দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ ধারণ করার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হিমালয়ের মধ্যে যে এক বৃহৎ এবং সূক্ষ্ম অস্তিত্ব আছে, তা হিমালয়ে চলতে চলতেই টের পাওয়া যায়। হিমালয় কিন্তু একটা জ্যান্ত ব্যাপার। গাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে এই জ্যান্ত ব্যাপারটাকে টের পাওয়া যায় না। টের পাওয়া যায় হাঁটতে হাঁটতে। ধরুন, আপনি খুব ক্লান্ত। ঘামছেন, হিমালয়ের ওই ঠান্ডাতেও। কারণ সমতল থেকে পাহাড়ের স্তব্ধতার কথাই আপনি ভেবে এসেছেন প্রণবেন্দুর কবিতার মতো। কিন্ত যখন আপনি হাঁটছেন, তখন সমতল থেকে উঠে এসেছেন অনেকটা উচ্চতায়। ডানদিকে ঘাড় ঘোড়ালেই দেখা যাচ্ছে অনেক নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদী। সে সুন্দর কিন্তু ভয়ংকর। হিমালয়ের সম্পর্কে কোনও কথা ব্যাখ্যা করে বলাই যায় না। হিমালয় যেন বা ইংরিজি ভাষায় যাকে বলে কোনানড্রাম। এমন একটা কিছু, যা ব্যাখ্যা করা বেশ অসম্ভব। ভয়ংকর সুন্দর। কিন্তু এই সুন্দরের মধ্যে যে ভয়ংকরের বিষয়টি আছে, তাকে আপনি ভাল না বাসলে, হিমালয় আপনাকে গ্রহণ করবে না। সে বলবে, আমাকে গ্রহণ করতে হবে আমার মতো করেই। তোমার সৌন্দর্যের ধারণা তুমি ফেলে এস সমতলের ঘরের মধ্যেই। এখানে এসে সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করো। এ যেন কবিতা লেখা। কবিতা লিখতে বসলে যেমন ভুলে যেতে হয়, কবিতা সম্পর্কে সমস্ত রকম পড়াগুলোকেই। কারণ আপনাকে যাত্রা করতে হয় এক দুরূহ রাস্তা দিয়ে। সেই রাস্তায় খাদ আছে, গর্ত আছে, চিরকালীন হারিয়ে যাওয়ার ইশারা আছে, হাতছানি আছে। আবার টেনে তোলার হাতও আছে। তো, আমরা ঘাঙরিয়া থেকে এমনই এক দুর্গম পথে হাঁটতে হাঁটতে বনের মধ্য দিয়ে, নদী পেরিয়ে, ঝরনা পেরিয়ে শেষে ঘামতে ঘামতে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় পনের হাজার ফুট উপরে এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম, যেখানে এসে মনে হল এ জায়গায় না এলেই ভাল হত। এত সুন্দর, যে মনে হচ্ছে, এই সুন্দর আমাকে অন্ধ করে দেবে। এত সুন্দরকে বেশিক্ষণ দেখা উচিত নয়। কারণ আমাকে তো ফিরে যেতে হবে। এই এত সুন্দরকে নিয়ে আমি কী করব? আমি তো পারব না একে লিখতে, পারব না এর গন্ধ, এর রং, এর ছোট ছোট ফুলের বৈচিত্র্যগুলিকে কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে। আমার কোনও ক্ষমতা নেই। না আছে ফুল ফোটানোর ক্ষমতা, না আছে সেই ফুল দেখে কোনও শব্দ উচ্চারণের ক্ষমতা। শুধু ইচ্ছে করছে এখানে এই ফুলের বাগানের মধ্যে শুয়ে পড়ি। এই গন্ধের মধ্যে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ি। আর আমার শরীরের উপর জন্ম নিক এমনই কোনও ফুলের বাগান।
