বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ
লেখক: রিচার্ড জেনিথপ্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস
আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায়
রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার ‘হেটেরোনিমস‘ বা কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি। পেসোয়া শুধু ছদ্মনামে লিখতেন না, তিনি ডজনখানেক এমন কবি চরিত্র তৈরি করেছিলেন যাদের নিজস্ব জীবনী, শারীরিক গঠন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং স্বতন্ত্র কাব্যশৈলী ছিল।রিচার্ড জেনিথ গত তিন দশক ধরে পেসোয়ার পাণ্ডুলিপি এবং তার কয়েকটি অগোছালো বাক্সের বা ট্র্যাঙ্ক যেখানে পেসোয়ার বহু পান্ডুলিপি পরে ছিল। সেইসব পান্ডুলিপির ওপর কাজ করছেন। সব অর্থেই বইটি কেবল একটি জীবনী নয়, এটি পেসোয়ার সেই গোলকধাঁধায় ভরা মনের মানচিত্র।
জেনিথ বইটির শুরুতেই দেখিয়েছেন পেসোয়ার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ—তার দক্ষিন আফ্রিকার ডারবান প্রবাস। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের সাথে তিনি সেখানে যান। এই প্রবাস জীবন তাকে পর্তুগিজের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী করে তোলে। জেনিথ যুক্তি দিয়েছেন যে, পেসোয়ার এই ‘দুই ভাষার মধ্যবর্তী অবস্থান’ থেকেই হয়তো তার সত্তার বিভাজন বা বহুত্ববাদের জন্ম। তিনি শেক্সপিয়র, মিল্টন এবং কিটসের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যা পরবর্তীকালে তার ‘মারিটাইম ওড’’ বা ‘মহাসমুদ্রের গান’ কবিতায় ফুটে উঠেছে।
১৯০৫ সালে লিসবনে ফিরে আসার পর পেসোয়া আর কখনো পর্তুগাল ত্যাগ করেননি। জেনিথ খুব চমৎকারভাবে লিসবনের ধুলোমাখা রাস্তা, কফি হাউজ (যেমন—’আ ব্রাসিলেইরা’) এবং পেসোয়ার সাধারণ বাণিজ্যিক জীবন তুলে এনেছেন। দিনের বেলা তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কেরানি, কিন্তু রাতে তিনি হয়ে উঠতেন এক মহাবিশ্বের স্রষ্টা।বইটিতে পেসোয়ার প্রেমের জীবনের (অফেলিয়া কুইরোজের সঙ্গে একমাত্র ব্যর্থ প্রেম) ডিটেলস এসেছে। জেনিথ এও দেখিয়েছেন কীভাবে পেসোয়া রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে তার ভেতরের কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সঙ্গে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
জেনিথের এই জীবনীর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো পেসোয়ার তিন প্রধান ‘হেটেরোনিমস’-বা তিন ব্যক্তিত্বের বিশ্লেশন: আলবার্তো কায়েইরো: যিনি প্রকৃতির কবি, দর্শনের ঘোর বিরোধী।রিকার্ডো রেইস: যিনি ধ্রুপদী ছন্দে আস্থাশীল এবং বৈরাগ্যবাদী।আলভারো দ্য ক্যাম্পোস: একজন আধুনিকতাবাদী প্রকৌশলী, যার কবিতার ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গতিশীল।
জেনিথ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে পেসোয়া নিজের অস্তিত্বকে এই চরিত্রগুলোর মধ্যে বিলীন করে দিয়েছিলেন। এটি কোনো মানসিক অসুস্থতা ছিল না, বরং এটি ছিল তার সাহিত্যের এক চূড়ান্ত নিরীক্ষা।