শিশিরকুমার দাশ: খুঁজে ফিরি কর্ণ, কর্ণের সহোদর/মোস্তাক আহমেদ

মৃত্যুলগ্ন পার হয়ে যতবার গিয়েছি নিঃসীমে

বিদ্যুতের দীপ হাতে: অন্ধকারে আকাশের বিস্তৃতি অপার

বিদ্রোহী ঝড়ের যত উদ্বাহু মেঘেরা

আমন্ত্রণ করে আনে অতীতের ঘন অন্ধকার;

তবু দেহ ভিজে গেছে শান্তিস্নিগ্ধ হিমে।

                                                                                        (মৃত্যুলগ্ন/জন্মলগ্ন)

 

কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জন্মলগ্ন’। ‘পূর্বমেঘ প্রকাশ ভবন’ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৫৬-তে। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। কী দীপ্ত উচ্চারণ! কয়েক বছর হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। কলকাতা বদলে যাচ্ছে দিনকে দিন। শিশিরকুমার দাশ তখন হালতুতে। পূর্বপল্লী (বর্তমান নাম তারাপীঠ)-তে বাবার তৈরি বাড়ি। সে বাড়িতেই জন্মাচ্ছে একের পর এক কবিতা, ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ। ভিত গড়ে উঠছে উপন্যাসের। চলছে অনুবাদ। স্বাধীন দেশের স্বাধীন সত্তা। ‘জন্মলগ্ন’ই বটে!

১৯৫৫-তে হালতুতে পাকাপাকি আসা। নতুন এক গল্পের জন্ম হচ্ছে হালতুতে— আধুনিক এক রূপকথার। এ তাঁর প্রস্তুতি পর্ব। তাঁর পাণ্ডিত্যে আগামী পৃথিবী মুগ্ধ হবে। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যেও শোনা যাবে আত্মবিশ্বাসী পদচারণা। হালতুর সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। এলাকার সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে। সেসব তাঁর লেখায় ঢুকে পড়ে হুড়মুড় করে। স্বভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায়। কথার পিঠে কথা জমা হয়। তারপর গবেষণার প্রয়োজনে, চাকরি সূত্রে কত কত জায়গা! মাঝে মাঝে ফিরে ফিরে আসা। এক অবিচ্ছেদ্য টানে। কত কত স্মৃতি! জলকাদা পেরিয়ে কতদিন বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে কসবা হয়ে ফেরা! হাঁটতে হাঁটতে। ফাঁকা এলাকা। কোথায় এত বাড়িঘর, এত মানুষ, এত পসরা! শহর এদিকে ঘন হয়ে ওঠেনি তখনও। কবি হাঁটেন— গবেষক, তরুণ গল্পকার, বিশ্বগ্রাসী প্রতিভা। জন্মায় ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’, ‘বিড়াল’, ‘একটি শিশুর জন্ম’, ‘অন্য ক্ষুধা’, ‘কৃষ্ণচূড়া’র মতো অসংখ্য লেখা। আবহে কবিতারই সুর, আলাপে অতল-দর্শন।

শিশিরকুমার দাশ নামটি মনে এলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। মেধা ও পাণ্ডিত্যের সহাবস্থান তাঁকে সমসময়েই কিংবদন্তি করে তুলেছিল। গর্ব হয় এমন বাঙালিকে নিয়ে— কিন্তু একটা অপরাধবোধও আমাদের বহন করতে হবে চিরকাল। বিদেশের নিশ্চিত হাতছানি উপেক্ষা করে যে প্রতিভা বাংলাকে ভালোবেসে ফিরে এসেছিলেন, আমরা তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করতে পারিনি। দিল্লিও নয়, তিনি চেয়েছিলেন বাংলা, বাংলার মানুষের ভালোবাসা— অন্তহীন স্বপ্ন বুনেছিলেন তাঁর লেখায়, আলোচনায়, কাজে ও যাপনে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে তিনি মেলাতে চেয়েছিলেন শেকড়কে মনে রেখে, ডানা আর শেকড়ের মেলবন্ধন ছিল তাঁর প্রধান প্রয়াস। সরাসরি সবসময় আমরা যে তাঁকে উপেক্ষা করেছি এমনটা নয়— নীরব থেকেছি, জেনেও না জানার ভান করেছি, হা-হুতাশ করেছি আর সন্তর্পণে দূরত্ব নির্মাণ করেছি অকারণ যৌক্তিকতায়—

সতর্ক সহজ দৃষ্টি, তবু উদাসীন।

ঝড়ে আন্দোলিত কাছে, মেঘহীন দিনে

সুনির্দিষ্ট ব্যবধান মৌন প্রতিবেশী,

একের মৃত্যুতে অন্য প্রাজ্ঞ দার্শনিক

হয়তো গভীর যোগ মাটির আঁধারে

একই রক্তজাত দুই সহোদর এরা

একের রথের চক্র গ্রাস করে মাটি

অন্যে তাঁকে হত্যা করে দ্বিধাহীন শরে।

                                                                  (সহোদর/হয়তো দরোজা আছে অন্যদিকে)

     অনেকেই মনে করেন, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সর্বকালের সেরা ছাত্র তিনি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দু-টিতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। কিন্তু এতে আশ্চর্যের কোনো কারণ আছে কী! সে তো প্রতি বছরই কেউ না কেউ হন। সেসময় তিনি পেয়েছিলেন রেকর্ড মার্কস। উত্তরকালের কোনও ছাত্রের পক্ষে একটা সময় পর্যন্ত তা ছোঁয়া ছিল দুঃসাধ্য। তাতেই বা কী! ছড়িয়ে আছে তাঁর পাণ্ডিত্যের অনেক অনেক গল্প। তাঁর মেধায় মুগ্ধ মাস্টারমশাইরা, বন্ধুমহল, অগণিত ছাত্রছাত্রী— গল্প পৌঁছোয় সাহিত্যে উৎসাহী পাঠকমহলেও। গ্রিক ভাষা তাঁর করায়ত্ত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যেও তিনি অনায়াস। ভাষাতত্ত্ব আবার তাঁর অতি প্রিয় বিষয়। কখনও তিনি কলকাতায়, কখনও দিল্লিতে, লন্ডনে কিংবা নিউ ইয়র্কে। ভূগোল বাড়তে থাকে তাঁর কাজ ও ভাবনার। কিন্তু বাংলা যে তাঁকে বড্ড টানে। সেই অমোঘ টানেই আবার কলকাতা। অথচ তাঁকেই নেওয়া হল না কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রীডার’ পদে। বর্ধমানেও না। ‘সংঘবদ্ধ প্রতিকূলতায়’ আমাদের পাপ বাড়ে। ১৯৬৯ সালের ১৯ এপ্রিল শিশিরবাবুর মাস্টারমশাই জনার্দন চক্রবর্তীর একটি চিঠিতে আছে সেসবের ভেতরের গল্প। তিনি লিখছেন,

বাবা শিশির, তোমার স্নিগ্ধস্পর্শ পেলাম। তোমার ‘কর্মচাঞ্চল্যহীন’ কথাটি অন্তর স্পর্শ করল। তাই দু-একটি কথা লেখা প্রয়োজন বোধ করি। তোমার কর্মক্ষেত্র প্রশস্ততর এবং অর্থনৈতিক-বিবেচনা নিরপেক্ষ হোক্‌। এমন একটি আশা ও অসন্তোষ আমার মনেও ফল্গুর মতো বয়ে চলে। বিশ্বাস করো, বাবা। বর্ধমানে লড়েছিলাম। অধ্যাপক পদের জন্য। তোমার অনুকূলে নিয়োগ ঠেকিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সংঘবদ্ধ প্রতিকূলতায় তোমাকে আনতে পারিনি। কোলকাতার সাম্প্রতিক রীডার-নিয়োগে তোমার জন্যে কিছু করা সম্ভব হয়নি। কারণটি কৈফিয়তরূপে তোমাকে জানাই।…

