কালো , আঁধারের মাঝে ;
কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়। বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে শুনেছিলাম আমাজনের নিগ্রো নদীর নাম, সেও কি আমাদের খুব কাছেই? একরাশ বিস্ময় কিলিবিল করছে। বাইরে প্যাচেপ্যাচে গরম। রাত কিন্তু বেশি নয়, তখন সাড়ে আটটা বা নটার কাছাকাছি হবে, অথচ এমন আধার দেখে মনে হবে যেন রাত ১ টা বেজে গেছে। শহর থেকে গেলে বোধহয় এমনই মনে হয়। এয়ারপোর্ট থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে আমরা হোটেলে ঢুকে গেলাম। হোটেলে ঢুকে দেখি কালো বড় বড় অনেক মুখোশ ঝুলছে দেওয়ালে। আপাতত এখানে এক রাত থাকতে হবে। আগামীকাল যাব আরও দূরের এক গ্রামে।
পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম শহর ভ্রমণে। প্রথমে যাব বাণিজ্য বন্দর তারপর স্থাণীয় বাজার দোকান ঘুরে নিগ্রো নদীর ধার। পোর্টে যাওয়ার পথে বুঝলাম চারিপাশে জঙ্গল দিয়ে ঘেরা এই রাজধানী। আমরা বেশিরভাগ সময়েই শহরের মধ্যে জঙ্গল দেখে থাকি কিন্তু এটা জঙ্গলের মধ্যের এক শহর যা রাতের অন্ধকারে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায়। সারি সারি বিশালাকার জাহাজ বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে , কিছু মাল বোঝাই , কিছু যাত্রী পরিবাহী। সাঁওপাওলো থাকতে শুনেছিলাম, ব্রাজিলের জলপথে ব্যবসার মূল বন্দর হল আমাজন নদীর উপর দুটি পোর্ট, তার মধ্যে এই বন্দর একটা, আর একটা আছে পাশের রাজ্য বেলেমে, সেখানেও আমাজনের বিস্তৃতি।
নিগ্রো নদী আর ধুসর নদী, দুই মিলে আমাজন নদীর জন্ম। ৬ কিলোমিটার অব্দি এই দুই নদীর মিলনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাজারে পসরা বছরের হরেকরমের মাছের। নদীর জলের মতই ধূসর আর কালো রঙের নকশায় সজ্জিত সেখানের মাছগুলোও। একটার পিঠে আর একটা করে মাছ রাখা। এমন সব মাছ চার বছর সাঁওপাওলোতে থেকে কখনই দেখিনি। একমাত্র চিনতে পারলাম কালো আর কালচে শ্যাওলা রঙের তাম্বাকি মাছ,আগে খেয়েছি, খুবই রান্না করি, যা একেবারেই আমাদের কাতলা মাছের আমাজনতুতো ভাই। আর তারপাশেই রাস্তায় বিক্রি করছে ঝুড়ি করে রাখা সব্জি। সবকটা ঝুড়িই ঝুলন্ত। মাছের রাজ্যে এরা খুবই ম্রিয়মান বলেই হয়ত দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে। কি অদ্ভূত! রাস্তার ফুটপাতেও দেখি সেই একই নকশা। সাদা কালো টাইলস ঢেউ খেলে গেছে। অনেক দূর অব্দি চলে গেছে এমন ফুটপাথ। এখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নদী যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা এমন সাজানো দেখেই বোঝা যায়।
শহরের হট্টগোল থেকে অন্য দিকে রয়েছে পন্তে নেগ্রা বিচ। নিগ্রো নদীর ধারে বালি জমে বিশাল বিচের মত হয়ে গেছে। চারিপাশ একদম বিচের মত করেই সাজানো। আইসক্রিম, স্ন্যাক্সের ছোট ছোট ছাতা লাগানো স্টল ,রঙিন বেলুন, রামধনু রঙের চেয়ার। বিচের ধার দিয়ে রয়েছে সারি সারি গগনচুম্বী ফ্ল্যাট। ঝা চকচকে চারিপাশ। লাইট হাউসের পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখি সমুদ্রের মতই শেষ না দেখতে পাওয়া ব্যাপ্তি নিগ্রো নদীর। বলে না দিলে, এখানে সমুদ্র নদীর পার্থক্য বোঝা যাবে না। কোন প্রান্ত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধুই অসম্ভব কালো জল। মনে হচ্ছে, জলের মধ্যে কেউ যেন কালি ফেলে দিয়েছে। এমন অদ্ভূত রঙ , আমি আগে কখনও দেখিনি। নীচের থেকে উপরে উঠলে জলকে আরও কালো দেখাচ্ছিল।এই কালো জলের জন্যই বিচের বালিগুলো আরও বেশি জ্বলজ্বল করছিল। উপর থেকে কালো জলের ব্যাকগ্রাউন্ডে বালির উপর সাদা চেয়ারগুলোকে দেখতে আল্পনার মত লাগছিল
