বিমর্ষ জল ও উড়ন্ত লাল কার্পেট/গৌতম গুহ রায়

খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো খবর আছে ? থাকলে বলবে । আমি এখন ২৪, সব সহ্য করতে পাড়ার বয়স হয়েছে ।’ গত ২১ বছর দিদা সুখময়ী দীপাকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন, তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন । এরপর মৃদুস্বরে বললেন, ‘সুধীর মারা গেছে । গত রাতে বিহারের মধুবনি থেকে একজন ফোন করেছিল । জেল থেকে মুক্তির পর ওখানে বোনের বাড়িতেই থাকত ।’ স্পষ্টতই একটা ধাক্কা খেল সে । গোটা জীবন যে মানুষটাকে ঘৃণা করে এসেছে, এই জীবনে যাকে নিয়ে কোনো স্মৃতিই নেই, চার বছর বয়সের খুব ঝাপসা কিছু মহূর্ত ছাড়া যাকে সে কোনোদিন কাছে পায়নি, এই প্রথম সেই মানুষটার হঠাৎ খুব ফাঁকা লাগল, মানুষটার জন্য বুকে একটা চিনচিন ব্যাথা অনুভব করল দীপা ।
দিনের আলো তখন কমে আসছে, সন্ধ্যা নামবে । বর্ষার মেঘভার আকাশ একচিলতে জলাভূমির উপর ঝুঁকে পড়েছে । দীপার কিছুই আর ভালো লাগছে না। বিছানায় শুয়ে থাকলে বুকে একরকম দলাবাঁধা চাপ অনুভব করছে । সেসময় অব্যক্ত একটা হাহাকার মুহূর্তের মধ্যে তাকে গ্রাস করে নিতে চায় । বারান্দায় গিয়ে বসে । মুহুর্তের মধ্যে ফিরে আসে খুব ছোটোবেলার ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যগুলো । চোখ বন্ধ করে ডুব দিতে চায় নিজের স্মৃতির গহিনে । বদ্ধ পুকুরের থৈ থৈ জলে ডুবে যাওয়ার মতো তার চোখ কান নাক জুড়ে জল, দম বন্ধ হয়ে আসে তার । একবার ভরা বর্ষায় পাণ্ডাপাড়ার বিসর্জনের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে প্রায় মারা যাচ্ছিল সে । তখনও সাঁতার জানে না, জলে ডুব দিয়ে অসাবধানে জলের নীচেই কিছুটা গভীরে পা এগিয়ে যায়, জল থেকে মাথা তুলতে গিয়ে দেখে চোখের উপর দিয়ে জল বইছে, পা ভেসে উঠছে, পুকুরের তলদেশ ছুতে পারছে না আর, গোটা শরীরটাকে থৈ থৈ জল দখল করে নিয়েছে । পাড়ারই বিমলদাদা পুকুরে সাঁতার কাটতে এসেছিলেন, তিনি ডুবন্ত দীপাকে দেখতে পেয়ে চুলের মুঠি ধরে জল থেকে টেনে তোলেন । আজ চোখ বন্ধ করার পর শৈশব স্মৃতি থেকে ভেসে আসা তেমনই একটা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। দীপা বড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। খালের পার ধরে, পুরোনো আদরপাড়ার ভেতর দিয়ে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে । একটা প্রায় বুঁজে যাওয়া পুকুরের পাশ দিয়ে ঝোপ-জঙ্গল এড়িয়ে দ্রুত পা চালায় । এই মজে আসা পুকুরটা একসময় গোটা এই অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল । আদরপাড়ার এই দিঘির নাম দুলালী দিঘি। তিস্তার দুলালি, বর্ষা এলে যখন আদরের মেয়ের সঙ্গে মা তিস্তা দেখা করতে আসে আর তখন এই এলাকা জুড়ে বন্যা নামে । আজ তিস্তা অনেক দূরে, তার দুলালী আগ্রাসী মানুষের দখলে আজ একটি মজা ডোবা । আনমনেই বাড়ি থেকে একা একা বেরিয়ে এসেছে, উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে হাঁটছে সে। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে দেখল রাস্তার ধারে, মাঠের পূর্বদিকে কয়েকটি অশ্বত্থ ও শিরিষগাছ এখনো টিকে আছে ।
রেলকোয়ার্টারের সামনে একটা কচুরিপানায় ঢাকা পুকুর । স্টেশনের কাছাকাছি এক নম্বর রেলগেট । রেলগেটের একদিকে রামকৃষ্ণ মিশন অন্যদিকে জলজঙ্গল আর ওই প্রাচীন অশ্বত্থ গাছগুলো। একটি মাঝবয়সি পুরুষ রেলকলোনির পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে জলের দিকে মুখ করে পেচ্ছাব করছিলেন । সেই দেখে একজন বয়স্ক গ্যাংম্যান রেল-কোয়ার্টার থেকে হৈ হৈ করে ছুটে এল । গালাগাল খেতে খেতে মধ্যবয়সী পুরুষটি প্যান্টের জিপার আটকাতে আটকাতে ঘুরে দাঁড়া্লেন । মুখোমুখি দীপা । আরও দ্রুত হেঁটে জায়গাটা পার হতে চাইল সে । লোকটাকে চিনতে পেরেছে, তপন বোস, ফুড কর্পরেশানের বড়োবাবু। দীপাকে দেখে তপনবাবু ঐ অবস্থাতেই ডাক দিলেন – – ‘কোথায় যচ্ছো দীপা ? চলো এগিয়ে দিচ্ছি ।’
লোকটি রাস্তার ধারে দাঁড় করানো তাঁর মোটরসাইকেলের দিকে ইশারা করলেন । তপন বোসের এই গায়ে পড়া স্বভাব তাকে বিরক্ত করে । সে কোনো কথা না বলে আরো দ্রুত হেঁটে এগিয়ে চলে । এমন লোকগুলোর উদ্দেশ্য ও ইশারাকে চেনে সে । রেলেরই নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রাস্তাটা ভেঙে গিয়ে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে । এমনিতেই তার হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল, তার উপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা শুয়োর ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে সামনে চলে এল । ভাঙা রাস্তায় নিজেকে সামলানো কঠিন, টাল সামলাতে পারল না । পড়ে গিয়ে পায়ের নখে লাগল, প্রায় উপড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা । ব্যথায় চোখে জল এসে গেল । তবুও উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল । চোখ ফেটে জল আসছে তার, ব্যথা অথবা স্মৃতির । চারপাশের আলো আরো কমে আসছে তখন ।
প্রচীন অশ্বত্থ গাছে অজস্র বাদুড়, সারাদিন ঝুলে থেকে এখন তারা জাগছে । বাদুড়েরা চামড়ার ডানা ঝাপটে উড়ছে । স্টেশনের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে দীপা, তার মাথার উপর দিয়ে বাদুড়েরা উড়ে যাচ্ছে তখন । মেঘের থেকে অন্ধকার নেমে আসছিল গাছপালার মধ্য দিয়ে, বৃষ্টির ভয়ও । দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল পেছন থেকে কেউ ডাকছে, ঘুরবে কি ঘুরবে না ভাবতে ভাবতে মনে হল এই ডাক তার খুব চেনা । বাবার মতো, অথচ তার তিন বছর বয়সে বাবা জেলে যাওয়ার পর থেকে সেই ডাক সে আর কোনোদিন শোনেনি । ঘুরে দাঁড়াল । না, কেউ নেই । আবার এগোতে থাকল। মেঘে আকাশটা ঘন কালো হয়ে উঠছিল, চারদিকের আলো হারিয়ে যাচ্ছিল ।

