একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে থেকে ওই জাল টাঙিয়েই ব্যাডমিন্টন খেলা চলত জোরকদমে। ইদানীং সেখানে গাড়ি থাকে। স্থানীয় পৌরপিতার গাড়ি। মাঠগুলো জুড়ে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে গেল আর বন্ধ হয়ে গেল সব আউটডোর গেমস।রআজকাল শুধুই ইন্ডোর গেমসের রমরমা। টিভিতে আইপিএল আর আইএসএল। যদিও মোবাইল গেমসই তুলনায় বেশি; তা বাদে ক্যারম আর তাস। বিবি পাসানো থেকে শুরু করে টোয়েন্টি নাইন। এলাকার বয়স্করা সন্ধের দিকে এলে অবশ্য ব্রিজ খেলা চলে কিছুক্ষণ। লাগোয়া রাস্তার পাবলিক লাইব্রেরি দীর্ঘদিন বন্ধ। নিখরচায় খবরের কাগজ পড়তে তাই অগত্যা—পাড়ার ক্লাব। মোবাইলের পর্দায় অনভ্যস্ত বুড়ো মানুষদের পক্ষে তোফা বন্দোবস্ত। সঙ্গে দু-হাত তাসখেলা উপরি পাওনা।
ক্লাবঘরের ভিতরে লজঝরে আলমারিটার সামনে হেলিয়ে-রাখা একটা ক্যারমবোর্ড। হাল দেখে বোঝা যায়, খেলা নিয়মিতই হয়ে থাকে। ব্যাডমিন্টনের জন্য কেনা হ্যালোজেনটা কবেই মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। ক্যারমবোর্ডের উপরের বাল্ব্ আর তার হোল্ডার তাই খেলা শেষ হয়ে গেলে রেখে দেওয়া হয় আলমারির ভিতর। আলমারির উপরের তাক পৌরপিতার নিজস্ব। ক্যারমের জন্য নিজের তিনটে স্ট্রাইকার, লুডো আর দাবার বোর্ড। আছে ব্যবসায়ী খেলার বোর্ডও। পিচবোর্ডের ছোটো একটা বাক্সের ভিতর ভরা আছে অগুনতি টাকা। রোজ রাতের খাওয়া সেরে ক্লাবঘরে একবার করে ঢুঁ মেরে যায় পৌরপিতা উজ্জ্বল গোপ (জগা)। ক্লাবের সংলগ্ন জমিতে মাথা তুলেছে পার্টি অফিস—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ক্লাবের জমিতে পার্টি অফিস—জবরদখল। পাশের লাইটপোস্টে যখন মুখ্যমন্ত্রীর ছবিওয়ালা ফ্লেক্স ঝোলানো হয়, পথচলতি লোকজন তখন দেখে নিচে লেখা : ‘প্রচারে : মাননীয় উজ্জ্বল গোপ (জগা), পৌরপিতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবী’। এই ওয়ার্ড সংরক্ষণের আওতায় চলে এল যখন, সেই তখন থেকেই জগা এখানকার পৌরপিতা। তার আগে প্রোমোটারি লাইনে মাথা গলানোর চেষ্টা করেছিল বেশ কয়েকবার। সুবিধে করতে পারেনি বিশেষ। বহুদিনের পুরোনো এই পাড়ায় অধিকাংশই বামুন, কায়স্থরা কিছু বাড়ি। জগাদের খাটাল ছিল একসময়। প্রোমোটারের দৌলতে চারতলা বিল্ডিং উঠেছে সেখানে। টাকার সঙ্গে দুটো ফ্ল্যাট পেয়েছিল জগা। ফার্স্ট ফ্লোরের ফ্ল্যাটে বউকে নিয়ে তার সংসার। গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়েছিল প্রথম দিকে। মিউনিসিপ্যালিটি ইলেকশনে ওটাই হয়ে যায় তার নির্বাচনী কার্যালয়। সেই থেকে যত গোপন মিটিংয়ের আখড়া ওটা। নিন্দুকরা অবশ্য আড়ালে বলে, ওখানে বোম বাঁধা হয়, রাখা থাকে পেটো। তারা বুরবক, জানে না যে, নিজের ফ্ল্যাটে কেউ ওসব রাখে না।
