খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো খবর আছে ? থাকলে বলবে । আমি এখন ২৪, সব সহ্য করতে পাড়ার বয়স হয়েছে ।’ গত ২১ বছর দিদা সুখময়ী দীপাকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন, তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন । এরপর মৃদুস্বরে বললেন, ‘সুধীর মারা গেছে । গত রাতে বিহারের মধুবনি থেকে একজন ফোন করেছিল । জেল থেকে মুক্তির পর ওখানে বোনের বাড়িতেই থাকত ।’ স্পষ্টতই একটা ধাক্কা খেল সে । গোটা জীবন যে মানুষটাকে ঘৃণা করে এসেছে, এই জীবনে যাকে নিয়ে কোনো স্মৃতিই নেই, চার বছর বয়সের খুব ঝাপসা কিছু মহূর্ত ছাড়া যাকে সে কোনোদিন কাছে পায়নি, এই প্রথম সেই মানুষটার হঠাৎ খুব ফাঁকা লাগল, মানুষটার জন্য বুকে একটা চিনচিন ব্যাথা অনুভব করল দীপা ।
দিনের আলো তখন কমে আসছে, সন্ধ্যা নামবে । বর্ষার মেঘভার আকাশ একচিলতে জলাভূমির উপর ঝুঁকে পড়েছে । দীপার কিছুই আর ভালো লাগছে না। বিছানায় শুয়ে থাকলে বুকে একরকম দলাবাঁধা চাপ অনুভব করছে । সেসময় অব্যক্ত একটা হাহাকার মুহূর্তের মধ্যে তাকে গ্রাস করে নিতে চায় । বারান্দায় গিয়ে বসে । মুহুর্তের মধ্যে ফিরে আসে খুব ছোটোবেলার ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যগুলো । চোখ বন্ধ করে ডুব দিতে চায় নিজের স্মৃতির গহিনে । বদ্ধ পুকুরের থৈ থৈ জলে ডুবে যাওয়ার মতো তার চোখ কান নাক জুড়ে জল, দম বন্ধ হয়ে আসে তার । একবার ভরা বর্ষায় পাণ্ডাপাড়ার বিসর্জনের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে প্রায় মারা যাচ্ছিল সে । তখনও সাঁতার জানে না, জলে ডুব দিয়ে অসাবধানে জলের নীচেই কিছুটা গভীরে পা এগিয়ে যায়, জল থেকে মাথা তুলতে গিয়ে দেখে চোখের উপর দিয়ে জল বইছে, পা ভেসে উঠছে, পুকুরের তলদেশ ছুতে পারছে না আর, গোটা শরীরটাকে থৈ থৈ জল দখল করে নিয়েছে । পাড়ারই বিমলদাদা পুকুরে সাঁতার কাটতে এসেছিলেন, তিনি ডুবন্ত দীপাকে দেখতে পেয়ে চুলের মুঠি ধরে জল থেকে টেনে তোলেন । আজ চোখ বন্ধ করার পর শৈশব স্মৃতি থেকে ভেসে আসা তেমনই একটা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। দীপা বড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। খালের পার ধরে, পুরোনো আদরপাড়ার ভেতর দিয়ে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে । একটা প্রায় বুঁজে যাওয়া পুকুরের পাশ দিয়ে ঝোপ-জঙ্গল এড়িয়ে দ্রুত পা চালায় । এই মজে আসা পুকুরটা একসময় গোটা এই অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল । আদরপাড়ার এই দিঘির নাম দুলালী দিঘি। তিস্তার দুলালি, বর্ষা এলে যখন আদরের মেয়ের সঙ্গে মা তিস্তা দেখা করতে আসে আর তখন এই এলাকা জুড়ে বন্যা নামে । আজ তিস্তা অনেক দূরে, তার দুলালী আগ্রাসী মানুষের দখলে আজ একটি মজা ডোবা । আনমনেই বাড়ি থেকে একা একা বেরিয়ে এসেছে, উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে হাঁটছে সে। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে দেখল রাস্তার ধারে, মাঠের পূর্বদিকে কয়েকটি অশ্বত্থ ও শিরিষগাছ এখনো টিকে আছে ।