আদালতে সেদিন ওর সাক্ষ্য কাঠগড়ায় সবার সামনে নেওয়া হয়নি । বিচারক, মহিলা, তাঁর চেম্বারে দুই পক্ষের উকিলের সামনে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি সেই রাতে কি দেখেছিলে? ভয় না পেয়ে বলো, যা সত্যি সেটাই বলো।’ মায়ের মুখটা তখন ওর চোখের সামনে, বড়ো করে দেওয়া সিঁদুরের লাল কপালজুড়ে ছড়িয়ে গেছে । কান্নায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল । মায়ের মৃত্যুটা দিদা, মামারা কেউ মানতে পারেননি । মা-হারানো দীপার কাছে তো সামনেটা শুধুই মাত্র পিচ্ছিল এক যন্ত্রণার গহ্বর । সেই কাল রাত্তির । সন্ধ্যা থেকেই বাবা-মায়ের দুজনের মধ্যে ঝগড়া, ঝগড়ার কারণ দীপা জানে না । পাশের ঘরে সে পড়ছিল, ঝগড়ার চিৎকার কানে আসছিল আর বইয়ের সামনে দমবন্ধ করে বসে ছিল সে । হঠাৎ মায়ের একটা জোরে চিৎকার এবং তারপর সব চুপ । দরজার ফাঁক দিয়ে চার বছরের মেয়েটি দেখল, বাবা বিছানার উপর বসে, দু’হাতে ধরা একটা বালিশ, বালিশের গায়ে সিঁদুরের দাগ । মায়ের মুখটা হাঁ হয়ে আছে, নীল, চোখটা খোলা, উপরের দিকে তাকিয়ে আছে । বড়ো বড়ো চোখ ও দুই ভ্রুর উপরের কপালটা সিঁদুরে ঝাপটায় লালে লাল, মুখটা নীলচে কালো হয়ে আছে, চোখমুখ স্থির ।
রাতেই পুলিশ এল, বাবা সেরকমই চুপ করে বিছানার উপর বসে, নিজেই ধরা দিলেন । পাশের ঘরে দিদা দীপাকে তাঁর বুকে জাপটে ধরেছিলেন, মামারা মাথা নীচু করে সেখানেই বসে । পুলিশ হাতে দড়ি বেঁধে বাবাকে ভ্যানে তুলছে, দিদার দু-হাতের মাঝখান দিয়ে দীপা দেখছে । বাবা একবারও সেদিকে, তার দিকে তাকালেন না ! বাবাকে দীপার এই শেষ দেখা ।
আজ আর পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছে না, উদভ্রান্তের মতো রেললাইন ধরে হাঁটছে, বারে বারে থমকে যাচ্ছে পা । ভেতরের যন্ত্রণা প্রবল হলে শরীরী যন্ত্রণা উবে যায়, দীপারও নখের ব্যথাটা উবে গিয়েছিল । হাঁটতে হাঁটতে মুখ ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাচ্ছে, ফিরে দেখছে, বাবার মতো কেউ ডাকছে ।
তাদের বাড়িটা হঠাৎ করেই মনে হল জনশূন্য হয়ে গেছে, থমথমে অন্ধকার তার মুখের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে হাসিখুসি তিন কামরার বাড়িটা । মায়ের থাকা না থাকাটা যে কতো ভয়ানক পার্থক্য এনে দেয় সেটা একদিনেই বুঝতে পারল সে । মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জন্য সবসময় এক অদৃশ্য সুরক্ষা বর্ম নির্মাণ করে রাখেন, তিনি না থাকলে সেই বর্মটাই অদৃশ্য হয়ে যায় । বাবা নানা কারণেই অনেক দিনই বাড়িতে থাকেননি, কিন্তু জন্মানোর পর থেকে কোনোদিন মাকে ছাড়া একদিনও থাকেনি সে । মায়ের সেই ছায়াটাই হঠাৎ উবে গেল । তীব্র রোদে মধ্য মরুভূমিতে একা দাঁড়িয়ে সে, পায়ের নীচে, চারদিকে তীব্র ও অসহনীয় গরম তাপ ।
কাকিমা তাদের ঘরে রেখে দিল ওকে । তিন দিনের মাথায় মায়ের শ্রাদ্ধ হয়েছিল। দীপার আজ সবটা মনে নেই, শুধু মনে আছে কাকা উঁচুস্বরে পুরুতকে বলেছিল, ‘আমাদের কাশ্যপ গোত্র’। কিন্তু একরাতে সেই কাকাই, কাশ্যপ গোত্রের ছাতা ভেঙে চণ্ডাল কসাই হয়ে উঠল, দুহাতের শক্ত মুঠোয় খামচে ধরল ওকে । এরপর ভয়ে তার কথা বন্ধ হয়ে যায়, কাকার মতো পুরুষমানুষ দেখলেই দীপা থরথর করে কাঁপত । সবাই বলল, ওকে মায়ের ভূত ধরেছে, মায়ার বন্ধন মরেও ছাড়তে পারে না গো । দিদা এসে শুনলেন, তিনি দীপার আতঙ্কিত মুখের নীল দেখে হয়তো কিছুটা বুঝলেন । এরপর কোলে করে নিয়ে গেলেন তাঁদের বাড়িতে, দীপার মামাবাড়ি । আর কাশ্যপ গোত্রের লাহিড়ি-বাড়িতে ফেরা হয়নি তাঁর । কাশ্যপ মুনি মৃতের শরীরে প্রাণ সঞ্চারের মন্ত্র জানতেন, কিন্তু কাশ্যপ গোত্রের ছায়ার ওই মৃত্যুপুরী থেকে মাত্র চার বছরের শিশুটিকে অন্য ছায়ায় চলে আসতে হল । এর মধ্যেও সময় তার মতোই নির্বিঘ্নে বয়ে যায়, সময়ের থেমে থাকার উপায় নেই, কোনো সংকটই তাকে থামাতে পারে না । এই অপরাজেয় সময় মুছে দেয় অনেক ব্যক্তিগত শোকের কুয়াশা । কান্নার ঝরাপাতার দীর্ঘপথ পার হয়ে একদিন ক্লান্ত দীপা পড়াশোনায় মন দেয় ।

পয়লা আষাঢ় এলে নিজেকে সকাল থেকে খুব নিঃস্ব মনে হয় তার । আজ দীপা পঁচিশে পা দিল, অথচ কি নীরবে চলে যাচ্ছে দিনটা ।  একসময়  বাবার উদ্যোগে ধুমধাম করে একমাত্র মেয়ের জন্মদিনের উদযাপন হতো, তার ঘর সাজানো হতো ।  আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবেরা আসত ।  সবাই মিলে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত হই হই । মা নিজের হাতে পায়েস রাঁধতেন । মা শূন্য পৃথিবীতে আর কোনোদিন সে পায়েস খায়নি দীপা ।  আজ, পঁচিশে পা দিয়ে দিনটাকে অভিশপ্ত মনে হয়, খুব একা লাগে তার । সন্ধ্যায় দিদা তার ঘরে আসে, একটা ছোটো কাঁসার বাটি, বাটিতে ক্ষীর । দিদার চোখের কোনে শুকনো জল দেখতে পায় সে । তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে দীপা ।

ধীরে ধীরে সময় এগোলো, স্মৃতি পুরোনো হলো, শরীর বাড়ল, বয়স বাড়ল । স্কুলে যাওয়ার পথে, প্রাইভেট পড়ার সময়, বাড়িতে মামা-কাকা, চারদিকের চোখে সাপ হিসহিস করে উঠতে দেখতো । কুকুরের মতো লোল-জিহ্বা পুরুষগুলোর চোখ থেকে বেরিয়ে আসতো কুৎসিত ইশারা । অস্বস্তি হত, মনে হত ক্ষুধিত, অতৃপ্ত পুরুষদের লালায় তার শরীর মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে।  মনে হত স্নানের সময়, কাপড় পাল্টানোর সময় কেউ আড়াল থেকে নজর করছে তাকে । দিদা  সান্ত্বনা দিতেন –  একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, এই সব নজর থেকে বেঁচে থাকতে হবে । সেই বেঁচে থাকার জন্য নির্জন বারান্দায় পুতুলের মতো খেলনা হয়েও চুপ থাকতো ।  বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ইচ্ছে করতো না, মনে হতো সবাই তাঁর একাকিত্বের বৃত্ত ছেদ করার জন্য ফুটো খুঁজছে, সুযোগ পেলেই  আঁচড়ে, কামড়ে দেবে । চারদিকে চেপে আসা দেয়াল, চারদিক রুদ্ধ, আলো নেই বাতাস নেই, দমবন্ধ হয়ে আসছিলো । সেই অসহনীয় নিস্তব্ধতার মধ্যে সে মৃত্যুকে কামনা করতে থাকলো ।  একদিন পড়ার ঘরে নিজের হাতেই হাতের শিরায় ব্লেড চালিয়ে দিলো । মামা হাসপাতলে সময়মতো নিয়ে যাওয়ায় সেবার প্রাণ বাঁচে ।