সন্ধেয় পার্টি অফিসে মিটিং সেরে, লোকজনের অভাব-অভিযোগ শুনে, বিহিতের যথাসম্ভব আশ্বাস অথবা নিদান দিয়ে ক্লাবে এসে ঢোকে জগা। আলমারি থেকে বেরোয় পৃথুল স্ট্রাইকার। ঘুঁটি জমা পড়ে জালের ভিতর, স্ট্রাইকার অথচ গলে না পকেটের ফাঁক দিয়ে। ক্যারম খেলায় তার কোনো ফাইন হয় না কখনও।
রাতের খাওয়া শেষ হলে পর রোজই বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ হাঁটে জগা। পাড়ার দুটো কুকুর তখন তার পায়ে-পায়ে ঘোরে। একটা সাদা, কালো অন্যটা। কোনোদিন বিস্কুট পায়, বেশির ভাগ দিনই পায় না। ঘেউ-ঘেউ করলে লাথি জোটে। এইভাবে ক্রমে চিৎকার কমে এসেছে কুকুর দুটোর। দাঁত খিঁচিয়ে চাপা গজরানি যদিও আছে। মন ফুরফুরে থাকলে মুখে তু-তু আওয়াজ করে সে। কুকুর দুটোও তখন সামনের দু-পা তুলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আহ্লাদে। জগা আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়, ঘাড়ে। অবোধ প্রাণী, গলে যায় ওইটুকুতেই। পুরোনো লাথি বা থুতুর কথা মনেও আসে না আর। বেপাড়ার কোনো কুকুর পথ ভুলে যদি-বা ঢুকে পড়ে এলাকায়, তখন ওরাই পাহারাদার।
কুকুররা থাকতে জগার অতএব রাতে কোনো ভয় নেই। নিশ্চিন্ত মনে সে এসে ঢোকে ক্লাবঘরে। বন্ধ পার্টি অফিসের বাইরের গ্লো-সাইন বোর্ডে তখন জ্বলে থাকে আলো। হালকা হলুদ দেয়ালের সামনে রাখা মাঝারি মাপের আলমারির দরজা খুলে যায় আর তার হাতে উঠে আসে দাবার বোর্ড। বাক্স থেকে ঘুঁটি বের করে ঝুলনের সৈন্য সাজায় সে। মনে-মনে খাড়া করে অদৃশ্য প্রতিপক্ষ। তারপর ইচ্ছেমতো নৌকা ডোবায়, গজে আছড়ায়, ঘোড়ার পায়ে দলে একশেষ করে ছাড়ে। ক্লাবের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তখন অদ্ভুত এক মুখভঙ্গি করে গজরায় কুকুর দুটো। ধলা কুকুরটা বলে : ‘হেথা হতে যাও, পুরাতন!’
শ্যামলা কুকুরটা ধরতাই দেয় : ‘হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।’
আর-কেউ না-বুঝলেও পৌরপিতা বোঝে। পৌরপিতাদের বুঝতে হয়।
এমনটা প্রথম সে দেখেছিল বছর দশেক আগে, ভোটে জেতার পর।
ভোটের রেজাল্ট বেরোতেই চারপাশে মুহুর্মুহু শ্লোগান, আবির উড়ছে হাওয়ায়, আশেপাশের মুখগুলোয় উল্লাস। সেই হুল্লোড়ে প্রায় ভেসে গিয়েই পার্টি অফিস আর ক্লাবের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল জগা। বিদায়ী পৌরপিতা, একই দল, এসেছিল অভিনন্দন জানাতে। কী মনে করে কে জানে, প্রথমে চিৎকার, তারপর বিকট একটা মুখ করে গজরাতে শুরু করে দিয়েছিল কুকুর দুটো। সেই প্রথম, এখনও মনে আছে জগার, ভিড়ের মাঝেও স্পষ্ট শুনেছিল সে, ধলা কুকুর বলছে : ‘হেথা হতে যাও, পুরাতন!’
