচড়ে? মনে পড়ে, ভূতের থাপ্পড় খেয়েছিলো আনোয়ার খন্দকার গলির অন্ধকারে।
নিশুতি জোছনায় ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে আনোয়ার সেদিন ফিরছিলো বর্ধমান শহর হতে তাদের কোয়ার্টারে। গলিতে পা রাখতেই দমকা হাওয়া এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেল যেন তার মান ইজ্জত, খাঁ খাঁ করে উঠলো আনোয়ারের তলপেট আর একই সঙ্গে পেয়ে গেল বেদম পেচ্ছাপ। মূত্রত্যাগ করতে পাশ ফিরে খন্দকার গলির পাঁচিলের সান্নিধ্যে আসতেই সপাটে তার ব্রণ ভরা গালে এসে পড়লো ডান হাতের একটা চড় আর রেখে গেলো পাঁচ আঙুলের দাগ। অথচ কোনো হোগামারানিকে চোখে দেখা গেল না গলিতে। কোয়ার্টারে ঢুকে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে ঘষে ঘষে গাল থেকে দাগ উঠলেও তার মন থেকে গেলো না ভূতের ভয়, কটাদিন জাহান আরা রাতে টর্চ নিয়ে তাকে বাসস্টপ থেকে গলি দিয়ে ঘরে আনতে গেলো মাথায় ওড়না চাপিয়ে। অবশেষে ছোটখালাকে ডেকে সাতশো সত্তর টাকার তাবিজ করানো হলে, সে তাবিজ গিলে খেতে পারলো আনোয়ারের ভূতের ভয়। এরপর আর ভূতের চড় খেতে হয়নি আনোয়ারকে অথচ ঘুমের ভিতর জাহান আরার উপর তাদের উপদ্রব বেড়েই চলল।
অনেক দিন ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে মোরশেদের আস্তাবল থেকে কোয়ার্টারে ফিরে জাহান আরা গ্যাসে চায়ের জল চাপিয়ে, পাশে সিমুইয়ের দুধ বসিয়ে চট করে বাথরুমে গিয়ে দেখে এসেছে তার দুই ঊরুতে নখের দাগ কত গভীর, অথবা তার ঠোঁটের নিচের কালশিটে অতটা আবছা কি হয়েছে, যাতে সে নির্বিঘ্নে বাজার হাট করতে পারে! একেকবার মনে হয়েছে মোরশেদের ঘোড়াগুলোই বা কি! রাতের অন্ধকারে ঘরের মহিলাকে ভূতে টেনে নিয়ে আসছে দেখেও সাড়াশব্দ করে না! একটুও ডর করে না! অথচ সিনেমা সিরিয়ালের ঘোড়াদের দাপট দেখো! সব অভিনয়! গ্যাসে দুধ ফুসলে উঠলে জাহান আরা সিটিয়ে যায়।
আনোয়ার কোর্টের দিকে রওনা হয়ে গেলে ওড়নায় কালশিটে ঢেকে জাহান আরা খন্দকার গলি দিয়ে বাজারে আসে। রাঙা আলুটা, লাল মুলোটা, কাঁচা কলাটা কিনে ফেরার পথে সে মোরশেদ ও তার ঘোড়ার মুখোমুখি পড়ে যায়। জাহান আরা আরো সিটিয়ে আসে। অথচ ঘোড়া বা মোরশেদ, কেউই যেন তাকে আগে কখনো দেখেনি, এমনভাবে এড়িয়ে বেরিয়ে যায় পাশ কাটিয়ে, যে খন্দকার গলির শূন্যতা জাহান আরাকে গিলে খেয়ে জানিয়ে দেয় সে আসলেই কতখানি একা। যেন পৃথিবীর সকলে তাকে ভূতের খপ্পরে ছেড়ে দিয়েই খালাস। ঘোড়া না মোরশেদ, কার উপর অভিমানে যেন সে কোয়ার্টারে ফিরে দুপুরে আর কিছু খায় না। সারা বিকেল ফ্রিজ খুলে বরফ বের করে ঠোঁটের কালশিটের উপর