ঘুরতে ঘুরতে নিগ্রো নদীর ধারে কখন যে সন্ধ্যে নেমে এলো, বুঝতেই পারলাম না। এরপরের গন্তব্য ১২০ কিমি দূরের জঙ্গলের মধ্যে এক গ্রাম মানাকাপুরু। রাতের অন্ধকারেই সেখান গিয়ে পৌঁছাতে হবে। শহর থেকে একটু দূরে যেতেই ফোনের ইন্টারনেট তথা নেটওয়ার্ক সব হাপিশ। মানাকাপুরু গ্রামে হোটেলের নাম আগে থেকেই ড্রাইভারকে বলে রেখেছিলাম। ভাগ্যিস এদুয়ার্দো ড্রাইভার ছিলেন স্থাণীয় মানুষ । ঐ চত্বরে আর কতগুলোই বা হোটেল , বাড়ি আছে? যে কটা আছে, স্থানীয় মানুষেরা সবাই সবাইকে চেনেন। গাড়ির জানলা দিয়ে কালো ছায়া দুইপাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কোথায় গিয়ে উঠব কোন ধারণাই নেই। শুধু জানতাম জঙ্গলের মাঝে একটা হোটেলে বুকিং ছিল। প্রায় এক দেড় ঘন্টার পর হাল্কা আলোয় সাজানো একটা বাড়ির গেটে ঢুকে গেল আমাদের গাড়ি। চোখ ছানাবড়া করে হোটেলের নাম দেখে বুঝলাম, ঠিকই এসেছি। আমাদের দেখে ভিতর থেকে এক মহিলা আর এক কম বয়সী ছেলে বেরিয়ে এলেন। আলাপে বুঝলাম, মহিলাটি এই হোটেলের মালিক আর ছেলেটি তার কর্মী। আমাদের দেখে ঝটপট ইংরাজিতে কথা বলতে শুরু করলেন, বেশ খানিকদূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, “ এই ঘরেই আপনারা থাকবেন। এখানে ফোন আর লাইটের খুবই সমস্যা। রাত ১০ অব্দি আমরা রেসেপশনে থাকি। তারপর আমাদের আর পাবেন না। আমাদের এই হোটেলটা একটা বুনো জঙ্গলের মধ্যে। রাত ১০ টার পর ঘর থেকে একদমই বেরবেন না। অন্ধকার হয়ে গেলে যেকোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর কোন পশু বেরিয়ে আসতে পারে। এছাড়াও আশেপাশে হাঁটলে বুঝে পা ফেলবেন, চারিপাশে প্রচুর গিরিগিটি বা বুনো টিকটিকির উৎপাত। মশা মাছি তো আছেই। একটু বেরলেই দেখবেন আমাদের হোটেলের মধ্য দিয়েই বয়ে যাচ্ছে জলস্রোত। এই জল আসছে পাশেরই এক ঝর্ণা থেকে। সেটাও দেখে পার হবেন। এমন এক প্রত্যন্ত জঙ্গলের মাঝে আমাদের হোটেল , তাই আপনাদের সাবধান করে দিচ্ছি।” আমরা শুনে তো হতবাক। কীভাবে এখানে কয়েক রাত কাটাব জানিনা। ঘরের মধ্যে টিমটিমে আলো। খাওয়া দাওয়া থাক, জঙ্গলের অন্যরকম কোন ফলের জুস খেতে চাইলাম। ঘরে বসে হবে না, রিসেপশনে খেতে গেলাম, সেও আবার টিকটিক গিরিগিটি দেখে আস্তে আস্তে চলেছি। হলুদ রঙের গ্লাস ভর্তি ফলের জুস দিল। অসাধারণ তার স্বাদ। অনেকটাই আমের মত। জানলাম, স্থাণীয় ভাষায় এই ফলকে বলে তাপেরেবা। এক রাতেই আমের থেকে বেশি প্রিয় হয়ে গেল এই তাপেরেবা ফল।
জুস খেয়ে আশপাশ চক্কর দিতে বেরলাম, অবশ্যই রাত ১০টার আগে ফিরে আসব। সরু জলস্রোত বয়ে যাচ্ছে, তার উপর দিয়ে বানানো ছোট সেতু, সেতুর গায়ে টুনি আলো। এই সেতু পেরলেই কালো জঙ্গল। জঙ্গলে ঢুকে প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধুই ঝি ঝি পোকার আওয়াজ, কখনও বা মনে হচ্ছে বাঁদরের শব্দ। বা কেউ যেন আমাদের মাথায় গাছের উপরে বসে আছে। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধুই কালো আর কালো। খানিকবাদে দেখলাম, চাঁদের আলো এসে পড়েছে গাছের পাতায়। তার মানে আজ পূর্ণিমা, আকাশ ঢাকা গাছে এতক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না। নীচে পাতার উপর জল চিকিমিকি। । পাশেই নিশ্চয়ই কোন জলাশয় আছে। ঘন আঁধারের মাঝে চাঁদকে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। মনে পড়ে গেল, জাকি লোককথার গল্পটা। জাকি ছিল চাঁদের দেবী । তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখে প্রেমে পড়েছিলেন সূর্যের দেবতা গুরারাসি। গুয়ারাসির প্রেমের প্রস্তাবে জাকিও তার প্রেমে পড়ে যায়। পরস্পরের ভালোবাসা সম্পর্ক জোরালো হতে থাকে। এমন সময় আলোর অভাবে গুয়ারাসিকে জোর করে আলাদা করে দেওয়া হয়। সেই বিচ্ছেদে, বিরহে জাকি এতই কাঁদতে থাকে যে, তার চোখের জলের বন্যা থেকেই আমাজন নদীর জন্ম হয়। আজ আমিও জাকিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু ঐ যে মাথার উপরে কারা নড়ছে বুঝতে পারছি না, ভয় তাড়াতাড়ি ঘরেই ঢুকে এলাম। ১০ টা বাজতেই সব টিমটিমে আলোও নিভে গেল। শুয়ে শুয়ে ভাবছি, আমরা এখন একদমই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ক্লান্ত চোখে, ঘুমের মধ্যে মনে হল, কেউ যেন দরজার সামনে চলাফেরা করছে। কালো কোন ছায়া সমানে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল।
এসো শ্যামল সুন্দর ;
সকালে উঠতেই জঙ্গলের শোভা পেলাম। চারিপাশ শুধুই সবুজ।প্রকৃতির আলোই জঙ্গলের অলঙ্কার। আমাদের হোটেলের মধ্য দিয়েই বয়ে যাচ্ছে সরু জলস্রোত। আরও এক পরিবার এসেছে , তারা ঐ জলে নেমে স্নানে মত্ত। ঝর্ণা থেকে নেমে আসা নিরন্তর বহমান এই জল পানীয় হিসেবেও খাওয়া যায়। ভীষণ পরিষ্কার। আমরাও স্নান করব , ইচ্ছা হল। কিন্তু তার আগে ত্বককে রক্ষা করতে মাখতে হবে দুইরকম ক্রিম। সানস্ক্রিন আর মশা না কামড়ানোর ক্রিম। দুই লেয়ার ক্রিমের পর নামলাম জলে। সবুজে ঘেরা চারিপাশে এমন হাপুশ হুপুশ স্নানের মজাই আলাদা। কিন্তু সে সুখ বেশিক্ষণ রইল না। কুটকুট কামড় শুরু হয়ে গেল, পায়ে মশা কামড়াচ্ছে। জলে সব ক্রিম ধুয়ে গেছে, যার ফলে মশার আক্রমণ থেকে রেহাই নেই। খানিকবাদেই জল থেকে উঠে ঘরে গিয়ে রেডি হয়ে গেলাম। গতকালের ড্রাইভার এদুয়ার্দোকে বলা ছিল, তিনি আজ আমাদের মানাকাপুরু গ্রাম থেকে আরও দূরে অনেক ঝর্ণা দেখাতে নিয়ে যাবেন। আমাজনের জঙ্গলের ৭০ শতাংশ ব্রাজিলে আছে , বাকিটা পেরু কলম্বিয়া বলিভিয়া আরও কিছু দেশে ভাগাভাগি। ব্রাজিলের এই অংশটাই একটা গোটা ভারতের আয়তন। তাই কয়েকদিনে ভারত দেখা যেমন সম্ভব নয় তেমনি আমাজন জঙ্গলও সব ঘুরে ফেলা সম্ভব নয়। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে নৌকো করে পৌঁছাতেই প্রায় ১৫ দিন লেগে যায়।
দুপাশে সবুজের সবুজের গালিচার মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা। যেদিকেই তাকাই , শুধু গাছ আর গাছ। কোথাও উঁচু কোথাও নীচু। এদুয়ার্দো বলছিলেন, এখানে দুটো ঋতু, বেশি বৃষ্টির মাস আর কম বৃষ্টির মাস। এখন জুন, এখন ব্রাজিলের দক্ষিণে শীতকাল আর আমাজনে কম বৃষ্টির মাস। এই সময় জঙ্গলের গ্রামে বন্যাও হয় না। গ্রীষ্মকালে এমন অনেক গ্রাম জলের তলায় ঢুকে যায়। কেউ তাদের খোঁজও রাখে না। দেশের সব সরকারই নাকি অভিবাসীদের বরাবর উপেক্ষা করেছে – আক্ষেপ করছিলেন এদুয়ার্দো। ওর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক গল্প শুনতে শুনতে পৌছে গেলাম , এক ঝর্ণার কাছে। অফুরন্ত কালো জলরাশি ঝরে পড়ছে জঙ্গলের মধ্যে। গাছের ছায়ায় জল আরও বেশি কালো দেখাচ্ছিল। দুপাশে সবুজ জঙ্গলের মধ্যে জলের ফেনাকে আরও সাদা লাগছে। এই ঝর্ণার একদম নীচে গিয়ে স্নান করা যায়। উপরে আকাশ ভরে গেছে গাছে, আর শরীরে তখন অনন্ত জলরাশি বয়ে যাচ্ছে। এমন মুহূর্ত জীবনে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এদুয়ার্দো তাড়া দিলেন, আরও দুখানা ঝর্ণা দেখতে যাব আমরা। এই অঞ্চলে ২০০ টারও বেশি ঝর্ণা আছে। সবকটা দেখা সম্ভবই হয় না।
