টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি।
স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের চাঁই বড় পেছলা। পা হড়কালে হাঁটুর হাড় ভাঙবে নির্ঘাৎ -‘
‘আমার মনে হচ্ছে আমি আর এ দুনিয়ায় নেই। তা পায়ের তলায় কি আছে বুঝব কি করে –‘,বললুম আমি। স্কুয়ার ডান হাতটা তখুনি আমার দিকে এগিয়ে ধরা। সে হাত ধরবার আগেই আমার নজরটা রাস্তার পাশে। সেখানে কটা লোক। একটু দূরেই উবু হয়ে গোল হয়ে বসা।
‘ও লোকগুলো এই জমাট-বাঁধা হিমে বসে করছে কি – ‘ আমার জানবার ইচ্ছে। স্কুয়ার খিলখিলিয়ে হাসি। ওগুলো পাথর। অরোরার আলোয় দেখাচ্ছে ও রকম। গ্যানগ্যানের কাছে শুনো ওদের গপপো –‘ আমি আর কথা বাড়ালুম না। পাহাড়ে চড়তে লাগলুম স্কুয়ার সঙ্গে। গ্যানগ্যানের বাড়ির আলোটা এবার নজরে। সেখানে গিয়েই শুনব গপপোটা।
একটা চড়াই ভেঙে আরও ওপরে। গ্যানগ্যানের বাড়ির গেটের মুখে। সেখানে দরজায় রঙীন কাগজের শিকলি। কাগজের রঙীন বাতির লণ্ঠন। ‘এসব কি –‘, আমার জিজ্ঞাসা।
‘আজ যে গ্যানগ্যানের জন্মদিন-‘ স্কুয়ার জবাব দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে। ‘এসো এসো ভেতরে এসো-‘ স্কুয়া আমার হাত ধরে টান।
আগুন-কাঁদায় বসা গ্যানগ্যান নিজের জায়গাটিতে নিজের আরাম কেদারায়। গ্যানগ্যানের সাজ পোশাক আজ দারুণ। নিত্যি গায়ে চড়ানো লোমের কোটের বদলে ঝকঝকে পুরু লোমের একখানা চমৎকার কোট। একেবারে আনকোরা নতুন। মাথায় নতুন লোমের টুপী। তাতে পালক বসানো। ঘোমটার মতো কান মাথা ঢাকা। বুকে পিঠে সুন্দর কাজ করা পশমের ঝালর লাগানো লেস। কাঁধ বেড়ে দামী ব্যাজারের লেজের চামরের মতো স্কার্ফ। আজ গ্যানগ্যান আর চাঁদের মা বুড়ী নয়। নিজেই চাঁদের পাহাড়।
আমার মনে খচখচানি। স্কুয়াটা কি দুষ্টু মেয়ে। আগে বলবে তো। গ্যানগ্যানের ‘বার্থ-ডে’ -জন্মদিন বলে কথা। ডিয়ার ওল্ড গ্যানগ্যান। সেঞ্চুরী পার করা গ্যানগ্যান। এমন একজনকে একটু উপহার দেবার এমন সুযোগ কি আর আসবে আমার। কি আর করা যাবে। শুধু হাতেই এগোলুম গ্যানগ্যানের সামনে।
আমাকে দেখেই গ্যানগ্যানের এক মুখ হাসি। ফোকলা মুখের হাসিটা বড় মন-ছোঁওয়া। আমার দু’ গালে চুমু গোটাকতক। তারপরেই ছড়া –
‘এসো গো আমার কালোমানিক
মেঘলা দিনে আলো খানিক।
জন্মদিনে জ্বালাও বাতি
তুমি আমার মনের সাথী।
সাদা কালোয় কী আসে যায়
মনের মানুষ মেলে যেথায়।’
কুলকুলিয়ে হাসি গ্যানগ্যানের।
এর ফাঁকে কখন স্কুয়ার হাত আমার কোটের পাশপকেটে। সেখানে কি একটা টপ করে ভেতরে গুঁজে দেওয়া। সঙ্গে সঙ্গে আমার বাঁ হাতে একটু চাপ। ইসারা বুঝেই আমারও বাঁ পকেটে হাত। তাতে যা ঠেকল তা টেনে বার করা। ওমা কী সুন্দর ছোট্ট একটা বাদামী রঙের গাইগরু। শান্ত দুটো বড় বড় চোখ। চমৎকার মুখখানা। কানদুটো খাড়া। দুটো ছোট ছোট শিং। পেছনে লেজ। ভারী পালান দুধে ভরা। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে হয়। সেটা গ্যানগ্যানের হাতে দিয়ে বললুম ‘হ্যাপি বার্থ-ডে টু ইয়্যু গ্যানগ্যান। মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস-‘ গ্যানগ্যানের চোখে-মুখে খুশী উপচে পড়া। স্কুয়া ধাঁ করে গরুটা গ্যানগ্যানের হাত থেকে তুলে নিলে। দাঁড় করিয়ে দিলে একটা আড়করে-ধরা বই এর ওপর। গরুটা গটগট করে হেঁটে চলল সামনে। গ্যানগ্যান সেটাকে তুলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলে। তার পরেই তার ছড়া –
‘বাহবা কি চমৎকার
কি সুন্দর এই উপহার।
ছোট্ট গরু মজার খেল
নাম দিলুম এর কৃষ্টাবেল’
গ্যানগ্যানের মুখখানা গম্ভীর। দুটো চোখ ছলছল। তাতে জল ভর-ভর। কোটের হাত থেকে রুমাল বার করে চোখ মোছা। নাক ঝাড়া।
স্কুয়া বললে, ‘কি হল গ্যানগ্যান’ –
‘হবে আবার কি -। আমার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী কৃষ্টাবেলের কথা মনে পড়ল। অমন একটা দুধেল গাই। আমি বলতে গেলে তার দুধ খেয়েই মানুষ। আমার মাও যা কৃষ্টাবেলও তাই-‘
‘তা – তার হলটা কি’ স্কুয়ার জিজ্ঞাসা।
‘এক রাতে তাকে নিয়ে লোপাট পুঁটে দত্তি ট্রো-গুলো-‘ ভাঙা ভাঙা ধরা গলায় কথা গ্যানগ্যানের।
আমরা ততক্ষণে যে যার জায়গায় বসা। আমার কানের কাছে মুখ স্কুয়ার। ফিসফিসে কথাগুলো তার। ‘গ্যানগ্যান এখন চলে গেছে রূপকথার রাজ্যিতে’ বলেই সে পাশের ঘরে গা ঢাকল।
‘তা গ্র্যান্ডমা শুনেছি তোমাদের ছেলেবেলায় ঐ পুঁটে দত্তি ট্রো-দের উৎপাত নাকি’- আংকল জ্যাকের কথার ওপর থাবড়া গ্যানগ্যানের। শেষ হবার আগেই –
‘ওরে বাবা – সে আর বলতে – উৎপাত বলে উৎপাত-‘ শিউরে-ওঠা কথা গ্যানগ্যানের।
‘পুঁটে দত্তি মানে-‘ আমার অবাক জিজ্ঞাসা। ‘ধেড়ে দত্তিদের গল্পো তো শুনেছি। পুঁটেদত্তি আবার কারা-‘ ‘আরে পুঁটে দত্তি, পুঁটে দত্তি গ্যানগ্যানের জোর দেওয়া কথা। ‘এই এত্তটুকু খুদে খুদে দত্তিগুলো – ট্রো-দত্তি’ বলেই কড়ে আঙুলের পাবটা উঁচিয়ে ধরল গ্যানগ্যান। ‘দুৎ – ঐ টুকু আবার দত্তি হয় নাকি-‘ আমার সুরে অবিশ্বাস। গ্যানগ্যানের জবাব ছড়ায়।
‘সত্যি বলছি সত্যি
এত্তটুকু এক রত্তি
তবুও তারা দত্তি।
(তাদের) গায়ে দারুণ জোর।
তারা ম্যাজিক জানে
জানে কতো বিদঘুটে মন্তর।
তারা খুশী হলে দেবে তোমায় মহারাজ বানিয়ে।
তারা এক নিমেষে আনবে খবর দুনিয়া বেড় দিয়ে।
তারা চটে গেলে রাতারাতি
সব করবে ধ্বংস।
সাবড়ে দেবে গরু ঘোড়া
শুয়োর ভেড়ার বংশ।
আমাদের ছেলেবেলায় লোকেদের মুখে মুখে একটা ছড়া-‘ গ্যানগ্যানের মুখে ছড়ার বান।
‘শিকার করতে কেউ যেওনা ফাঁকা পাহাড় অঞ্চলে
পুঁটে দত্তি ট্রো-রা ঘোরে সেথায় সবাই দঙ্গলে।’
আমার মনে মনে নাড়াচাড়া। পুঁটে দত্তিদের চেহারাগুলো ভাবার চেষ্টা।