অজস্র তাঁর লেখালেখি। চারটি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ তো আছেই। বেরিয়েছে কবিতা সংগ্রহের দু-টি খণ্ড। সেখানে ওই কাব্যগ্রন্থগুলি ছাড়াও স্থান পেয়েছে অনূদিত, অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত কবিতা। খোঁজ মিলেছে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত আরও অনেক কবিতার। পাওয়া গেছে বেশ কিছু ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, অল্প বয়সের কিছু লেখা। অনূদিত নানা কাব্যের পাশাপাশি হদিশ পাওয়া গেছে অগ্রন্থিত কিছু অনুবাদ কবিতারও। তাঁর লেখা মৌলিক নাটকের সংখ্যা চল্লিশটিরও বেশি। সব নাটক অভিনয়ও হয়নি। অপ্রকাশিত ছ-টি নাটক সম্প্রতি সংকলিত হয়েছে। শিশিরবাবুর কিছু কিছু নাটক অন্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে— পাওয়া গেছে পুরোনো পাণ্ডুলিপি, কিছু খসড়া। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস দু-টি। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত ছোটোগল্প পঞ্চাশটির কাছাকাছি। সেগুলি একত্রে প্রকাশের কাজ চলছে। প্রায় এক ডজন তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ। আবার বর্তমান প্রবন্ধ সংগ্রহের বাইরেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র প্রবন্ধ। দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ শুরু হয়েছে। এই খণ্ডে প্রবন্ধ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রথমটির চেয়েও বেশি।

কবিতা ছাড়া অন্যান্য যেসব অনুবাদের কাজ আছে তার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ইংরেজি বইও ডজনখানেক। পাওয়া গেছে অর্ধশতাধিক ইংরেজি প্রবন্ধ। শিশিরকুমার দাশ কিছু কিছু যৌথ সম্পাদনার কাজও করেছেন। আছে পরীক্ষিৎ সেন ছদ্মনামে লেখা কিছু রচনা। আছে বক্তব্যের প্রতিলিপি। আরও কত কী যে! ৬৭ বছরের (১৯৩৬-২০০৩) জীবনে দু-হাত ভরে না লিখলে এত লেখা সত্যিই অসম্ভব। পাওয়া গেছে তাঁকে লেখা অসংখ্য চিঠি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, জনার্দন চক্রবর্তী, প্রমথনাথ বিশী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, দেবেশ রায়, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী, স্বপন মজুমদার— আরও অনেক অনেক নাম। তাঁর লেখা অল্প কিছু চিঠি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে— খোঁজ চলছে বাকিগুলোর। তবে এক্ষেত্রে সব চিঠি পাওয়া কঠিন, অনেকেই গুছিয়ে রাখেননি। এছাড়াও সন্ধান মিলেছে তাঁর ইংরেজি লেখার বাংলা খসড়া, বাংলা অনুবাদ। সেগুলির অধিকাংশই জড়ো করা গেছে।

প্রথম প্রকাশের নিরিখে একবার উঁকি দেওয়া যাক তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের দিকে। চিনে নেওয়া যাবে স্থান-কাল-পাত্রের আপাত প্রভাব। ধারণা পাওয়া যাবে তাঁর প্রতিভার ব্যাপ্তি সম্পর্কে। তবে স্বল্প এই পরিসর শিশিরকুমার দাশকে বোঝবার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ নয়। বলা যেতে পারে, এই আলোচনা একটা ভূমিকা মাত্র। তাঁকে নিয়ে চর্চার পরিসর তৈরি হোক এটাই প্রধান প্রত্যাশা। তাই তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে জানানোর আগ্রহ থেকে এই অসম্পূর্ণ তালিকা:

 

কবিতা

জন্মলগ্ন (১৯৫৬)

হয়তো দরজা আছে অন্যদিকে (১৯৮৬)

অবলুপ্ত চতুর্থচরণ (১৯৮৬)

বাজপাখির সঙ্গে কিছুক্ষণ (১৯৯২)

 

কবিতা (অনূদিত)

বহুযুগের ওপার হতে (Collection of Ancient Greek Lyrics, ১৯৮৯)

আই ছিং: নির্বাচিত কবিতা (১৯৯১)

জর্জ সেফেরিস: নির্বাচিত কবিতা (১৯৯২)

ঠাম্মার উল বোনা (From English Version of Uri Orlev’s Hebrew Poem Granny Knits, ১৯৯৯)

 

এছাড়া ১৯৯১ সালে ‘কালোমাছের পাঁচালী’ (A long Ballad by Chinese Poet Ai Ching) ‘প্রমা’ পত্রিকায় ও ১৯৯৬ সালে ‘প্রাচীন নাবিকের পালা’ (The Rime of the Ancient Mariner by S.T. Coleridge) ‘চতুরঙ্গ’-এ প্রকাশ পায়। আবার কবিতা সংগ্রহের দু-টি খণ্ড পাওয়া যায়। তবে এখনও খোঁজ মিলছে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অনেক কবিতার। পাওয়া গেছে বেশ কিছু ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, অল্প বয়সের লেখা। অগ্রন্থিত কিছু অনুবাদ কবিতাও আছে সে তালিকায়।

 

নাটক (গ্রন্থিত)

সক্রেটিসের জবানবন্দী (সক্রেটিসের জবানবন্দী এবং সক্রেটিসের সন্ধান একত্রে, ১৯৭৫)

ভাঁড়ু দত্ত (১৯৭৭)

মুচিরাম গুড় (১৯৮৩)

আদিম অন্ধকার (১৯৮৫)

আকবর-বীরবল (১৯৯৪)

বাঘ (বইমেলা ১৯৯৬)

অলৌকিক সংলাপ (১৯৯৬)

সিন্দুক (১৯৯৬)

পুরস্কার-প্রহসনম্‌ (১৯৯৯)

দাদাজী, আমরা কোন্‌ পার্টির লোক (২০০৩)

অপ্রকাশিত নাটক সংগ্রহ (২০২২)

 

কিছু কিছু নাটক অন্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আছে ত্রিশের উপর অগ্রন্থিত মৌলিক নাটক। এগুলিও প্রকাশের কাজ চলছে।

 

নাটক (অনূদিত):

বন্দিনী/ট্রয়কন্যা (মূল নাটক: এউরিপিদেস-এর ‘ত্রোইআদেস’, ১৯৮৩)

রাজা ওইদিপৌস (মূল নাটক: সোফোক্লেস-এর ‘ওইদিপৌস তুরান্‌নুস’, ১৯৮৮)

আন্তিগোনে (মূল নাটক: সোফোক্লেস-এর ‘আন্তিগোনে’, ১৯৮৯)

গ্রীক নাটক সংগ্রহ (২০১২)

 

অগ্রন্থিত অনুবাদ নাটকও আছে। সেগুলি একত্র করবার ব্যবস্থা হয়েছে। 

 

প্রবন্ধগ্রন্থ

মধুসূদনের কবিমানস (১৯৫৯)

বাংলা ছোটগল্প (১৮৭৩-১৯২৩) (১৯৬৩)

গদ্য ও পদ্যের দ্বন্দ্ব (১৯৮৫)

কবিতার মিল ও অমিল (১৯৮৭)

পাঠ্যক্রম ও সাহিত্য (১৯৯২)

ভাষা জিজ্ঞাসা (১৯৯২)

ফুলের ফসল (সংকলনের রাজনীতি) (১৯৯৮)

মোদের গরব মোদের আশা (১৯৯৯)

ভারতসাহিত্যকথা (১৯৯৯)

আত্মজীবনী: জীবনী ও রবীন্দ্রনাথ (২০০৭)

নবজাগরণ: চৈতন্যদেব, রামমোহন ও খৃস্টধর্ম (২০২০)

সিংহশিশু (১ জানুয়ারি ২০২২)

 

ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরও অজস্র প্রবন্ধ। প্রবন্ধ সংগ্রহের প্রথম খণ্ড প্রকাশ পেয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ চলছে।

 

গদ্য সাহিত্য (অনূদিত)

আকবর (মূল গ্রন্থ: লরেন্‌স্‌ বিনিইয়ান্‌-এর ‘আকবর’, ১৯৫৯)

বিদ্যুৎগতি অভিযান: ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৯৭১ (মূল গ্রন্থ: ডিকে পালিত-এর ‘Lightning Campaign’, ১৯৭২)

কাব্যতত্ত্ব (মূল গ্রন্থ: অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’, ১৯৭৭)

 

মিলেছে তাঁর ইংরেজি লেখার অনেক বাংলা খসড়া, বাংলা অনুবাদ। সেগুলির কিছুটা এখনও পর্যন্ত জড়ো করা সম্ভব হয়েছে। সবটা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ!