রেলকোয়ার্টারের সামনে একটা কচুরিপানায় ঢাকা পুকুর । স্টেশনের কাছাকাছি এক নম্বর রেলগেট । রেলগেটের একদিকে রামকৃষ্ণ মিশন অন্যদিকে জলজঙ্গল আর ওই প্রাচীন অশ্বত্থ গাছগুলো। একটি মাঝবয়সি পুরুষ রেলকলোনির পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে জলের দিকে মুখ করে পেচ্ছাব করছিলেন । সেই দেখে একজন বয়স্ক গ্যাংম্যান রেল-কোয়ার্টার থেকে হৈ হৈ করে ছুটে এল । গালাগাল খেতে খেতে মধ্যবয়সী পুরুষটি প্যান্টের জিপার আটকাতে আটকাতে ঘুরে দাঁড়া্লেন । মুখোমুখি দীপা । আরও দ্রুত হেঁটে জায়গাটা পার হতে চাইল সে । লোকটাকে চিনতে পেরেছে, তপন বোস, ফুড কর্পরেশানের বড়োবাবু। দীপাকে দেখে তপনবাবু ঐ অবস্থাতেই ডাক দিলেন – – ‘কোথায় যচ্ছো দীপা ? চলো এগিয়ে দিচ্ছি ।’
লোকটি রাস্তার ধারে দাঁড় করানো তাঁর মোটরসাইকেলের দিকে ইশারা করলেন । তপন বোসের এই গায়ে পড়া স্বভাব তাকে বিরক্ত করে । সে কোনো কথা না বলে আরো দ্রুত হেঁটে এগিয়ে চলে । এমন লোকগুলোর উদ্দেশ্য ও ইশারাকে চেনে সে । রেলেরই নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রাস্তাটা ভেঙে গিয়ে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে । এমনিতেই তার হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল, তার উপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা শুয়োর ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে সামনে চলে এল । ভাঙা রাস্তায় নিজেকে সামলানো কঠিন, টাল সামলাতে পারল না । পড়ে গিয়ে পায়ের নখে লাগল, প্রায় উপড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা । ব্যথায় চোখে জল এসে গেল । তবুও উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল । চোখ ফেটে জল আসছে তার, ব্যথা অথবা স্মৃতির । চারপাশের আলো আরো কমে আসছে তখন ।
প্রচীন অশ্বত্থ গাছে অজস্র বাদুড়, সারাদিন ঝুলে থেকে এখন তারা জাগছে । বাদুড়েরা চামড়ার ডানা ঝাপটে উড়ছে । স্টেশনের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে দীপা, তার মাথার উপর দিয়ে বাদুড়েরা উড়ে যাচ্ছে তখন । মেঘের থেকে অন্ধকার নেমে আসছিল গাছপালার মধ্য দিয়ে, বৃষ্টির ভয়ও । দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল পেছন থেকে কেউ ডাকছে, ঘুরবে কি ঘুরবে না ভাবতে ভাবতে মনে হল এই ডাক তার খুব চেনা । বাবার মতো, অথচ তার তিন বছর বয়সে বাবা জেলে যাওয়ার পর থেকে সেই ডাক সে আর কোনোদিন শোনেনি । ঘুরে দাঁড়াল । না, কেউ নেই । আবার এগোতে থাকল। মেঘে আকাশটা ঘন কালো হয়ে উঠছিল, চারদিকের আলো হারিয়ে যাচ্ছিল ।