বুক ভরে এই সৌন্দর্যকে গ্রহণ করতে করতে আমি বুঝতে পারছিলাম আমাদের জ্ঞান, অজ্ঞানলাঞ্ছিত। আমাদের বোধ, নির্বাক শিশুর মতো বসে থাকে মনের মধ্যে। সে খুব একটা পাত্তা পায় না। কিন্তু আসলে সে-ই থাকে আমার মনের মধ্যে। আপনার মনের মধ্যে। আপনার কত বয়স? ষোল, না একষট্টি? কিন্তু আপনার মনের মধ্যে যে শিশুটি আছে, যে আসলে শুধুই বিস্মিত হতে জানে, তার বয়স বাড়ে না, জানেন তো? কিন্তু তাকেও ফিরে আসতে হয়। কারণ অসম্ভব সুন্দরের কাছে বেশিক্ষণ থাকার কথা নেই আমাদের কারোর। আমাদের ফিরে আসতে হয় সেই উচ্চতা থেকে, যে উচ্চতা আসলে একা। নিঃসঙ্গ থাকতেই সে ভালবাসে। আমরা শুধু বাইরের পর্যটক হয়ে উঁকি মেরে তাই গোপনীয়তাকে ভঙ্গ করতে পারি। সে হয়তো বিরক্ত হয়, কিন্তু সহ্য করে নেয়।
মানুষ এটাই বোঝে না। কারণ সে সুন্দরকে অধিকার করতে চায়। প্রকৃতিকে সে বুদ্ধিহীন, চৈতন্যহীন মনে করে। কিন্তু প্রকৃতিই মানুষকে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। আরে, আমি তো প্রকৃতিই। আমি তো প্রকৃতি হয়েই প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন। তাই সে প্রকৃতির বুকের ভিতর দিয়ে টানেল খুঁড়বে, চার লেনের রাস্তা বানাবে, পাহাড়ের মাথা অব্ধি রেললাইন টানবে, আরো কত কী! মানুষ এত সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভুলে যাবে, যে সে আসলে একটা ক্ষুদ্র অংশ এই প্রকৃতির গায়ে। প্রকৃতি তাকে থাকতে দিয়েছে অতিথির মতো। নিজের সন্তানকে কি আর ফেলে দেওয়া যায়?
কিন্তু চূড়ারও গৃধিনী আছে। জয়ের কবিতায় তো আমরা পাই। সেই ভয়ংকর উচ্চতা তার ভয়ংকর সত্ত্বা দিয়ে বুঝতে পারে, মানুষকে সহ্য করার অর্থ হল মানুষ প্রকৃতিকে তার ক্রীতদাস বলে মনে করে। মনে করে মানুষ বুদ্ধিমান আর প্রকৃতি জড়। কিন্তু এই মহাপ্রকৃতির তো চৈতন্য আছে। আছে চিন্তাও। সে মানুষের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান। সে জানে, মাঝেমাঝে শাসন করতে হয়। মাঝেমাঝে ধ্বংস করতে হয়। না হলে মানুষ বোঝে না, যে তার ক্ষমতা ও চিন্তারও সীমাবদ্ধতা আছে।
আমার প্রিয় হিমালয় আজ যে এমন ধ্বংসাত্মক, তা কি এমনি এমনি? একদিনে এত ভয়ংকর হননি তিনি। তাঁকে ভয়ংকর হতে হয়েছে। তাও তিনি ফোঁস করেছেন মাত্র। রুদ্র হয়ে উঠলে, আরও কী যে হত! আমার বিশ্বাস, ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারের সেই ফুলের উপত্যকা আছে নির্বিঘ্নে। একা। শান্ত।
মানুষ যদি এমন সুন্দর আর শান্ত হতে পারত! মানুষ যদি এমন কবিতা হয়ে উঠতে পারত!
কবিতা না হয়ে মানুষ সভ্য হয়ে উঠেছে। সভ্যতাই সভ্যতার হন্তারক।



