 

যৌথ প্রবন্ধগ্রন্থ

বিতর্কিত অতিথি: রবীন্দ্রনাথ ও চীন (শিশিরকুমার দাশ ও তান ওয়েন, ১৯৮৫)

শাশ্বত মৌচাক: রবীন্দ্রনাথ ও স্পেন (শিশিরকুমার দাশ ও শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, ১৯৮৭)

 

মুক্তগদ্য

দূর লালপুর। প্রমা। ১৯৮৮।

 

আখ্যান

ইতিহাসের রঙ্গলোকে (২০১৩)

 

উপন্যাস

নীল সমুদ্র (১৯৬০)

সীমান্ত (১৯৬১)

 

 

ছোটোগল্প

এখনও পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত ছোটোগল্পের সংখ্যা প্রায় ৫০। একটিও গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। এটা খুবই আশ্চর্যের! সঙ্গত কারণ জানা যায় না। সম্প্রতি উপন্যাস ও সমস্ত গল্প একসঙ্গে প্রকাশের উদ্যোগ চলছে।

 

শিশু–কিশোর সাহিত্য

সোনার পাখি (১৯৫৯)

তারায় তারায় (১৯৬০)

আর্গোস (১৯৮৯)

মাইকেল (১৯৯৪)

চিংড়ি (১৯৯৬)

চাঁদমামা আর বাঘের মাসি (২০০২)

 

যদিও ‘তারায় তারায়’-এর মতো গ্রন্থকে শিশু-কিশোর সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কারণ মিথের অনেক বিশেষত্ব পরিণত মনের সঙ্গেই মানানসই। তাছাড়া খোঁজ মিলেছে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বেশ কিছু লেখার। বিশেষ করে বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে তাঁর কিশোর সাহিত্যের সৃজন আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে।

 

সম্পাদিত গ্রন্থ

চতুর্দশী (১৯৬৬)

শতায়ু সুকুমার (১৯৮৮)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত: নির্বাচিত রচনা (১৯৯৫)

সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী (২০০৩)

শশিভূষণ দাশগুপ্ত স্মারক গ্রন্থ (অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের সঙ্গে সহ সম্পাদনা, ১৯৯৭)

  

ইংরেজি গ্রন্থ

Early Bengali Prose (Carey to Vidyasagar, 1996)

Western Sailors Eastern Seas (German Response to Indian Culture, 1971)

Structure of Malto (1973)

The Shadow of the Cross (Cristianity and Hinduism in a Colonial Situation, 1973)

Sahibs and Munshis (An Account of the College of Fort William, 1978)

The Mad Lover (Essays on Medieval Indian Poetry, 1984)

The Artist in Chains (The Life of Bankimchandra Chatterji, 1984)

The Polyphony of the Bhakti Movement (1998)

Indian Ode to the West Wind (Studies in Literary Encounters, 2001)

A History of Indian Literature 500-1399 (From the Courtly to the Popular, 2005)

A History of Indian Literature 1800-1910 (Western Impact: Indian Response, 1991)

A History of Indian Literature 1911-1956 (Struggle for Freedom: Triumph and Tragedy, 1995)

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পঞ্চাশটিরও বেশি ইংরেজি প্রবন্ধ। তুলনামূলক সাহিত্য-ভাবনা সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। আবার এই প্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে বোঝা যায় শিশিরকুমার দাশ নিজের লেখা অনেক বাংলা প্রবন্ধকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন, কিংবা ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধকে বাংলায়। 

 

সম্পাদিত ইংরেজি গ্রন্থ

Comparative Literature: Theory and Practice (Amiya Dev & Sisir Kumar Das, 1989) 

English Writings of Rabindranath Tagore I (Poems, 1994)

English Writings of Rabindranath Tagore II (Plays, Stories, Essays, 1996)

English Writings of Rabindranath Tagore III (A Miscellany, 1996)

Talks in Chaina by Rabindranath Tagore (1999)

The Oxford Tagore Translations (Selected Writings on Literature and Language: Rabindranath Tagore, Sisir Kumar Das & Sukanta Chowdhuri, 2001)

 

আছে অজস্র বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থের সমালোচনা, একের পর এক ডায়েরি, নানা ধরনের লেখার খসড়া। আরও কত কী যে পাওয়া গেছে, সবটা প্রকাশ করতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে! এতকিছুর পরেও তাঁকে নিয়ে চর্চার হাল অত্যন্ত খারাপ। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগগুলিতে তিনি কিছুটা চর্চিত হলেও ভারতবর্ষের নানা প্রতিষ্ঠানের বাংলা বিভাগগুলিতে তাঁর লেখা প্রায় চর্চা হয় না বললেই চলে। একমাত্র তাঁর অনূদিত ‘কাব্যতত্ত্ব’ (মূল গ্রন্থ: অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’) আমরা পড়তে বাধ্য হই। সাধারণ পাঠকের কাছেও তিনি দূরতর দ্বীপ। অগম্য পাণ্ডিত্যের ভয়ে আমরা সেক্ষেত্রে বড়ো জড়সড়ো। অথচ ‘অবলুপ্ত চতুর্থচরণ’, ‘অলৌকিক সংলাপ’, ‘তারায় তারায়’ এরকম একের পর এক গ্রন্থে যাঁরা ডুব দিয়েছেন তাঁরা জানেন কী মণিমুক্তো ছড়ানো আছে এসব গ্রন্থের রন্ধ্রে রন্ধ্রে!

এখনও পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করেছে ‘দিগঙ্গন’ (২০০৩), ‘এবং মুশায়েরা’ (২০০৩), ‘CLAI’ (2004), ‘অজন্তা’ (১৯১৭) পত্রিকা। তাঁর স্মৃতিতে বেরিয়েছে ‘Studies Comparative Literature: Theory, Culture and Space’ (2007)। এত বড়ো মহান প্রতিভার পক্ষে এই মাত্র চর্চা কোনও অর্থেই যথাযথ নয়। আমাদের অপারগতার এ এক দগদগে দৃষ্টান্ত। ছোটো-বড়ো মিলিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকারের সংখ্যাও গোটা পাঁচেক। আশ্চর্য, এমন একজন প্রতিভাধর মানুষের সাক্ষাৎকারের সংখ্যা কেন যে এত কম!

এই লেখাটি নিছক স্মৃতিকাতরতা বা শিশিরকুমার দাশকে স্মরণ— ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। বরং একটা প্রয়াস, শিশিরকুমার দাশকে নিয়ে যাতে একটা চর্চার পরিসর তৈরি হয়। কাজের শুরুতে বোঝা যায়নি, কোন্‌ গভীর সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া হচ্ছে। যত নামা তত টের পাওয়া। কত যে ভুল ছিল অনুমানে! দিল্লিতে তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরি— ব্যক্তিগত সংগ্রহ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, একের পর এক মানুষের সঙ্গে এই সূত্রে পরিচয়, কত নতুন ঘটনা— নতুন আবিষ্কার! চাক বাঁধে গল্পেরা!—

নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিজে ঢাকা থাকো

স্বচ্ছন্দ নিপুণ কারুকাজ

স্বচ্ছ তবু গোপনীয়, নিরাপদ তবুও বিষাদ

জটিল জালের অন্তরাল

অন্তরাল, তবুও সহজ

… … …

সহজের আবরণ সবচেয়ে বড়ো জটিলতা।

                        (মাকড়সা/হয়তো দরোজা আছে অন্যদিকে)

রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রমোহিনী, রামেন্দ্রসুন্দর, কান্তকবি, নিবেদিতা— তাঁর লেখায় অনায়াসে উঠে আসে। বিভিন্ন উপন্যাসের আলোচনায় তিনি স্বচ্ছন্দ, আছে নানা বিষয়কেন্দ্রিকতাও। প্রাচ্যকে অতিক্রম করে সে আলোচনা এগোয় পাশ্চাত্যের দিকে। সাফো, সেফেরিস, লুকাচ, হুইটম্যান থেকে ওমর খৈয়ামে। উনিশ শতক তাঁর গবেষণা ও ভালোলাগার বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা তাঁর চোখ এড়ায় না। বহু লেখায় মেলে তারই ছাপ। সৃজনশীল লেখায় সেসব প্রভাব ফেলে। ভেঙে ফেলেন কবিতার চেনা ছক, চেনা ভাষা—  গদ্যের মেজাজ পালটে দেন। শিশুর মনের জগতও অধরা থাকে না। একাকার হয় নস্টালজিক ভাবনা—

মদনপুরের কাঙালি/দিব্যি ছিলেন বাঙালি।/হঠাৎ এলো মাথায় প্ল্যান্‌/ভাতের সঙ্গে খাবেন ফ্যান,/ঠিক সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে/হলেন তিনি চীনাম্যান।

কবিরাজের কাছে যেতেই/খেতে দিলেন পচা চিজ/দিব্যি ছিলেন চীনাম্যান,/এবার হলেন পর্তুগীজ।

ডাক্তারেতে দিলেন ওষুধ/পাঠিয়ে দিলেন মোজাম্বিক,/দিব্যি ছিল পর্তুগীজরে/রাতারাতি হলেন গ্রিক।

হাকিম বলেন রেগে গিয়ে/এই খেয়ে নে তিন গোলি,/দিব্যি ছিল গ্রিক ভাইরে/এবার হল সিংহলি

কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন/মদনপুরের কাঙালি,/হে ভগবান, আমায় তুমি/আবার করো বাঙালি।

                                                                                (দিব্যি ছিল বাঙালি/চাঁদমামা আর বাঘের মাসি)

শিশিরকুমার দাশের রচনার ভিত্তি তথ্য, তত্ত্ব ও মেধাসম্পন্ন ভাবনা। তাঁর যুক্তিগ্রাহ্য ও বুদ্ধিপ্রদ লেখনি পাঠককে মোহিত না করে সচেতন করে। বিস্মিত করে তাঁর পড়াশুনোর বিস্তৃতি। কোনো অস্পষ্টতা নয়, তিনি সরল ও স্বাভাবিকভাবে তাঁর দর্শনগত প্রজ্ঞাকে প্রকাশ করেন কবিতায়, গল্পে, নাটকে, প্রবন্ধে। সেকারণে খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধে রামমোহনের চিন্তা-দর্শন, মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথের সময়-অতিক্রমী ভাবনা কিংবা তাঁর নাটকের সময়-সমাজ সজাগ মনোভাব বুঝে নিতে পাঠকের কোনো অসুবিধা হয় না। প্রসঙ্গসূত্র আবার সেক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে। প্রসঙ্গসূত্র জানান দেয়, শিশিরকুমার দাশের পাণ্ডিত্যের গভীরতা।

‘আজ আমাদের চিন্তার একটা বিরাট সংকট, দেশ ও বিশ্ব, স্বাতন্ত্র্য ও একীকরণ, ঐক্য এবং খণ্ড ইত্যাদির সম্পর্ক নিয়ে। আর আমাদের দেশে এখনও চলেছে ভাষা সংকট,…’। ‘বিদ্যাসাগর: সংস্কৃত ও ইংরেজি’ প্রবন্ধে এসব কথার মধ্যে শিশিরকুমার দাশের প্রতিবাদের একটা সুনির্দিষ্ট দিশা টের পাওয়া যায়। যেখানে বিদ্যাসাগর আমাদের কাছে তাত্ত্বিক প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন না, হাজির হন জীবন ও কর্ম নিয়ে, আচরণ ও বিশ্বাস নিয়ে। এসবই যেন জারিত হয় তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে। জন্মায় ‘বাঘ’ বা ‘আকবর-বীরবল’-এর মতো নাটক। জাগ্রত জিজ্ঞাসা নিয়ে পাঠক হাঁটুমুড়ে বসে এক মহাবোধির কাছে।

তিনি মনে করিয়ে দেন মধুসূদনকে কেন উপস্থিত করা দরকার সংবেদনশীল মনের কাছে, কেন বঙ্কিম আমাদের সরলীকরণের দ্বারা খণ্ডিত! রবীন্দ্রনাথ আমাদের শুধু মুগ্ধই করেন না, উদ্বুদ্ধ করেন চিন্তার স্বাধীনতায়— আসন্ন সংকটের মুহূর্তে পথ দেখান আগামীর। শিশিরকুমার দাশ তুলে এনেছেন গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর কথাও— এক নিষ্ঠুর আত্মযন্ত্রণার ইতিহাসে ফুটে উঠেছে তাঁর সত্যকার (‘উদার’ শব্দটি ইচ্ছে করে ব্যবহার করা হল না একারণে যে, উদারতা দেখানোর মধ্যে অনেক সময় একটা দাক্ষিণ্যের ব্যাপার থাকে, যা শিশিরকুমার দাশের ব্যক্তিত্ব ও ভাবনার সঙ্গে বেমানান) মানসলোক। তিনিই আবার দেখান, কীভাবে রামেন্দ্রসুন্দর বিজ্ঞানজিজ্ঞাসার সঙ্গে জীবনজিজ্ঞাসাকে মিলিয়েছেন। কীভাবে কান্তকবি সমালোচকদের উন্নাসিকতা এবং রসলোভী পাঠকের স্মৃতির অনুদারতাকে জেনেছেন তাও পাঠকের সামনে তুলে ধরেন— ‘ফুল যে ঝরিয়া পড়ে কথা নাহি মুখে… সেকি তা দেখিতে আসে? হেসে ঝরে যায়।’ নিবেদিতার আবিষ্কৃত ভারতবর্ষকেও তিনি খোঁজেন বৌদ্ধিক মগ্নতায়—

প্রাচীন ভিটের ধ্বংসাবশেষে গড়েছি ভিত্তি নতুন গৃহের

মৃত দেবতার স্মৃতির অপর নবদেবতার শস্যগন্ধ

এ শ্রাবণ নয় পুনরাবৃত্তি গত শ্রাবণের

    (এ শ্রাবণ/ হয়তো দরোজা আছে অন্যদিকে)

অরণ্যহননের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে বলতে শিশিরকুমার দাশ ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিষয়টিকে সুচিহ্নিত করেন ‘আরণ্যক: ভারতবর্ষ কোন দিকে’ প্রবন্ধে। ‘ইছামতী’র আলোচনায় তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি বিরোধী কাঠামোকে প্রতিষ্ঠা দেন। ‘মৃগয়া’ প্রশ্ন করতে শেখায়— ‘তারপর?’। একটি দীর্ঘ আলোচনা ‘ঝরা পালক থেকে ধূসর পাণ্ডুলিপি’। ‘মায়াবী দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন ও উজ্জ্বল’ সত্তার সঙ্গে পাঠকের নতুন পরিচয় ঘটে। পাঠক মুগ্ধ হতে বাধ্য ‘খণ্ডিত দেশ: অখণ্ড কবি’র একের পর এক চিঠিতে। আশাপূর্ণার ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’তে আছে একটা অন্বেষণ, প্রবন্ধের পরতে পরতে তারই অনুরণন। আর এসবের নির্যাস হয়ে জন্মায় আত্ম-সমালোচনা, আত্ম-আবিষ্কার, প্রতিবাদের নানা মৌলিক রচনা— দূর লালপুরে গড়ে ওঠে স্মৃতির মিনার।

‘পড়া: রূপ ও রূপায়ণ’ থেকে ‘ছিন্নভিন্ন অর্ধশতাব্দী’— ‘নিরীক্ষণ’ তাঁর আলোচনার প্রধান অনুঘটক, ভিয়েন। তলিয়ে দেখার সঙ্গে আছে তার সম্বন্ধ। ‘জনপ্রিয়তা ও উপন্যাস’, ‘আখ্যানের বাক্য’, ‘নাটকে আখ্যান’, ‘ভারতীয় রাজনৈতিক উপন্যাস’— এরকম বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব সহজেই তাঁর ভাবনায় ভর করে। যুক্তি, তথ্য, উপাদান-উপকরণের সুঅন্বয়ে সেগুলি সাহিত্যমূল্যে উত্তরিত।

