বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন
কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য
আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায়
৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার ! সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে মৃত্যুর বিষ নিঃশ্বাসে। কবি মনে সংক্রমিত সেই ভয় আর অস্থিরতা চারিয়ে যায় তার কবিতার শিরা উপশিরায়। স্মৃতির দরজায় ঘা পড়ে, উঠে আসে ৩/৪ সি, তালতলা লেন-এর সেই ঐতিহাসিক বাড়িটার কথা। স্মৃতিমেদুর চেতনায় ভাসতে থাকে বিদ্রোহ, প্রতিবাদ, বিপ্লব আর সাম্যের গান। সে জগত থেকে আজ নির্বাসিত একটা সময়, পূতিগন্ধময় পঙ্কিল প্রতিবেশ। না-জানার ‘আন্ধারে’ প্রতিদিন তলিয়ে যেতে থাকে একটা ‘কালকের ভোর’। এমনই একটা সময়ের ইতিবৃত্ত লেখা হতে থাকে ২০২১-২৩ এই মৃত্যু ছোঁয়া সময় জুড়ে। ক্ষয়াটে একটা কালপর্বে দাঁড়িয়ে কবি পেছনে ফিরে দেখেন অতীতের পান্ডুলিপি তোলা আছে বিগত সময়ের কুলুঙ্গিতে। আধুনিকতায় ক্লিষ্ট একটা আগ্রাসন ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলেছে শহর থেকে শহরতলীর কুমারীত্ব। ‘কী যেন হারিয়ে গেছে/কী যেন লন্ঠন।’ লন্ঠনের শান্ত স্নিগ্ধ আলোর মতই আজ হারিয়ে গেছে যাপনের শান্ত সাম-গান। আকাশে আকাশে উড়ে যায় তোলা উনুনের গল্প, তাই ‘উনুনের ছাই আজও আকাশে ভূমিকা।’ সময়ের সাথে সাথে মানুষও অতীত হয়ে যেতে থাকে, আর অতীত তো সর্বদাই মৃত! তাই ‘রাজবাড়ি’-তে, ‘মরে যাওয়া/মানুষেরা/কেউ আর/আসে না এখানে।’ ঘুরে ফিরে মৃত্যুর বিষন্নতা ঘনিয়ে আসে কবিতার বর্ণে-গন্ধে। কবি বুঝে নেন, বিদেহীর মৃত্যুবরণের যন্ত্রণা নেই। কিন্তু ‘যত অপমান,তত/জন্মান্তর হয়’, প্রতিদিন সত্তার অসংখ্য রক্তক্ষরণের মধ্যে থেকেই যাপনের প্রতিটা মুহূর্ত হয়ে ওঠে আর একটা নতুন মৃত্যুর জন্মান্তর! ‘চিরকুটে যা লেখা ছিল…’ কবিতাটিতে যাপনের এক গভীর অনুধ্যান আর মৃত্যুচেতনার ধ্যনমগ্ন বিষন্নতার এক অন্তর্লীন আঁতাত তৈরি হয়। আর এখান থেকেই কবির শোকযাপন। শোক থেকেই তো শ্লোক ! এই পথ বেয়েই তো আদিকাল থেকে কবিতার পথচলা… সেই প্রথম শ্লোকের ক্ষরিত রক্তধারা প্রবহমান অনন্তযাপনের স্ফীত গর্ভে, সেখান থেকে উঠে আসা কবিতার আখরগুলি রক্তস্নাত। বহমান সময়ের শোনিতস্রাবে ধৌত হয় পূণ্যশ্লোক, ‘যে অক্ষরে রক্ত নেই/তাকে তুমি/কবিতা বলো কি?’ যে সময়ের মধ্যে দিয়ে কবির কবি হিসেবে পথচলা তার গায়ে সেঁটে আছে ‘ধ্বংসস্তূপ’-এর ক্ষয়িষ্ণু উচ্ছ্বিষ্ট। এক ধরনের মরবিড ফিলিং এই পর্যায়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য। ‘শুকনো হাড়ে শ্যাওলা জ’মে………’, হতাশা আর বঞ্চনার কালশিটে পড়া একটা ভয় জমাট বেঁধে আছে, ‘চারিদিকে তো পাথর, কারো চোখের কোনে জল আসে না’। সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞান শুধু অন্ধকার বিলোয়। তবু কবি প্রশ্ন করেন, ‘চারিদিকে তো পাথর, তুমি কেমন করে ফুল ফোটাবে……। ‘পুঁজি’ কবিতাটা অপ্রেম যাপনের এক বিলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। অবিশ্বাসের কাটাকুটি খেলায় নিস্তার নেই মৃত্যুর পরেও। কফিনের মাটিও চিনে নিতে চায় মৃতের প্রকৃত পরিচয়, ‘কফিনেও/সার্বভৌম মাটি/ ভাবে/কে কে /ঘড়িয়াল ছিল!’ প্রেতের মতো নেমে আসা নৈরাশ্যের অন্ধকারে, ‘আশাবাদ বিক্রি করে সাপের ফণায়।’ জীবন বিষিয়ে ওঠে সরীসৃপের তরল গরলে, অমোঘ হয়ে ওঠে মৃত্যুর অনিবার্যতা। একটা অন্তহীন অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে এও এক journey of the poem. অবিশ্বাসী একটা সময়ে বিশেষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞান থেকে একে একে উঠে আসে ‘তোমাকে বিশ্বাস করে’, ‘শ্রেণিসংগ্রাম’, ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’, ‘রেডবুক’-এর মতো কবিতারা। জীবনের প্রতি বিশ্বাস, আদর্শ, মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণু স্বপ্নের মতোই আজ অপসৃয়মান। স্তিমিত আবেগে ক্ষোভ আর অভিমান স্তূপীকৃত। ‘একটি রাস্তা/একাই/ভ্রমন………। একটি লোক/একাইই/মিছিল।’ ক্রমাগতঃ গোষ্ঠীচেতনা থেকে ব্যক্তিচেতনায় এই নির্বাসন একধরণের alienation- কথা বলে। ভাঙ্গা স্বপ্নের টুকরো জড়ো করতে করতে কবিতার শরীরে নামে নিঃসঙ্গতার ক্লান্তি আর হতাশা। ‘পদশব্দে বোঝা যায় সেও/চলে গেল।শব্দ কোনদিন/পিছনে ফেরে না।তুমি/শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে থাকো।’ শব্দের মতোই সময় ফেরে না কখনো। শুধু বিপ্রতীপ গতিপথে সময় আর কবিতার মুখোমুখি দেখা হয়। ফুলের গন্ধের বদলে ফুটন্ত ভাতের গন্ধে মরা পেট ফুলে ওঠে, ‘এ জীবন ঢেকে যায়/রান্নার ধোঁয়ায়’। শোষিত শ্রমিকের হৃদস্পন্দনে ধ্বনিত হয় আদর্শের প্রতি নিষ্ঠার বেদমন্ত্র। বঞ্চনা আর অত্যাচারের প্রতিপক্ষে যে বিপ্লবের আগুন অনিবার্য তারই আবাহন চলে কবিতার ছত্রে ছত্রে। ৩/৪ সি,তালতলা লেনে ভেতরে ভেতরে গুমরে ওঠে ক্ষোভ, উগ্রে দেয় রাগ ! স্পর্ধিত হয়ে ওঠে শব্দচয়ন। কবিতা হয়ে ওঠে পুরাণকথার অনুষঙ্গে সময়ের বহমান নৈরাজ্যের অবিশ্রান্ত ধারাপাত। ‘রাধারানি অভিসারে গিয়ে আজও /ফেরেননি কোথাও/ক্ষীরসাগরের জলে ডুবু ডুবু/লাশ ভেসে আছে’। উঠে আসে তাজমহল তৈরির ইতিহাস কথা অথবা মুন্ডহীন কনিষ্কের ঐতিহাসিক বিবৃতি। আসলে অনেক কথা জমা হয়ে আছে হাঁ-করা সময়ের অতিকায় গর্ভে। আর সেখান থেকে অতীতের সঙ্গে ঘটমান বর্তমানের একটা যোগসূত্র নির্মাণে প্রয়াসী কবি দেখেন একবিংশ শতকের ঘনীভূত মৃত্যুচ্ছায়া। অতিমারির মৃত্যুমিছিল, রক্তধোয়া যুদ্ধ, পৃথিবী জোড়া স্বজন-সুজন হারানোর শোক! এক অতিকায় প্রেক্ষিতে বিষাদ-বিষন্নতায় কবিতা জমাট বাঁধে অন্ধকারে ঢালাইয়ের শব্দে। বিনাশের অঙ্গীকারে সময় বাঁধা পড়ে। যাপনের অনিশ্চয়তা, মৃত্যুভয়, পীড়িত বিশ্বের নাভিশ্বাস যখন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় কবিকে তখনই ঈশ্বরে বিশ্বাস অনিবার্য হয়ে ওঠে ! কবিতার বিভিন্ন মুডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঈশ্বর, ভগবান, দীনবন্ধু নানা আহ্বানে ঈশ্বর বিশ্বাসের নানা উদ্যাপন তৈরি হয় কবিমনে। এই অসহনীয় তামসিকতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হিন্দোল সমান্তরাল একটা বিশ্বাসের জগৎ খুঁজে নেন, যেখানে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ সমপর্ণে আশ্রয়ের শান্তি মেলে। ব্যর্থতার গ্লানি যেখানে ঈশ্বর বিশ্বাসের গভীরে তলিয়ে যায়। ঈশ্বর সহায় হয়ে ওঠেন পৃথিবীর, ‘দীনবন্ধু পৃথিবী সহায়।’
হিন্দোলের কবিতা উচ্চকিত নয়, বরং অস্থিত সময়ের মধ্যে দিয়ে চললেও শান্ত ছায়ার মতো একটা বিষাদ আচ্ছন্ন করে রাখে ওর কবিতাকে। সময়ের কাছে প্রত্যাশিত যে সুখসময় ক্ষয়াটে পৃথিবীতে তার কোন চিহ্ন নেই আর আজ ! ‘দেখেছি গোধূলিমুখ, আমাদের দালান পেরিয়ে/অনাথ শিশুর মতো একটি উঠোনে পড়ে আছে।’ বিপন্নতার এই ধারাভাষ্যে কবিতা খুঁজে নেয় তার নির্গমনের সঠিক নির্মান আর মেধা-মননের পারস্পরিক বোঝাপড়া।




