‘পুঁটে দত্তি এটুকু এটুকু দত্তি। ট্রো-ট্রো। এদেশে বলে ট্রো। হুবহু মানুষের চেহারা-‘ বললে গ্যানগ্যান। ‘আগে তাদের উৎপাত ছিল সংঘাতিক। আর নজরেও পড়ত যেখানে সেখানে। আজকাল তাদের আর দেখিনে। এখন চাদ্দিকে লোকজন অনেক। অনেক বসত। অনেক চাষ-আবাদ। অনেক হৈ হট্টগোল। তা’পর ধর ইলেকট্রিক বাতির আলো। মোটর-গাড়ি এরোপ্লেনের গর্জন। ট্রো-রা এখন একদম নিপাত্তা। কৈ আজকাল তো আর কাউকে বলতে শুনিনে ট্রো-তে পেয়েছে। কি ট্রো-তে বাণ মেরেছে-‘
‘তা ট্রো-রা তখন কি করত একটু শোনাও না গ্যানগ্যান-‘ স্কুয়ার আবদেরে গলায় অনুরোধ। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামনে বড় বড় কেকের টুকরো ভরা প্লেট আর কফির পেয়ালা নামিয়ে দেওয়া।
‘ট্রো-তে পাওয়া ব্যাপারটা কি-‘ আমার প্রশ্ন। ‘অবিশ্যি আমাদের দেশে লোককে ভূতে পায় পরে পরে আমার কথা।
‘তোমাদের দেশের ভূত কি রকম’ -জানতে ইচ্ছে গ্যানগ্যানের।
ভূত ঘোষ্ট মানুষ ম’লে ভূত। তাদের নানা উৎপাত জ্যান্ত মানুষদের ওপর আমার কথা।
‘ ‘না-না ট্রো-রা মরা মানুষের ভূত নয়। ওরা জ্যান্ত ভূত গ্যানগ্যানের যোগ দেওয়া আমার কথার পিঠে।
‘কি জানো ট্রো-রা দত্তিদের মতোই একজাতের অপদেবতা। দত্তিরা সবাই হোঁৎকা হোঁৎকা। পাথরের মতো প্রকাণ্ড। ট্রো-রা খুব খুদে খুদে। তাই ওরা পুঁটে দত্তি। তবে ওরা ইচ্ছে করলেই ধেড়ে দত্তিদের মতো বড়ও হতে পারে। কিন্তু ওরা এমনিতে খুদেই। যতো উঁচু উঁচু পাহাড় দেখবে ওগুলো সবাই জমাট বেঁধে পাথর হওয়া ধেড়ে দত্তি। আর ছোট ছোট পাথরের চাঁই-গুলো সব পুঁটে দত্তি ট্রো-‘
কফির পেয়ালায় একটা চুমুক গ্যানগ্যানের। গলা ভিজিয়ে তার কথা, ‘ব্যাপারটা কি জানো- ট্রোগুলো সব রাতের জীব। তাদের চরা-বরা নাচন-কোঁদন রবরবা সবই রাতের বেলা। দিনের আলো ফুটল কি তাদের আর পাত্তা নেই। আলো ফুটে ওঠার আগেই তাদের সব কাজকর্ম শেষ। সুট-সাট নিজেদের গর্তে সেঁধোন। আর ধর – যদি কোন ট্রো আরামসে শুয়োরের ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে একদম বেহুঁস, কি কারুর গোয়াল থেকে গরু-ভেড়া লোপাট করতেই ব্যস্ত, খেয়ালই নেই।
ওদিকে রাত কেটে গিয়ে দিনের আলো ফুটেছে, তক্ষুনি তারা পাথর হয়ে যাবে। ঐ রকম পাথর হয়ে যাওয়া একটা পুঁটে দত্তির দল তুমি দেখতে পাবে দক্ষিণ উন্স্টের গ্রীনবেক পাহাড়ের পেছন দিকটায়-’
‘তোমার বাড়ি আসবার পথের পাশে একটু আগেই দেখলুম একদল বেঁটে লোক এই হি-হি ঠাণ্ডায় গোল হয়ে বসা। স্কুয়াকে শুধোলুম ওরা এখানে কি করছে। তা স্কুয়া তো হেসেই খুন। বলে ধুৎ ওগুলো সব ছোট ছোট পাথর -‘ বললুম আমি।
‘আরে ওই তো পুঁটে দত্তির দল। স্কুয়া সেদিনের বাচ্চা মেয়ে – ও কী জানে –‘ হৈ হৈ করে বলে উঠল গ্যানগ্যান। ‘ওগুলো কোন গেরস্তের ঘর থেকে নির্ঘাৎ শুয়োরের মাংস চুরি করেছে। তা’পর বেভুল হয়ে শুয়োরের ঠ্যাং চিবুচ্ছে- এমন সময় দিনের আলো। টেরই পায়নি। ব্যস-একসাটে একদম পাথর-‘












