দিনসাতেক পরে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে এলো দীপা । চারদিক চুপচাপ, কারও মুখে কথা নেই । দিদা এরপর থেকে কাছে কাছে থাকতেন সবসময় । নানা গল্প শোনাতেন, পুরাণ থেকে, রামায়ণ মহাভারত থেকে । জন্মেজয়ের কথা, পরীক্ষিতের কথা, নল দময়ন্তির কথা । কাশ্যপ মুনির কথা থেকে চলে আসেতেন পরীক্ষিতের গল্পে । পাণ্ডবদের উত্তরাধিকার অভিমন্যু-উত্তরার পুত্র মহারাজ পরীক্ষিৎ একদিন মৃগয়া করতে গিয়ে একটি হরিণকে বাণবিদ্ধ করেন । মহারাজ সেই হরিণকে অনুসরণ করতে করতে গভীর বনের ভেতর মৌনব্রতধারী শমীক মুনির আশ্রমে হাজির হন । ধ্যানমগ্ন তাঁকে হরিণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেও ঋষি নিরুত্তর থাকেন । তাঁর কাছে কোনো উত্তর না পেয়ে ক্রুদ্ধ রাজা মুনি শমীকের গলায় একটা মৃত সাপ পেঁচিয়ে দিয়ে চলে আসেন । তপোরত মুনির পুত্র শৃঙ্গী পরীক্ষিতের হাতে বাবার লাঞ্ছনা দেখেন ।  ক্রুদ্ধ শৃঙ্গী রাজাকে অভিশাপ দেন, এই পাপী রাজা মৃগয়ার দিন থেকে সাত রাতের মধ্যে মহাবিষধর তক্ষক  নাগের দংশনে মারা যাবেন ।  ছয় দিনের দিন কাশ্যপ মুনি পরীক্ষিতের বিষ নামানোর জন্য রাজপুরীর দিকে যাত্রা করেন । পথে ব্রাহ্মণ বেশধারী তক্ষকের সঙ্গে তার দেখা হয় । কাশ্যপের অভিপ্রায় জানতে পেরে তক্ষক তাঁর কাছে  মৃতকে তাঁর প্রাণদানের ক্ষমতার প্রমাণ চান । এক মৃত বটগাছকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন । তক্ষক-দংশনে মৃত বটগাছকে কাশ্যপ মন্ত্রবলে আবার বাঁচিয়ে দেন। এই অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তক্ষক তাঁকে রাজার থেকেও বেশি অর্থ প্রদানের শর্তে  রাজার বাড়িতে না গিয়ে  বাসায় ফিরে যেতে বলেন । মুনিঋষি দৈব বলে জানতে পারেন যে পরীক্ষিতের জীবনকাল শেষ । তাই সে তক্ষকের কাছ থেকে অধিক অর্থ নিয়ে বাসায় ফিরে যায় । কাশ্যপ গোত্রের সন্তান এই গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে,  বন্ধ চোখের ওপাড়ে সে  দেখতে পায় মুনি অর্থ নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন আর অন্যদিকে বিষের জ্বালায় ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছেন পরীক্ষিৎ, অর্জুন পুত্র অভিমন্যুর সন্তানের সারা দেহ বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে । মায়ের, বাবার,  জন্মদাতাদের শবদেহের এপার থেকে ওপারে তাকিয়ে  দীপা দেখছে তাদের গোত্রাধিপতি কাশ্যপ ঘাতক তক্ষকের দেওয়া অর্থের বিনিময়ে মৃত্যুকে জয়ী করে চলে যাচ্ছেন ।

মামাবাড়ি থেকেই দীপা মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় । কো-এডুকেশান স্কুল । দীপা লক্ষ্য করতো তার প্রতি শিক্ষক থেকে সহপাঠি প্রত্যেকের একটা ভিন্ন রকমের নজর । তার দিকে ধেয়ে আসা লোলুপ লালসামাখা দৃষ্টির কারণ বুঝতে পারত, এই নজর তার শরীরের দিকে । দীপার ভারী বুকের  দিকে তাদের নজরে খুব অস্বস্তি হতো, নিজের ভেতর কুঁকড়ে যেতো সে  ।

মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল যেদিন বেরুলো সেদিন সকাল থেকে দিদা তাঁর গোপালের ঘরে, নাতনির জন্য প্রার্থনা করছেন । পরীক্ষার রেজাল্ট হাতে পেয়ে অনেকদিন পরে দীপার ও দিদার খুব আনন্দ হয়েছিল ।  স্কুলের প্রথম তিনজনের মধ্যে রয়েছে সে । সবাই খুশি, দিদা সবাইকে প্রসাদ দিলেন । এতো আনন্দের মধ্যে কেউ তার ভেতরের কান্নাটা বুঝতে পারছিলো না । এত বছর দিদাই তার মা হয়ে সবটা আগলে রাখছিলেন ।  আইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল ছোটবেলা থেকেই । আইন কলেজে পড়তে এসে দীপার দুজন বন্ধু হলো । সোনম ও কুহেলী । কলেজে পড়তে পড়তে ক্রমশ তার বিপদগুলো নিজেই সামলে নিতে শিখছিল,  পারছিল । জেনে নিয়েছিলো নিকটজনদের স্পর্শের চরিত্র,  আদর ও লোভের পার্থক্য । জেনেছিল প্রশ্রয়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হুলের ছোবল । দীপার কাছে ছোটমামা ছিলো এক সাক্ষাৎ বিপদ, মহা বিপদ । দিদা বুঝতে পারছিলেন, চিন্তায় তাঁর ঘুম ছুটে গেলেও প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না । কিন্তু দীপা ক্রমশ নিজেকে সামলে নিতে শিখছিলো ।  এই সময় তার অধিকাংশ সময় কাটত ছোটবেলার বন্ধু গোপার সঙ্গে । বাবা-হারানো গোপা নার্সিং-এর ছাত্রী ।

বাড়ির ভেতর যে চাপ নিয়ে থাকে সেখান থেকে মুক্তি আসে বাইরে বেরুলে । তখন ব্যাক্তিগত বিষাদবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসা সে এক অন্য দীপা ।  তিন বন্ধু মিলে তখন আনন্দের পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় । ফুচকা খেয়ে তেতুলের টক লাগা হাত বান্ধবীদের ওড়নায় অবলীলায় মুছে নিয়ে অন্যজনের হাতের শালপাতার বাটি থেকে ফুচকা থাবা মেরে মুখে পুরে আনায়াসে গিলে নেওয়ার আনন্দে উদ্দাম হয়ে ওঠে । খোলস ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসা এই দীপাকে বন্ধুরা বুঝতে পারে, সবাই অনন্দের চাদরে জড়িয়ে রাখে ওকে। হ্যাঁ, অনেক অন্ধকার জড়িয়ে খুশির দিকে এগিয়ে  যাওয়া দীপা অন্যরকম, সবাই বোঝে শুধু ওই ছেলেটি ছাড়া ।  চুপ করে দূরে দূরে থাকা কচি গোঁফের লাজুক ভাবের ছেলেটা । হাসতে হাসতে একদিন ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে ফেলে দীপা । ছেলেটি সেই হাত সরিয়ে দেয় না, নিজেও সরে যায় না । চলতে চলতে মুখোমুখি হলেই হেসে ওঠে তারা, চোখ বড়ো বড়ো করে ছেলেটি ওর দিকে তাকিয়ে থাকাটা অনুভব করে দীপা।  কয়েকদিনের মধ্যেই মধ্যরাতে একটা মেসেজ আসে – ‘তুমি আমার চণ্ডালিনী, তুমি আমার দেবযানী আমি তোমার কচ’ । দীপা হাসে । কয়েকদিন পরে আবার মধ্যরাতে – ‘ডিয়ার চণ্ডালিনী, তোমার মন ভালো নেই ?’ দীপা প্রথম উত্তর দেয় – ‘মন কি বস্তু ? মৃতের মন থাকে না, বিত্তের ও লোভের মন থাকে’ ।  এরপর চমকে যায় দীপা – ‘না, তোমার মন নাই, দেখো না তাই মনের মানুষ অপেক্ষায় থাকে । তোমার মন নাই, বব আছে । মুখে তুলে দাও ওই ভারী সুধা ভাণ্ড’ । দীপা এটা ভাবতে পারে না । রাগে, ঘৃণায় উত্তর লেখে – ‘আছে, দেখবে ?’ লিখেই নম্বরটা ব্লক করে দেয়। বাইরে মধ্যরাতের কুকুরেরা প্রবল চিৎকার করছে তখন । কুত্তার চিৎকারে ঘুমোতে পারে না সেই রাতে । বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় । দীপা অন্ধকার খোঁজে । শুক্লপক্ষের চাঁদ যখন চারদিকে মায়া ছড়িয়ে রাখে দীপার তখন খুব ভয় হয় । চাঁদের আলোর ভয় জড়িয়ে  চাঁদের মায়ায় দীপা হারিয়ে যায় । তার নাকে আসে শ্মশান চিতার পোড়া মাংসের গন্ধ, সামনে প্রখর জ্যোৎস্নায় জলন্ত চিতাকাঠ থেকে মানুষের উচ্চতাকে ছাপিয়ে আগুনের ফুলকি উড়ছে । জলন্ত চিতা কাঠের ভেতর উপুর হয়ে শুয়ে অর্ধদগ্ধ একটা নারী শরীর ।  তার পুড়তে থাকা শরীরের থেকে বেড়িয়ে আসা ভারী স্তন, টপটপ করে দেহরস আগুনের উপর পড়ছে, তেজদৃপ্ত হচ্ছে বহ্নিশিখা । আগুনের আলোয় চারদিকের অন্ধকার বৃত্তটা আরও ঘন হয়ে ওঠে । হঠাৎ তার মাটির ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে করে । শ্মশানের কাছেই একটা পুরোনো নিমগাছ । সেখানে বসে চিতার দিকে তাকিয়ে ছিল, এবার গাছের গুড়ির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পরে সে । অন্ধকারে মনে হয় অনেকগুলো বেঁজি তার চারদিকে এসে দাঁড়িয়েছে, ঘিরে ফেলছে । বেঁজিদের ঠোঁটে সাপের রক্ত । অন্ধকার আরো নিবিঢ় হয়ে তাকে গহ্বরের ভেতর গিলে নেয় ।

