লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে।
মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে।
কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে আছে।
ওঙ্কার ক্লিনিক তালাবন্ধ।তালা খোলানোর জন্য রাস্তা ঘুরে অন্য গেট দিয়ে ঢুকে দেখি সেখানে এখনও অমাবস্যা চলছে। একটা রোগা এবং বাচাল রাস্তার বেড়াল আমার পিছন দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। বরং তার ভেতরে কিছু প্রাণের আভাস ছিল। তাকে তাড়াতে গিয়ে টিকিটবাবু উঠে নড়েচড়ে বসলেন।লক্ষ করলাম আজ রাস্তায় পুলিশ কম।তাই দক্ষিণেশ্বরের দিকে একটা যানজট হয়ে আছে। আরো একটা বেড়াল তাড়িয়ে সিভিক পুলিশ আমার যাবার রাস্তা করে দিলো তবু তাকে ধন্যবাদ দিলাম না। দিতে ইচ্ছে করল না। সফল মানুষদের সঙ্গে এই কারণেই অসফল মানুষের তফাৎ হয়ে যায়।সফল মানুষেরা যে কোনো সময়,যে কোনো রাস্তায় চায়ের দোকান খুঁজে বের করে। আমি পেলাম না যথারীতি। কিন্তু এখনই চা খাওয়া দরকার।কারণ সূর্যের আলো গঙ্গার পশ্চিম দিকে হেলে গেছে… যানজট আর নেই।
এই যে হঠাৎ হঠাৎ জ্বর জ্বর ভাব এর কারণ কী? খুব ব্যক্তিগত নাকি বিশ্বকাপে ভারতের দুর্বলতাজনিত হতাশা?
থার্মোমিটার সঙ্গে থাকে… দেখাচ্ছে ৯৮’২°, ওজন পাঁচ কেজি কমে গেছে,এসব তো পাহাড়ি রূপকথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তখনই ফোনটা এল।
এটা পড়ে দেখুন…
একটা লেখা পাঠিয়েছে কেউ।কে পাঠালো?
৫৫ বছর আগে পড়া তাঁর প্রথম উপন্যাসের প্রথম পাতার পিডিএফ।
বাহ্ দারুণ তো!কী ঝরঝরে গদ্য। মনে হল যেন গতকাল লেখা। কিন্তু না। ৫৫ বছর আগের। আসলে আমার মধ্যেই অনেকটা পরিতোষ,বেশিটা আমি এবং অল্প একটু শেখর আছে। পড়তে পড়তে টের পাচ্ছি। লেখাটা পাঠিয়ে উপকার করেছে, বলতেই হবে। ধন্যবাদ দেব। ইচ্ছে করছে না।
আসলে এখনকার লেখায় অনেক তথ্য থাকে। তত্ত্ব থাকে। কিন্তু এই স্পিরিটটাই নেই।
বেশিরভাগ গল্পের শুরু হয় একটা সকাল থেকে। সাধারণত একজন লেখক সকালবেলা লিখতে বসে। সেই জন্য? আমার তা মনে হয় না। রাত্তিরে লিখলেও গল্পের শুরু হয় সকালেই। এটা হল লেখকের মনস্তত্ত্ব।
এই যেমন এখন সকাল। অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। আগষ্ট মাসের বৃষ্টি। কখন থামবে কেউ জানে না।
খলনায়ক, ধরে নিন এখন খুলনায়।সে শিউলির বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছে।তার উচ্চতা ৫ ফুট ৮ । গায়ে কালো রঙের ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট। চোখে কালো চশমা।ভিলেন যে রকম হয়ে থাকে।সে অস্থির ভাবে হাঁটছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়ে আবার নিবিয়ে দিলো।চা খাবে? না শিউলিকে একটা ফোন দেবে?সে ভাবছে? মেসেজ করেছে তিনবার। উত্তর নেই।
শিউলি ৫ ফুট ৫ । শ্যামলা রঙ। ফেসবুকে শিউলি পম্পা লিখলেও আসলে সে কর্মকার। এদেশেই পড়াশোনা করেছে।এম এ এম ফিল।পি এচ ডি করেনি।