আদালতে সেদিন ওর সাক্ষ্য কাঠগড়ায় সবার সামনে নেওয়া হয়নি । বিচারক, মহিলা, তাঁর চেম্বারে দুই পক্ষের উকিলের সামনে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি সেই রাতে কি দেখেছিলে? ভয় না পেয়ে বলো, যা সত্যি সেটাই বলো।’ মায়ের মুখটা তখন ওর চোখের সামনে, বড়ো করে দেওয়া সিঁদুরের লাল কপালজুড়ে ছড়িয়ে গেছে । কান্নায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল । মায়ের মৃত্যুটা দিদা, মামারা কেউ মানতে পারেননি । মা-হারানো দীপার কাছে তো সামনেটা শুধুই মাত্র পিচ্ছিল এক যন্ত্রণার গহ্বর । সেই কাল রাত্তির । সন্ধ্যা থেকেই বাবা-মায়ের দুজনের মধ্যে ঝগড়া, ঝগড়ার কারণ দীপা জানে না । পাশের ঘরে সে পড়ছিল, ঝগড়ার চিৎকার কানে আসছিল আর বইয়ের সামনে দমবন্ধ করে বসে ছিল সে । হঠাৎ মায়ের একটা জোরে চিৎকার এবং তারপর সব চুপ । দরজার ফাঁক দিয়ে চার বছরের মেয়েটি দেখল, বাবা বিছানার উপর বসে, দু’হাতে ধরা একটা বালিশ, বালিশের গায়ে সিঁদুরের দাগ । মায়ের মুখটা হাঁ হয়ে আছে, নীল, চোখটা খোলা, উপরের দিকে তাকিয়ে আছে । বড়ো বড়ো চোখ ও দুই ভ্রুর উপরের কপালটা সিঁদুরে ঝাপটায় লালে লাল, মুখটা নীলচে কালো হয়ে আছে, চোখমুখ স্থির ।
রাতেই পুলিশ এল, বাবা সেরকমই চুপ করে বিছানার উপর বসে, নিজেই ধরা দিলেন । পাশের ঘরে দিদা দীপাকে তাঁর বুকে জাপটে ধরেছিলেন, মামারা মাথা নীচু করে সেখানেই বসে । পুলিশ হাতে দড়ি বেঁধে বাবাকে ভ্যানে তুলছে, দিদার দু-হাতের মাঝখান দিয়ে দীপা দেখছে । বাবা একবারও সেদিকে, তার দিকে তাকালেন না ! বাবাকে দীপার এই শেষ দেখা ।
আজ আর পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছে না, উদভ্রান্তের মতো রেললাইন ধরে হাঁটছে, বারে বারে থমকে যাচ্ছে পা । ভেতরের যন্ত্রণা প্রবল হলে শরীরী যন্ত্রণা উবে যায়, দীপারও নখের ব্যথাটা উবে গিয়েছিল । হাঁটতে হাঁটতে মুখ ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাচ্ছে, ফিরে দেখছে, বাবার মতো কেউ ডাকছে ।
তাদের বাড়িটা হঠাৎ করেই মনে হল জনশূন্য হয়ে গেছে, থমথমে অন্ধকার তার মুখের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে হাসিখুসি তিন কামরার বাড়িটা । মায়ের থাকা না থাকাটা যে কতো ভয়ানক পার্থক্য এনে দেয় সেটা একদিনেই বুঝতে পারল সে । মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জন্য সবসময় এক অদৃশ্য সুরক্ষা বর্ম নির্মাণ করে রাখেন, তিনি না থাকলে সেই বর্মটাই অদৃশ্য হয়ে যায় । বাবা নানা কারণেই অনেক দিনই বাড়িতে থাকেননি, কিন্তু জন্মানোর পর থেকে কোনোদিন মাকে ছাড়া একদিনও থাকেনি সে । মায়ের সেই ছায়াটাই হঠাৎ উবে গেল । তীব্র রোদে মধ্য মরুভূমিতে একা দাঁড়িয়ে সে, পায়ের নীচে, চারদিকে তীব্র ও অসহনীয় গরম তাপ ।
কাকিমা তাদের ঘরে রেখে দিল ওকে । তিন দিনের মাথায় মায়ের শ্রাদ্ধ হয়েছিল। দীপার আজ সবটা মনে নেই, শুধু মনে আছে কাকা উঁচুস্বরে পুরুতকে বলেছিল, ‘আমাদের কাশ্যপ গোত্র’। কিন্তু একরাতে সেই কাকাই, কাশ্যপ গোত্রের ছাতা ভেঙে চণ্ডাল কসাই হয়ে উঠল, দুহাতের শক্ত মুঠোয় খামচে ধরল ওকে । এরপর ভয়ে তার কথা বন্ধ হয়ে যায়, কাকার মতো পুরুষমানুষ দেখলেই দীপা থরথর করে কাঁপত । সবাই বলল, ওকে মায়ের ভূত