মানুষের স্মৃতিও একদিন  ধীরে ধীরে ফিকে হয়, নতুন রং ও রেখায় সাজানো হয় তার জীবনের চালচিত্র । আইন নিয়ে পড়ার ফাঁকে দীপা সোস্যাল ওয়েলফেয়ার নিয়ে একটা ডিপ্লোমা করে নিয়েছে । দু’বছর  হলো জলপাইগুড়ি আদালতে যোগ দিয়েছে সে । ক্রিমিনাল কোর্টে প্র্যাকটিস করছে, এবং এর পাশাপাশি স্থানীয় একটি অনাথ আশ্রমের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে । সন্ধ্যার পর সেখানে, অনাথ মেয়েদের সঙ্গেই সময় কাটে তার । ওকালতি আর অনাথ আশ্রম, নিজেক ব্যাস্ত রাখে দীপা । সিনিয়র অনুপম রায় সন্তানের মতো ভালোবাসেন ওকে । এই অনুপম রায়ই মা’য়ের কেস লড়েছিল ।

আষাঢ়ের প্রথম রবিবার,  বৃষ্টিমুখর দিন । রবিবার সকালে সিনিয়রের চেম্বারে আসতে হয় কেসগুলো সাজিয়ে নিতে । কাজের বাইরে সাহিত্য সংস্কৃতির কথাবার্তাও হয় তাদের মধ্যে । এদিনও, কাজের চাপ কম তাই অনুপম রায় তাঁর চেম্বারে বসে দীপাকে মেঘদূত থেকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন । সেই সময় এক বৃদ্ধা এলেন, সঙ্গে বছর কুড়ির একটি মেয়ে । ভালো করে তাকিয়ে দেখা যায় যে তার মুখে ও ঠোঁটে রক্ত জমে থাকার পুরোনো দাগ । বৃদ্ধার আর্জি – মেয়ের স্বামী কিছুদিন হলো ওকে ছেড়ে চলে গেছে, তার আগে নিয়মিত ওর গায়ে হাত তুলত । এখন মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডিভোর্সের মামলা করেছে । ডিভোর্স হলে একা মেয়ে এরপর কি করবে?  মেয়েটার সংসার বাঁচান । অভিজ্ঞ উকিল অনুপম রায় বুঝলেন স্পষ্টতই আদালতের বাইরেই ব্যাপারটা মেটাতে চাইছেন এঁরা ।

–       বরের ফোন নম্বর আছে ? এখন কোথায় থাকে জানেন?

–       হ্যা, বার্নিশ ঘাটের কাছে ওদের চাষ জমি আছে, সেখানে ।

মেয়েটির নাম ঝুমা, বরের নাম সুজয় ঘোষ । অনুপম রায় তখনই নম্বর নিয়ে সুজয়কে ফোন করলেন । বিষয়টি বললেন । অন্যদিক থেকে  তার অভিযোগের অন্ত নেই । তবুও উকিলের বুদ্ধি ও কথার কাছে পরাস্ত হয়ে সে অনুপম বাবুর সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলতে রাজি হলো । তবে বার্নিশে নয়, তিস্তার পশ্চিমে, সারদাপল্লি চরে ওর লিজের জমি আছে, পরদিন বিকেলে সেখানে থাকবে সে ।

অনুপম বাবু এবং দীপা গাড়ি নিয়ে জুবলি পার্ককে ডানে রেখে তিস্তার বাঁধ ধরে  হেঁটে সারদাপল্লীতে পৌঁছোল ।  সুজয়কে ফোন করে জানাল যে সে চার নম্বর স্পারের মাথায় অপেক্ষা করছে, সেখানে নদীর চরে তাঁর বাথানে সে আছে । আরও কিছুটা হেঁটে স্পারের মাথায় গিয়ে নদীর শুকনো চরে নামতে হলো ।

বিস্তৃত বালুচর জুড়ে সবুজ,  মাঝে বিচ্ছিন্ন ভাবে কয়েকটা ছনের কুঁড়ে ঘর । কয়েকটি গরু বাঁধা সেখানে । ওদের দেখে সুজয় এগিয়ে এলো, বললো, ‘একটু বসুন । আমি গরু দুইয়ে আসছি ।’ একটা বাঁশ দিয়ে বানানো বেঞ্চ, সেখানে তাঁরা বসলেন । পাশেই একটা বাদামি দুধেল গরু বাঁধা ।  বা হাতে একটা  অ্যালোমিনিয়ামের বালতি নিয়ে এলো সুজয়, ডানহাতে  তেলের ছোট বাটি একটা । দুধের বাটে প্রথমে তেল মেখে নিয়ে তারপর টেনে টেনে দুধ দুইছিলো । সাদা দুধের রেখা সরু হয়ে বালতিতে পড়ছিলো আর সেই ফেনিল দুধের ভেতর থেকে চোঁ চোঁ করে একটা অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিলো ।  কিছুটা দূরে  একই রঙের একটা বাছুর বাঁধা, তার মাথায় সাদা একটা বৃত্ত । বড়ো বড়ো চোখ কিছুটা কুঁচকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে ।  গরুটিও বাছুরটিকে দেখছে, একই দৃষ্টিতে । দীপার খুব চেনা মনে হয় এই তাকানোটা । মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে । মায়ের কথা মনে পড়ায় খুব কান্না পায় তার । অনুপমবাবু বুঝতে পারে, তাই দীপাকে বলেন, ‘চারপাশটা একটু ঘুরে ফিরে দেখো । পূর্বের দিকে দেখো নদীজলেরও দেখা যাবে, গত বছরও তিস্তা এখান দিয়েই বইতো । এখন তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিস্তৃত চর সবুজ, সেখানে ফসল ফলেছে ।’ দীপা হাটতে হাটতে নদীর বিগত জলচিহ্ন রেখার কাছে চলে যায় । এখানে বালুর রং রূপালি । সেই রূপালি বালুতে পা দিয়ে সে চাপ দেয়, বালু ভিজে ওঠে ।