সঙ্গে-সঙ্গে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছে শ্যামলা কুকুর : ‘হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।’
লুডো কিংবা ব্যবসায়ী—ভালো লাগে না জগার। ওই খেলা দুটোয় ভাগ্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। এটা তার বরাবরের না-পসন্দ্। খেলবে নিজের দমে, জিতবে নিজের অওকাদে। ছোটোবেলার খেলা বলেই গোছানো স্মৃতির মতো ওসব লুকিয়ে রেখে দিয়েছে সে। দাবা বরং তার বেশ পছন্দের। মাথা খাটিয়ে পথ খুঁজতে হয়, বুদ্ধির প্যাঁচে মাত দিতে হয় বিরোধীকে। বোড়ে মরলে মরুক, সব দুর্যোগ থেকে আগলে রাখতে হয় রাজাকে।
যদিও যে-যুদ্ধে রাজার প্রাণসংশয় হয় না, সেটা যুদ্ধ নয়—বিশুদ্ধ রাজনীতি। পৌরপিতা জানে। কুকুররা জানে না—দাবা খেলার বোড়েদের মতোই।
দিন কয়েক আগে শহরের নামী হাসপাতালে যা-সব ঘটে গেল, তা নিয়ে শুরুর ক-টা দিন খানিক উদ্বিগ্নই দেখিয়েছে পৌরপিতাকে। এমনিতে কোনো কিছুতেই ঘাবড়ানোর বান্দা নয় সে। তার জোড়া ভুরুর উপর অপ্রশস্ত কপালে কেউ কখনও দুশ্চিন্তার সামান্য ভাঁজও দেখেনি। এবারও ঘাবড়াত না; কিন্তু কুকুর দুটো হঠাৎ এমন কঁকিয়ে কেঁদে উঠেছিল যে, ভিতরে-ভিতরে থম মেরে গিয়েছিল সে। যদিও অন্তরের সেই স্তব্ধতাকে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না কোনো। এমন অনেক কিছুই বুঝতে দিতে নেই, লোকচক্ষুর থেকে লুকিয়ে রাখতে হয় পৌরপিতাদের।
শহরের হাঙ্গামায় এখানকার মানুষজনের কিছু যায়-আসে না। পৌরপিতা জানে। বাইরের দুনিয়ার উথালপাতাল নিয়ে মানুষ কথা বলে বেশি, কিন্তু নির্বাচনের সময় সেইসব রাজপথ দূরে সরে যায়, স্থানীয় গলিপথের পরিচ্ছন্নতাই বড়ো হয়ে ওঠে। রাস্তার আলোটা, রোজের জলটা, পরিষ্কার নর্দমাটা পেলেই মানুষ ফের গুটিয়ে যায় নিজস্ব শামুকখোলে। ওই খোলসে আঘাত করতে নেই, তাতে হিতে বিপরীত ফল—পৌরপিতা বোঝে।
এলাকায় যাদের উপার্জন বেশি, এসব ছুটকো ব্যাপারে সত্যিই মাথা ঘামায় না তারা। যাদের সেভাবে রোজগার নেই, ভাঁড়ে মা ভবানী, তাদেরই হাতে রাখতে হয়। সংখ্যা বড়ো বালাই। যত সমস্যা ওদের নিয়েই। কোনো কারণে একবার যদি রেগে যায়, একজোট হয়ে যাবে সব। এই কারণেই পুরসভার বিভিন্ন টুকরো কাজের দায়িত্ব এদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে থাকে জগা। কেউ নর্দমা পরিষ্কার করে, কেউ রাস্তা ঝাঁট দেয়, সাতসকালে লোকের বাড়ি-বাড়ি ঘুরে রোজের বর্জ্য সংগ্রহ করে কেউ, কেউ-বা মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রচারের দায়িত্ব সামলায়। সুলতাও এমনই একজন।