এখানে একটা ইস্কুলে পড়ায়। ইংরেজির শিক্ষক।তার গলায় একটা সমস্যা আছে। থেকে থেকে গলা বসে যায়। গান গাইতে অসুবিধে হয়।গলা ফুলে গিয়ে বুজে আসে। রাত্তিরে কাশি হয়। সঙ্গে পেটে ব্যথা ও হালকা জ্বর।
ও কিছুদিন আগে ভারতে, মানে কলকাতায় ওর আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিল।ওর মাসির বর মানে মেসোমণি কামারহাটি মিউনিসিপ্যালিটির অফিসে চাকরি করে। সার্ভেয়ার। হার্টের রুগি। তাকে দ্যাখে বেলঘরিয়া নিবাসী এক প্রবীণ ডাক্তার।তো মেসো বলল,এত ভুগছ,চলো আমার ডাক্তারকে একবার দেখিয়ে নাও।উপকার পাবে।আর খরচাপাতি কম।
মাসি ওকে নিয়ে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে গেল একদিন। বাড়ির ভিতরে একতলায় চেম্বার।
একটু দেরি করে ডাক্তার নামল। পাজামা ও পাঞ্জাবী পরে। কাঁচাপাকা চুল দাড়ি।যত না দেখল গল্প হল তার চেয়ে বেশি। অল্প ওষুধ দিয়ে বলল:গলার সঙ্গে মনের যত্ন নাও। তারপর রিপোর্ট নিয়ে ও নিজেই দেখাতে গেল আরো একবার। অনেক কথা বলল নিজের থেকে। যেমন ও দেশে কেমন আছে, ওখানকার জলবায়ু,ওর নিজের জীবন, বিয়ে ও বিয়ে ভাঙার কাহিনি। ডাক্তার সব কথা ধৈর্য্য ধরে শুনল কিন্তু মতামত দিলনা।
এই ডাক্তার আবার বই লেখে। ওকে একটা বই দিলো ফ্রিতে।আর বলল,গান করো আর ডায়েরি লেখো।এটাই চিকিৎসা। পারলে এ দেশে চলে এস। ওখানে বেশিদিন ভালো থাকা মুশকিল।
ও বলল খুলনা আমার ভালো লাগে স্যর। ওখানেই থাকব। ওই গাছপালা, নদী,ঝিল, আমার ইস্কুল, ছাত্রছাত্রী আর আমার স্মৃতি নিয়ে থাকতে চাই। ওটা আপনি বুঝবেন না।
কেন? আর কোনো বিশেষ কারণ? আশেপাশে আত্মীয়স্বজন আছে। ঠিক আছে। কিন্তু নিজের বলতে তো কেউ নেই।দূর সম্পর্কের দাদা,বোন, পিসি এদের জন্য থেকে যাবে?তা ছাড়াও অন্য ঝুঁকি আছে।
ঐ বাসা বা ভিটে তো নিজের স্যর। আমি গাছের সঙ্গে কথা বলি। পাখিদের সঙ্গে গলা মেলাই।সময় কেটে যায়। সহকর্মী ও বন্ধু কিছু আছে। কলকাতা বেলঘরিয়া নিমতা ভালো কিন্তু ওই পরিবেশ তো পাবনা।
ডাক্তার বলেছিল, এখন তো স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তুমি নিজেই বললে সে স্বাভাবিক নয়। তোমার সন্তান নেই। তাহলে কোনো বিশেষ বন্ধু আছে? সেই টানে…
ও বলল,না স্যর। বিশেষ বন্ধু নাই। একজনকে ভালো লেগেছিল।সে একটা সুন্দর স্মার্ট ফর্সা মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করছে।আর একজন,তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে ভালো লাগে কিন্তু সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে চাইনা। অনেক হ্যাপা আছে এই দেশে।বোঝেনই তো।
খুলনায় ফিরে ও এই ডাক্তারকে হোয়াটসঅ্যাপ করে।কেন করে ও নিজেই জানে না।
অসুখের কথা বলে। নতুন পড়া বই এর কথা লেখে। শুধু একটা সত্যি কথা ও লুকিয়ে রেখেছে। একবারও বলেনি,যে ও আমিনুলকে পছন্দ করে।
