‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’
গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ ওঠাতে চাইছে ও ? যেন একদা সহপাঠীকে বোঝাতে চাইছে, যতই ক্লাসে ফার্স্ট হ’, তোর বাপটা একটা লুচ্চা!
গৌরীর নাকছাবিতে আলো পড়ে চকচক করে লাল পাথরটি, রানি বিবর্ণ মুখে ঢোঁক গেলে, ভাবে তার বাবা কথাই বা বলে কেন এই মেয়েটার সঙ্গে? তাদের সরকারি কোয়ার্টাসের পেছনে ছড়ানো ছেটানো বস্তি-এলাকার এই বাজে মেয়েটা ছাড়া বাবার আর কথা বলার লোক নেই?
গৌরী ও রানি একসঙ্গে সরকারি গার্লস স্কুলে পড়ত, এই শহরের সবচেয়ে ভালো স্কুল। এক ক্লাসেও কিছুদিন পড়েছে, কিন্তু আজকের পর থেকে গৌরীকে দেখলে হাসা তো দূরের কথা, সে ফিরে তাকিয়েও দেখবে না।
মা-কেও তার কথাটা বলতে লজ্জা করবে। উঠতি মেয়ের বুকের দিকে কেন তাকাবে তার বাবা! কথা বলতে হলে তো চোখের দিকে তাকানোই দস্তুর। চোখ না দেখলে কথার অর্থ বোঝা যায়? আর তার রাশভারি বাবা, ছেলেদের সঙ্গে মেশার দারুণ বিরোধী বাবা কিনা…না: গৌরী খুব বাজে বকে আর পরশ নামে এক কেবল-মিস্ত্রির সঙ্গে প্রেম করে, এ তো সবাই জানে। ওর কথা সত্যি হতেই পারে না।
ভ্রু কুঁচকে, মুখ ভেটকে রানি শুধু বলে, ‘হ্যাট! কী উল্টো পালটা কথা!’
গৌরী খিলখিল করে হাসে, ‘উল্টাপাল্টা? আমি কই? আরে তর বাপটাই একটা উল্টাপাল্টা লোক! তর মতো ভালো মাইয়ারা ঐসব বুঝে না। না, না, বুঝে বুঝে, কিন্তু কতক দেরিতে বুঝে!’
হাসতে হাসতে গৌরী চলে যায়, যাবার আগে রানির সারা শরীরে শুকনো লংকা বাটা ডলে দিয়ে যায়। জ্বলতে জ্বলতে রানি পায়ের কাছের মাটির ঢেলা কুড়িয়ে মণিদের টিনের চালে ঢিল মারে, ভেতর থেকে কাকিমা কে রে, কে রে বলে চেঁচিয়ে উঠতেই নিজেদের বাড়ির গলিতে সুড়ুৎ করে সটকে পড়ে। একটা লাঠি কুড়িয়ে পেয়ে ফার্নের মতো দেখতে ধার-কুঁচকে থাকা পাতাগুলোকে মেরে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, যেন শাসন করে ‘আর কোনো দিন তাকাবি ?’ বলে।
বাড়িতে ফেরে যখন তার কালচে মুখ দেখে মা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, ‘হতচ্ছাড়ি মেয়ে, সারা দুপুর আড্ডা মেরে উড়েপুড়ে এই বাড়ি ফিরল! তুই কি সারাটা গরমের ছুটি এইভাবে কাটাবি নাকি?’
‘যদি বলি মা তোমাকে,’ মনে মনে ভাবে রানি, ‘কেন আমার মুখের এই অবস্থা, তোমার খুব ভালো লাগবে না, বুঝলে মা!’