চেপে ধরে রেখে সর্দি বাধায়। রাতে আনোয়ার ফিরে এলে তাকে হাঁচি চেপে চালের রুটি আর গোস্ত দিতে গিয়ে সে চোখ হতে অশ্রু বের করে ফেলে, তারপর আরো রাতে সে বিছানায় যায় আরেকটি অভিনব নিদ্রাসফরের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। সকালে চোখ মেলে ফের মোরশেদের আস্তাবলে। জাহান আরার পিচুটি ভরা চোখের দিকে মোরশেদের ঘোড়াদুটো চুপ করে চেয়ে থাকে। ওদের চোখে না আছে ভয়, না আছে ভালোবাসা। শুধু বোবাদৃষ্টি দিয়ে ওরা জাহান আরাকে দেখে, কোনো শব্দ করে না। মাছি উড়ে উড়ে ওদের নাকেতে, মুখেতে, পেটেতে, পাছাতে এসে বসে, গা কাঁপিয়ে মাছিও তাড়ায় না ঘোড়াদুটো। এ কেমনতর অশ্ব!– ভাবতে ভাবতে জাহান আরা কোয়ার্টারে ফিরে আসে।
বেলায় খালামনি খবর আনে মোরশেদের ঘোড়ারা পাগল হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে বাজারে, সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই লাথ কষাচ্ছে। জাহান আরা বুঝলো ভূতে শুধু তাকেই ধরেনি, ঘোড়াদেরও ভর করেছে। পশু- পুলিশ ডেকে এনে ঘোড়াদুটোকে গুলি করে মেরে তবে ভূত বাগে আনা গেছে, সন্ধ্যায় এই খবর পাওয়া ইস্তক জাহান আরা চুপ মেরে থাকে।
পরদিন তার ঘুম ভাঙে দত্তাবাদের কুয়াশায়। চারদিকে হাওর ভরা পানি আর পানি ভরা মাছ আর মাছেদের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে উঠে এসে কুয়াশা গজিয়েছে। সেই আবছা হাওর চরাচরের মাঝে ফিনফিনে নাইটি গায়ে জাহান আরা ঠান্ডায় থরথর করে কেঁপে ওঠে। কাঁপতে কাঁপতে কোয়ার্টারে ফেরার পথে সে বোঝে এই ঠান্ডাতেও কপালে যা ঘাম বলে মনে হয়েছিলো তা আসলে রক্ত। খন্দকার গলির ভিতর দিয়ে জাহান আরার আবছা ছায়া এক ছুটে কোয়ার্টারে ফিরে আসে। বাথরুমের চৌবাচ্চার ভিতর মুখ ও মাথা ডুবিয়ে রক্ত ধোয়। আরশির কাছে এসে চুল সরিয়ে ক্ষতর উপর লাল ঔষধ দেয়। তারপর পরিপাটি পোশাকে চুপিসাড়ে আনোয়ারের পাশটিতে এসে শুয়ে ঘুমের ভাণ করে। আনোয়ার তার বিবির ঘুমের এই অসুখের খবর রাখেনা।
দুপুরে ঘুমনোর অভ্যাস নেই জাহান আরা। তা না হলে দুপুরের ভূতেরা তাকে আরো কোন কোন দেশে নিয়ে ফেলতো কে জানে! বিবাহের পঞ্চম বৎসরে সে একটিবার মাত্র দুপুরবেলায় ঘুমিয়েছিলো। তাও গোসলের সময়, নাঙ্গা শরীরে। ঘুম যখন ভাঙলো তখন সে বাথরুমের চৌবাচ্চায় ভাসছে, আর চৌবাচ্চার কালো পানিতে ভেসে বেরাচ্ছে নানা জাতীয় মরশুমি ফল, ভাসছে আঙুর, ভাসছে আপেল, তরমুজের টুকরো আর জাহান আরার ঘন কালো চুল। পাশের কোয়ার্টার থেকে ভেসে আসছে ফরিদা খানুমের গলা, তিনি বলছেন, “জিকর মেরা সুনা তো চিড়কে কাহা, কিস দিওয়ানে কি বাত করতে হো?”