সুলতার বরের ডানদিকটা যখন পড়ে গেল একেবারে, মুখ বেঁকে গেল, বিছানা ছাড়া আর উপায়ান্তর রইল না, তুলে দিতে হল এতদিনের জুতোর দোকান, তখন ওদের পরিবারকে দেখেছিল এই জগাই। তারপর থেকে চলৎশক্তিহীন স্বামীকে খাইয়ে-দাইয়ে, সব পরিষ্কার করে কাজে বেরিয়ে পড়ে সুলতা। হাতে-ঠেলা একটা দু-চাকার ভ্যান নিয়ে সকাল-সকাল তিনটে গলির ভিতর ঘুরতে হয় তাকে। কিছুক্ষণ পরে-পরে বাজাতে হয় মুখে-গোঁজা হুইসল। তার জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রসীমার যাবতীয় নোংরা বর্জ্যে ভ্যান ভরে উঠলে ট্রান্সফার সেন্টারে গিয়ে সেসব জমা করে পুরসভায় চলে আসে সে। হাজিরা-খাতায় সই করে। সই করতে কখনও ভুল হয় না তার। সই না-থাকলে সেদিনের টাকা বাদ চলে যায় মাসের হিসেব থেকে। ভাগ্য ভালো থাকলে মাসে-মাসে টাকা মিলে যায়, নতুবা দু-মাসে একবার।
হাসপাতালের কাণ্ড নিয়ে টালমাটাল শুরু হল যখন, শহর থেকে ডাক এল মেয়েদের রাতদখলের, পুরসভার এইসব অস্থায়ী কর্মীদের নিয়ে পার্টি অফিসে মিটিং করেছিল পৌরপিতা উজ্জ্বল গোপ (জগা)। নিজে বলেছিল কম, শুনেছিল বেশি। যদিও তার বক্তব্যই তুলনায় বড়ো ঠেকেছিল, কেন-না উপস্থিত বাকিরা কেউ কিছু বলেনি তেমন। প্রশান্তি খেলে গিয়েছিল পৌরপিতার চোখে-মুখে। সে নিশ্চিত হয়েছিল, আদতেই এরা তুচ্ছাতিতুচ্ছ, পরজীবীর দল; মুখ বুজে আদেশ পালন করাটাই এদের দস্তুর। চুপ করে থাকতে-থাকতে কথা হারিয়ে ফেলেছে ওরা।
জগার চাপা হুমকিতে কাজ হয়। স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে এলাকার একজন মহিলাকেও দেখা যায় না বাড়ির বাইরে। এমন-কি পরের দুটো শনিবারেও নয়। প্রচ্ছন্ন আনন্দে সেই-সেই রাতে ক্লাবঘরে দাবার বোর্ড সাজিয়ে বসেছে সে। বেপাড়ার কুকুরদের চিৎকারে তাড়িয়ে এসে চাপা গজরানিতে ধলা কুকুর তখন বলেছে : ‘হেথা হতে যাও, পুরাতন!’
শ্যামলা কুকুরও জানান দিয়েছে নিজের অস্তিত্ব : ‘হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।’
ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসির ঝিলিক নিয়ে অতঃপর দাবা খেলায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে সজ্জন পৌরপিতা।
এই বন্দোবস্তে গোল বাধল আজ রাতে। শনিবার বলে ফের রাতদখলের ডাক ছিল, গত কয়েক সপ্তাহের মতোই ঠিক।
কিছু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে মুষলধারে। জল না-জমলেও পথঘাট এখনও ভিজে। রাতের খাওয়া সেরে, বগলে জলের বোতল, ক্লাবঘরের তালা খোলে জগা। পাশে অন্ধকার পার্টি অফিসের বন্ধ দরজার উপরে গ্লো-সাইন বোর্ড আলোয় ভরপুর। টিউব জ্বালিয়ে পায়ে-পায়ে আলমারির কাছে এসে পৌঁছায় সে। লজঝরে আলমারির ঈষৎ নড়বড়ে হাতলে চাপ দেয় আর বাইরের বৃষ্টিভেজা রাস্তায় জুতোর মচমচানি কানে আসে তার। দ্রুত দরজার কাছে চলে আসে সে। ক্লাবের পাশের রাস্তা দিয়ে পাড়ার সব বাড়ি উজিয়ে বেরিয়ে পড়েছে মেয়েরা। ওদের মাঝে সুলতাই শুধু নয়, পুরসভার অন্য অস্থায়ী মহিলা কর্মীদেরও পদক্ষেপণ নজর এড়ায় না তার।