অনুপম রায় মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো সুজয়ের অভিযোগ,  ঝুমার সংসারে মন নেই,  ওর সঙ্গে থাকতে চায় না, এর মধ্যে ওর এক চাচাতো ভাইয়ের কথাও উঠে এলো । তাঁকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটা সমাধান সূত্রে আসা গেলো । জলপাইগুড়ি শহরে নয়, দুজনে বার্ণিশের বাসায় গিয়ে থাকবে । একটু দূর থেকে দীপা শুনছিলো, সুজয় বলছে, সে স্বীকার করে নিলো, ‘আমি গায়ে হাত তুলে অন্যায় করেছি, কিন্তু সংসারটা তো করবো বলেই একদিন বিয়ে করেছিলাম । একটা সন্তান এলেই সব ঠিক হয়ে যেতো । ও তো সেটাই চায় না । ওকে আগে বোঝান ।’ দীপার কানে এসে কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিলো, শব্দগুলো ক্রমশ দ্রুত দূরে সরে সরে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছে দূর থেকে  তাকে কেউ অস্পষ্ট উচ্চারণে কিছু বলছে । মনে হলো কেউ বলছে, ‘মেয়েদের ইচ্ছা পতির ইচ্ছার স্রোতে না বইলেই চরা পড়ে যায় নদীতে । সন্তান সেই চরের ফসল হয়ে ভূমির সঙ্গে নদীকে টেনে রাখে । পুরোন দিনের লোকেরা তাই বলতেন – ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে’ ।

একা একা বালুর উপর হাঁটতে হাঁটতে দীপা নদীচরের বুকের চাষ জমির দিকে যায় । পলিমাটি এখানে উজার করে দিয়েছে সবুজ শস্যে। অনেকটা জায়গা জুড়ে সবুজ, লঙ্কা চাষ হয়েছে একদিকে, যেখানে শুধুই বালু সেখানে তরমুজের লতা ছেয়ে আছে । এর মাঝে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কার্জকারণ ছাড়াই তার রাম চণ্ডালের কথা মনে পড়ে । শ্মশান চণ্ডাল রাম একটা মৃতদেহ গোপনে পুড়িয়েছিল । সেই নিয়ে পরে থানা-পুলিশ হয়, ব্যাপারটা আইন আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এই কেসের কারণে রাম আদালতে এলে  মাঝে মাঝে এসে দীপার সঙ্গে গল্প করতো । উদ্ভট সেই সব গল্প, যেগুল সে সত্যি ভাবতো । যে মৃতদেহটি সে গোপনে পুড়িয়েছিল সেটি ছিল  বিশু মস্তানের বৌয়ের, পোয়াতি ছিল মেয়েটি। পুড়িয়ে ফেলার আগে কয়েকদিন মৃতদেহটি কলাপাতা আর চাটাইয়ে পেঁচানো ছিল । সেই পচা লাশ পোড়ানোর আগে দুই  বোতল দেশি মদ সেভেন্টি গিলতে হয়েছিল তাকে । কেরোসিন তেলে চুবিয়ে সেই পচা লাশে আগুন দেওয়ার পর এক আশ্চার্য দৃশ্য দেখেছিলো রাম । লাল গালিচায় চড়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে বিশু মস্তানের পোয়াতি বৌ । মেঘের সঙ্গে ঘসা খেয়ে মাঝে মাঝে দেহটা কাঁপছে, বিদ্যুতের মত ঝলকে উঠছিলো রূপালী আলোর রেখা । রামের ভয় হচ্ছিলো – যদি আকাশ থেকে পড়ে যায় মরাটা ! রামের মুখে তার গল্প শেষ হওয়ার  আগেই দীপার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উকিলেরা হো হো করে হেসে ওঠে । দীপার কিন্তু হাসি পায় না । অলৌকিক বিশ্বাসভরা পুঁথি-পাঠহীন রামের চোখের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে চায় আকাশে ভেসে যাওয়া উড়ন্ত লালা কার্পেট । মৃত স্ত্রীরা হয়তো এভাবেই আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হয়ে মেঘের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে বিদ্যুতের আলো মেখে উড়ে যায় বেহস্তের দিকে । রামের বিশ্বাসকে আশেপাশের মানুষগুলো বিশ্বাস করে না । দীপার কাছে এই অশিক্ষিত চণ্ডালের মনে গেঁথে থাকা স্মৃতি তাই বলে মিথ্যা হয়ে যায় না ।  প্রত্যেকে তাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহ আকাশে ভাসিয়ে দিতে চায়, স্বর্গের দিকে,  অন্যদের মতো তারা এটা বিশ্বাস করে ।

তিস্তার পার থেকে তারা ফিরে আসে । হাসপাতালের সামনে এসে দীপা গাড়ি থেকে নেমে গেল । গোপার সঙ্গে দেখা করবে, ওর সেই স্কুলের বন্ধু, এখন হাসপাতালে নার্সের কাজ করে । গোপারও বাবা নেই, ওর যখন বারো বছর তখন ওর বাবা বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হন । গোপা তখন ক্লাস এইটে পড়ে । স্কুল থেকে কলেজ, বি এস সি পাশ করে । এরপর নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা করে এখন সরকারি হাসপাতালের নার্স । গোপা একদিন দীপাকে বলছিলো, ‘আমি প্রায় প্রতিদিন কতো বিষ খাওয়া, পয়জন কেসের রুগীর পরিচর্যা করি । এদের বাঁচিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি । এই পেশেন্টদের যখন দেখি সেই সময় প্রতিবার বাবার কথা মনে হয় । হাসপাতালের সেই বেডটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, যেখানে বাবাকে এনে শোয়ানো হয়েছিল । আমি থাকলে হয়তো বাবাকে মরতে দিতাম না ।’  গোপার দুই চোখ কান্নায় ছলছল করে ওঠে, তাঁর দু’হাত জড়িয়ে কেঁদে ফেলে দীপা । ওর মনে পড়ছিলো জন্মেজয় পুত্র রাজা পরীক্ষিৎ এবং ঋষি কাশ্যপের কথা । তক্ষকের মহাবিষে মৃত্যুপথযাত্রী রাজাকে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে আনার শক্তির, জ্ঞানের প্রয়োগ না করে ঘাতক তক্ষকের অনুরোধে মধ্যপথ থেকে  ফিরে যাচ্ছেন ঋষি । দীপার কাছে তখন ন্যায় অন্যায়ের সামাজিক বুনন তছনছ হয়ে যায় । নিজের শরীরে তক্ষকের বিষের জ্বলা অনুভব করে, জীবন-মৃত্যুর শাসন অগ্রাহ্য করে একবার গোত্রের শাসনের টুটি চিপে ধরে জবাব চাইতে ইচ্ছে করে ।  দীপা অনুভব করে চারদিকে  ধু ধু বালুচর, নদীর গরম বালুতে মুখ গুজে পরে আছে সে । নদী বাঁধের শাসনের ফলে একসময়ের বহতা ওই নদী শুকিয়ে  জেগে ওঠা এই বালুচর ।

আজ গোপার কাছে দু-দন্ড থাকতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে তাঁর, পিতৃহীন দুই সন্তান । বাবাকে নিয়ে দীপার চিন্তায়, স্বপ্নে, গল্পে কোনো শব্দ নেই ।  পিতৃহীন দুই সন্তান – একজনের বুক টনটন করছে বাবার  জন্য । অন্যজন, জলহীন তিস্তা চরের ভেতর খুঁজে পেতে চাইছে এক চোরা স্রোত, হারানো জল ।  নদীও হয়তো  দুই ধারে জল ও সবুজ শষ্য নিয়ে কোন স্রোতের অপেক্ষায় থাকে  । বৃষ্টির অপেক্ষায়…

আরও পড়ুন:

সাইলেন্স দিস আপকামিং কল/যশোধরা রায়চৌধুরী

মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি। বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম। এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন? বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের …

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই …

পড়ুন

পিরিত/অভিমন্যু মাহাত

খুব টানটান ছিল বেদনা যত দিন যায় ভুল বাড়ে, প্রবঞ্চনাও বাড়ে স্মৃতিভ্রষ্ট সুতোয় পিরিতের বহি সমস্ত ঋতু জুড়ে বিলাপ শালপাতার আড়ালে আশ্চর্য ঝুমুর এভাবেই একদিন হঠাৎ দর্শন যার তত্ত্ব ও তালাশ ছিল পুরনো সহসা উঁকি মারে নিরুদ্দিষ্ট প্রণয় কিন্তু নাশকতা সামান্য দূরে, আম্রমুকুলের গন্ধে টের পাই অভিমান কেন ভাঙে আজও বুঝিনি… কাল যাব অশোকনগর

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার প্রাচুর্য আহার, তুলতে গিয়ে দেখি, প্রায় শেষবেলা অঘ্রাণ আভায় একেকটি কালের কাঠামো ভেঙে যায়