‘ফিরুক তোর বাবা আজ বাড়িতে, যদি নালিশ করে তোকে মার না খাওয়াই তো আমার নাম পরমা নয়।’
ইসসস, ফুঁসে উঠে মনে মনে রানি ভাবে, মারলেই হল! নিজের মেয়ের বয়সি খুকির মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না যে লোক, সে আবার মারবে! মা, তুমি নিজের নাম রেখো গরমা। মাঝে মাঝে গরম দেখানো ছাড়া তোমার আর করার কিছু নেই।
নিষ্ঠুরের মতো ভাবনা ঠিকই, কিন্তু এটাও ঠিক যে মা ছাড়া রানির আর কেউ ছিল না। রাতে শুয়ে মায়ের কোমরের ওপর নিজের পা তুলে দিয়ে গৌরীর বলা অসভ্য কথাটা রানি যখন বলল, মা একদম চুপ করে ছাইগাদা হয়ে গেল। এতক্ষণ মশলা আর হলুদের গন্ধ বেরোচ্ছিল শাড়ি থেকে, কেমন তাজা সুবাস, হঠাৎ চামড়া খসখসে হয়ে গেল, গন্ধ-ফন্দ সব উবে গিয়ে ধূসর ছাই ছাই কী যেন উড়তে লাগল মশারির ভেতর অন্ধকারে! খুব কষ্ট হল রানির মায়ের জন্য, কথা ঘোরাবার জন্য আর কিছু মনে না আসায় দুম করে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘মা, সব গল্পে দুয়োরানির কপালে এত কষ্ট কেন!’
নিরীহ প্রশ্ন, কী ভেবে করা প্রশ্নকর্তা নিজেও পরিষ্কার জানে না হয়ত, কিন্তু মা রেগে গেল। পড়াশুনোয় ভাল, কিন্তু তার মেয়েটা বড় পাকা! মেশে বস্তির মেয়েগুলোর সঙ্গে, বারণ করলেও শোনে না, ডানপিটে আর দুরন্ত। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ‘জানি না, যত্ত আজেবাজে কথা আর আজেবাজে চিন্তা। গৌরীর সঙ্গে ফের কথা বলতে দেখলে নোড়া দিয়ে দাঁতের গোড়া ভেঙে দেব হতচ্ছাড়ি!’
কারণ বুঝত না, কিন্তু রানি দেখত মা কেমন যেন খিটখিটে হয়ে উঠছে আজকাল, এমন ভাষা ব্যবহার করছে মাঝে মাঝেই যা আগে কখনও করত না! আর একবারও তো ফুঁসে উঠে বলতে পারত, ‘যা:, যত বাজে কথা, তোর বাবা এরকম করতেই পারে না।’ তাহলেই জলে জল, দুধে দুধ মিশে যেত। তা না, কী যাচ্ছেতাই ভাবে তাকেই বকছে দ্যাখো!
কথা না বাড়িয়ে রানি চোখ বুজে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল, টের পেল মা পা টিপে টিপে উঠে পাশের ঘরে গেল। তার পরের চাপা কান্না ও শাসানি, শাপশাপান্ত আর ঘরের দরজায় ছিটকিনি তুলে দেওয়া অবধি কান খাড়া করে রাখল সে। কিন্তু এসব মিটে যাবার পর একগাদা চাপা শব্দের ঝড় তাকে রোজই এমন ভয় দেখাত, তা ভাবতে এখনও রানি শিউরে ওঠে ! যেন নি:শব্দে কেউ কারও ওপর চড়াও হচ্ছে, মেরে ফেলবে বলে, কিন্তু আক্রান্ত প্রতিরোধ করছে না, চেঁচাচ্ছে না, যেন সে ক্ষতবিক্ষত হবার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে, মাঝে মাঝে শুধু অদ্ভুত কিছু আওয়াজ ভেসে আসে, তা কষ্টের না ভয়ের, নাকি আনন্দের, রানি বোঝে না, সে এইসব শুনবে না বলে ভয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।
একবার ওই রকম ভয় দেখান রাতের শেষে খুব ভোরে হিসি করবে বলে উঠে পর্দার ফাঁকে রানি দেখে কে যেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মা নাকি! কেমন যেন অন্যরকম অচেনা আলুথালু মা! শাড়ির আঁচল এলোমেলো, চোখ সদ্য-গজানো লালচে বটপাতার মতো চকচক করছে! কিন্তু তাকিয়ে আছে দৃষ্টিহীন ফাঁকা চোখে!
‘মা,’ রানি ডাকে, ‘আমার কাছে শোবে চল!’
অন্যমনস্ক উত্তর ভেসে আসে, ‘আর একটু দাঁড়াই। ভোরের হাওয়াটা এত ঠান্ডা!’