যদিও পর্তুগিজ ভাষায় পেসোয়া শব্দের অর্থ “মানুষ”, কিন্তু তিনি নিজেকে “অব্যক্তিক” করে তুলতে চেয়েছিলেন। সাহিত্যিক অমরত্বের স্বপ্ন দেখলেও, তিনি মজা করে নিজের নাম দিয়েছিলেন “ফার্দিনান্দ সামওয়ান”—অর্থাৎ, তিনি বিশেষ কেউ নন। কৈশোর কেটেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়; পরে তিনি লিসবনে ফিরে এসে নীরস অফিসের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দেন এবং ১৯৩৫ সালে মৃত্যুর আগে আর কখনও বিদেশ ভ্রমণ করেননি। যৌন সম্পর্কহীন জীবনে তিনি নিজেকে নিমগ্ন করেছিলেন, রিচার্ড জেনিথের ভাষায়, “আত্ম-নিষেকের উল্লাসে”। এই লাজুক, নিরীহ মানুষের মস্তিষ্কে বাস করত এক ভিড়ভাট্টা “পারা-বিশ্ব”—অসংখ্য কল্পিত চরিত্র, যারা ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজ ভাষায় লিখত পেসোয়ার প্রতিনিধি বা প্রতিরূপ হয়ে। সম্মিলিতভাবে তারা সৃষ্টি করেছিল “বিশ শতকের অন্যতম সমৃদ্ধ ও অদ্ভুত সাহিত্যভাণ্ডার”।
র্যাঁবো প্রথম রোমান্টিক কবিতার আত্মমুগ্ধতাকে অতিক্রম করেছিলেন এই ঘোষণা দিয়ে যে, একজন লেখকের “আমি” আসলে অন্য কেউ—এক কল্পিত অপরিচিত। সেই যুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে পেসোয়া নিজেকে বহুগুণে বিভক্ত করেছিলেন। রিচার্ড জেনিথের সুবিশাল সমালোচনামূলক জীবনীতে তাঁর ৫০টি পরিচয় তালিকাভুক্ত আছে এবং প্রতিটি “হেটেরোনিম”-এর জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন বিস্তারিত জীবনকাহিনি।
কেউ ছিলেন দ্বন্দ্বযুদ্ধে অভ্যস্ত এক দাপুটে ব্যারন, কেউ জন্মছক বিক্রি করতেন, আবার কেউ ছিলেন টোগা-পরা এক নব-পৌত্তলিক কবি, যিনি সুবিধামতো এক পাগলাগারে বাস করতেন। এক কুঁজো ও বাতগ্রস্ত মেয়ে—এই বিচিত্র সমাবেশে একমাত্র নারী—জানালার ধারে বসে আকুল চোখে এক সুপুরুষ পথচারীর দিকে তাকিয়ে থাকত। সপ্তদশ শতকের এক অশরীরী আত্মা পেসোয়াকে জ্যোতিষী আদেশ পাঠিয়েছিল হস্তমৈথুন বন্ধ করার জন্য, আর “ভুডুইস্ট” নামে এক অশুভ আত্মা তাঁর কাঁপতে থাকা আত্মাকে ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করত।
বিশেষত তিনটি হেটেরোনিমের মাধ্যমে পেসোয়া কবিতার ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। সরল রাখাল আলবের্তো কায়েইরো সেজে তিনি লিখেছিলেন নিষ্পাপ গ্রামীণ গীতিকবিতা; মার্জিত ধ্রুপদী কবি রিকার্দো রেইশ হয়ে তিনি লাতিন ঘরানার দেবতাদের উদ্দেশে স্তোত্র রচনা করেন; আর ভবিষ্যতবাদী আলভারো দে কাম্পোসের কণ্ঠে—যিনি নাকি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার—তিনি উদযাপন করেন যন্ত্রনির্ভর নগর আধুনিকতাকে। এই সব পরিচয়ের মধ্যে যাতায়াত করা ছিল যেন আত্মার পুনর্জন্মের মতো, কিংবা পেসোয়ার নিজের ভাষায়, “লিঙ্গ পরিবর্তনের” মতো অভিজ্ঞতা।
তাঁর এই বিকল্প সত্তাগুলোর ব্যবহার শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এক আঁকড়ে ধরা তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে পেসোয়া কাম্পোসকে দিয়ে একটি চিঠি লিখিয়েছিলেন, যাতে তাকে দূরে থাকার সতর্কতা জানানো হয়। আর যখন সেই তরুণী ফোন করে সাক্ষাতের আশা করেছিল, পেসোয়া রিকার্দো রেইশ সেজে ফোন ধরে জানিয়েছিলেন যে “ফার্নান্দো” এখন উপলব্ধ নন।
বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পেসোয়ার অসমাপ্ত মাস্টারপিস ‘দ্য বুক অফ ডিসকোয়ায়েট‘-এর বিবর্তন। জেনিথ দেখিয়েছেন কীভাবে বার্নান্দো সোয়ারেস (পেসোয়ার আধা-হেটেরোনিম) চরিত্রের মাধ্যমে লিসবনের একঘেয়েমি এবং অস্তিত্বের সংকটের এক অনন্য বয়ান তৈরি হয়েছে। এই অধ্যায়গুলো পড়লে বোঝা যায় কেন পেসোয়াকে আধুনিক ‘অস্তিত্ববাদের’ অন্যতম পূর্বসূরি বলা হয়।পেসোয়া কেবল কবি ছিলেন না, তিনি জ্যোতিষশাস্ত্র, থিওসফি এবং আধ্যাত্মবাদের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। জেনিথ তার বইয়ে পেসোয়ার এই রহস্যময় দিকটি উন্মোচন করেছেন। পাশাপাশি, পর্তুগালের তৎকালীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পেসোয়ার রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানকেও নির্মোহভাবে বিচার করেছেন।