পরের ঝর্ণায় দেখতে যাওয়ার আগে এদুয়ার্দো বললেন, “ এই ঝর্ণা দেখতে পেতে তোমাদের জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা পথ ট্রেক করতে হবে। নীচে একটা নদীও আছে সেখানেও স্নান করতে পারো। তবে ফিরে আসার রাস্তা মনে রেখো। ফোনে তো পাবে না, আমি বাইরেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব”। গাছে ঘেরা সরু রাস্তার মধ্য দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। কত রকমের পাতা, হরেক রঙের । পাতা গুলোর আকৃতি আমি আগে দেখিনি। পাতার গায়ে সূর্যের আলোর নকশা কেটেছে। গাছ বেশি, আলো কম। দূরে কোথাও যেন জলরাশির আওয়াজ পাচ্ছি। ক্রমশ গভীরে যাচ্ছি। কুড়ি মিনিট গভীর জঙ্গলে হাঁটার পর দেখি আমরা ঝর্ণার মাথায় দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়ে নীচে নামলে আরও ভালো করে দেখা যাবে। আর তারও নীচে বয়ে গেছে কালো জলের নদী। এ এক বিশাল ঝর্ণা।ঝর্ণার জলের উপর সূর্যের আলো পড়ে মনে হচ্ছে কেউ যেন বিয়ার ঢেলে দিয়েছে। কালো বিয়ারের ঠিক যেমন রঙ হয়। আর জলের উপর সাদা ধবধবে ফেনাকে দেখে মনে হবে ক্যাপুচিনো, একটু তুলে খেয়ে নিই। না , এই ঝর্ণার সামনে যাওয়া সম্ভব নয়, তীব্র জলের স্রোত। নীচে নদীতে স্নান সেরে উপরে আসতেই রাস্তা আর চিনতে পারছি না। দেখে মনে হচ্ছে, সবদিক দিয়েই যাওয়া যাবে। কোনটা ঠিক জানি না। খুব ক্ষিদেও পাচ্ছে। তাই বোধহয় মাথাও ঠিক করে কাজ করছে না। ডানদিকের পথ ধরেই চলতে থাকলাম, খানিক যেতেই দেখি এক জলাশয়। তার উপর ভেসে আছে অসংখ্য গোল গোল বিশাল সবুজ পাতা অনেকটা পদ্ম পাতার মত । এর নাম ভিতোরিয়া রেজিনা। সূর্যের আলো যখন এই সবুজ পাতার পড়ার দৃশ্য দেখলে, চোখ স্নিগ্ধ হয়ে যায়। মনে পড়ে গেল, ভিতোরিয়া রেজিনার সেই প্রচলিত গল্প। নাইয়া নামে ইন্ডিজেনাস এক মেয়ে থাকত এই আমাজনের জঙ্গলে। তার এক প্রেমিক ছিল কিন্তু সেই প্রেমিককে কেউ কখনও দেখেনি। লোকে বলত, নাইয়া প্রতি পূর্ণিমার রাতে তার প্রেমিককে খুঁজতে নদীর ধারে আসত। একদিন জলের মধ্যে সে তার প্রেমিকের ছায়া দেখে, জলে ঝাঁপ দেয়। আসলে সেটা তার ভ্রম ছিল। নাইয়া ডুবে যায়। তারপর থেকেই প্রেমিককে ফিরে পাওয়ার আশায় নাইয়া ভিতোরিয়া রেজিনার রূপে জলের উপর ভেসে থাকে।
কিন্তু আমাদেরও তো পথের ভ্রম হয়েছে। আমাদেরও কি তবে এই জঙ্গলেই সারা জীবন কাটাতে হবে নাকি? এখানে অনেকটা সময়ও চলে গেল, আশায় আছি এদুয়ার্দো আমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছেন। এই জলাশয়ের রাস্তা ভুল, এই পথ দিয়ে তো আসিনি। গেলাম অন্য দিকে। খানিক যেতেই কিছু গাছ চেনা লাগল। গাছের নীচে গজানো বিষাক্ত মাশরুমও দেখলাম, আসার পথেও দেখেছিলাম। এইবার বোধহয় ঠিক পথেই চলেছি। গাছ চিনে চিনে ফিরে আসার চেষ্টা চালাচ্ছি। মাঝে মধ্যে পেটও ডাক দিচ্ছে। এই সময় উপলব্ধি করলাম, জীবনের সুরক্ষা আর পেটের জ্বালা মিটে গেলে সব সমস্যাকেই তুচ্ছ বলে মনে হয়। হেঁটেই চলেছি, কত পথিক এইখান দিয়ে এসেছে গিয়েছে এই গাছেরা তার সাক্ষী। আমাদের মত অনেকেই হয়ত রাস্তাও হারিয়ে ফেলেছে, এই গাছেরা সব জানে। এই জঙ্গলে না এলে বোধহয় , গাছকে এমনভাবে ভালোবাসতে পারতাম না। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই অবশেষে আমাদের গাড়ির কাছে এসে পৌছালাম। ভাগ্যি ভালো, ড্রাইভার এদুয়ার্দো গাড়ির মধ্যেই ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে আমাদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প করলাম, বললাম আশেপাশে কোন খাবারের দোকানে নিয়ে যেতে । এদুয়ার্দো বলল, “নিকটবর্তী ৩০ কিমির মধ্যে কোন খাবারের দোকান নেই। মানাকাপুরু গ্রামের বাজারের মধ্যে কিছু স্টল আছে, সেখানে খাওয়া পেয়ে যাবেন।” অগত্যা। আর কোন ঝর্ণা নয়, এইবার সেই মানাকাপুরুর গ্রামেই আবার ফিরে যাই। খাওয়া নেই, তার মধ্যে নদীতে স্নান করে, এতটা পথ হাঁটাহাঁটি করে শরীর অসম্ভব দুর্বল লাগছে। চোখ বুজে আসছে। গায়ে কোনই জোর নেই। এমন সময় এদুয়ার্দো গাড়ি থামিয়ে নামলেন। দেখি দুমুঠো ভর্তি কিসব ফল তার হাতে। বললেন, “এই নাও , খিদে পেয়েছিল বলছিলে যে, গাছের নীচে এই ফলগুলো পড়েছিল, কুড়িয়ে আনলাম। এখানে আমরা এইভাবেই ক্ষিদে মেটাই”। নিজে হাতে নিয়ে দেখি, লাল জামরুল। সাধারণত, আমরা সাদা জামরুল খাই। এমন লাল জামরুল প্রায় দেখিই না। অনেকদিন বাদে জামরুল খাচ্ছি, তাও আবার এমন এই ক্ষিদের মুখে। গাড়ি থেকে নেমেই নিজেই আরও জামরুল কুড়াতে গেলাম। সেখানে দেখি জামরুলের সাথে জামও পড়ে আছে। ঠিক ছোটবেলায় স্কুল ফেরার পথে এইভাবেই জামরুল কুড়িয়ে বাড়ি ঢুকতাম। তখন ঐ জামরুলগুলো খেতাম না, শুধুই কুড়াতে মজা লাগত। কে জানত, আমাজনের জঙ্গলে ঝর্ণা দেখতে এসে এইভাবেই ছোটবেলাকার জামরুল কুড়ানোর স্বাদ পেয়ে যাব। এই জঙ্গলে আরও কত রকমের যে ফল পাওয়া যায়, সেটা ব্রাজিলিয়ানরা নিজেরাও জানে না। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, ফিরে গিয়ে আমাজনের ফলের উপর লেখা কোন বই কিনব। যাইহোক, জামরুল তখনকার মত সাময়িক আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করেছিল। আবারও সেই সবুজ গালিচার মাঝ দিয়ে ফিরে আসা। আসার পথে তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যাবে, দূরে বেশ কয়েক জায়গায় গাছের উপর ধোঁয়া দেখছি। এদুয়ার্দো বললেন, এখন কম বৃষ্টির ঋতু, এখন খুব শুষ্ক, তাই গাছের পাতার ঘষা লেগে প্রায়ই আগুন লেগে যায়। অনেক প্রাণী এইভাবে প্রতি বছর মারা যায়, কেউই তাদের কোন খবর রাখে না।
ফিরে এলাম মানাকাপুরু গ্রামের বাজারে। সেখানের এক স্টল থেকে এদুয়ার্দো আমাদের তাকাকা খেতে বললেন। এই তাকাকা নিয়ে আমি আগেই পড়ে এসেছিলাম। এটা একধরনের পাতা আর চিংড়ি দেওয়া স্যুপ। ঐ পাতা যেমন তেমন নয়। ঐ পাতাকে বলে জাম্বো। এই পাতা দিয়েই এনাস্থেসিয়া করার ওষুধ বানানো হয়। তাই আমিও এই স্যুপ চেখে দেখতে খুবই উৎসাহী ছিলাম। এক বাটি ভর্তি করে স্যুপ দিল।তার উপরে ভিতোরিয়া রেজিনার মত জাম্বো পাতা ভেসে রয়েছে আর পাশ দিয়ে উঁকি মারছে কিছু কমলা চিংড়ি। নিচে জল টলটল। জাম্বো পাতা মুখে দিতেই, জিভ আমার কেমন যেন ভারি হয়ে গেল। কেমন যেন আঠালো কিছু খাচ্ছি মনে হচ্ছে। চিংড়ির স্বাদ ভুলিয়ে দিয়েছে জাম্বো পাতা। ধীরে ধীরে পুরোটাই খেয়ে নিলাম, প্রথমটা অদ্ভুত স্বাদ লাগলেও, পরে স্বাদটা আর খারাপ লাগল না। না আমি অজ্ঞানও হলাম না। বরং তাকাকা খাওয়ার পর একটু এনার্জি ফিরে পেলাম। টিমেটিমে আলো দেওয়া হোটেলে ফিরে এলাম। সারাদিনটা পাতা দেখে, পাতার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে,পাতাকে ল্যান্ডমার্ক করে, পাতার ছবি তুলে, পাতা খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।