সাফোর কবিতা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি অবলীলায়। একজন কবি আলোচনা করেন আর এক কবির কবিতা। বদলে যায় গদ্য, বলবার ধরন— আপাততুচ্ছ উপকরণের মধ্যে উঠে আসে গভীর ও সুন্দরের কথা। আলোচনা করেন সেফেরিসের কবিতা নিয়েও। অনুবাদ করেন বহু কবিতা। গ্রীস, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, সাইপ্রাস একাকার হয়ে যায়। ‘লুকাচের ক্রোধ’-এ সমালোচনা আছে লুকাচের দ্বন্দ্ব-টানাপোড়েন নিয়ে। সমর্থন-অসমর্থনের ভিত্তিতে আছে নিরপেক্ষ যৌক্তিকতা। ‘হুইটম্যান ও ভারতীয় সাহিত্য’ একটি অসামান্য তত্ত্বকেন্দ্রিক প্রবন্ধ। চেনা গতের থেকে সে এক মুক্তির স্বাদ। ‘ইরান তোমার যত বুলবুল’-এ গভীর প্রত্যয়ে তাঁর দাবি, ‘নিমন্ত্রণের রূপকের মধ্য দিয়ে যদি এই সম্পর্ককে বুঝতে চাই তাহলে বলব এ এক এমন নিমন্ত্রণ যাকে বাঙালি অন্তরের সঙ্গে গ্রহণ করেনি, উপেক্ষা করতে চায়নি হয় তো, কিন্তু উদাসীন থাকতে চেয়েছে। আমাদের সংস্কৃতির বিস্তারের এক সম্ভাবনাকে খর্ব করে দিয়েছে এই উদাসীনতা।’ আছে আরও কত লেখা! ‘আধুনিক কবিতা: রীতি ও চিন্তা’, ‘গ্রীক নাটক ও আমরা’, ‘জীবনানন্দ’, ‘বার্ট্রান্ড রাসেলের ছোটগল্প’, ‘বাংলা কাব্যসাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা’, ‘বাংলা শব্দের ইতিহাস’, ‘শেক্সপীয়রের দেশে’, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা’ ইত্যাদি—

 

পড়ে থাকে পৃথিবীর বুকে

উচ্চারিত ও উচ্চার্য; অনুত্থিত সব শব্দ,

অনুৎপন্ন, উৎপাদিত সব আলো, মৃত সুর

অসঙ্গত স্তুতি বাক্য, সংকুচিত সম্ভাবনা, প্রত্যাশিত সব বাণী,…

                                     (প্রার্থনা/ হয়তো দরোজা আছে অন্যদিকে)

 

এই ছোট্ট লেখাটাও লিখতে গিয়ে সারা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে ফেলেছি তাঁর বই, নথি, পাণ্ডুলিপি। কী সুন্দর করে একের পর এক পাণ্ডুলিপিতে লেখা পূর্বপল্লী, ডাকঘর হালতু, চব্বিশ পরগনা বা দিল্লির ঠিকানা বা বিদেশের কোনো… ইত্যাদি। এরকম সুন্দর হাতের লেখা খুব কম দেখা যায়। মায়াবী, কুঁদে কুঁদে যেন কোন্ শিল্পীর নির্মাণ। একসময় ‘অমৃতযন্ত্রণা’ পত্রিকা বেরিয়েছিল তাঁর হস্তাক্ষরেই। এখনও কত লেখা যে পাণ্ডুলিপিতেই থেকে গেছে! অনেক সময় তিনি লেখা ‘টাইপ’ করে পাঠাতেন। আছে সেসবের নমুনাও। হঠাৎ হাতে আসে ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের ১৪ পৌষ আনন্দবাজারের পাতা।

রবিবারের আনন্দবাজার, বেরিয়েছিল শিশিরকুমার দাশের লেখা একটি গল্প— ‘সিংহল-পুকুর’। জানা যায়, পূর্বপল্লীর বাড়ির কাছেই ছিল একটি পুকুর। ‘সিংহল’-এর মতো দেখতে। তাই শিশিরবাবুরা এই পুকুরের নাম দেন ‘সিংহল-পুকুর’। এই পুকুরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কাহিনি। কাহিনির মূল চরিত্র চার বছরের রবি আর আট বছরের বাণী। গল্পটি পড়তে পড়তে কেমন যেন শিশু রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে। কিন্তু গল্প বদলে যায় পুকুরে ডুবে বাণীর মৃত্যুর পর। বাণী যে সাঁতার জানত না! কয়েকমাস পর অসুস্থ শরীরে জানলা থেকে রবি দেখে, বড়ো লরি এসে ভরাট করে দিয়ে যাচ্ছে তাদের সাধের পুকুর। আস্তে আস্তে পুকুর উধাও। বাণীও নেই, পুকুরও। রবির অসুস্থ শরীর সময়ের অসুস্থতার রূপক! বদলে যায় জনপদ। ফ্ল্যাট ওঠে যত্রতত্র। কসবার হাঁটা পথ যায় বদলে। গল্প শেষ হয় সংশয়ের যৌক্তিক বাতাবরণে— বোজানো পুকুর দেখে ‘রবির মনে হল, দিদি তাহলে কোথায় যাবে? …’

সচেতন লেখকের যে দায়বোধ থাকে, শিশিরকুমার দাশের লেখায় তার হদিশ মেলে। এ তো তাঁর শেকড়ও। ফিরতে চেয়েছিলেন এই কলকাতায়। কিন্তু…। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে তাঁকে যথেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হয়নি। যতটা গুরুত্ব তাঁর পাওয়ার ছিল তা তিনি পাননি। অনেক পাপ জমেছে আমাদের। আজ পাপক্ষালনের সময়। প্রণতি জানাই সেই মহাত্মাকে—

কে ভাসাবে রাত্রির প্রদীপ, কে গাঁথবে যন্ত্রণার চুনীপান্নার মালা।

তুমি এলে, তুলে দিলে হাতে স্বপ্ন আর কল্যাণ। বললে: তাকাও আমার দিকে।

যেমন করে ভোরের সূর্য তাকায় ভোরের সমুদ্রের দিকে।

                                                                                                                      (আবির্ভাব/জন্মলগ্ন)

তাঁর চর্চাতেই তাঁর আরাধনা, তাতেই আমাদের মুক্তি। নতুন করে তাঁকে নিয়ে আলোচনার বিস্তৃত পরিসর তৈরি হচ্ছে। গবেষণা চলছে, অপ্রকাশিত লেখা প্রকাশ পাচ্ছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলি গ্রন্থবদ্ধ হচ্ছে। আশ্চর্য সেসব পাঠ-অভিজ্ঞতা! পাঠক, গবেষক, উৎসাহী মনন অপেক্ষায় থাকে এরকম আশ্চর্যের। যে আশ্চর্য আদপে মেধাবী মননের হদিশ দেয় আর ছুঁয়ে থাকে অপার মুগ্ধতা। মুগ্ধতায় আগামীর আবাহন। আবাহনে কর্ণ, কর্ণের দোসর…

আরও পড়ুন:

অনন্ত সংলাপ/অর্পিতা কুণ্ডু

আমি: ঢেউ তো প্রোজ্জ্বল, তাতে তুমি বসে আছ শিরোচূড়ামণি। হাটের নাগর তুমি, ভিটায় নিমিত্ত সামগান — তোমাকেই বর্মে বৃত্তে চুপিসাড়ে রোমন্থন করি। যেমত অছিলা পটিয়সী, যে মৃদু চারণভূমি পার করে কাছে আসি, তার কিঞ্চিৎ আদর কোরো। বহুবর্ণ লোক সমাগমে একেলা ফেলো না তাকে রৌদ্র-বাতায়নে। সে: না সখি, না, বাতায়ন-পাশে তোমার শরীর মুক্ত, জনশ্রুতি এই — …

পড়ুন

গুঁড়োমশলা/কাবেরী গোস্বামী

সে এখন একটি অচল পয়সার মতন ফিরেও তাকায় না আর কেউ কারণ, সে আজ শুষ্ক বিবর্ণ পরিত্যক্ত এক যোনি