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা আমাকে দেখিয়েছিল। ছোটো বাচ্চা তখন ও। কাজ থেকে ফিরে ভূতকে ওর মা আবিষ্কার করেছিল ওদের ধান সিদ্ধ করা উনুনের ভেতর কালি ঝুলি ছাইমাখা অবস্থায়। ওর মা হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখ দিদি, এ যদি ভূত না হয় তো ভূত কাকে বলবি? …

পড়ুন

কানুর বিয়ে/সুবর্ণা মণ্ডল

কানুর সেদিন খুব কান চুলকাচ্ছিল। আগের দিনের যে পায়রাটা হাত থেকে ফসকে গিয়ে শুধু একটা পালক রেখে গেল, কানু সেই পালক কানে ঢুকিয়ে আরামে চোখ যেই না বুজেছে অমনি বাপের চিল চিৎকার, “হ্যাঁ নবাব আমার, কানে পালক গুঁজেই থাকো। যা বয়স বাড়ছে এরপর আর মেয়ে জুটবে না কপালে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যা। নবাবপুত্তুরের যা …

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে অবশ করে তোলে। লোকজন কী রকম চোখ টেপে, টিপ্পনী কাটে, সন্ধ্যায় একা বেরোলে খারাপ মেয়ে ভেবে ইশারায় কেউ প্রস্তাবও দেয়। আমার পরিচিত কয়েকজনকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি, তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না, তা নয়, তবে …

পড়ুন

প্রশ্নপদ/অশোক দেব

সব মরুবৃক্ষ কেন শ্রাবণ জাতক? তাদের দেহের জল সেকথা জানে না?   একলা শ্রাবণে বসে এইসব ভাবি বালিমাখা চাঁদ কাল কার ঘরে ছিল?   তাহলে তৃষ্ণার ফুল বিরহ-গন্ধক? আগুনে আগুনে কথা, বিদায় সংগীত?   কে তুমি গাইছ ওগো এমন মাথুর, এমন শ্রাবণে এলে রাধিকাসম্পদ?  

পড়ুন

গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে রাস্তার বাঁকটা পার হলেই হয়তো পেয়ে যাব ছই দেওয়া গরুর গাড়িটাকে। গরু দুটোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা। বাজছে টুং-টুং, টিং-টিং।   চট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ওমা, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। জমাট হিমের দেশে নরম পালকের লেপ আর ভেড়ার লোমের মাখনের মতো …

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই। রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের …

পড়ুন

মুষলপর্ব/বেবী সাউ

শূন্যতার রং নিয়ে বড়ো বেশি ভেবে চলো তুমি অথচ জলের কাছে প্রতিদিন শিখে নিই নীল ঘষা রং আমাদের অভিমানগুলো ভেঙে গেছে আজ তার কোনো গতিপথ নেই; সূত্র ভুলে গেলে, বলো, কীভাবে মেলাবে— জীবনের মায়া, ছায়াধ্বনি! সহজ ভেবেছি যতটুকু, কঠিনের আবরণে ঢেকে গেছে রোজ সেই লক্ষ্যভেদ, মাছের নরম চোখ কিংবা জাতিভেদ প্রথা বারবার ফিরে আসে— বারবার …

পড়ুন

বৃষ্টির দিন/কালীকৃষ্ণ গুহ

বৃষ্টির দিন ফুরোয় না কারো জীবন থেকে। বৃষ্টির দিনগুলি সব বিরহযাপনের দিন।   বিরহযাপন শেষ হয় না জীবনে।   কারো বিরহ কান্নার জন্ম দেয় কারো কাছে তা শুধু স্মৃতি হয়ে আসে।   এখন বৃষ্টির দিনে শুধু বাইরে তাকিয়ে চারদিকের গাছপালা ভিজতে দেখি। তাদের অনুচ্চারিত আনন্দ দেখতে পাই।   সেদিন একটা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা পাগলকে …

পড়ুন

অচেনা দুপুর/সৈয়দ কওসর জামাল

প্রতিবাদ ভুলে থাকি আজ পড়ে থাকি এককোণে, দুরে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে স্থিতভূমি, বেতাল অ-সুরে   কোন সুরে বাজবে সেতার আষাঢ়ে বাজবে কোন মন? জানালার পাশে আজ নয় বিপর্যস্ত কোরো না জীবন   বরং কবিতা লেখো, ভেজো জবুথবু শালিকের মতো, বৃষ্টি এসে সলজ্জ বলুক এসো প্রেম, এসো ইতঃস্তত   একটি কবিতা লিখেছিলে তুমুল বৃষ্টির কোনও …

পড়ুন

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা। এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা …

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার !  সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে …

পড়ুন

গদ্য বনাম কবিতা/অংশুমান কর

“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।” বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা …

পড়ুন

আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;   কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়।  বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে …

পড়ুন

বজ্রসেনি/সার্থক রায় চৌধুরী

নুয়ে পড়া ডাল আর চুঁয়ে পড়া জল, জলের গভীর থেকে মেঘ বহুতল, আকাশ পাগল যেন আত্মহারা এক বৃষ্টি এলো- জানে ভিজল যারা..   জানে? পাগল তবে কার নেশার ঘোরে আঁকে বজ্র, হাওয়ায় ভেজা পালক ওড়ে…

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। জলপ্রপাত অবিরাম দুগাল বেয়ে! কাকে বেছে নেব? শালবনে জ্যোৎস্নাপথ? নাকি রাতের নদীজল? কে হবে সঠিক নির্বাচন? কার করপুট-স্পর্শে শঠতা নেই, কারা কারা আমার বৃত্তে নিরাপদ হবে, সেই সব নির্ভুল নির্বাচন সহজ নাকি? নির্বাচন শব্দটি যে কত অমোঘ …

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের আশ্রয় নয়। বিষয়টা নিয়ে আসলে অনেক দিক থেকেই তর্ক হতে পারে। প্রতিযোগীরাও নানা দিক থেকে আলোচনা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের ফলাফল খুব স্পষ্ট হল না। সকলেই মানলেন রবীন্দ্রনাথের গান আশ্রয় হওয়া উচিত। মোশনের সমর্থনে যাঁরা বললেন, তারাও সেটা …

পড়ুন

এ এক ‘অচেনা’ দেশ/পার্থ মুখোপাধ্যায়

আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই।  প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু …

পড়ুন

খেলার দৃশ্যান্তর/অনির্বাণ বসু

একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে …

পড়ুন

পিতা নোহসি/প্রতিভা সরকার

‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’ গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ …

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন কঠোর তবু অন্ধ ভিখিরির হাত ধ’রে আরেকটি গল্প লেখে, ভাবে— লেখা কিছু জমে থাক আগামীর দিকে   আশা ভাঙে। জাগে শুধু ডুবে যাওয়া পুরোনো বন্দর   শান্ত মানুষের মতো; নির্মোহ ততটা   ভেসে যায়   ততটুকু স্পর্ধা হলে, নাবিক তোমায়   …

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো বাংলাভাষার দেহত্বকে এই যে উজ্জ্বলবাক্য ঠিকরে পড়ছে বিকেলের প্রায়… চলাচল নিভে আসছে। কিছুপরে সন্ধে নেমে এলে একটি দুটি তারা জ্বলবে তোমার স্পর্শের মতো,নিভে জ্বলে ওঠা আকাশের মাথায় মাথায়…

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই …

পড়ুন

বৃষ্টি তুমি রোদের মধ্যে /বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টি আমি জানি তুমি চরিত্রহীন, কুলটা নও কখনও হবে না মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতন ধূর্ত জাফরি-কাটা যে বারান্দা থেকে তোমায় ছুঁয়েছিলাম, প্রবল খরার মরশুমে সেই জাফরি আমার মাথায় ঘুরত…   শুধুমাত্র ‘বেঁচে’ জীবন কাটানো খুব কঠিন বলে বিকেলবেলার তেজি আগুন রাত্রি নামলে ছাই হয়ে যায় বম্বে থেকে বেঙ্গালুরু পাক্ খেয়ে পাক্ খেতে খেতে তোমায় পাবো …

