‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।
‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –
সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- তার গ্যানগ্যানের কাছে। তার গ্যানগ্যান শুনেছিল তার গ্যানগ্যানের কাছে। ঘটনা সবই সত্যি। ইন্দিষ্টারে পিক্ট্-দের গড়টা দেখেছিস তো। সেখান থেকে পাহাড়ে পথটা ঢাল দিয়ে নিচের দিকে গড়ানে। ঐ পথের ধারেই নিক্কির ঘর। ওর আশ-পাশের ফাঁকা বাদা আর মাঠগুলোতে পুঁটেদত্তিগুলোর একচেটে রাজত্বি। তা তাদের তো কেউই আর চোখে দেখতে পায় না। নিক্কি কিছু না জেনেই ঘর বেঁধেছিল ওখানে। পাহাড়ের গায়ে জমিগুলোতে চাষ-আবাদ করার মতলবে। বছর দুই জমিতে এন্তার ফসল। জমি তো নয় সোনার থাল। নিক্কির ঘরে বস্তা বস্তা ওট। গোলা ভর্তি গম-যব। তাজা ঘাস আর খড় খেয়ে নিক্কির গরুর বড় বড় বালতি ভরা দুধ। সেই দুধে নিক্কির বাড়িতে মাখন চীজের ছড়াছড়ি। ভেড়াগুলো গায়গতরে বেশ ভারী। যেমন মাংস তেমনি লোম। পশমে ঘর ভর্তি। চাষের দানা খেয়ে নিক্কির মুর্গীরা কেঁদো কেঁদো। টাটুগুলোর গতরও ঘাস-দানাতে ধাঁই-পাঁই। তাদের ছাঁই গুষ্টির দলে বাড়-বাড়ন্ত। নিক্কি আর তার গিন্নী আল্লাদে ফাটো ফাটো। তখন দুটোতে কেবল গেলে আর কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় পিপের মতো গড়ায়। কটা দিনেই দুই কত্তা-গিন্নী গিলে গিলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একেবারে কুমড়ো-পটাশ। তা হবে না কেন।
গায় গতরে ধরল ঘুণ
শুধু গেলে আর লাগায় ঘুম।
দুটোতে এখন বেজায় কুঁড়ে আলসে। নিক্কি কোন রকমে উঠে একটু জমি চষে ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে। ঘরে ফিরেই আকণ্ঠ খেয়ে আবার ঢুক করে শোয়া। তারপর ভোঁস ভোঁস তার নাকডাকানি। তার গিন্নীও তাই–
সারালো জমি। যা চষেছে তাতেই অঢেল ফসল। নিক্কি ঘুম ভেঙে ঘরে শুয়ে শুয়ে তাই দেখে। ফসল এক সময়ে পেকেও ওঠে। নিক্কির আর অবসর হয় না সেগুলো কাটার। বৌকে বলে যা না ওগুলো কেটে ঘরে তোল –বৌ বলে–
মুর্গী ভেড়া শুয়োর গরু টাট্টু ঘোড়া
ওদের কন্না করতে করতে
আমার দুটো হাতই জোড়া–
তা ফসল কাটতে যাই কখন–
এদিকে আশপাশের পড়শীদের খামার ভর্তি কাটা ফসলে। সেখানে গাদার পর গাদা। নিক্কির গতরই ওঠে না। ফসল কাটতে ইচ্ছেই করে না। একরাতে বিছানায় ঢোকার আগে বাড়ির বার দরজায় দাঁড়িয়ে তার খুব নীচু গলায় আপন মনে কথা–
যদি ঘুম ভাঙলেই দেখতে পাই
রাতারাতি ফসল কেটে
কেউ করেছে ঘর বোঝাই
তাকে দোব আমার সেরা দুধেল গাই
খুব ভোরে ভেঙেছে নিক্কির ঘুম। জানালা ফাঁক করে সে দেখে বাইরের দিকে। এটা তার রোজকার অব্যেশ। আবহাওয়ার হালচাল দেখার জন্যে। আর শুধু নিক্কি কেন আমাদের এ অঞ্চলের সব চাষীদেরই এটা নিত্তিকার কাজ। তা জানলা খুলতেই নিক্কির চোখ কপালে। সামনে ওটে ভরা ক্ষেতটা বিলকুল সাফ সুরত –