পড়ুন

তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন। তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান। আমার …

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার হিমঝিম মস্তানা আমি তোমার কুঁকড়ে থাকা পোকা তুমি আমার ফলানা ঢিমকানা   সকাল থেকে রাত্রি আমি তোমার প্রেম বলিনি তবুও , কে খায় ধোঁকা   রাত্রি থেকে দিন তো তুমি আমার সূর্য চাঁদের চাঁদোয়া টাঙায় খোকা   প্রেমের কাছে, প্রেমের …

পড়ুন

গ প্ পো ৬ – উপকারী পুঁটে দত্তির গপপো/বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘ম্যাকলাখানরা তো ব্রাউনি পুষত —’ এতক্ষণে কথা বললে আংকল জ্যাক। ‘ও সব ব্রাউনি ফ্রাউনি আমি জানি না —’। মুখ ঝামটা গ্যানগ্যানের। ‘ব্রাউনি হোক, পিক্সি হোক, লেদোকোন আর ট্রোন্ড যাই-ইহোক—এক ফিনরা বাদে ওরা সবাই পুঁটে দত্তি। ট্রো —’ ‘তা ফিনরাও তো পুঁটে। এই এতটুকু —’। বললে আংকল জ্যাক। ‘তা হোক, ফিনরা তো আর ডাঙর নয়। তারা …

পড়ুন

বৃষ্টি নামচা /অগ্নি রায়

এক   ছোট ছোট চিরকুটে ভরে যাচ্ছে বাদলবেলা। বল্লভপুর, গোবিন্দপুর, মুকুটমণিপুর হয়ে মধুপুরে পৌঁছেও শেষ নয় পথ, এই পুরবাসী তালিকাকে পৌঁছতে হবে একশ আটে! তবেই বৃষ্টি থামবে ঠাকুমার কথামতো। কচিকন্ঠের মিনতি কাকলির কাছে লেবুপাতা আর করমচা ঝরে যায়। বালিকাসংঘের গায়ে জলের ছাঁট আবার ফিরে আসার কথা দিয়ে সরে পরে, এক আশ্চর্য লোকায়ত টোটকার পর।   …

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি সচেতন প্রতিরোধ ছিল প্রগতি, আর মেঘ ডাকলে সূর্যত্রাসে কেঁপে উঠত প্রতিক্রিয়া। রথ দেখতে যাওয়ার মতো তুমি সুদূর করে নিয়েছিলে তোমার দিগন্তরেখা, স্বপ্নের সেই সাদা ঘোড়াটিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত স্ববিরোধে বেরিয়ে পড়েছিলে সাম্রাজ্যবিস্তারে, খুরে খুরে ধুলোর ঝড় তুলে বিলিয়েছিলে কল্যাণ, ফিরে এসেছিলে …

পড়ুন

পেরেস্ত্রোইকা/কস্তুরী সেন

অতল, আত্মবিস্মৃত, শেষত শেষ কাকে বলে ? উদ্বেগের পর উদ্বেগ, বিরতির পর পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেলা সাড়ে চারটেয় ধর্মতলা পেরিয়ে যাচ্ছে দুশো একুশ মাঝমাঠ, খাদ্য আন্দোলন, একদিন একদিন শহরে মানুষ পোড়ে, জিতে বেরিয়ে আসে হিমঋতু ‘এই যে ধাইন্যক্ষেত্র তা দ্যাখতে তো পয়সা লাগে না’ দেখতে দেখতে দেখে যাওয়া, মানুষের এলোমেলো ভিড়, সিগনালে আলো নিভে যায় সাবেক …

পড়ুন

পিতা নোহসি/প্রতিভা সরকার

‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’ গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ …

পড়ুন

একা মানুষ, পঞ্চাশ অস্তিত্ব/চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ লেখক: রিচার্ড জেনিথ প্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য …

পড়ুন

দি লাস্ট মিটিং/সমরজিৎ সিংহ

একটি রাস্তা । তারপর, আবার রাস্তা । তারপর সমাধি । তার উপর চাঁদের ছায়া । দু’একটা পাতা । রাস্তার ওপাশে একটা ভাঙা দোকান । তিনটে চেয়ার । সমাধি থেকে উঠে এসে এই চেয়ারে বসলেন তিনি । টোটেনখাম । চাঁদ তখন পিছলে যাচ্ছে রাস্তার উপর । তিনি তার ভাঙা হাড়ের আঙুলগুলি বের করে কাকে যেন ডাকলেন …

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই …

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি …

পড়ুন

বজ্রসেনি/সার্থক রায় চৌধুরী

নুয়ে পড়া ডাল আর চুঁয়ে পড়া জল, জলের গভীর থেকে মেঘ বহুতল, আকাশ পাগল যেন আত্মহারা এক বৃষ্টি এলো- জানে ভিজল যারা..   জানে? পাগল তবে কার নেশার ঘোরে আঁকে বজ্র, হাওয়ায় ভেজা পালক ওড়ে…

পড়ুন

নোটপ্যাডের নৌকো/মন্দাক্রান্তা সেন

এক বর্ষার দিনে সে আসবে বলে কথা দিয়ে আসেনি।   এই সামান্য বিষয় নিয়ে পদ্য লিখে প্যানপ্যান করা এই বয়সে নিতান্তই ন্যাকামি হয়ে যাবে।‌   নাকের জলে চোখের জলে ছপছপ করছি । কোথা গেলে,‌ সেয়ানা প্রাণাধিক   নোটপ্যাডে নৌকো ভাসাই । নেহাত বালিকা আহা‌ আহা ।   তুমি আসবে বলে আসোনি। বেশ করেছ ।   …

পড়ুন

প্রেম/রামকিশোর ভট্টাচার্য

প্রতিদিন রামপ্রসাদি মেখে কাপড় কাচতে কাচতে সাবান হয়ে একদিন গলে গিয়েছে মা ৷ অবসাদ পালক জড়িয়ে হঠাৎ জলবায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাবাও , এখন একলা একা সুতির ফুলমাখা কুর্তি মারুবেহাগ দুপুরে দু’হাত নাচিয়ে ঝুলেই থাকে – দিগন্তের বুকে , জোছনার রূপকথা নিয়ে – কচি হাওয়ারাই ঝিরিঝিরি গান শুনিয়ে যায় , রঙের বেলা গড়িয়ে গেলেও নাইলনের …

পড়ুন

এক মেঘলা না থাকা/শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে মা, তুমি ছাদে উঠেছিলে  বালতি ও কাপড় সাবান জলের মধ্যে সূর্য তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি অথচ …

পড়ুন

আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;   কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়।  বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে …

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা আমাকে দেখিয়েছিল। ছোটো বাচ্চা তখন ও। কাজ থেকে ফিরে ভূতকে ওর মা আবিষ্কার করেছিল ওদের ধান সিদ্ধ করা উনুনের ভেতর কালি ঝুলি ছাইমাখা অবস্থায়। ওর মা হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখ দিদি, এ যদি ভূত না হয় তো ভূত কাকে বলবি? …

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে একাই পাহারায় সে হাসির খানিক মুখে সাবলীল উত্তরাধিকার কখনো বা সাজিয়ে নিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো ‘আমি’র মধ্যে কতগুলো দাঁড়টানা কাক কালো এলোমেলো কখনো ভাবিনি অন্ধকার উজাড় হয়ে আসে কোন পথে! কেমন করে রোদ টুকু মরে যায় …

পড়ুন

সাইলেন্স দিস আপকামিং কল/যশোধরা রায়চৌধুরী

মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি। বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম। এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন? বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের …

পড়ুন

পিরিত/অভিমন্যু মাহাত

খুব টানটান ছিল বেদনা যত দিন যায় ভুল বাড়ে, প্রবঞ্চনাও বাড়ে স্মৃতিভ্রষ্ট সুতোয় পিরিতের বহি সমস্ত ঋতু জুড়ে বিলাপ শালপাতার আড়ালে আশ্চর্য ঝুমুর এভাবেই একদিন হঠাৎ দর্শন যার তত্ত্ব ও তালাশ ছিল পুরনো সহসা উঁকি মারে নিরুদ্দিষ্ট প্রণয় কিন্তু নাশকতা সামান্য দূরে, আম্রমুকুলের গন্ধে টের পাই অভিমান কেন ভাঙে আজও বুঝিনি… কাল যাব অশোকনগর