পানি খামচে, খাবলে জাহান আরা চৌবাচ্চায় ভাসমান ফলের টুকরোর মাঝ থেকে উঠে এসে গায়ে কাপড় জড়ায়। তার ভয় হয়, বাথরুমের ভিতরের ভূতেরা তার ভেজা নাঙ্গা দেহ চেটে ফেলবে বুঝি। সেই একবারই সে নিজের শরীরে কোথাও কোনো ক্ষত আবিষ্কার করেনি। কেবল কাপড় পরতে পরতে জলে ভেসে থাকা ফলের টুকরোর দিকে চেয়ে তার চোখে নেশা ধরেছিলো। সেই নেশাকে প্রশ্রয় না দিয়ে জাহান আরা দ্রুত মধ্যাহ্নভোজন সেরে খালামনির বাড়ি চলে যায়। এর কিছুদিন পর আনোয়াররা জানতে পেরেছিলো তাদের খোকা হবে।
পেটে যখন খোকা, রাত হলে জাহান আরা খাটের পায়ার সঙ্গে নিজের হাত বেঁধে ঘুমোতে যেত। চার মাস ভূতে এই উপায়ে চুপ ছিলো। তারপরই আনোয়ারকে সে চড় মারে। বোধহয় ভূতের গোঁসা হয়েছিলো জাহান আরাকে আগের মতো কাছে না পেয়ে। আনোয়ারের ব্রন ভরা গালে বরফ ঘষতে ঘষতে জাহান আরার মায়া লেগেছিলো যত না আনোয়ারের উপর, তার চেয়েও ঢের বেশি খন্দকার গলির ভূতেদের উপরে। আনোয়ারের গালে ভূতের হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপের উপর হাত বুলিয়েছিলো জাহান আরা। আনোয়ার ভেবেছিলো বিবি বুঝি তাকে আদর করছে। কিছুদিন পর পর টর্চ হাতে খন্দকার গলির অন্ধকারে ভূত খুঁজতে বেরিয়ে জাহান আরা বাসস্টপ অবধি গেলো, আনোয়ার ভাবলো তার বিবি বুঝি তাকে কোয়ার্টারে নিয়ে যেতে এসেছে। বোকা আনোয়ার আসল খবর জানলো না। অথচ এরপর একদিন কাকভোরে পদ্মপুকুরে গলা অবধি জলের ভিতর জেগে উঠে জাহান আরা টের পেলো পেটের খোকাকে ভূতে খেয়ে ফেলেছে তার অগোচরে। তার ভিতরে এখন একটা ফাঁপা পুকুর গমগম করছে। পদ্মপুকুর হতে উঠে এসে বাবলাতলা পার করে গলির ভিতর সে ঢুকলো যখন, তার পিছু পিছু তার যোনি বেয়ে, ঊরু ও দাবনা বেয়ে, জঙ্ঘা ও পায়ের গোছ বেয়ে মাটিতে নেমে আসা রক্তের ধারাও প্রবেশ করলো খন্দকার গলিতে। ভূতেরা সেদিন উঁচু হতে চুপ করে জাহান আরার একাকী মৌনমিছিল দেখেছিলো।
খালামনি এসে জাহান আরাকে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে। জাহান আরা মনে করলো ভূত বুঝি এবার ঘাড় হতে নাবলো। কিছুদিন সব চুপচাপ। রক্তপাত একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো একসময়। শুধু কাটা মরশুমি ফল দেখলে বমি পেত তার। কাটা আম, জাম, আনারস, আঙুর দেখলেই পেটের ভিতর হতে খোকার স্বপ্ন ও খোকার শূন্যতা তার গলা বেয়ে উঠে আসতে চাইতো। আনোয়ার একদিন এসে ছলছল চোখে জাহান আরার হাত চেপে ধরে ফিরে যাওয়ার কথা পাড়লো। কাপড় জামা গুছিয়ে কোয়ার্টারে ফিরে আসার আগে জাহান আরাকে বাদামী রঙের বাতাসা খেতে দিলেন খালামনি। ওতে মন্ত্র ও ম্যাজিক দুইই আছে,– এতে যদি ভূতেরা তার পিছু ছাড়ে!
রেশনের কেরোসিন তেল নিয়ে ফেরার পথে গলির ভিতর মোরশেদের মুখোমুখি হয়ে যেতে সে টের পেলো ভূতেরা কোথাও যায়নি, মোরশেদের বোবা চোখে তার মৃত ঘোড়াদের ফেলে যাওয়া মৌনতা সেজে সেইসব ভূতেরা নিশ্চুপে এখনো জাহান আরাকে দেখে যাচ্ছে। মোরশেদের চোখ হতে জাহান আরা নিজের চোখ নামিয়ে বুকের কাপড় ঠিক করে কেরোসিনের জার হাতে দ্রুত হেঁটে চলে কোয়ার্টারের দিকে। তার পিছু ধাওয়া করে মোরশেদের জর্দার গন্ধরা বেশ কিছুদূর যায়, তবু ঠিক তার নাগাল পায় না।
পরদিন ভোরে তার ঘুম ভাঙে মোরশেদের আস্তাবলে। চোখ খুলে দেখে ঘোড়ার পানি খাওয়ার গামলার সামনে সে দাঁড়িয়ে। এখানে আর কোনো ঘোড়া নেই, এক কোণে কেবল একটা রোম ওঠা খচ্চর ঘুমোচ্ছে। এত ভোরে মোরশেদও বুঝি জাগেনি। পা কামড়ে বসে থাকা মশাদুটো মেরে জাহান আরা আবিষ্কার করে তার বাম হাত জুড়ে অসহ্য যন্ত্রণার আল্পনা জেগে উঠছে। আস্তাবলের উল্টোদিকে একটা দড়িতে বুঝি মোরশেদের লুঙ্গি শুকোতে দেওয়া আছে। জাহান আরা ঝুলন্ত লুঙ্গির কাপড়টাকে অনেকটা সময় ধরে দেখে, তার ইচ্ছে হয় ওটা চুরি করে কোয়ার্টারে নিয়ে যেতে, তারপর আনোয়ার কোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলে লুঙ্গি পরে বসে থাকতে। কিন্তু কাপড়ের খণ্ড সে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনা, তাই পরাজিতের মতো বাম হাতের কব্জিতে কালশিটে নিয়ে কোয়ার্টারে ফিরে আসে জাহান আরা।
এসে দেখে অকাতর ঘুম আনোয়ারের শিয়রে ও শরীরে।
দেখে বড় রাগ হয় তার, ধাক্কা দিয়ে সে জাগায় আনোয়ারকে আর বলে, “আমি আর তোমার সঙ্গি থাকবেনে। খোকা মরেচে, আমিও ভূতের হাতি মরতি চায়না।” আনোয়ারকে সে বাম হাতের আঘাতের চিহ্ন দেখায়। আনোয়ার চুপ করে থাকে। আনোয়ারকে সে তার পিঠের আঁচড় দেখায়। আনোয়ার মাথা নিচু করে।
জামা কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে খন্দকার গলির ভিতর দিয়ে শেষবারের মতো জাহান আরা যখন বেরিয়ে আসছে আনোয়ার হোসেন তখনও থম মেরে বসে আছে কোয়ার্টারের সবুজ ড্রয়িং রুমে। ঘুম তার ঘুচেছে চিরকালের মতো। ভূত তার মাথা থেকে নামেনি, নামবেও না কোনোদিন। খন্দকার গলির অন্ধকার হতে এক জাহান আরা নির্গত হলে আরেক জাহান আরা আসবে, হয়তো তার নাম বদলে হবে রোশন আরা, অথবা তহমিনা, অথবা কোহিনূর, বা সানজিদা, বা রাকেয়া, রাবেয়া, আনোয়ারা, ফতিমা, সলমা, সুলতানা, রোকসানা, শবনম… অথবা শবনম।



