নীলের পরে নীল ;
পরের দিন ঠিক হল, বন্যায় ডুবে যাওয়া কিছু দ্বীপপুঞ্জ ঘুরতে যাব। নদীর কাছে গিয়ে নৌকো ভাড়া নিতে হবে। আমরা ছাড়া আর কোন ট্যুরিস্ট নেই। বুঝলাম , এইসব জঙ্গলের গ্রামের মাঝে বেশি কেউ ঘুরতে ভালোবাসে না। তবে আমাজন ঘুরতে না এলে, সমুদ্র পাহাড়ের মত জঙ্গলকেও যে এতটাই ভালোবাসা যায়, তা আগে উপলব্ধি করতে পারিনি। নৌকা আমাদের দুঘন্টা ঘোরাবে, জলের ভেসে যাওয়া দ্বীপগুলোর একদম ভিতরে ঢুকে দেখব। নীল আকাশের প্রতিফলন পড়েছে জলে উপরে। সেই কালো, ধূসর জল, এখানেই অনেকটাই নীলচে। আমাদের নৌকা সবুজ জঙ্গল ছাড়িয়ে ক্রমেই দ্বীপের দিকে এগিয়ে চলেছে। দ্বীপ বলতে কোন মাটি দেখা যাচ্ছে না, বোঝা যাচ্ছে অনেক লম্বা লম্বা কিছু গাছ ছিল, সেগুলো সবটাই জলের তলায় ডুবে গেছে। আয়নার মত স্বচ্ছ জল, শুকনো গাছের ডালপালা নৌকার উপর দিয়ে আমাদের মাথায় এসে লাগছে। নীচের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, কি জানি কত বাড়ি ঘর, পশু এই স্বচ্ছ জলের গভীরে তলিয়ে গেছে। অপরের দিকে তাকালে নীল আকাশের ফালি ফালি ঝলক গাছের ফাঁক দিয়ে সরে যাচ্ছে। আমাদের নৌকোর রঙ ছিল নীল, তার গা দিয়ে সাদা ঢেউ উথলে পড়ছে। ছবি আঁকতে দিলেও এই দৃশ্যের নিখুঁত বর্ণনা করা যাবে না।
এইখানেই নীল জলের নদীর নীচে এক জায়গায় নেমে ডলফিন দেখার ব্যবস্থা আছে। ইচ্ছা হল ডলফিন দেখার। গেলাম সেখানে। এখানেও তাও কয়েকজন ট্যুরিস্ট দেখলাম। আসলে এই জায়গাটা খুব গ্রামের মধ্যে নয়, বরং শহর থেকেই বেশি কাছে। সিকিউরিটি গার্ডেরা সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দিচ্ছে। নদীর একদম মধ্যিখানে নীল জলের মাঝে নেমে ডলফিন দেখতে হবে। কেউ কেউ দেখলাম গায়ে সেই দুইরকমের ক্রিম মেখে নিচ্ছে। যারা কয়েকজন নেমে আছে, তারা হাতে কিসব খাবার। সত্যি ডলফিন এসে তাদের থেকে সেই খাবারগুলো খেতে আসছে। ছুঁচালো মুখ দেখেই তো আমি ভয় পেয়ে গেলাম, খাবার থাক, শুধুই নীল জলে একটু ডুবে চলে আসি। লাইফ জ্যাকেট পরে নামলাম, কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে আমি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি। কি বিপদ, সাঁতার তো তেমন জানি না তার মধ্যে এটা একদম মাঝ নদী। ডলফিন, হাঙর আর কতই না কি আছে! নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছি, জাপটে ধরলাম এক মহিলাকে। সে দেখি খুব সুন্দর করে ভেসে আছে। “আমি ভেসে যাচ্ছি আমাকে বাঁচান” – ইংরাজিতে বললাম, কি জানি সে কি বুঝল। সে খালি বলে যাচ্ছে , আমাকে ছাড়ুন আমার লাগছে। না আমি তো কিছুতেই ছাড়ব না তাকে,ছাড়লেই অনেক দূরে চলে যাবে, সেখানে আর কেউ নেই। ভয়ে আমি তার গলায় টুঁটি টিপে ধরেছি। মহিলাটি দেখি হেসে যাচ্ছে, খুব হাসছে, চিল্লাচ্ছে আর কি ভাষায় কথা বলছে বুঝছি না। আমি পর্তুগিজেও তাকে বোঝালাম, সে দেখি তাও বোঝে না। আমার হয়েছে যত মুশকিল। থাক বাবা নীল জল, থাক বাবা ডলফিন, এখন পারে উঠতে পারলেই আমার শান্তি। দূর থেকে সিকিউরিটি গার্ডকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছে না, সে ভাবছে আমি ডলফিনের আনন্দে দাঁত কেলাচ্ছি। কী করি? মহিলার গলা ছাড়িনি। মনে পড়ে গেল, আমাজনের জলের দেবীর কথা ইয়ারা। তিনি ছিলেন মৎস্যকন্যা। জলের কোন বিপদ হলেই ব্রাজিলিয়ানরা ইয়ারা দেবীকে স্মরণ করে। মনে করা হয়, ইনি ইন্ডিজেনাসদের দেবী। ব্রাজিলে খৃষ্টান ধর্মের অধিপত্য থাকলেও, ইয়ারা দেবীর গুরুত্ব কেউ কমাতে পারেনি। আমি এক হাত তুলে ভীষণ জোরে ‘ইয়ারা, ইয়ারা, বাচাও ইয়ারা’ করে চিৎকার করতে লাগলাম বারংবার। এতক্ষণে সিকিউরিটি গার্ড বুঝলেন, ঐ ইয়ারা নাম শুনেই বোধহয় বুঝলেন। সাঁতার কেটে আমার এক হাত ধরে পারে তুলে নিয়ে এলো। দেখা গেল, আমার লাইফ জ্যাকেটে ছিদ্র ছিল, তাই ওমন হচ্ছিল। এই যাত্রায় সত্যিই ইয়ারা দেবীই আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন।
ধূসর নদী এবং বাকিরা ;
ফিরে এলাম মানাউস শহরে। আমাজন রাজ্যের রাজধানী। এখানে কয়েকদিন থাকব। মানাকাপুরু গ্রাম থেকে ফিরে এসে একেই বিশাল শহর বলে মনে হচ্ছে। টিমটিমে আলো নয়, অনেক বেশী লোকজন, ইন্টারনেট , বাণিজ্য বন্দর, গমগমে বাজার। মানাউসের কাছেই নৌকো করে একটু গেলেই কালো নদী আর ধূসর নদীর মিলন দেখা যায়। ৬ কিমি ধরে এই দুই নদীর মিলন দেখা যায়। দুই রঙের জল একসাথে মিশালে , ঠিক কোন জায়গাটায় মিশছে আমরা সচরাচর বুঝতে পারিনা। কিন্তু এইক্ষেত্রে তা কীভাবে সম্ভব? তার কারণ হল, দুই নদীর জলের তাপমাত্রা, স্পিড আর উপাদান আলাদা। তাই দুই জলের প্রথম মিলনটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এঁকে বলে নদীর সঙ্গম। পরে একসাথে অনেকটা মিশে গেলে তাদের আর আলাদা করে বোঝা যায় না। ধূসর নদীর আর এক নাম হল সলিমোয়েস। মাটি গোলা জলের মত রঙ। তবে ধূসর নদীর উপর দেখলাম ভাসমান বাড়ি, স্কুল, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল। এই নদীর উপর ভালোই জনবসতি। দুই ধার দিয়ে প্রচুর গাছ। বোটগুলোও ভীষণ জোরে ছুটে চলেছে। কালো নদী অনেক শান্ত, একাকী। ধূসর নদী অনেক বেশি জনবহুল আর অশান্ত। বোটে করে আমরা যাব এক আদিবাসীদের গ্রামে। সেখানে তাদের বাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর খাওয়াদাওয়া করে ফিরে আসব। ধুসর নদীর উপর কচুরিপানায় ভর্তি এক সাঁকোর উপর বোট আমাদের নামিয়ে দিল । সবাই এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসীদের গ্রামে। ঢোকার পথে দুটি ছেলে এলো জলের উপর দিয়ে। সামনে একজনের হাতে ধূসর রঙের একটা শ্লথ আর পিছনের একজনের মাথা গলা বুক ঘাড়, পা হাতে প্যাঁচানো ছাই আর কালো রঙের ছোপ দেওয়া বিশালাকার এক সাপ। এই কি তবে এনাকোন্ডা? ব্রাজিলের সবাই বলে, এখানে এনাকোন্ডা নামে কোন সাপ নেই। বিশাল যে সাপ আছে তাকে সুকুরি বলে। এই সুকুরি সাপের দৈর্ঘ্য আজ পর্যন্ত কেউ জানে না, শুধুই শোনা কথা আর মানুষের ধারণা। এনাকোন্ডাও তো একটা রূপকথার গল্প। কিন্তু এই ছেলে দুটো হাতে নিয়ে কি করছে? বুঝলাম, ওরা ছবি তোলার জন্য নিয়ে এসেছে। ছবি তোলার পর কেউ যদি ওদের কিছু পয়সা দেয়। ধূসর রঙের শ্লথের নখ দেখেই ভয় পেয়ে গেলাম। আর ছাই রঙের সুকুরি ? সে দেখি ফণা তুলে এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখছে। দূর থেকেই ভয় পাচ্ছি, তাকে নিয়ে আবার ছবি তোলা! বিবেকানন্দের বাণী শোনার পরেও অত সাহস অবলম্বন করতে পারিনি। এগিয়ে গেলাম গ্রামের দিকে। খড়ের বাড়ি তার নীচে ছোট বড় আদিবাসী মহিলা পুরুষেরা সেজেগুজে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রেডি হয়ে আছে। গাছের পাতা দিয়ে বানানো তাদের জামাকাপড়। গায়ে আঁকিবুঁকি। আমরা সবাই চারিদিকে মাটিতে বসে পড়লাম। বাজনার সাথে গানের সাথে ওদের নিজেদের ভাষায় সবাই মিলে নৃত্য পরিবেশন করল। আড়ম্বরহীন পরিবেশনা, শহুরে সভ্যতা থেকে উপেক্ষিত। বাচ্চারা ট্যুরিস্টদের গালে রঙ করে দিচ্ছে, এঁকে দিলেই কি সবাই আদিবাসী হয়ে যায়? আমি একটু সরে এলাম। গেলাম খাওয়া দাওয়ার দিকে।