ভয়ে ভয়ে বাবার ঘরের ভেজানো দরজার দিকে তাকায় রানি, বলে, ‘বকবে কিন্তু!’ এবার মা ঝলসে ওঠে, ‘বকুক! সরমাদির কাছে গিয়ে থাকে ও। প্রত্যেক শনিবার। তোর বাবার আসলে সব চাই। সবাইকে চাই। ও একটা রাক্ষস।’
সরমা রানির নিজের বড়োমাসি। মেসো হঠাৎ হার্টফেল করবার পর গ্রামের দিকে একটা স্কুলে পড়ানোর কাজ পেয়েছে। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে পাশের পাড়ায় বাড়ি ভাড়া করে থাকে।
ময়দানের দিকের সন্ধ্যার আবছায়ায় ফস করে দেশলাই কাঠি জ্বলে উঠেছিল। সেই ক্ষণিক আলোয় ক্যাবের জানালা থেকে রানি দেখল তিরতিরে নাক আর টানা চোখের একটা মেয়ের আবছা অবয়ব। গৌরী! ঠিক যেন গৌরী!
অন্ধকারে মেয়েটা হারিয়ে গেল পর মুহূর্তে, হয়ত কেউ দেশলাই জ্বেলে তাকে মেপে নিচ্ছিল, কিন্তু ছোটবেলার সেই আঘাতটা যেন ফিরে এল একদম টাটকা! একটা থাপ্পড়ের মতো।
পাশে বসা বুড়ো লোকটার দিকে ঘাড় ঘোরাল রানি। দেহের রেখাগুলো সব ভেঙেচুরে গেছে, কোলকুঁজো হয়ে বসে আছে, কিন্তু রান্নাঘরের মাছে নজর দেওয়া সতর্ক বেড়ালের মতো তাকিয়ে আছে ওইদিকেই, যেখানে মেয়েটাকে দেখা গিয়েছিল! রানি ঘাড় ঘোরাতেই তাড়াতাড়ি সামনের দিকে তাকাল, নির্বিকার মুখ, যেন মাছভাজাটি উলটে খায়নি কখনও। কিন্তু রানি তো জানেই, এইগুলো সব ছলনা, তার চোখে ধুলো দেওয়া!
আর বেশিদিন বাবাকে সহ্য করতে পারবে না রানি। মা কিডনি পচিয়ে আগেভাগে চলে যাবার পর একাই তো থাকে পৈত্রিক বাড়িতে। চোখ দেখান হলে সেখানেই আবার রেখে আসবে। তারামাসি শুধু দেখাশোনা করে নাকি ওরা স্বামী স্ত্রীর মতো থাকে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই রানির। সারা জীবন নিজের বৌ মেয়েকে কষ্ট দেওয়া এই লোকটার চোখে আর মাথায় প্রবল যন্ত্রণা হয় শুনে নেহাত কর্তব্যবোধে সে শহরের বড় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছে। দেখানো হলেই রেখে আসবে আবার। এটা তার সচেতন সিদ্ধান্ত। খারাপ স্বভাব এত কিছুতেও পাল্টায়নি যখন, তখন আর একে নিয়ে ভাবার কোনো মানে হয়না। পেতে পেতেও মায়ের স্বভাব সে পায়নি ভাগ্যিস! অত সর্বংসহা মাটির মানুষ রানি নয়!
তার বাড়ির অনেকদিনের ঠিকে মেয়ে মানা তাকে সেদিন হাসতে হাসতেই বলছিল, ‘তোমার বাবা অমন একদৃষ্টে আমার দিগে তাকিয়ে বসে থাকে কেন গো বৌদি? আমি দেখতে কোন দীপিকা, বলদিনি?’
মনে মনে জ্বলতে জ্বলতেও উত্তর বানিয়েছিল রানি, ‘আরে মানা, তোকে দেখতে ঠিক আমার ঠাম্মার মতো। সেই চোখমুখ, সেই একঢাল কালো কোঁকড়া চুল! তাই।’
উত্তরটা খুব একটা মনে ধরেনি বোধহয়, ঘর মুছতে মুছতে মানা বলে, ‘অসোয়াস্তি হয় গো, আমরা তাড়াহুড়ায় থাকি, কখনও আঁচল খসে পড়ে, কখনও পায়ের গোচ বেইরে যায়। একটা বুড়ো মানুষ যদি হাঁ করে তাই দেখতে লাগে, কেমনধারা অনাছিস্টি তুমিই বল!’
মানা চলে যাবার বাবার খাটের কাছে দুমদুম করে এসে দাঁড়াল রানি। ঝনঝন আওয়াজ করে চায়ের কাপ, মুড়ির বাটি সরাতে সরাতে বলল, ‘আগে যে অত বই পড়তে? সে অভ্যাসটা গেল কোথায়! এখন খালি হাঁ করে তাকিয়ে বসে থাকা। একটু পজিটিভ হবার চেষ্টা করতে দোষ কী ?’
মনে মনে বাবাকে বাবা ডাকলেও মুখে ওই শব্দটা উচ্চারণ করা বহুদিন আগে ছেড়েছে রানি। তার মনে হয়েছিল, যে তার মা-কে সারাজীবন ঠকিয়েছে, সেই লোকটার পিতৃত্ব অস্বীকার করা সম্ভব না হলেও, তাকে নিয়ে কোনও রকম আদিখ্যেতা নয়।
বাবা থতমত খেয়ে বলে, ‘বই? বই পড়তে আর ভালো লাগে না রে। আর কটাই বা ভালো উপন্যাস লেখা হয় এখন! শিকার কাহিনি থাকলে পড়তাম বুঝলি। তা তোর বাড়িতে তো সেসব নেই।’
অকারণে বাবা হাসে, হাত মোচড়ায়, যেন মেয়ের সঙ্গে তার কত সখ্য! ভ্রু কুঁচকে যায় রানির, ‘কে বলল নেই? ওই যে সেলফের কোণে জিম করবেট অমনিবাস!’
‘করবেট তো ছোটবেলা থেকে পড়ছি। আরও পড়ব? আচ্ছা পড়ব’খনে।’
পরদিন রানি দেখে বাবার সামনে করবেট খোলা, কিন্তু হাঁ করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
স্বভাব যায় না ম’লে, দাঁত কিড়মিড় করে তার, মানা কখন আসবে বসে বসে বুড়ো তাই ভাবছে!
ডাক্তারের কাছে যাবার আগে গড়িয়াহাটে যাবে রানি। ইনি আসবার পর থেকে ঘ্যানঘ্যান করছেন, “তারার জন্য একটা পুজো করার শাড়ি কিনে দিস। বার বার বলে দিয়েছে। আমি টাকা দিয়ে দেব।”
লজ্জাশরম থাকলে নিজের মেয়ের কাছে এইরকম বলা যায় না। কিন্তু তারামাসির সঙ্গে বাবার ঠিক কি সম্পর্ক রানি জানে না। পাড়াপড়শিদেরও কোনও নালিশ শোনা যায়নি। তাছাড়া তারামাসি মায়ের শেষ দিনগুলোতে করেছিল খুব। তার কোলে মাথা রেখেই মা চলে গিয়েছিল।
একটা শাড়িই তো!
অনেক আলো-জ্বলা দোকানটায় বেদম ভিড়। সরস্বতী পুজো ঘাড়ের ওপর, বাসন্তী রঙ শাড়ি দেখছে অনেকগুলো অল্পবয়সী মেয়ে। তাদের ক্যালোরব্যালোর ছাড়িয়ে কাপড় গুছিয়ে তুলতে ব্যস্ত একজন সেলসম্যানের সামনে বাবাকে নিয়ে দাঁড়াল রানি, “দাদা, পুজো করবার শাড়ি দেখাবেন?”
“গরদ দেব তো? লাল পাড়ের নাকি অন্য রঙ?”
তারামাসির স্বামী কি বেঁচে আছে? তাদের বাড়িতে মালির কাজ করত হেঁপোরুগি রোগা লোকটা। এখনও বেঁচে আছে? বাবাকে জিজ্ঞাসা করবে বলে ঘাড় ঘোরাতেই রানি দেখল বাবা নেই তার পাশে। এদিক ওদিক খুঁজতেই দ্যাখে এগিয়ে গেছে একটু, হাঁ করে তাকিয়ে আছে অল্পবয়সী মেয়েদের ভিড়ের দিকে।
দ্যাখো কী কাণ্ড! একটা মেয়েকে প্রশস্ত গদির ওপর তুলে তার হালফ্যাশানের জামার ওপরেই কায়দা করে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে এক বয়স্ক সেলসম্যান, মেয়েটা চোখ ঝলসানো সুন্দরী, ছলবল করছে, বন্ধুদের বলছে, “ ঠিক করে বলবি, এটা আমাকে মানাচ্ছে কিনা!” ওর সুঠাম বুকের ওপর শাড়ির আঁচল অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বিছিয়ে দিল দোকানদার, ও পাত্তাই দিল না!
পুজোর সময় থেকে এই নতুন ফ্যাশন দেখে আসছে রানি, দোকানে গিয়ে শাড়ি পরে, ছবি তুলে, দেখেশুনে, তবে শাড়ি কেনা।
সে যার যা খুশি করুকগে, কিন্তু পচা গন্ধ যেমন শকুনকে ডেকে আনে, এই বুড়োটা ঠিক এসে জুটেছে শাড়ি পরানো দেখতে। হিড়হিড় করে বাবাকে টেনে নিয়ে আসে রানি, ‘তোমার না তারামাসির জন্য শাড়ি কেনার কথা!’ ‘হ্যাঁ তো,’ বাবা বলে, ‘কী একটা গোলমাল হচ্ছিল ওখানে!’
রানি বলতে যায়, ‘তুমি লোকটাই যে গোলমেলে!’ কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় সে, বয়সে ছোটো হলে ঠাস ঠাস দুটো লাগাত ঠিক, কিন্ত টেনে আনতে গিয়ে এটা খেয়াল না করে পারে না, কত পলকা হয়ে গেছে মানুষটা, রোগা একটা হাত, একটু টানতেই কেমন আছড়ে এসে পড়ল কাউন্টারে!
পাপ ছাড়ে না বাপকে, বয়স খেয়ে যায় দাপকে। বাবার দাপ বা দর্পের এই হাল দেখে রানি খুশি হবার চেষ্টা করল, কিন্তু তার কান মাথা রাগে অপমানে দপদপ করছিল! হিসহিসিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘কোনো পুরনো অভ্যাসই ছাড়তে পারোনি, তাই না?’
বাবা কেমন করে যেন মাথা ঘোরাল, যেন অচেনা বিরাট প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া একা মানুষ, তারপর অসংলগ্ন ভাবে বলল, ‘না কই, কিছু নেই তো! পরমা কিছু বলেছে তোকে?’
যে মানুষটা দশ বছরেরও আগে নিজের সব দাবিদাওয়া নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার এই হঠাৎ উল্লেখে রানির চোখ জলে ভরে উঠল। বাবাকে ঠেলে সরিয়ে কাউন্টার থেকে ক্যাশমেমো আর শাড়ির প্যাকেট নিয়ে বলল, ‘চলো এবার।’
ডাক্তার সেন এই চেম্বারে অনেক রাত অবধি রোগী দেখেন। রানিদের ডাক এল রাত আটটায়। মনে মনে অস্থির হচ্ছিল রানি, বেশি রাত হলে তাদের ওদিকটায় যাবার ক্যাব পাওয়া যায় না। অস্থিরতার সঙ্গে রাগ মিশে গেল, যখন সে দেখল, খুব ঝলমলে জামা গায়ে একটা হাসিখুশি মেয়ে বসে আছে উল্টোদিকে, বাবা হাঁ করে তাকে গিলছে, সঙ্গীর সঙ্গে তার হাসিঠাট্টার কথা একটাও যেন না হারায় সেই আগ্রহে ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। “সোজা হয়ে বসো না!” রানি ফিসফিস করে বলল। কিন্তু তাকে পাত্তা দিলে তো। রাগে দাঁত কিড়মিড় করছিল, আরও কিছু বলে বসত হয়ত, কিন্তু সেই মুহূর্তে পর্দার ওপাশ থেকে ডাক এল, “শুদ্ধচিত্ত সমাদ্দার!” বাবাকে নিয়ে চেম্বারে ঢোকার আগে রানি না ভেবে পারল না, ঠাকুরদা একখান নাম রেখেছিল বটে!
ডাক্তার অনেকক্ষণ ধরে শুদ্ধচিত্তকে দেখল। ভারী আর অদ্ভুতদর্শন ফ্রেম লাগিয়ে তাতে নানা লেন্স বসিয়ে, বোর্ডের লেখা পড়তে বলে, চোখে গোল আলো ফেলে নিজেই খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর রানিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কতদিন ধরে এইরকম?’
এইরকম মানে? মাথায়, চোখে ব্যথা করে আর একটু ঝাপসা দেখে, এছাড়া আর কিছু তো শোনা যায়নি।
‘না,’ ডাক্তার বলল, ‘উনি প্রায় অন্ধ। আশি পার্সেন্ট দৃষ্টি হারিয়েছেন, এখন খুব চড়া রঙ আবছা দেখা ছাড়া আর কিছুই ওর নজরে পড়ে না। আলোর উৎস কোনদিকে বুঝতে পারেন, কিন্তু সেই আলোয় কিছু দেখতে পারেন না।’
রানি বাবার দিকে তাকাল, ভাবলেশহীন মুখে শুনে যাচ্ছে। যেন ডাক্তার এইসব বলবে সেটা আগেই জানত। তাহলে কি রানি ভুল? চেম্বারে ঝলমলে মেয়েটিকে নয়, শাড়ির দোকানে শাড়ি পরতে থাকা মেয়েটিকে নয়, এমনকি মানার পূর্ণকুম্ভের মতো বুকও নয়, বাবা এখন তাকিয়ে থাকে ঝাপসা কিছু রেখা আর রঙের দিকে? ওই ভাবে জীবনকে ছুঁয়ে থাকতে চায়? রানির চোখে জল এল। যদি বাবার অবিশ্বস্ততার ইতিহাস অজগরের লেজের মতো অনেক পেছনে না বিস্তৃত হত, হয়ত সে ক্ষমা চাইত, বলত, ‘ভুল হয়ে গেছে।’ কিন্তু সে আর হয় না এখন!
ডাক্তার আরও কী কী বলছে এবার মন দিয়ে শুনতে চাইল রানি।
‘শুনুন মিসেস দাসগুপ্ত, আজ থেকে অন্তত দশ বছর আগে ওর চোখের ছানি কাটানো উচিত ছিল। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেকেন্ডারি গ্লকোমা, ইনফ্লামেশন, দুটোই রয়েছে। উনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন বলছেন, বই পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেন যখন, তখনই তো আপনাদের সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল। আমি তো বুঝতেই পারছি না, কী করে উনি এতদিন এতবড়ো একটা সমস্যা চেপে রাখলেন।”
রানি বলতে চাইল, আজ কুড়ি বছর সে বাড়ি ছাড়া, দশ বছর আগে মা চলে গেছে, তারপর আর একবারও ওমুখো হয়নি সে। সপ্তাহান্তে একটা ফোনকল করেই সব কর্তব্য মিটে যায়। এবার শুধু তারামাসির কাকুতিমিনতিতে…।
কিন্তু ডাক্তারকে কিছুই বলে ওঠা গেল না। এসব কি কাউকেই বলা যায়!
আগে ভাগে ক্যাবে উঠে বাবার হাত ধরতে গেল রানি, বাবা সাহায্য নিল না। কেমন করে যেন তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিল, দরজার হাতল চেপে ধরে হাঁচড়পাঁচড় করে উঠল, যেটুকু ছোঁয়া লাগল, রানি দেখল, মানুষের নয়, খড়ের মতো শুকনো নীরস একটা কাকতাড়ুয়ার হাত! এখন খেয়াল করছে বলে আরও অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছে । চশমাটা খুলে পকেটে রাখল হাতড়ে, জানালার কাচ ওঠাবে বলে হাতড়ে হাতল খুঁজে বার করল বাবা।
বাইরের হাওয়া এসে চলন্ত গাড়িতে রানির চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিল। একটা ছোট্ট নিষ্পাপ খুকির মতো সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে গেল, “এইভাবে কি প্রায়শ্চিত্ত করা যায়! হ্যাঁ বাবা, করা যায়? বল না?”
কিন্তু বাস্তবে সে ঘষটে আরও একটু দূরে চলে গেল, এমন ভাবে বসল যাতে ভিউ ফাইন্ডারে বাবার জবুথবু শরীরটা চোখের কোণ দিয়েও সে না দেখতে পায়।












