পড়ুন

এ এক ‘অচেনা’ দেশ/পার্থ মুখোপাধ্যায়

আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই।  প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু …

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে অবশ করে তোলে। লোকজন কী রকম চোখ টেপে, টিপ্পনী কাটে, সন্ধ্যায় একা বেরোলে খারাপ মেয়ে ভেবে ইশারায় কেউ প্রস্তাবও দেয়। আমার পরিচিত কয়েকজনকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি, তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না, তা নয়, তবে …

পড়ুন

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে এ শহরে তো লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে–আমরা এখান থেকে পুরীধামে যাই, চিল্কাতে জলবিহার করি, লিঙ্গেশ্বর মন্দির দর্শন করি –অথচ — যে ‘কিন্তু’ আর ‘অথচ’ আমাকে এবার রথে চাপাল-সারথি বলল–উধার তো কোই যাতা নেহি। বললাম –সেই জন্যেই তো। উচ্চবর্ণের দেব দেবী …

পড়ুন

বৃষ্টি তুমি রোদের মধ্যে /বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টি আমি জানি তুমি চরিত্রহীন, কুলটা নও কখনও হবে না মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতন ধূর্ত জাফরি-কাটা যে বারান্দা থেকে তোমায় ছুঁয়েছিলাম, প্রবল খরার মরশুমে সেই জাফরি আমার মাথায় ঘুরত…   শুধুমাত্র ‘বেঁচে’ জীবন কাটানো খুব কঠিন বলে বিকেলবেলার তেজি আগুন রাত্রি নামলে ছাই হয়ে যায় বম্বে থেকে বেঙ্গালুরু পাক্ খেয়ে পাক্ খেতে খেতে তোমায় পাবো …

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের আশ্রয় নয়। বিষয়টা নিয়ে আসলে অনেক দিক থেকেই তর্ক হতে পারে। প্রতিযোগীরাও নানা দিক থেকে আলোচনা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের ফলাফল খুব স্পষ্ট হল না। সকলেই মানলেন রবীন্দ্রনাথের গান আশ্রয় হওয়া উচিত। মোশনের সমর্থনে যাঁরা বললেন, তারাও সেটা …

পড়ুন

বিস্মৃতপ্রায় লেখক নিরুপমা দেবী/ঈশিতা ভাদুড়ী

অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক। নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক …

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার !  সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে …

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ …

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই। রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের …

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন কাজ-কাজ-কাজ ধ্যানসম একাগ্র। রান্নাকরার মাঝে বলতে গেলেই কিছু সম্বিত ফিরত যেন! সকলের রাত হয়। তাঁর তো হয় না। সকাল-দুপুর-সন্ধে আঁচলের গিঁটে বেঁধে বিলিয়ে দিতে দিতেই ক্লান্ত একটা দেহ মাঝরাতে বিছানায় হাই পাওয়ারের গ্লাস বালিশের পাশে রেখে দুচোখ জুড়িয়ে এলে একদিন …

পড়ুন

মন্দির দেখা সহজ নয়/শ্রীলা বসু

বেড়ানোর পোকাটা আমার মাথায় এসেছে প্রধানত পৈতৃক সূত্রে। বাবার হাতে ম্যাপ টাইম টেবিল দেখতাম হরদম। গাড়ি চালিয়ে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে নতুন জামাইকে নিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে রাঁচি চললেন তখন একচেখে ভালো দেখেন না। তবু কী ? অন্য চোখ তো আছেই। কিছু বললে বলতেন পতৌদির একচোখে ক্রিকেট খেলার কথা। তবে …

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি   ভেবেছিলাম কোনোদিনই ফিরবে না আর দেখা হয়ে যাবার পর বৃষ্টিপাতের মতন অহেতুক বিপর্যয় এল   যাত্রীহীন ট্রেন এক পাহাড়ি স্টেশনে কিছু অস্পষ্ট ছায়া, টুপি পড়া, উঠে গেলো নির্দিষ্ট কামরায়   নিজেকে যোদ্ধা ভেবে ঢুকে যাই সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাকে যেখানে আমিই …

পড়ুন

ফিল্ম শুটিং-এর গল্প/পার্থ মুখোপাধ্যায়      

১৯৮১ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বংশীচন্দ্র গুপ্ত। ‘ শিল্প নির্দেশনায় বংশী সমকক্ষ ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বংশী ছিল এক এবং অদ্বিতীয়।’ তার স্মরণ সভায় শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই রকম বক্তব্যই রেখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ‘পথের পাঁচালী …

পড়ুন

গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে রাস্তার বাঁকটা পার হলেই হয়তো পেয়ে যাব ছই দেওয়া গরুর গাড়িটাকে। গরু দুটোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা। বাজছে টুং-টুং, টিং-টিং।   চট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ওমা, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। জমাট হিমের দেশে নরম পালকের লেপ আর ভেড়ার লোমের মাখনের মতো …

পড়ুন

গ প্ পো ৫ – কুঁড়ে নিক্কির গল্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।   ‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –   সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- …

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার প্রাচুর্য আহার, তুলতে গিয়ে দেখি, প্রায় শেষবেলা অঘ্রাণ আভায় একেকটি কালের কাঠামো ভেঙে যায়

পড়ুন

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে। কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে …

পড়ুন

অচেনা দুপুর/সৈয়দ কওসর জামাল

প্রতিবাদ ভুলে থাকি আজ পড়ে থাকি এককোণে, দুরে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে স্থিতভূমি, বেতাল অ-সুরে   কোন সুরে বাজবে সেতার আষাঢ়ে বাজবে কোন মন? জানালার পাশে আজ নয় বিপর্যস্ত কোরো না জীবন   বরং কবিতা লেখো, ভেজো জবুথবু শালিকের মতো, বৃষ্টি এসে সলজ্জ বলুক এসো প্রেম, এসো ইতঃস্তত   একটি কবিতা লিখেছিলে তুমুল বৃষ্টির কোনও …

পড়ুন

প্রস্তাব/সুমন গুণ 

পাতায় বৃষ্টির শব্দ সাংসারিক, দ্বিপ্রাহরিক। আস্থা ও আশ্বাস থাকে, সমবেত, শুভানুধ্যায়ীর পীড়া ও আরাম থাকে। যথাস্থান থাকে। থাকে মেঘ, অস্পষ্ট ও গূঢ়,  সম্পর্কের অসহায়তার মতো,  চিন্তা ও ক্ষমার মতো, পতনকালীন বজ্র ও বিদ্যুৎভরা নৈশব্দের মতো।   পথেও স্তব্ধতা থাকে দ্রুতগামী; নৈকট্য ও নিশ্চয়তাভরা। কোথাও স্থানাংক আছে, ছাদ আছে, দরজা ও রেলিংঘেরা সুবাতাস আছে,  আছে স্থিতি, …

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি। কতবার কলসপুর যাত্রা শুরুর মুখেই ভেস্তে গিয়েছে। আমি কলসপুরের   কাছাকাছি থেকে ঘুরে এসেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু যেতে পারিনি কেন যে–তা ঠিক ধরতে পারি না। ভেবেছিলাম একবার একাই ঘুরে আসব। কিন্তু শেষে মনে হয়েছে দীপিকা দুঃখ পাবে। লুকিয়ে না যাওয়াই …

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে গেছে সুর। মনে হয় নিষ্পত্র গাছগুলিতে একটি একটি করে জেগে উঠছে কচি পাতা। মনে হয় রোদ্দুর হয়ে গেছে আধো আধো কথা বলা শিশু। শীতকাল হলেও পৃথিবীতে কোথাও একটা নিশ্চয়ই শিউলি ফুটে, ঝরে সাদা করে রেখেছে উঠোন …

পড়ুন

গদ্য বনাম কবিতা/অংশুমান কর

“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।” বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা …

পড়ুন

প্রশ্নপদ/অশোক দেব

সব মরুবৃক্ষ কেন শ্রাবণ জাতক? তাদের দেহের জল সেকথা জানে না?   একলা শ্রাবণে বসে এইসব ভাবি বালিমাখা চাঁদ কাল কার ঘরে ছিল?   তাহলে তৃষ্ণার ফুল বিরহ-গন্ধক? আগুনে আগুনে কথা, বিদায় সংগীত?   কে তুমি গাইছ ওগো এমন মাথুর, এমন শ্রাবণে এলে রাধিকাসম্পদ?  

