তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন।
তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান।

আমার মনে এসব দৃশ্যের গর্ভের ভিতর ফুটে উঠছে সারি সারি দৃশ্যঘটনার ফুল,পাপড়ি,শুকনো পাতা। কালস্রোত স্তদ্ধ হয়ে আছে।

আবার ভাবনাস্রোত শুরু হল। আমাদের বাড়ির পাশে একগলা জঙ্গলের ভিতর কিছু নতুন মানুষজন দেখেছিলাম গতসপ্তাহে। তারা টোটো বোঝাই করে এসেছিল নন্দীগ্রাম থেকে। এসেই ভোর থেকে সন্ধে অবধি বন কেটে সাফ করে বোঝা বেঁধে নিয়ে যেত। শুকনো লতাপাতা,কাঁটা ঝোপ, গাছের ডাল সব। আমার মা শনগাছ দিয়ে ঝাঁট বানায়,সেসব শনগাছও চেঁছেপুঁছে নিয়ে গেছে।

আবার গান ঢুকে পড়ছে স্মৃতির ভিতর। বৃষ্টির তেজ কিছুটা মরেছে। এবারের গানটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে – ‘ ‘এত গয়না বেটি কোথায় পেলি?
সিংহীর উপর ধিঙ্গী হয়ে বাপের বাড়ি চলে এলি!’

মনে পড়ছে,কাজহারানো, জ্বালানি কাটা মানুষগুলোর ভিতর একজনকে আমি জিগগেস করেছিলাম – ‘হ্যাঁ গো,তোমরা রান্না করার গ্যাস,সিলিন্ডার পাওনি?’

সে বলল – ‘হ্যাঁ বাপ,উজালা গ্যাস পেয়ছি,খাবার যোগাড় করতে পোঙার ছালব্যাকলা উঠে গেল,মাসে মাসে আবার গ্যাসের টাকা।’

একটু দূরে দেখছি একজন মহিলা অনেক দূরে বুনোবেলি গাছের গোড়া বাঁচিয়ে গোয়াললতা পরিষ্কার করছে, যাতে পায়ে না জড়িয়ে যায় বনে ঢুকতে গেলে। মায়ের মতোন দেখতে খানিকটা অথবা রোগা মেয়েপাখির মতোন।পাশে তার দুটি ছেলে দুটি মেয়েকে বসিয়ে রেখেছে শুকনো মুড়ি দিয়ে। লতা কাটার গন্ধে ভারি বাতাস। আমি বলছি –

‘তোমার দাখানা তো ভোঁতা হয়ে গ্যাছে , অমন বাঁকিয়ে কাটছ কেন?’

সে ঘামভেজা জ্বলজ্বলে মুখে তাকিয়ে বলে –

‘উঁহু! যথিষ্টি ধার,গলা নেমি যাবে বদলোকের।আর এই ডুমুরডাল বাঁকিয়ে না কাটলে কষ লেগে চোখ নষ্ট হয়ি যায়।’

আমি বললাম – ‘ও। আচ্ছা, এই চারটি ছেলেমেয়ে তোমার? ’

সে বলল – ‘হুঁ।’ তারপর ডাল কাটতে কাটতে বনের ভিতর ঢুকে গেল।

আমি ভয়ে ছেলেমেয়েদের নাম শুধচ্ছি না,যদি বলে – ওই ছেলেটি গণশা,ওটি কার্তিক,ওই জোড়া মেয়ে দুটি লক্ষ্মী সরস্বতী। তাড়াতাড়ি একগলা বন থেকে পালিয়ে আসছি,যদি দৈবাৎ অন্ধকার বনে দেখা যায়- ঘুমে ঢুলে থাকে পেঁচা,গর্তে ধান খোঁজা ইঁদুর,না খেতে পাওয়া শুকনো সিংহ,খিদের জ্বালায় সাপ সন্ধানে গাছে ওড়া ময়ূর আর পুকুরে মুখ চুবিয়ে গুগুলি ধরা হাঁস,আর নিরন্ন কাটামুণ্ডু মহিষ।

এসব দেখে ফেললে আমি ভাত খেতে পারতাম না আর। দৃশ্যের কষ লেগে চিরঅন্ধ হয়ে যেতাম।

আরও পড়ুন:

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি।…

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা…

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি…

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের…

পড়ুন

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের…

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে…

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা…

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক…

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন…

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের…

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি  …

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন…

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল।…

পড়ুন

আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;   কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে…

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার…

পড়ুন

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে…

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি।…

পড়ুন

গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে…

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে…

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন…

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি…

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর…

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো…

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার…

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে…

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা