সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই তাদের গাঁয়ের গেরস্তদের ওপর উৎপাত। তাই তখনকার লোকদের অনেকেই মন্তর-তন্তর জানত। ভূত ঝাড়াতে কি দত্তি তাড়াতে। সব গাঁয়েই ওস্তাদ গুণীনদের মন্তর জানা। এই সব ওস্তাদদের সেরা ওস্তাদ অ্যাডাম। তার মন্তরে ভয়ানক জোর। তার বাড়িটা সুমুদ্দুরের ধার-ঘেঁষা। গাঁয়ের একটেরে। গাঁয়ের লোকেরা ভেড়া পোষে। টাট্টু ঘোড়া গরু পালে। সামান্য ক্ষেতখামারও করে। কেউ কেউ যাঁতাকল পেতে গম পেষাই করে। অ্যাডামের ঘরেও একখানা যাঁতাকল। তার পাথরের চাকিটা প্রকাণ্ড। ওজনে বিষম ভারী। তাকে ঠেলে চালানো এক বিপর্যয় ব্যাপার। সেই যাঁতায় শুধু নুন পেষা হয়। অ্যাডাম নিজে একটু কুঁড়ে মানুষ। যাঁতা চালায় তার বৌ। নিত্যি যাঁতা ঘোরানো। সারা গাঁয়ের নুন পেষা। একলা বৌটা পারবে কেন। একদিন সে কেঁদে কেটে হাট পাকায়। সে কিছুতেই আর চাকি ঘোরাবে না। রেগে-মেগে অ্যাডামকে বলে-
‘দিন রাত্তির লবণ পিষে
গতর গেল ধুলোয় মিশে
এতই যদি জানিস গুণ
ঘুরিয়ে চাকি পিষগে নুন-’
‘কিঃ এতো বড়ো কথা-। গুণীনের গুণের ওপর ফোঁড় কাটা। দেখাচ্ছি দাঁড়া।’ অ্যাডামও রেগেমেগে বাড়ি ছাড়া। হাঁটতে হাঁটতে গাঁ ছাড়িয়ে তার পা ফাঁকা পাহাড় আর মেঠো অঞ্চলে। সেখানে জনমনিষ্যি নেই। সেটা ধেড়ে দত্তির রাজ্যি।
ধেড়ে দত্তির দুটো গিন্নী
গ্রোত্তি মিন্নি, শ্রোত্তি ফিন্নি
দূর থেকে অ্যাডাম দেখে কি-ধেড়ে দত্তিটা একটা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসা। তার দুই গিন্নী দুপাশে। মহা আরামে সে কচি কচি শুয়োর ছানা চিবুচ্ছে। ভয় পাওয়া দূরের কথা। অ্যাডাম তা দেখেই দিল এক মন্তরের বাণ ছুড়ে ধেড়ে দত্তিটার দিকে। বাণ সটান বিঁধেছে দত্তির বুকে এফোঁড় ওফোঁড়। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে ধেড়ে দত্তির আরামও গেল ছুটে। দত্তি হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাটিতে মুখ রগড়ায়। আর গোঁ গোঁ আওয়াজ করে। দত্তির হাতে পায়ে টাস। বুকে ডলে বাঁশ। তার হাতির মতো শরীরটা বেদনায় ছটফট। কি হল কি হল করে দত্তির দুই গিন্নী তার গায়ে মাথায় হাত বোলায়। কিন্তু কিসে কি-
ফুস মন্তরের এমনি জোর
দত্তির বুকে এফোঁড় ওফোঁড়।
দত্তি চেঁচায় জান গেল মোর।
দত্তির দুই গিন্নী প্রোত্তি মিন্নি আর প্রোত্তি ফিন্নি তো কেঁদেই আকুল।
‘কত্তা মল্লে কি হাল হবে
শুয়োর ছানা কে খাওয়াবে-
ভেউ ভেউ করে কান্না দুই গিন্নীর। এমন সময় অ্যাডাম সেখানে হাজির।
‘কি হয়েছে। এত কান্নাকাটি কেন-’ যেন সে কিচ্ছুটি জানে না।
‘আর কেন। আমাদের পেয়ারের কত্তার পরান যে যায়। এখন কি করি উপায়-’
‘আমি সারিয়ে দিতে পারি। আমায় কি দেবে বল-’
‘আমরা দু’জন সারাজীবন তোমার কেনা বাঁদী হয়ে থাকব। যখুনি ডাকবে তখুনি আসব। যে কাজ বলবে সেই কাজ করব-’
‘-ঠিক তো, তিন সত্যি কর-’
‘-তিন কেন, তিন হাজার সত্যি করতে পারি। এখন বাঁচাও তো কত্তাকে-’
অ্যাডাম মন্তর পড়তে থাকে। উলটো পাকের মন্তর। আর সঙ্গে সঙ্গে ধেড়ে দত্তির হাত পায়ের টাঁসও ছাড়তে থাকে। ঝেড়ে পেড়ে উঠে বসে ধেড়ে দত্তি অ্যাডামের পায়ে পড়ে আর কি।
‘যে শুয়োরের বাচ্চাটা খাচ্ছিলুম সেটা আসল শুয়োয়ের বাচ্চা। ভারি বদ। তার মাংসটা পেটে যেতেই মাথায় একটা কেমন চক্কর। কোথা দিয়ে কি যে হয়ে গেল! তা তুমি আমায় বাঁচিয়েছ। আমি তোমার কেন গোলাম।যা বলবে তাই করব-’
‘-যো হুকুম-’
ধেড়ে দত্তি আর তার দিউ বৌয়ের সঙ্গে পাকাপাকি বন্দোবস্ত। অ্যাডামের বাড়ি ফেরা। বৌকে কোন কথা নয়। শুধু তার মুখে একটা বুলি ‘ফট্’। বৌটা অবাক্। দেখে ঘরঘর করে যাঁতার চাকি ঘোরে। ঝরঝর করে পেষা নুন পড়ে টন টন। চটপট একঘর নুন। অ্যাডাম তখন চেঁচায় ‘হট’। সঙ্গে সঙ্গে সব বন্ধ। যাঁতা একদম ঠান্ডা। চুপচাপ। কাউকে দেখা যায় না। কিন্তু কাজ হয়ে যায়। গুণীন ছাড়া আর কেউ তো দত্তিদের দেখতে পায় না। দেখে শুনে অ্যাডামের বৌ তো ‘থ’। বৌ-এর মুখে আর রা- নেই।
গায়ে চড়িয়ে গয়না
ঘোরে চরকি ঘুরনি
ওড়ে রঙীন উড়নি।
অ্যাডামের ঘরে শান্তি। তখন,
অ্যাডাম গিন্নি মনের সুখে
কেকের গরাস ওঠায় মুখে
ঝলসে নিয়ে ভেড়ার ঠ্যাং
খুব আরামে চিবিয়ে খান
আর ওদিকে,
ধেড়ে দত্তির গিন্নী যারা।
ভুতের বেগার দিচ্ছে তারা
নুন বেচে অ্যাডাম ফুলে ফেঁপে জয়ঢাক। এখন তার বড় বাড়ি। খোঁয়াড় ভর্তি ভেড়া। গোয়াল ভর্তি দুধেল গাই। আস্তাবলে পঞ্চাশটে টাট্টু। অ্যাডামের রমরমা দেখে কে।
ওদিকে গাং-ডাকাতের দল সুমুদ্দুর পার হয়ে আসে। মুখে তাদের মুখোস। হাতে নাঙ্গা তরোয়াল। যা পায় তাই চুরি-ডাকাতি করে নিয়ে তোলে জাহাজে। তারপর পাল তুলে দিয়ে সুমুদ্দুর পার। গাং-ডাকাতেরা ঘোরে গাঁয়ের আনাচে-কানাচে।
অ্যাডামের বাড় বাড়ন্ত দেখে গাং-ডাকাতদের সর্দার ঘাপটি মেরে বসে থাকে তার যাঁতা কলের আড়ালে। ব্যাপারটা কি জানা দরকার। এত কম সময়ে এত নুন হয় কি করে। লোকের দেখা নেই, জনের দেখা নেই। নুন তৈরী হচ্ছে। ব্যাপারটা কি-। হঠাৎ তার কানে যায় ‘ফট’। আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় দুটো ঝড়ের ঝাপটা ঘরে ঢুকে যাঁতার চাকিটা ঘুরোচ্ছে। চোখ রগড়ে দেখে। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু যাঁতার চাকি ঘুরছে ঘরঘর করে। আর নুন পড়ছে ঝরঝর করে। দেখে তো গাং-ডাকাতদের সর্দার হাঁ।
হঠাৎ তার মাথায় একটা দুষ্টু মতলব। দক্ষিণ দেশে নুন মেলে না। নুন বড় আক্রা। সেখানে এই কলটা তুলে নিয়ে গেলে হয় না।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ।
রাত দুপুরে অ্যাডামেরা দুই কত্তা-গিন্নী আগুনের ওমে কম্বলের তলায় ঘুমিয়ে কাদা। ওদিকে যাঁতাকল চলে দুই দত্তিবৌ-এর হাতের ঠেলায় সারারাত। গাং-ডাকাতদের সর্দার চুপিচুপি তার শাগরেদদের ডেকে এনে যাঁতাকলটা উঠিয়ে নিয়ে যায় জাহাজে।..
তা কল ওঠালে কি হবে! দত্তিনীরা তো আর কল ছাড়তে পারে না। তারাও যাঁতা ঘোরাতে ঘোরাতে সেই সঙ্গে গিয়ে ওঠে জাহাজে। তাদের কেউ দেখতেও পায় না। জাহাজের মাল্লারা তখুনি চার চারে ষোল খানা পাল তুলে দে হাওয়া।
জাহাজে উঠে এদিকে দত্তিনীদের যাঁতা ঘোরানোর কামাই নেই। কামাই নেই নুন তৈরির। হু-হু করে নুন জমছে জাহাজে। দেখে শুনে সর্দার আর তার শাগরেদদের মহা ফুর্তি। বোতল বোতল মদ গিলে নেচে গেয়ে তারা বেহুঁশ। শেষে নাক ডাকিয়ে পেল্লায় ঘুম।
ঘুম ভাঙতেই গাং-ডাকাতগুলো দেখে সর্বনাশ। তারা সবসুদ্ধ চাপা পড়তে চলেছে নুনের গাদায়। সর্দারটা ঝেড়ে পেড়ে উঠে যাঁতাকল থামাতে যায়। কে যেন তাকে ছিটকে ঠেলে দেয়। মাঝি-মাল্লা লোক-লঙ্কর সবাই এসে যাঁতা থামাতে যায়। সব ক’টাই ছিটকে পড়ে যায় যাঁতার কাছ থেকে। যাঁতাও থামে না। নুন তৈরিরও কামাই নেই।
‘হট’ মন্তর না শুনলে তো দত্তিনীরা থামবে না। আর সে মন্তরও কেউ জানে না-।
শেষকালে নুন জাহাজে বোঝাই হয়ে ছাপিয়ে পড়া। জাহাজটা ভারী হতে হতে এক সময় ভুষ করে জলের তলায় ডোবা। তাতে লোক-লশকর আর যাঁতাকলটা অবধি জলের তলায়। গাদা গাদা নুন সুমুদ্দুরের জলে গোলা। তার জল নোনা তখন থেকেই।
‘শুনলে তো, সুমুদ্দুরের জল নোনা হবার গপ্পো। আমার কথা যদি বিশ্বাস না কর তো-’
বলেই বুড়ীর আমাকে জিজ্ঞেস ‘কোথা দিয়ে এ দেশে এসেছে? নরওয়ে দিয়ে না স্কটল্যাণ্ড দিয়ে-’
‘স্কটল্যান্ড’ আমার জবাব।
বুড়ীর তখুনি জবাব- ‘তাহলে পেন্টল্যান্ড ফার্থ বলে সুমুদ্দুরের ঐ অঞ্চলটা পার হয়ে এসেছ। দেখেছ কি ওখানে কত বড় একটা ঘূর্ণি আছে সুমুদ্দুরের ওপরে-’
‘বোধ হয় দেখেছি’- আমার আমতা আমতা কথা।
গপ্পো শেষ। স্কুয়া গিয়ে কফির ট্রে নিয়ে এল। আংকল জ্যাক এতক্ষণ বসে বসে পাইপ টানছিল। আর এক মনে গপ্পো শুনছিল। বললে, ‘এই গপ্পোটার গোড়া হল নর্সসাগা। নরওয়ে দেশের রূপকথা-’
গ্যানগ্যান বললে, ‘আমি তোর মতো পণ্ডিত তো নই। আমি গপ্পোটা শিখেছি আমার গ্যানগ্যানের কাছ থেকে।
তবে শুনেছি আমার গ্রেট গ্রান্ড-পা আর আমার গ্যানগ্যান তাদের ছেলে মেয়েদের নিয়ে নরওয়ের কূল থেকে কাঠের নৌকোয় পাড়ি দিয়েছিল। সে অনেক বছর আগেকার কথা। সুমুদ্দুরের ওপর তখন প্রকাণ্ড ঘূর্ণিঝড়। সেই ঝড়ে নৌকোটা তাদের নিয়ে এসে এদেশের চড়ায় আটকেছিল। সে আর এক গপ্পো-।’



























