বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই পীঠস্থান। অরণ্যসংকুল বীরভূমির লাল মাটি আর শাল অরণ্যের গভীরে প্রাচীনযুগের সে নিদর্শন হলেও কোলকাতার কাছেই এই স্বল্পশ্রুত মন্দিরের খোঁজ অনেকেরই অজানা ।
কথায় বলে ‘কীর্তযস্য স জীবতি’ ! আর মহারাজা নন্দকুমারের সেই কীর্তিসমূহ হেস্টিংস বিলোপ করতে চেয়েও পারেননি। তাঁর অজস্র কীর্তির মধ্যে অন্যতম হল বীরভূমের আকালীপুরে উত্তরবাহিনী ব্রাহ্মণী নদীতীরে গুহ্যকালীর প্রতিষ্ঠা । নদীতীর সম্মুখে শ্মশান। তাই শক্তিপীঠের মাহাত্ম্যের অভাব নেই । এই নদীতে মানুষজন এখনো মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন। ছমছমে অনুভূতি নিয়ে মন্দির চত্বরে হাজির হয়ে সেটাই মনের মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খেতে লাগল।
গুহ্যকলিকা ছাড়াও রানিসাগর এবং গুরুসাগর নমে দুটি দীঘি সহ আগছায় পূর্ণ অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ কালের দলিলের প্রামাণ্যস্বরূপ। নন্দকুমার সিরাজদউল্লার স্বেচ্ছাচারিতা, হঠকারিতা, ব্যাভিচার মেনে নিতে না পারায় ইংরেজদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ান। ব্রিটিশদের ঘৃণ্য চক্রান্তে আর ওয়ারেন হেস্টিংসের চরম স্বার্থলোলুপতায় মহারাজা নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগের ফলে খিদিরপুরের কুলিবাজারে দেশপ্রেমী নন্দকুমারকে ৭০ বছর বয়সে বরণ করতে হয়েছিল নৃশংস ফাঁসির শাস্তি। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেছিলেন ‘আমি নির্দোষ্, আমার বিচার করবেন দেশবাসী এবং স্বয়ং ঈশ্বর।’
শ্যাম এবং শ্যামার যুগ্ম উপাসক নন্দকুমার থাকতেন কলকাতার বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে। আকালীপুরের গুরুসাগর হ্রদটি ছাড়াও রাণিসাগর জলাশয়টি নিজপত্নী ক্ষেমঙ্করীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন নন্দকুমার ।
জালিয়াতির অভিযোগের পরিণামে ফাঁসির দায়ে গাঁয়ের অধিবাসীরা এখনো বুঝি মহারাজাকেই দোষী বলে সাব্যস্ত করেন আর তাই বুঝি তাঁর রাজবাড়ির কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। শুধু গুহ্যকালীই স্বমহিমায় রয়েছেন এখনো ধুনি জ্বালিয়ে।
নন্দকুমার যখন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তখন ব্রাহ্মণী নদীতীর ছিল জঙ্গলাকীর্ণ । কথিত আছে এই গুহ্যকালী মহাভারতে বর্ণিত মগধরাজ জরাসন্ধের আরাধ্যা দেবী । কালস্রোতে ইনি কাশীরাজ চৈতসিংহের গৃহে পূজিতা হন । রাজা চৈতসিং তাঁর রাজ্যে এক ইঁদারা খননের সময় জঙ্গলের মধ্যে এই কালীর হদিশ পান। অস্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়ে পুজো শুরু হয়। হেষ্টিংস সে সময় এই অপূর্ব শ্মশানবাসিনী গুহ্যকালীর শিল্পশৈলীর কথা জানতে পেয়ে ইংল্যান্ডের অ্যান্টিক বস্তুর সংগ্রহশালায় ঐ দামি কষ্টিপাথরের মূর্তি নিয়ে যাবার ফন্দি আঁটেন। চৈতসিং এইকথা জানতে পেরে গোপনে দেবীকে ব্রাহ্মণী নদীর জলে নিমজ্জিত করে রাখেন। মহারাজ নন্দকুমার স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাতারাতি এই দেবীমূর্তিকে