ধরেছে, মায়ার বন্ধন মরেও ছাড়তে পারে না গো । দিদা এসে শুনলেন, তিনি দীপার আতঙ্কিত মুখের নীল দেখে হয়তো কিছুটা বুঝলেন । এরপর কোলে করে নিয়ে গেলেন তাঁদের বাড়িতে, দীপার মামাবাড়ি । আর কাশ্যপ গোত্রের লাহিড়ি-বাড়িতে ফেরা হয়নি তাঁর । কাশ্যপ মুনি মৃতের শরীরে প্রাণ সঞ্চারের মন্ত্র জানতেন, কিন্তু কাশ্যপ গোত্রের ছায়ার ওই মৃত্যুপুরী থেকে মাত্র চার বছরের শিশুটিকে অন্য ছায়ায় চলে আসতে হল । এর মধ্যেও সময় তার মতোই নির্বিঘ্নে বয়ে যায়, সময়ের থেমে থাকার উপায় নেই, কোনো সংকটই তাকে থামাতে পারে না । এই অপরাজেয় সময় মুছে দেয় অনেক ব্যক্তিগত শোকের কুয়াশা । কান্নার ঝরাপাতার দীর্ঘপথ পার হয়ে একদিন ক্লান্ত দীপা পড়াশোনায় মন দেয় ।
পয়লা আষাঢ় এলে নিজেকে সকাল থেকে খুব নিঃস্ব মনে হয় তার । আজ দীপা পঁচিশে পা দিল, অথচ কি নীরবে চলে যাচ্ছে দিনটা । একসময় বাবার উদ্যোগে ধুমধাম করে একমাত্র মেয়ের জন্মদিনের উদযাপন হতো, তার ঘর সাজানো হতো । আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবেরা আসত । সবাই মিলে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত হই হই । মা নিজের হাতে পায়েস রাঁধতেন । মা শূন্য পৃথিবীতে আর কোনোদিন সে পায়েস খায়নি দীপা । আজ, পঁচিশে পা দিয়ে দিনটাকে অভিশপ্ত মনে হয়, খুব একা লাগে তার । সন্ধ্যায় দিদা তার ঘরে আসে, একটা ছোটো কাঁসার বাটি, বাটিতে ক্ষীর । দিদার চোখের কোনে শুকনো জল দেখতে পায় সে । তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে দীপা ।
ধীরে ধীরে সময় এগোলো, স্মৃতি পুরোনো হলো, শরীর বাড়ল, বয়স বাড়ল । স্কুলে যাওয়ার পথে, প্রাইভেট পড়ার সময়, বাড়িতে মামা-কাকা, চারদিকের চোখে সাপ হিসহিস করে উঠতে দেখতো । কুকুরের মতো লোল-জিহ্বা পুরুষগুলোর চোখ থেকে বেরিয়ে আসতো কুৎসিত ইশারা । অস্বস্তি হত, মনে হত ক্ষুধিত, অতৃপ্ত পুরুষদের লালায় তার শরীর মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। মনে হত স্নানের সময়, কাপড় পাল্টানোর সময় কেউ আড়াল থেকে নজর করছে তাকে । দিদা সান্ত্বনা দিতেন – একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, এই সব নজর থেকে বেঁচে থাকতে হবে । সেই বেঁচে থাকার জন্য নির্জন বারান্দায় পুতুলের মতো খেলনা হয়েও চুপ থাকতো । বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ইচ্ছে করতো না, মনে হতো সবাই তাঁর একাকিত্বের বৃত্ত ছেদ করার জন্য ফুটো খুঁজছে, সুযোগ পেলেই আঁচড়ে, কামড়ে দেবে । চারদিকে চেপে আসা দেয়াল, চারদিক রুদ্ধ, আলো নেই বাতাস নেই, দমবন্ধ হয়ে আসছিলো । সেই অসহনীয় নিস্তব্ধতার মধ্যে সে মৃত্যুকে কামনা করতে থাকলো । একদিন পড়ার ঘরে নিজের হাতেই হাতের শিরায় ব্লেড চালিয়ে দিলো । মামা হাসপাতলে সময়মতো নিয়ে যাওয়ায় সেবার প্রাণ বাঁচে ।
