আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই। প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে বিসর্জন দিয়েছি এক বিশাল সংখ্যক মানুষের দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা।
একসময় পাড়ার মোড়ের ব্যাংক বা রেশন দোকান ছিল আমাদের কাকা-দাদা-মামা গোত্রের এই প্রবীণ মানুষগুলোর চেনা পরিচিত গণ্ডি। সেখানে মানুষ ছিল, চোখের ভাষা ছিল। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক-একটা নির্জীব ‘কিয়স্ক’ বা ইন্টারফেস। আমাদের এবং আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে যা ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’, তাঁদের কাছে কিন্তু তা এক দুর্ভেদ্য গোলকধাঁধা। সামান্য একটা পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া বা একটা ওটিপি সময়মতো না আসা তাঁদের কাছে কিন্তু স্রেফ প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটি নয়, বরং এক ধরণের অস্তিত্বের সংকট। যে মানুষটি সারাটা জীবন সম্মানের সঙ্গে সংসার চালালেন, তাঁকেই আজ নিজের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে সন্তানের বা কোনো অপরিচিতের করুণার পাত্র হতে হচ্ছে। প্রশ্ন হতেই পারে যে, এই অসহায়ত্বের দায় কার ?
আমরা ঘোষণা করে বসে আছি, যে, স্মার্টফোনহীন জীবন এখন অচল। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি, এই ডিভাইসটি অনেকের কাছেই এক ধরণের ‘ডিজিটাল জেলখানা’ কিনা ? চোখের পাওয়ার কমে আসা মানুষটির কাছে এইসব ছোটো ছোটো আইকনগুলো এখন ঝাপসা।
কাঁপতে থাকা আঙুলের কাছে ‘টাচ স্ক্রিন’ আজ এক অবাধ্য অবয়ব। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন সবকিছুকে বাধ্যতামূলক ‘অ্যাপ-নির্ভর’ করে তুলতে ব্যস্ত, তখন পরোক্ষভাবে আমরা কি এটাই বুঝিয়ে দিই না যে, যারা এই প্রযুক্তিতে সড়গড় নও, এ সমাজে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই ? প্রবীণদের এই পরিকল্পিত বর্জন কি সত্যিই কোনো সভ্য মানসিকতার পরিচয়?
বলা হয় ডিজিটাল লেনদেন খুবই নিরাপদ। অথচ বাস্তব হল, সাইবার অপরাধীদের সবচেয়ে সহজ শিকার কিন্তু এই প্রবীণরাই। যাঁরা প্রযুক্তির মারপ্যাঁচ বোঝেন না, তাঁদের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে দিনের পর দিন কি লুণ্ঠিত হচ্ছে না তাঁদের আজীবনের সঞ্চয় ? দেখেশুনে মনে হয় না কি যে, এক অদ্ভুত প্যারাডক্সের মধ্যে বাস করছি আমরা — যেখানে আমরা একদিকে স্বচ্ছতার কথা বলব, অন্যদিকে আমাদের সবথেকে দুর্বল নাগরিকদের অরক্ষিতভাবে ছেড়ে দেব ডিজিটাল হায়নাদের জঙ্গলে ?
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সবথেকে বড়ো অভিশাপ হল সম্ভবত একটা ‘স্পর্শের অভাব’। আগে প্রবীণদের নিজেদের একটা সামাজিক বৃত্ত ছিল। ব্যাংকের লাইনে কথা হত, পোস্ট অফিসে আড্ডা হত। আজ সেই সব সুযোগ কেড়ে নিয়ে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এক শীতল প্লাস্টিকের বডি। ঘরে বসে সব পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। এই যে ডিজিটাল একাকীত্ব, এর কি কোনো ৫-জি স্পিড দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ?
বিনির্মাণ বা ডি-কনস্ট্রাকশন আমাদের আজকের দুনিয়ার সবথেকে আগ্রহ জাগানো একটা ধারণা বলুন ধারণা, দর্শন বলুন দর্শন, যা আমাদের শেখায় চাকচিক্যের আড়ালের কঙ্কালটাকে দেখতে কেবল নয়, তাকে বিশ্লেষণ করে আমাদের নিজেদের অবস্থানে পৌঁছতে। এই ডিকনস্ট্রাকশনই কি বলে দিচ্ছে না যে, আমাদের এই ঝকঝকে ডিজিটাল ভারতের ধারণার আড়ালে, তার নিচে চাপা পড়ে আছে কয়েক কোটি প্রবীণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস ? প্রগতি মানে যদি হয় অগ্রজদের পিছনে ফেলে যাওয়া, তবে সেই প্রগতিকে নিয়ে আমাদের কেন লজ্জিত হওয়া উচিত হবে না ?
প্রযুক্তির কাজ তো আসলে হওয়া উচিত ছিল মানুষের ক্ষমতা বাড়ানো, তাকে পরনির্ভরশীল করা তো নয়। আমরা কি সত্যিই এমন এক দেশ গড়তে চেয়েছিলাম, যেখানে অভিজ্ঞতার চেয়ে আঙুলের ডগার গতি বেশি দামি?
আজ কিন্তু সত্যিই সময় এসেছে এই ‘ডিজিটাল বর্ণাশ্রম’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার। গতির জয়গানের মধ্যিখানে অন্তত একবার থামুন, পেছন ফিরে একবার অন্তত তাকিয়ে দেখুন আপনার ফেলে আসা পথের ধারে আপনারই অগ্রজরা আজ তাঁদের রক্ত দিয়ে স্বাধীন করা নিজেদের দেশে ‘পরবাসী’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বাধীনতার পরে এই এতগুলো দশক পার হয়ে এসেও আমরা কি সত্যিই স্বাধীনতার স্বাদ পাবার জন্যে যোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছি ?












