আমিনুল ৫ ফুট ৮, ফুটবল খেলে খুলনার জাতীয় দলে। গান পছন্দ করে। তবে চঞ্চলের গান।বই ভালবাসেনা। আমিনুল বিবাহিত।ওর বউ গৃহবধূ। একটা ছেলেও আছে। একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে ওর সঙ্গে আলাপ হয়, তারপর ফোনে কয়েকবার। চমৎকার পেটানো চেহারা আমিনুলের। কিন্তু দোষ আছে।রবি ঠাকুরের গান ভালোবাসেনা। বলে,একঘেঁয়ে।
আর ভারত নামটাই অসহ্য তার কাছে। ভারতের সব খারাপ।খালি দাদাগিরি ফলায়,আর চিটিং করে ম্যাচ জেতে। একটা ওভাররেটেড ফালতু টিম মস্তানি করে বেড়ায় স্রেফ টাকার জোরে।
শিউলি তর্ক করেনা আবার অর্থহীন এই সম্পর্কে জড়াতেও চায়না।
ইদানীং আমিনুলের নজর একটু পাল্টে গেছে টের পায় শিউলি।তাই একটু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। সবসময় ফোন ধরেনা।
সব মেসেজ এর উত্তর দেয়না।
গতকাল রাতে আমিনুল ফোন করেছিল।
তোমাদের ওদিকে একটা কাজে আসছি। তোমার বাসায় যাব।চা আর নাস্তা করব। বেশিক্ষণ থাকতে পারবনা। কিছু জরুরি কথা আছে তোমার সাথে।
গত কদিন ধরে এ দেশে তোলপাড় হচ্ছে। এখন মিলিটারি শাসন,অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। পরিবেশ অশান্ত।
ও আমিনুলের কথা শুনে গেছে, কোনো উত্তর দেয়নি। এখন ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। কিন্তু বারবার নানা নম্বর থেকে মেসেজ আসছে।
হঠাৎ ডাক্তারবাবুর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ঢুকল। খুব সতর্ক থাকো। প্রয়োজন হলে তোমার আত্মীয়ের বাড়ি চলে যাও।একা থেকো না।
ও ঠিক করেছে সামনের গেট বন্ধ করে পেছনের দরজা দিয়ে বাগান পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় উঠে অটো নিয়ে ওর আত্মীয়ের বাড়ি চলে যাবে। আগামী কয়েকদিনে কী ঘটবে কেউ জানে না।
হয়তো আবার একটা ভুল করতে চলেছি। কিন্তু কিছু করার নেই।গা ম্যাজম্যাজ,নাক টানা, অক্সিমিটারের বাইরে যে জগত সেইখানে এখনও সেই যুবককে দেখতে পাচ্ছি। তাঁর আত্মপ্রকাশ।যার মধ্যে আমিও খানিকটা আছি।
ঘুম থেকে জেগে উঠে লিখতে বসা। সামনে কেউ নেই শুধু সাদা পৃষ্ঠা।
ধরা যাক একটা মেয়ে।তার গল্প।তার নাম দিলাম শিউলি।৫ ফুট ৫,একটু শ্যামলা রঙ। ইংরেজিতে মাস্টার্স করা। মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়। ওপার বাংলার একটা গ্রামে থাকে। কলকাতায় চিকিৎসা করিয়ে ফিরে গেছে নিজের দেশে।
একটা ঘটনাবহুল দেশ। যেখানে ধর্মের নামে একজন পুরুষ প্রেমিক থেকে খলনায়ক হয়ে যেতে পারে। মেয়েটিকে বাঁচানো যায়?
আত্মপ্রকাশের লেখক হলে হয়তো পারতেন।
সে এখন বড়ো রাস্তায়.. পালাবে। তাকে নিরাপদ জায়গায় পালাতেই হবে।
একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব আর গল্পলেখকের দায় পুরো আলাদা।
তাই জানিনা কী হবে?
ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা।
সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা ৩০মি। কিন্তু দুপুর তিনটে বেজে গেছে।



