দেখি মাচা করে রাখা আগুনের উপর সেঁকা হচ্ছে ছোট ছোট ধূসর রঙের মাছ। অতিথিদের জন্যই বোধহয় আজ অনেক মাছ সেঁকছে ওরা। পাশেই আর এক ঝুড়িতে ছাই রঙের কিসব রাখা। ভালো করে না দেখেই মুখে দিয়ে দিলাম। তেঁতো লাগল। ভালো করে দেখলাম। পিঁপড়ে ভাজা ছিল। এমন কড়া করে ভেজেছে যে তেঁতো হয়ে গিয়েছে। খড়ের বাড়িঘর দেখতে দেখতে ভিড় থেকে একটু দূরে সরে এসেছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। কোনরকমে ঠাই নিলাম এক চালের নীচে। বাকি আর কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। বৃষ্টি কখন কমবে বুঝতেও পারছি না। এমন বৃষ্টি দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব না, তা কি হয়? শুরু করলাম,” আজ যেমন করে গাইছে আকাশ, তেমনি করে গাও গো ”। গান গাইতে গিয়ে মাঝপথে মনে হল, বোট যদি আমাদের ছেড়ে চলে যায়, কী হবে? এখানে তো ইয়ারা দেবী কাজে দেবেন না। তাহলে কি জঙ্গলের, জলের রক্ষাকর্তা কোবরা নোরাতোকে ডাকতে হবে? আমাজনে এনাকোন্ডা সাপকেই লোককথায় কোবরা নোরাতো বলে। কিন্তু এই সাপ হলিউড সিনেমার মত অত শয়তান মোটেও না। লোককথায় বলা হয়েছে, কোবরা নোরাতো জঙ্গলের নদীর রক্ষাকর্তা। যারা জঙ্গলের নদীর ক্ষতি করতে আসে, তাদের কোবরা নোরাতো আক্রমণ করে। নদীর নীচে কোন এক গুহায় কোবরা নোরাতো সোনার খনির পাহাড়া দেয়। এমন মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে যদি নোরাতো বা অন্য কোন সাপ আমাদের পায়ের কাছে চলে আসে? হঠাৎ করেই সাপের ভয় বিচলিত হয়ে গেলাম। ঐ যে সেই ছাই রঙের সাপটাও তো আশেপাশেই আছে। কি জানি সেই জলে নাকি সেই ছেলেটার ঘাড়ে বসে আছে? এখন মনে হচ্ছে, বৃষ্টিটা তাড়াতাড়ি কমে যাক। ৪৫ মিনিট মত সাপের ভয় কাটানোর পর বৃষ্টি একটু কমতেই ছুট লাগাই সেই খড়ের বাড়ির দিকে। সেখানে আদিবাসীরা ছাড়া আর কী নেই। তাদের পর্তুগিজ ভাষায় জিজ্ঞাসা করলে, কিছুই বুঝতে পারে না। হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করি , আমাদের ধূসর রঙের বোট কোথায়? একজন একদিকে হাত দেখালো। হাতে একমুঠো পিঁপড়ে ভাজা তুলে নিয়ে ঐদিকেই ছুট দিলাম। খানিক এদিক ওদিক করার পর দেখলাম আমাদের বোট দাঁড়িয়ে আছে। চিপসের মত পিঁপড়ে ভাজা খেতে খেতে বোটে উঠলাম, বোটের চালক আমাদের উপর রেগে আছেন, কারণ তারা আমাদের জন্য বৃষ্টির মধ্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন।
ফিরে এলাম শহর থেকে বড় শহরে। জীবনযাত্রার আকাশপাতাল ফারাক। একই দেশে দুই জগৎ। হাজার সমস্যার মধ্যেও তারা হাসিমুখে থাকে। গাছেদের মতই ধৈর্যবান। ফিরে আসার পথে আমাজনের ফল আর লোককথার দুটো বই কিনলাম। আমাজনের জঙ্গলের এক চিলতে ঘুরে আসার স্মৃতি আমার চিরকাল মনে থাকবে। ঘুরে আসার পর আমাজনকে আরও বেশি করে পেতে ইচ্ছে করে, তাকে জানার ইচ্ছাটাও প্রবল বেড়ে গেছে। এমন বিরলতম অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনওই হয়নি।



