পড়ুন

গ প্ পো ৪ – পুঁটে দত্তিদের গপ্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি। স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের …

পড়ুন

কানুর বিয়ে/সুবর্ণা মণ্ডল

কানুর সেদিন খুব কান চুলকাচ্ছিল। আগের দিনের যে পায়রাটা হাত থেকে ফসকে গিয়ে শুধু একটা পালক রেখে গেল, কানু সেই পালক কানে ঢুকিয়ে আরামে চোখ যেই না বুজেছে অমনি বাপের চিল চিৎকার, “হ্যাঁ নবাব আমার, কানে পালক গুঁজেই থাকো। যা বয়স বাড়ছে এরপর আর মেয়ে জুটবে না কপালে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যা। নবাবপুত্তুরের যা …

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো বাংলাভাষার দেহত্বকে এই যে উজ্জ্বলবাক্য ঠিকরে পড়ছে বিকেলের প্রায়… চলাচল নিভে আসছে। কিছুপরে সন্ধে নেমে এলে একটি দুটি তারা জ্বলবে তোমার স্পর্শের মতো,নিভে জ্বলে ওঠা আকাশের মাথায় মাথায়…

পড়ুন

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা। এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা …

পড়ুন

তোমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম/বর্ণালী কোলে

(১) বিদ্রোহ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে জলকামান আক্রোশ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে মুহুর্মুহু ভীমরুলের মতো কামড় শান্ত হয়ে আসছে মল্লযুদ্ধ ক্ষোভ, অভিযোগ দেখা দিচ্ছে ফাল্গুন রাত্রি আকাশ জুড়ে শ্বেতরঙ্গন (২) যেভাবে বীণা স্পর্শ করে আছে পদ্মকে সেভাবে তুমি আমাকে স্পর্শ কোরো আসছি এখনও তুমি কাজ করছ শুকতারাটি উঠবে এবার শিয়রে তোমার …

পড়ুন

বিমর্ষ জল ও উড়ন্ত লাল কার্পেট/গৌতম গুহ রায়

খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো …

পড়ুন

পুরনো দিন নতুন দিন/শংকর চক্রবর্তী

মনে পড়ে সেইসব রবীন্দ্র-গানের সকাল সূর্যাস্তের থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলেশহীন কোনো সন্ধের পাশে বেজে উঠত জড়োসড়ো একবারও কেউ ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে চায়নি তখন সাদামাটা বিকেলগুলো শুধু এই ষড়যন্ত্রীর শহরে অন্ধকার নামিয়ে রাখত প্রতিদিন সেই সকাল থেকে ছুটে যেত সবাই একে অপরের জামা-প্যান্ট উদোম করে ছুটত তুমি শুধু সারাজীবন অপরাধীর মতো মোমবাতি হাতে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ …

পড়ুন

মায়াচাঁদ/অলোক বিশ্বাস

হাসছি বলেই চাঁদ উঠছে নাকি চাঁদ উঠছে বলে হাসছি— কোনো একক মাত্রাকে চায় না মানুষ, নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও। এমনতর সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে বীতশোক সাঁতরে আমি যাবো তাহার নিকটে। চাঁদে বসে গাইব মায়াবাদ, চাঁদে বসে বুনব খামার জমি। আমাদের দাবি অনুযায়ী ভালোবাসা চিরকাল চাঁদের সাপোর্ট পেয়েছে। পুনরায় চাঁদে গিয়ে অপেক্ষা করব তোমার জন্য। আমার রান্নাঘরে, পড়ার ঘরে বাজছে …

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই …

পড়ুন

কাজের ভাষা, মুখের ভাষা/স্বপ্নময় চক্রবর্তী

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, ‘এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় …

পড়ুন

ফুলঝরিয়া/সেবন্তী ঘোষ

এক পিছনে জঙ্গল ।ওই ওপারের রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গল। ক্রমশঃ দুপাশের জঙ্গল উজাড় করে  ফোর লেন হচ্ছে। এখনও পুরোটা খুলে দেয়নি। নবনির্মিত সেই পথের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ফুলঝরিয়া আর পিংকি। বসাটা নতুন নয়, জায়গাটা নতুন। বসার জায়গাটাও ঠিক নতুন নয়, দেখতে নতুন। পিংকি বলে, আগের ঘাসটাই ভালো ছিল রে, গড়িয়ে গেলে কত …

পড়ুন

খেলার দৃশ্যান্তর/অনির্বাণ বসু

একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে …

পড়ুন

বৃষ্টির দিন/কালীকৃষ্ণ গুহ

বৃষ্টির দিন ফুরোয় না কারো জীবন থেকে। বৃষ্টির দিনগুলি সব বিরহযাপনের দিন।   বিরহযাপন শেষ হয় না জীবনে।   কারো বিরহ কান্নার জন্ম দেয় কারো কাছে তা শুধু স্মৃতি হয়ে আসে।   এখন বৃষ্টির দিনে শুধু বাইরে তাকিয়ে চারদিকের গাছপালা ভিজতে দেখি। তাদের অনুচ্চারিত আনন্দ দেখতে পাই।   সেদিন একটা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা পাগলকে …

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন কঠোর তবু অন্ধ ভিখিরির হাত ধ’রে আরেকটি গল্প লেখে, ভাবে— লেখা কিছু জমে থাক আগামীর দিকে   আশা ভাঙে। জাগে শুধু ডুবে যাওয়া পুরোনো বন্দর   শান্ত মানুষের মতো; নির্মোহ ততটা   ভেসে যায়   ততটুকু স্পর্ধা হলে, নাবিক তোমায়   …

পড়ুন

মুষলপর্ব/বেবী সাউ

শূন্যতার রং নিয়ে বড়ো বেশি ভেবে চলো তুমি অথচ জলের কাছে প্রতিদিন শিখে নিই নীল ঘষা রং আমাদের অভিমানগুলো ভেঙে গেছে আজ তার কোনো গতিপথ নেই; সূত্র ভুলে গেলে, বলো, কীভাবে মেলাবে— জীবনের মায়া, ছায়াধ্বনি! সহজ ভেবেছি যতটুকু, কঠিনের আবরণে ঢেকে গেছে রোজ সেই লক্ষ্যভেদ, মাছের নরম চোখ কিংবা জাতিভেদ প্রথা বারবার ফিরে আসে— বারবার …

পড়ুন

শহর/বিজয় সিংহ

ফেরার আগে যে তুমি অহৈতুকী ছিলে ফেরার পরে যে প্রাক গোধূলিরা অপ্রবাসে ঢোকে ফক্স কে টু, হে আরাধ্য, সেইসব গ্রন্থনায় মায়ুশ মজ্জার থেকে অনুচক্রিকা কুড়াতে পাঠাও স্বপ্নের অতলে নেমে দেখেছি জুবিলি অসহায় ফুটেছিল হেতু তার কোনো বাড়িঘর নেই, লেক মল, পূর্ণদাস রোড নির্মিত আরশিনগরে পড়ে থাকা সংক্রামক লাশ ফেরার আগের রাত্রে নরসিংহমূর্তি দেখিয়েছে ও ফেরার …

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। জলপ্রপাত অবিরাম দুগাল বেয়ে! কাকে বেছে নেব? শালবনে জ্যোৎস্নাপথ? নাকি রাতের নদীজল? কে হবে সঠিক নির্বাচন? কার করপুট-স্পর্শে শঠতা নেই, কারা কারা আমার বৃত্তে নিরাপদ হবে, সেই সব নির্ভুল নির্বাচন সহজ নাকি? নির্বাচন শব্দটি যে কত অমোঘ …

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা