আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন।
তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান।
আমার মনে এসব দৃশ্যের গর্ভের ভিতর ফুটে উঠছে সারি সারি দৃশ্যঘটনার ফুল,পাপড়ি,শুকনো পাতা। কালস্রোত স্তদ্ধ হয়ে আছে।
আবার ভাবনাস্রোত শুরু হল। আমাদের বাড়ির পাশে একগলা জঙ্গলের ভিতর কিছু নতুন মানুষজন দেখেছিলাম গতসপ্তাহে। তারা টোটো বোঝাই করে এসেছিল নন্দীগ্রাম থেকে। এসেই ভোর থেকে সন্ধে অবধি বন কেটে সাফ করে বোঝা বেঁধে নিয়ে যেত। শুকনো লতাপাতা,কাঁটা ঝোপ, গাছের ডাল সব। আমার মা শনগাছ দিয়ে ঝাঁট বানায়,সেসব শনগাছও চেঁছেপুঁছে নিয়ে গেছে।
আবার গান ঢুকে পড়ছে স্মৃতির ভিতর। বৃষ্টির তেজ কিছুটা মরেছে। এবারের গানটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে – ‘ ‘এত গয়না বেটি কোথায় পেলি?
সিংহীর উপর ধিঙ্গী হয়ে বাপের বাড়ি চলে এলি!’
মনে পড়ছে,কাজহারানো, জ্বালানি কাটা মানুষগুলোর ভিতর একজনকে আমি জিগগেস করেছিলাম – ‘হ্যাঁ গো,তোমরা রান্না করার গ্যাস,সিলিন্ডার পাওনি?’
সে বলল – ‘হ্যাঁ বাপ,উজালা গ্যাস পেয়ছি,খাবার যোগাড় করতে পোঙার ছালব্যাকলা উঠে গেল,মাসে মাসে আবার গ্যাসের টাকা।’
একটু দূরে দেখছি একজন মহিলা অনেক দূরে বুনোবেলি গাছের গোড়া বাঁচিয়ে গোয়াললতা পরিষ্কার করছে, যাতে পায়ে না জড়িয়ে যায় বনে ঢুকতে গেলে। মায়ের মতোন দেখতে খানিকটা অথবা রোগা মেয়েপাখির মতোন।পাশে তার দুটি ছেলে দুটি মেয়েকে বসিয়ে রেখেছে শুকনো মুড়ি দিয়ে। লতা কাটার গন্ধে ভারি বাতাস। আমি বলছি –
‘তোমার দাখানা তো ভোঁতা হয়ে গ্যাছে , অমন বাঁকিয়ে কাটছ কেন?’
সে ঘামভেজা জ্বলজ্বলে মুখে তাকিয়ে বলে –
‘উঁহু! যথিষ্টি ধার,গলা নেমি যাবে বদলোকের।আর এই ডুমুরডাল বাঁকিয়ে না কাটলে কষ লেগে চোখ নষ্ট হয়ি যায়।’
আমি বললাম – ‘ও। আচ্ছা, এই চারটি ছেলেমেয়ে তোমার? ’
সে বলল – ‘হুঁ।’ তারপর ডাল কাটতে কাটতে বনের ভিতর ঢুকে গেল।
আমি ভয়ে ছেলেমেয়েদের নাম শুধচ্ছি না,যদি বলে – ওই ছেলেটি গণশা,ওটি কার্তিক,ওই জোড়া মেয়ে দুটি লক্ষ্মী সরস্বতী। তাড়াতাড়ি একগলা বন থেকে পালিয়ে আসছি,যদি দৈবাৎ অন্ধকার বনে দেখা যায়- ঘুমে ঢুলে থাকে পেঁচা,গর্তে ধান খোঁজা ইঁদুর,না খেতে পাওয়া শুকনো সিংহ,খিদের জ্বালায় সাপ সন্ধানে গাছে ওড়া ময়ূর আর পুকুরে মুখ চুবিয়ে গুগুলি ধরা হাঁস,আর নিরন্ন কাটামুণ্ডু মহিষ।
এসব দেখে ফেললে আমি ভাত খেতে পারতাম না আর। দৃশ্যের কষ লেগে চিরঅন্ধ হয়ে যেতাম।



