নিক্কি ভাবল বুঝি বা স্বপ্ন। দুটো চোখ তালুতে রগড়ে আবার তার নজর ক্ষেতের দিকে। নাঃ ওট গাছও নেই। ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নিক্কির দৌড় খামারের দিকে। দেখে সেখানে সব কাটা ওটের তড়পা থরে থরে গাদা দিয়ে সাজানো। তাই দেখে নিক্কির নিজের মাথার চুল শক্ত মুঠোয় ধরে ঝাঁকানি। একি অসম্ভব ব্যাপার রে বাবা একরাতে পুরো ক্ষেতের ফসল কাটা সারা-
হঠাৎ তার মনে ভাবনার ঝিলিক। মনে পড়ল তার দেওয়া কথা। যদি কেউ ওট কেটে খামারে গাদা করে দেয় তাহলে তাকে সে তার গোয়ালের সেরা দুধেল গাইটা দেবে। তাহলে কি তার আপন মনে বলা কথাগুলো শুনে ফেলেছে পুঁটে দত্তি ট্রো-গুলো। দৌড়ে নিক্কি ঢুকল গোয়াল-ঘরে। দেখে যা ভেবেছে তাই ঠিক। সবচেয়ে সেরা দুধেল গাইটা গোয়াল থেকে লোপাট। বড় পেয়ারের গাই সেটা নিক্কির। ভাবল হয়তো কোন রকমে বেরিয়ে গেছে গাইটা গোয়াল থেকে। খুঁজতে বেরুল নিক্কি।
এদিকে যায় ওদিকে যায় গরু নি-পাত্তা। গরুটার শোকে নিক্কি আধা-পাগল। সাত সকালে বাড়ির থেকে ছিটকে শুকনো মাঠে। সামনে হাওড় আর বাদা। খেয়াল নেই। হাঁটছে হন হন করে। হঠাৎ দূরের থেকে কার ডাক কানে। ‘হাই – নিক্কি ভাই শোন শোন’। নিক্কি দেখে হাত তুলে দৌড়ে আসছে তার পড়শী জোসুয়া। হাঁপাতে হাঁপাতে জোসুয়ার কথা, ‘কাল রাতে তোমার ক্ষেতে আজব কাণ্ড। আমি রাতে বেরিয়ে ছিলুম আমার হারিয়ে যাওয়া একটা ভেড়ার খোঁজে। দেখি একদল পুঁটে দত্তি ঝপাঝপ তোমার ক্ষেতের ওট কাঠছে। তড়পা বাঁধছে। আর এক সুরে গান গাইছে-
একের পর এক তড়পা বাঁধি
ফুর্তি করে গলা সাধি।
খাটলে খুটলে থাকি ভালো
যতক্ষণ না ফুটছে আলো। নেবো নিক্কির দুধেল গাই।
গতর রাখতে দুধতো চাই।
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ
গানের সঙ্গে সে কি চটপট কাজ পুঁটে দত্তিগুলোর। ঘণ্টা খানেকের ভেতর পুরো ক্ষেতটা সাফ। খামারে তড়পা গুছিয়ে গাদা দিয়ে সব কাজ খতম। যাবার সময় গোয়াল থেকে তোমার সেরা দুধেল গাইটা বের করে টেনে নিয়ে গেল। কাজেই সেটা আর তুমি খুঁজতে যেও না’
‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হল’ গ্যানগ্যানের কথা শেষ হতেই খোঁচাল স্কুয়া। এদিকে গরম গরম প্যান কেক সে এনে ফেলেছে সামনে। আমরা সবাই তুলে নিচ্ছি নিজের নিজের প্লেটে। স্কুয়া গ্যানগ্যানের প্লেটে খান চারেক দিয়ে বললে, কেমন হয়েছে খেয়ে দেখ গ্যানগ্যান। চীজের প্যান কেক। আমাদের পাড়ার বিল পেট্রীর বাড়ী থেকে পাঠিয়েছে চীজ। তোমার জন্মদিনে গুড উইশ করে –
‘দারুন সোয়াদ রে’ এক টুকরো গ্যানগ্যান মুখে তুলে বললে, ‘তুই পাকা রাঁধুনি। তোর বর হোক হিলান ম্যাকলাখান গুষ্টির সেই ছোঁড়াটা। এবার আবার্ডিনে গিয়ে তাকে পাকড়াও করবি। এতদিনে তার ইউনিভার্সিটির পড়া নিশ্চয় শেষ হয়েছে-‘












