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি   ভেবেছিলাম কোনোদিনই ফিরবে না আর দেখা হয়ে যাবার পর বৃষ্টিপাতের মতন অহেতুক বিপর্যয় এল   যাত্রীহীন ট্রেন এক পাহাড়ি স্টেশনে কিছু অস্পষ্ট ছায়া, টুপি পড়া, উঠে গেলো নির্দিষ্ট কামরায়   নিজেকে যোদ্ধা ভেবে ঢুকে যাই সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাকে যেখানে আমিই …

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার হিমঝিম মস্তানা আমি তোমার কুঁকড়ে থাকা পোকা তুমি আমার ফলানা ঢিমকানা   সকাল থেকে রাত্রি আমি তোমার প্রেম বলিনি তবুও , কে খায় ধোঁকা   রাত্রি থেকে দিন তো তুমি আমার সূর্য চাঁদের চাঁদোয়া টাঙায় খোকা   প্রেমের কাছে, প্রেমের …

পড়ুন

প্রেম/রামকিশোর ভট্টাচার্য

প্রতিদিন রামপ্রসাদি মেখে কাপড় কাচতে কাচতে সাবান হয়ে একদিন গলে গিয়েছে মা ৷ অবসাদ পালক জড়িয়ে হঠাৎ জলবায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাবাও , এখন একলা একা সুতির ফুলমাখা কুর্তি মারুবেহাগ দুপুরে দু’হাত নাচিয়ে ঝুলেই থাকে – দিগন্তের বুকে , জোছনার রূপকথা নিয়ে – কচি হাওয়ারাই ঝিরিঝিরি গান শুনিয়ে যায় , রঙের বেলা গড়িয়ে গেলেও নাইলনের …

পড়ুন

একা মানুষ, পঞ্চাশ অস্তিত্ব/চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ লেখক: রিচার্ড জেনিথ প্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য …

পড়ুন

এক মেঘলা না থাকা/শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে মা, তুমি ছাদে উঠেছিলে  বালতি ও কাপড় সাবান জলের মধ্যে সূর্য তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি অথচ …

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি সচেতন প্রতিরোধ ছিল প্রগতি, আর মেঘ ডাকলে সূর্যত্রাসে কেঁপে উঠত প্রতিক্রিয়া। রথ দেখতে যাওয়ার মতো তুমি সুদূর করে নিয়েছিলে তোমার দিগন্তরেখা, স্বপ্নের সেই সাদা ঘোড়াটিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত স্ববিরোধে বেরিয়ে পড়েছিলে সাম্রাজ্যবিস্তারে, খুরে খুরে ধুলোর ঝড় তুলে বিলিয়েছিলে কল্যাণ, ফিরে এসেছিলে …

পড়ুন

বৃষ্টি নামচা /অগ্নি রায়

এক   ছোট ছোট চিরকুটে ভরে যাচ্ছে বাদলবেলা। বল্লভপুর, গোবিন্দপুর, মুকুটমণিপুর হয়ে মধুপুরে পৌঁছেও শেষ নয় পথ, এই পুরবাসী তালিকাকে পৌঁছতে হবে একশ আটে! তবেই বৃষ্টি থামবে ঠাকুমার কথামতো। কচিকন্ঠের মিনতি কাকলির কাছে লেবুপাতা আর করমচা ঝরে যায়। বালিকাসংঘের গায়ে জলের ছাঁট আবার ফিরে আসার কথা দিয়ে সরে পরে, এক আশ্চর্য লোকায়ত টোটকার পর।   …

পড়ুন

গ প্ পো ৫ – কুঁড়ে নিক্কির গল্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।   ‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –   সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- …

পড়ুন

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে এ শহরে তো লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে–আমরা এখান থেকে পুরীধামে যাই, চিল্কাতে জলবিহার করি, লিঙ্গেশ্বর মন্দির দর্শন করি –অথচ — যে ‘কিন্তু’ আর ‘অথচ’ আমাকে এবার রথে চাপাল-সারথি বলল–উধার তো কোই যাতা নেহি। বললাম –সেই জন্যেই তো। উচ্চবর্ণের দেব দেবী …

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি। কতবার কলসপুর যাত্রা শুরুর মুখেই ভেস্তে গিয়েছে। আমি কলসপুরের   কাছাকাছি থেকে ঘুরে এসেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু যেতে পারিনি কেন যে–তা ঠিক ধরতে পারি না। ভেবেছিলাম একবার একাই ঘুরে আসব। কিন্তু শেষে মনে হয়েছে দীপিকা দুঃখ পাবে। লুকিয়ে না যাওয়াই …

পড়ুন

নোটপ্যাডের নৌকো/মন্দাক্রান্তা সেন

এক বর্ষার দিনে সে আসবে বলে কথা দিয়ে আসেনি।   এই সামান্য বিষয় নিয়ে পদ্য লিখে প্যানপ্যান করা এই বয়সে নিতান্তই ন্যাকামি হয়ে যাবে।‌   নাকের জলে চোখের জলে ছপছপ করছি । কোথা গেলে,‌ সেয়ানা প্রাণাধিক   নোটপ্যাডে নৌকো ভাসাই । নেহাত বালিকা আহা‌ আহা ।   তুমি আসবে বলে আসোনি। বেশ করেছ ।   …

পড়ুন

পেরেস্ত্রোইকা/কস্তুরী সেন

অতল, আত্মবিস্মৃত, শেষত শেষ কাকে বলে ? উদ্বেগের পর উদ্বেগ, বিরতির পর পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেলা সাড়ে চারটেয় ধর্মতলা পেরিয়ে যাচ্ছে দুশো একুশ মাঝমাঠ, খাদ্য আন্দোলন, একদিন একদিন শহরে মানুষ পোড়ে, জিতে বেরিয়ে আসে হিমঋতু ‘এই যে ধাইন্যক্ষেত্র তা দ্যাখতে তো পয়সা লাগে না’ দেখতে দেখতে দেখে যাওয়া, মানুষের এলোমেলো ভিড়, সিগনালে আলো নিভে যায় সাবেক …

পড়ুন

তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন। তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান। আমার …

পড়ুন

ফুলঝরিয়া/সেবন্তী ঘোষ

এক পিছনে জঙ্গল ।ওই ওপারের রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গল। ক্রমশঃ দুপাশের জঙ্গল উজাড় করে  ফোর লেন হচ্ছে। এখনও পুরোটা খুলে দেয়নি। নবনির্মিত সেই পথের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ফুলঝরিয়া আর পিংকি। বসাটা নতুন নয়, জায়গাটা নতুন। বসার জায়গাটাও ঠিক নতুন নয়, দেখতে নতুন। পিংকি বলে, আগের ঘাসটাই ভালো ছিল রে, গড়িয়ে গেলে কত …

পড়ুন

গ প্ পো ৪ – পুঁটে দত্তিদের গপ্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি। স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের …

পড়ুন

দি লাস্ট মিটিং/সমরজিৎ সিংহ

একটি রাস্তা । তারপর, আবার রাস্তা । তারপর সমাধি । তার উপর চাঁদের ছায়া । দু’একটা পাতা । রাস্তার ওপাশে একটা ভাঙা দোকান । তিনটে চেয়ার । সমাধি থেকে উঠে এসে এই চেয়ারে বসলেন তিনি । টোটেনখাম । চাঁদ তখন পিছলে যাচ্ছে রাস্তার উপর । তিনি তার ভাঙা হাড়ের আঙুলগুলি বের করে কাকে যেন ডাকলেন …

পড়ুন

প্রস্তাব/সুমন গুণ 

পাতায় বৃষ্টির শব্দ সাংসারিক, দ্বিপ্রাহরিক। আস্থা ও আশ্বাস থাকে, সমবেত, শুভানুধ্যায়ীর পীড়া ও আরাম থাকে। যথাস্থান থাকে। থাকে মেঘ, অস্পষ্ট ও গূঢ়,  সম্পর্কের অসহায়তার মতো,  চিন্তা ও ক্ষমার মতো, পতনকালীন বজ্র ও বিদ্যুৎভরা নৈশব্দের মতো।   পথেও স্তব্ধতা থাকে দ্রুতগামী; নৈকট্য ও নিশ্চয়তাভরা। কোথাও স্থানাংক আছে, ছাদ আছে, দরজা ও রেলিংঘেরা সুবাতাস আছে,  আছে স্থিতি, …