কথা বলতে ভুললেও হাঁটতে ভোলেনি ওরা। দল বেঁধে সব হেঁটে যাচ্ছে বড়ো রাস্তার দিকে। সেই রাজপথ পেরোলেই নদী। নদী গিয়ে মিশবে সাগরে।
বুদ্ধিমান না-হলে পৌরপিতার চলে না। দাবা খেলে হোক কিংবা অন্য কোনও উপায়ে, বুদ্ধি যথেষ্টই খোলতাই হয়েছে জগার; বিনা বাক্যব্যয়ে ক্লাবঘরের ভিতরে সেঁধিয়ে যায় সে। মনে-মনে একবার শুধু আওড়ায় : ‘রাত গ্যয়ি বাত গ্যয়ি—’। আগামীকাল নতুন সকাল।
দাবার বোর্ডে ঘুঁটি সাজিয়ে খেলায় মন দেয় পৌরপিতা। গতকাল কালো ঘুঁটি ছিল তার, আজ সাদা। প্রথম দানে একটা ঘোড়াকে আড়াই ঘর এগিয়ে দেয় সে। অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স! এবার প্রতিপক্ষের একটা নির্বিষ বোড়েকে এগিয়ে দেবে বলে হাত বাড়ায়। মুহূর্তে অবাক হয়ে দেখে, একটা বোড়ের এক ঘর এগোনোর সঙ্গে-সঙ্গে বাকি বোড়েগুলোও ঠিক ততটাই এগিয়ে আসে। তড়িঘড়ি নিজের একটা বোড়েকে এক ঘর এগোয় সে। পালটা চাল আর দিতে পারে না। কালো-কুঁদো বোড়েগুলো আবারও এগিয়ে আসে একসঙ্গে—যূথবদ্ধ। রাগের চোটে চতুরঙ্গ উলটে দেয় ও, লাল মেঝেয় ছড়িয়ে যায় নিষ্প্রাণ ঘুঁটিরা।
কিছু বুঝে উঠতে না-পেরে লুডো নিয়ে বসে পৌরপিতা। সবুজ ঘুঁটি তার। অথচ কিছুতেই ছক্কা পড়ে না। লাল নীল হলুদের হয়ে চাল দেয় আর দেখে, ছক্কা পড়ছে। এক-এক করে সব ঘুঁটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সবুজের ঘরে তখনও চারটে ঘুঁটি আটকে। বিরক্তিতে সাপ-লুডো খোলে। সেখানেও একই দশা : প্রতিপক্ষ তরতর করে মইয়ে ওঠে, উঠতেই থাকে আর তার ঘুঁটি বারবার খুঁজে নেয় সাপের মুখ। বুঝি-বা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে হরেক সাপ। তাদের ছাড়ানোর চেষ্টায় সে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে লুডোর বোর্ড।
খানিক ধাতস্থ হয়ে এবার ব্যবসায়ী খেলার বোর্ড আর টাকার বাক্স নিয়ে বসে পৌরপিতা। চালে গড়বড় হয়ে যায় প্রতিবার। ঘুরে-ফিরে বারবার জেলে এসে ঢোকে সে। জমানো টাকা থেকে জামানত দিতে-দিতে একটা সময় ফাঁকা হয়ে যায় ক্যাশবাক্স। তবু জেলের নিকষ অন্ধকার থেকে নিস্তার মেলে না। গরাদের ওপারে বন্দি মানুষটার ছবিতে নিজের মুখ চোখে পড়ে তার। বাইরে তখন কুকুর দুটো চিৎকার করে চলেছে তারস্বরে। খেলা থেকে জোর করে সবটুকু মনোযোগ টেনে সরিয়ে আনে পৌরপিতা। ভালো করে কান পাতে। শুনে বুঝে নিতে চায় ওদের মতিগতি।
ধলা কুকুর তখন বলছে : ‘হেথা হতে যাও, পুরাতন!’
কথার পিঠে কথা বসাচ্ছে শ্যামলা কুকুর : ‘হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।’












