রিচার্ড জেনিথের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল এবং তথ্যসমৃদ্ধ। প্রায় হাজার পৃষ্ঠার এই বইটিতে তিনি অসংখ্য অপ্রকাশিত ডায়েরি এবং চিঠিপত্র ব্যবহার করেছেন। তিনি পেসোয়াকে একজন ‘দেবদূত’ হিসেবে না দেখিয়ে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন, যার মধ্যে ছিল একাকিত্ব, মদ্যপানের সমস্যা এবং অন্তহীন বিষাদ।জেনিথ পেসোয়ার নীরস ও নিয়মবদ্ধ জীবনকে ভরিয়ে তুলেছেন তাঁর সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিস্তৃত সাংস্কৃতিক অভিযানের বিবরণে। পেসোয়া নিজেকে বলেছিলেন “এক পরিত্যক্ত জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শন”। তাঁর অদ্ভুত দার্শনিক কল্পনাগুলো নিয়ে খানিক বিব্রত হলেও, জেনিথ মনে করেন যে রোজিক্রুশিয়ানবাদ, রসায়নশাস্ত্র এবং অ্যালিস্টার ক্রাউলির নিষ্ঠুর কালোজাদুর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল নিজের অন্তর্লোককে বোঝার উপায়। জীবনীটি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যখন পেসোয়াকে এক ট্র্যাজিক-কমিক অদ্ভুত মানুষ, প্রায় এক পবিত্র সরল হিসেবে দেখানো হয়। জেনিথ তাঁর হেটেরোনিমদের তুলনা করেছেন “কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের কণিকা”-র সঙ্গে, যদিও আমার মনে হয় তারা বরং হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কাল্পনিক খেলাসঙ্গী। “নিজের পৌরুষে নির্বাসিত এক ছোট্ট বালক” পেসোয়া প্রায়ই মজার ছলে নিজেকে লিসবনের রাস্তায় আটকে পড়া এক আইবিস পাখি হিসেবে অভিনয় করতেন—এক পায়ে দাঁড়িয়ে, এক হাত পিছনে লেজের মতো গুঁজে, আর অন্য হাত সামনে ঠোঁটের মতো বাড়িয়ে। তাঁকে নিশ্চয়ই দেখতে লাগত, যেমন ছিল তাঁর হাতের লেখা, এক মিশরীয় হায়ারোগ্লিফের মতো।
রিচার্ড জেনিথের ““পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ“ কেবল একটি জীবনী নয়, এটি বিংশ শতাব্দীর এক নিঃসঙ্গ প্রতিভার মনের গহীন অরণ্যে ভ্রমণ। যারা বিশ্বসাহিত্য, আধুনিকতাবাদ এবং মানুষের সত্তার বহুমাত্রিকতা নিয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য এই বইটি একটি অপরিহার্য পাঠ। জেনিথ প্রমাণ করেছেন যে, পেসোয়া মারা গেছেন ১৯৩৫ সালে, কিন্তু তার সেই ‘ট্রাঙ্ক’ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শব্দ আজও জীবন্ত।পেসোয়ার মৃত্যু হয়েছিল তাঁর জীবনের মতোই নীরবে। তিনি রেখে গিয়েছিলেন কেবল কিছু বিল আর কাগজে ভরা একটি ট্রাঙ্ক, যা সম্পাদকরা এখনও উদ্ধার ও বিন্যাস করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে তাঁর দেহাবশেষ উত্তোলন করে স্থান দেওয়া হয় কামোঁয়েশ ও ভাস্কো দা গামার পাশে, জেরোনিমোস মঠে—যেখানে পর্তুগাল তার জাতীয় বীরদের সমাহিত করে।এটি একটি দীর্ঘ এবং পরিশ্রমসাধ্য পাঠ হতে পারে, তবে এটি শেষ করার পর পাঠকের মনে হবে তিনি কেবল একজনের জীবনী পড়েননি, বরং এক বিংশ শতাব্দীর পুরো ইউরোপীয় আধুনিকতার বিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন।












