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি …

পড়ুন

শহর/বিজয় সিংহ

ফেরার আগে যে তুমি অহৈতুকী ছিলে ফেরার পরে যে প্রাক গোধূলিরা অপ্রবাসে ঢোকে ফক্স কে টু, হে আরাধ্য, সেইসব গ্রন্থনায় মায়ুশ মজ্জার থেকে অনুচক্রিকা কুড়াতে পাঠাও স্বপ্নের অতলে নেমে দেখেছি জুবিলি অসহায় ফুটেছিল হেতু তার কোনো বাড়িঘর নেই, লেক মল, পূর্ণদাস রোড নির্মিত আরশিনগরে পড়ে থাকা সংক্রামক লাশ ফেরার আগের রাত্রে নরসিংহমূর্তি দেখিয়েছে ও ফেরার …

পড়ুন

মায়াচাঁদ/অলোক বিশ্বাস

হাসছি বলেই চাঁদ উঠছে নাকি চাঁদ উঠছে বলে হাসছি— কোনো একক মাত্রাকে চায় না মানুষ, নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও। এমনতর সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে বীতশোক সাঁতরে আমি যাবো তাহার নিকটে। চাঁদে বসে গাইব মায়াবাদ, চাঁদে বসে বুনব খামার জমি। আমাদের দাবি অনুযায়ী ভালোবাসা চিরকাল চাঁদের সাপোর্ট পেয়েছে। পুনরায় চাঁদে গিয়ে অপেক্ষা করব তোমার জন্য। আমার রান্নাঘরে, পড়ার ঘরে বাজছে …

পড়ুন

মন্দির দেখা সহজ নয়/শ্রীলা বসু

বেড়ানোর পোকাটা আমার মাথায় এসেছে প্রধানত পৈতৃক সূত্রে। বাবার হাতে ম্যাপ টাইম টেবিল দেখতাম হরদম। গাড়ি চালিয়ে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে নতুন জামাইকে নিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে রাঁচি চললেন তখন একচেখে ভালো দেখেন না। তবু কী ? অন্য চোখ তো আছেই। কিছু বললে বলতেন পতৌদির একচোখে ক্রিকেট খেলার কথা। তবে …

পড়ুন

বিস্মৃতপ্রায় লেখক নিরুপমা দেবী/ঈশিতা ভাদুড়ী

অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক। নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক …

পড়ুন

গ প্ পো ৬ – উপকারী পুঁটে দত্তির গপপো/বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘ম্যাকলাখানরা তো ব্রাউনি পুষত —’ এতক্ষণে কথা বললে আংকল জ্যাক। ‘ও সব ব্রাউনি ফ্রাউনি আমি জানি না —’। মুখ ঝামটা গ্যানগ্যানের। ‘ব্রাউনি হোক, পিক্সি হোক, লেদোকোন আর ট্রোন্ড যাই-ইহোক—এক ফিনরা বাদে ওরা সবাই পুঁটে দত্তি। ট্রো —’ ‘তা ফিনরাও তো পুঁটে। এই এতটুকু —’। বললে আংকল জ্যাক। ‘তা হোক, ফিনরা তো আর ডাঙর নয়। তারা …

পড়ুন

শিশিরকুমার দাশ: খুঁজে ফিরি কর্ণ, কর্ণের সহোদর/মোস্তাক আহমেদ

মৃত্যুলগ্ন পার হয়ে যতবার গিয়েছি নিঃসীমে বিদ্যুতের দীপ হাতে: অন্ধকারে আকাশের বিস্তৃতি অপার বিদ্রোহী ঝড়ের যত উদ্বাহু মেঘেরা আমন্ত্রণ করে আনে অতীতের ঘন অন্ধকার; তবু দেহ ভিজে গেছে শান্তিস্নিগ্ধ হিমে।                                                                                         (মৃত্যুলগ্ন/জন্মলগ্ন)   কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জন্মলগ্ন’। ‘পূর্বমেঘ প্রকাশ ভবন’ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৫৬-তে। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। কী দীপ্ত উচ্চারণ! কয়েক বছর হল দেশ …

পড়ুন

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে। কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে …

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে একাই পাহারায় সে হাসির খানিক মুখে সাবলীল উত্তরাধিকার কখনো বা সাজিয়ে নিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো ‘আমি’র মধ্যে কতগুলো দাঁড়টানা কাক কালো এলোমেলো কখনো ভাবিনি অন্ধকার উজাড় হয়ে আসে কোন পথে! কেমন করে রোদ টুকু মরে যায় …

পড়ুন

গুঁড়োমশলা/কাবেরী গোস্বামী

সে এখন একটি অচল পয়সার মতন ফিরেও তাকায় না আর কেউ কারণ, সে আজ শুষ্ক বিবর্ণ পরিত্যক্ত এক যোনি

পড়ুন

ফিল্ম শুটিং-এর গল্প/পার্থ মুখোপাধ্যায়      

১৯৮১ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বংশীচন্দ্র গুপ্ত। ‘ শিল্প নির্দেশনায় বংশী সমকক্ষ ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বংশী ছিল এক এবং অদ্বিতীয়।’ তার স্মরণ সভায় শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই রকম বক্তব্যই রেখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ‘পথের পাঁচালী …

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ …

পড়ুন

তোমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম/বর্ণালী কোলে

(১) বিদ্রোহ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে জলকামান আক্রোশ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে মুহুর্মুহু ভীমরুলের মতো কামড় শান্ত হয়ে আসছে মল্লযুদ্ধ ক্ষোভ, অভিযোগ দেখা দিচ্ছে ফাল্গুন রাত্রি আকাশ জুড়ে শ্বেতরঙ্গন (২) যেভাবে বীণা স্পর্শ করে আছে পদ্মকে সেভাবে তুমি আমাকে স্পর্শ কোরো আসছি এখনও তুমি কাজ করছ শুকতারাটি উঠবে এবার শিয়রে তোমার …

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে গেছে সুর। মনে হয় নিষ্পত্র গাছগুলিতে একটি একটি করে জেগে উঠছে কচি পাতা। মনে হয় রোদ্দুর হয়ে গেছে আধো আধো কথা বলা শিশু। শীতকাল হলেও পৃথিবীতে কোথাও একটা নিশ্চয়ই শিউলি ফুটে, ঝরে সাদা করে রেখেছে উঠোন …

পড়ুন

অনন্ত সংলাপ/অর্পিতা কুণ্ডু

আমি: ঢেউ তো প্রোজ্জ্বল, তাতে তুমি বসে আছ শিরোচূড়ামণি। হাটের নাগর তুমি, ভিটায় নিমিত্ত সামগান — তোমাকেই বর্মে বৃত্তে চুপিসাড়ে রোমন্থন করি। যেমত অছিলা পটিয়সী, যে মৃদু চারণভূমি পার করে কাছে আসি, তার কিঞ্চিৎ আদর কোরো। বহুবর্ণ লোক সমাগমে একেলা ফেলো না তাকে রৌদ্র-বাতায়নে। সে: না সখি, না, বাতায়ন-পাশে তোমার শরীর মুক্ত, জনশ্রুতি এই — …

পড়ুন

কাজের ভাষা, মুখের ভাষা/স্বপ্নময় চক্রবর্তী

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, ‘এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় …

পড়ুন

পুরনো দিন নতুন দিন/শংকর চক্রবর্তী

মনে পড়ে সেইসব রবীন্দ্র-গানের সকাল সূর্যাস্তের থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলেশহীন কোনো সন্ধের পাশে বেজে উঠত জড়োসড়ো একবারও কেউ ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে চায়নি তখন সাদামাটা বিকেলগুলো শুধু এই ষড়যন্ত্রীর শহরে অন্ধকার নামিয়ে রাখত প্রতিদিন সেই সকাল থেকে ছুটে যেত সবাই একে অপরের জামা-প্যান্ট উদোম করে ছুটত তুমি শুধু সারাজীবন অপরাধীর মতো মোমবাতি হাতে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ …

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন কাজ-কাজ-কাজ ধ্যানসম একাগ্র। রান্নাকরার মাঝে বলতে গেলেই কিছু সম্বিত ফিরত যেন! সকলের রাত হয়। তাঁর তো হয় না। সকাল-দুপুর-সন্ধে আঁচলের গিঁটে বেঁধে বিলিয়ে দিতে দিতেই ক্লান্ত একটা দেহ মাঝরাতে বিছানায় হাই পাওয়ারের গ্লাস বালিশের পাশে রেখে দুচোখ জুড়িয়ে এলে একদিন …

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা