শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই।
রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা যায়। মায়া তার স্বভাব সুলভ চঞ্চলতায় বিছানায় বসেছিল। বারান্দার টবে একটা দুর্লভ পাতাবাহার দেখে ফিরে আসতেই দেখল রুমু ঝারণ দিয়ে বিছানা পাট পাট করছে। অগত্যা সোফায় বসে সে। রুমু প্লেট ভরে মিষ্টি দেয়। চা করে।
একটু বোসো না, এক্ষুণি ঋক্ মানে দেবার্ঘ আসবে। ওকে তো দেখোনি। ঊষা পীড়াপীড়ি করতে থাকেন, সুন্দর নাতিকে দেখাবার জন্য। রুমু আর ময়ূখ দুজনেই সুন্দর, দেবার্ঘ সুন্দর হবে বোঝাই যায়।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দেবার্ঘ ফেরে। রুমু দরজা খুলে দিলে ডাইনিং-এ কারোর দিকে না তাকিয়ে সে সোজা বাথরুমে যায়, বাথরুমের দরজা লাগাবার আগে ব্যাগ খুলে বইপত্র মেঝেতে নামিয়ে রাখে, তারপর ব্যাগ নিয়ে ভেতরে চলে যায়।
মায়া, মীরা, দুজনে অবাক হল। জানুয়ারির এই সন্ধ্যেয় ছেলেটা চান করবে-রুমি শুচিবাই নাকি? মীরা জানতে
চায়-বাহির থেকে এসে স্নান কর নাকি তোমরা, শীতেও কর?
-না, না, রোজ না। ঊষা সহাস্যে জানান। যেদিন যেদিন আর.কে.(R.K)-র কাছে পড়তে যায় সেদিনই। একটু
বাতিক আছে রুমুর…
নিজেদের ছেলে এবং নাতিনাতনির অবাধ্য স্বভাব, শীতকালের দুপুরে স্নান নিয়ে মারামারির পর্ব মনে রেখে মায়া রুমুকে বলে-বাব্বা! খুব বাধ্য ছেলে তো তোমার!
-প্রথম প্রথম গাঁইগুই করত। এদের বাড়ির মতো একটু জলে ভয় আছে তো! তা, এখন বলতে হয় না। পড়া থেকে ফিরেই বাথরুমে যায়-
-কিন্তু স্নান কেন? -কোথায় যায়?
–আর বলবেন না, ছেলে অঙ্কে একটু কাঁচা। কিন্তু অঙ্কটা তো ভাইটাল। ওদের স্কুলের স্যারকে রেখেছি। খুবই ভালো পড়ান R.K. মানে রাসেল খান…
একটু অর্থপূর্ণ হাসে রুমু। তারপর বলে—
মুসলনমান। ছাইপাশ গেলা জাত। মাগো, এমন ঘেন্না করে। আমি স্নান না করে ছেলেকে ঘরে তুলতেই পারি না।
ব্যাগটা ওয়াটার প্রুফ, ধুয়ে দিলে কিছু হয় না –জামা কাপড় জলে ভিজিয়ে রাখে, পরে কেচে দই…
–বাঃ! কি বাধ্য ছেলে তোমার। এমন মাতৃভক্তি দেখা যায় না।
শ্লেষ নয়, মায়া স্বাভাবিক গলাতেই বলে। কিন্তু পরেরটুকু যোগ করে খুব অঙ্ক কষে -ঊষা বৌদি তো পা নিয়ে যেতে পারবেন না, তুমি একদিন যেও রুমু। আজ আর বসব না।ইউনুসটা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে।
–কে ইউনুস?
-ওই যে ভাই, আমাদের রিক্সওয়ালা। আমাদের বাড়ি তো উল্টো পথে। ফেরার পথে পাওয়া যাবে না বলে ওকে
বসিয়ে রেখে এসেছি…
রুমু-ঊষা বৌদির থতমত দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে মায়া মীরাকে নিয়ে রাস্তায় নামে।
মীরা বলে, কি যে কর। শুধু শুধু মিথ্যে কথা বলার কি ছিল… শীতের রাত্রে বেচারীদের কাজ বাড়িয়ে দিয়ে এলে!
দুষ্টু হেসে মায়া বলে, শুধু সোফায় নয়, আমি কিন্তু বিছানাতেও বসেছি। পাগলদের একটু শিক্ষা দরকার।
একটা ভুল অঙ্ক নিয়ে রুমু আর ঊষা বৌদির নাকাল অবস্থা কল্পনা করে ভৈরবের রিক্সয় বসে কুলকুল করে হাসতে
থাকে মায়া আর মীরা।



