জল থেকে উদ্ধার করে জমিদারির অন্তর্গত আকালীপুর ভদ্রপুরে এই মন্দিরে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। হেস্টিংস নৌকাপথে ঐ মূর্তিকে পাচার করে দিচ্ছিলেন অ্যান্টিক হিসেবে। ব্রাহ্মণী নদী ভাগিরথীর সঙ্গে কাটোয়ায় মিলিত হয়েছে। নন্দকুমার এই সেই নৌকাকে ভদ্রপুরে থামাতে পারেননি তাই আকালীপুরে নৌকা এসে ভিড়লে ঐ মূর্তিকে নামান। উত্তরবাহিনী ব্রাহ্মণী নদী কালের স্রোতে পূর্বমুখী হয়েছে। কে জানে দেবী স্বয়ং দুরাচার, অর্থপিশাচ হেস্টিংসের হাত থেকে বাঁচবার জন্যই হয়ত জঙ্গল পরিবেষ্টিত আকালীপুরকেই নিরাপদ স্থান বলে ভেবেছিলেন। অদূরে ব্রাহ্মণী নদীর কোলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেশম কুঠিরের ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসের উপদান আজও।
আটকোণা দুর্গের অনুকরণে নির্মিত মন্দিরটি চুন-সুরকির গাঁথনির মধ্যে ছোটো ছোটো পোড়ামাটির ইঁটের তবে পাঁচিল পলাস্তরা বিহীন । দেওয়ালের খোপে দেবীর দশমহাবিদ্যার মূর্তির অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা । জনশ্রুতি আছে ভদ্রপুরের মহারানি রাজপ্রাসাদ থেকে মন্দিরের চূড়ো দর্শন করতে চেয়েছিলেন। রানির ঐ দম্ভ দেবীর সহ্য হয়নি। তাই দৈব দুর্যোগে একরাতের মধ্যে নির্মিত ঐ মন্দিরের চূড়ো নষ্ট হয়ে যায় ও মন্দিরের পিছনের দেওয়ালে ফাটল ধরে। কারো মতে এই দেবীমূর্তি শ্মশানকালী বলে মন্দির প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থাকতে নারাজ । তাই নির্মাণকালেই এই মন্দিরটি বিদীর্ণ হয় এবং এখনো অসমাপ্ত ।
মন্দিরের গর্ভগৃহটিকে বেষ্টন করে পরিখার মতো আবরণী। তিনটি দরজা। প্রধান দরজা দক্ষিণদিকে। ত্রিনয়না দেবী দক্ষিণমুখী। ভারতবর্ষের অন্য কোথাও এমন কালীমূর্তির নিদর্শন নেই। অনেকটা নেপাল বা চীনের কালীমূর্তির মতো আদলে কালো কষ্টিপাথরের একখণ্ড টুকরো কেটে কোনো এক অনামা শিল্পীর বানানো। যার বাম ভাগে বালকরূপী শিবের কল্পিত অবস্থান।
আয়তাকার কালো পাথরের বেদীতে দুটি কুণ্ডলীকৃত সাপের ওপর অর্ধ পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবীর ডান পা সাপের মাথা স্পর্শ করা। মস্তকে পাঁচটি ধাপে সহস্রাধার। গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা। কর্ণ কুহর থেকে বুক অবধি নেমে এসেছে দুটি শিশুর মৃত শবদেহ । সর্প উপবীতধারী দেবীর নাভীকুন্ডের ওপর দিয়ে সাপের কোমর বেষ্টনী । দুহাতে সাপের বলয় । কেউ কেউ দেবী শরীরে সাপের আধিক্য দেখে এঁকে ‘বেদের বেটি’ও বলেন। উন্মুক্ত লোলজিহ্বা, বিস্ফারিত ত্রিনয়ন আর মুখ গহ্বরে নাকি আসল নরদন্তের সারি । চক্ষুও নাকি নর-করোটির অংশে নির্মিত । দুই হাতে বর এবং অভয় । একাধারে সৃষ্টি এবং লয়ের প্রতীকি এই দেবীর ভয়ানক রূপের মধ্যে আবার তাঁর প্রসন্ন রূপটিও প্রচ্ছন্ন। ব্রাহ্মণী নদীতীর সংলগ্ন শ্মশানঘাটটির পরিবেশও বেশ ছমছমে ।
শক্তিসাধনার ক্ষেত্র হিসেবে এই তীর্থভূমি পশ্চিমবঙ্গের আর পাঁচটি তীর্থ সাধনার স্থানের মতই । তবে আশপাশের ভদ্রপুর গ্রামটি শ্রীহীন এবং অমর্যাদায় মানুষদের সেখানে দিন যাপন।



