দিনসাতেক পরে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে এলো দীপা । চারদিক চুপচাপ, কারও মুখে কথা নেই । দিদা এরপর থেকে কাছে কাছে থাকতেন সবসময় । নানা গল্প শোনাতেন, পুরাণ থেকে, রামায়ণ মহাভারত থেকে । জন্মেজয়ের কথা, পরীক্ষিতের কথা, নল দময়ন্তির কথা । কাশ্যপ মুনির কথা থেকে চলে আসেতেন পরীক্ষিতের গল্পে । পাণ্ডবদের উত্তরাধিকার অভিমন্যু-উত্তরার পুত্র মহারাজ পরীক্ষিৎ একদিন মৃগয়া করতে গিয়ে একটি হরিণকে বাণবিদ্ধ করেন । মহারাজ সেই হরিণকে অনুসরণ করতে করতে গভীর বনের ভেতর মৌনব্রতধারী শমীক মুনির আশ্রমে হাজির হন । ধ্যানমগ্ন তাঁকে হরিণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেও ঋষি নিরুত্তর থাকেন । তাঁর কাছে কোনো উত্তর না পেয়ে ক্রুদ্ধ রাজা মুনি শমীকের গলায় একটা মৃত সাপ পেঁচিয়ে দিয়ে চলে আসেন । তপোরত মুনির পুত্র শৃঙ্গী পরীক্ষিতের হাতে বাবার লাঞ্ছনা দেখেন । ক্রুদ্ধ শৃঙ্গী রাজাকে অভিশাপ দেন, এই পাপী রাজা মৃগয়ার দিন থেকে সাত রাতের মধ্যে মহাবিষধর তক্ষক নাগের দংশনে মারা যাবেন । ছয় দিনের দিন কাশ্যপ মুনি পরীক্ষিতের বিষ নামানোর জন্য রাজপুরীর দিকে যাত্রা করেন । পথে ব্রাহ্মণ বেশধারী তক্ষকের সঙ্গে তার দেখা হয় । কাশ্যপের অভিপ্রায় জানতে পেরে তক্ষক তাঁর কাছে মৃতকে তাঁর প্রাণদানের ক্ষমতার প্রমাণ চান । এক মৃত বটগাছকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন । তক্ষক-দংশনে মৃত বটগাছকে কাশ্যপ মন্ত্রবলে আবার বাঁচিয়ে দেন। এই অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তক্ষক তাঁকে রাজার থেকেও বেশি অর্থ প্রদানের শর্তে রাজার বাড়িতে না গিয়ে বাসায় ফিরে যেতে বলেন । মুনিঋষি দৈব বলে জানতে পারেন যে পরীক্ষিতের জীবনকাল শেষ । তাই সে তক্ষকের কাছ থেকে অধিক অর্থ নিয়ে বাসায় ফিরে যায় । কাশ্যপ গোত্রের সন্তান এই গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে, বন্ধ চোখের ওপাড়ে সে দেখতে পায় মুনি অর্থ নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন আর অন্যদিকে বিষের জ্বালায় ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছেন পরীক্ষিৎ, অর্জুন পুত্র অভিমন্যুর সন্তানের সারা দেহ বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে । মায়ের, বাবার, জন্মদাতাদের শবদেহের এপার থেকে ওপারে তাকিয়ে দীপা দেখছে তাদের গোত্রাধিপতি কাশ্যপ ঘাতক তক্ষকের দেওয়া অর্থের বিনিময়ে মৃত্যুকে জয়ী করে চলে যাচ্ছেন ।
মামাবাড়ি থেকেই দীপা মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় । কো-এডুকেশান স্কুল । দীপা লক্ষ্য করতো তার প্রতি শিক্ষক থেকে সহপাঠি প্রত্যেকের একটা ভিন্ন রকমের নজর । তার দিকে ধেয়ে আসা লোলুপ লালসামাখা দৃষ্টির কারণ বুঝতে পারত, এই নজর তার শরীরের দিকে । দীপার ভারী বুকের দিকে তাদের নজরে খুব অস্বস্তি হতো, নিজের ভেতর কুঁকড়ে যেতো সে ।
মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল যেদিন বেরুলো সেদিন সকাল থেকে দিদা তাঁর গোপালের ঘরে, নাতনির জন্য প্রার্থনা করছেন । পরীক্ষার রেজাল্ট হাতে পেয়ে অনেকদিন পরে দীপার ও দিদার খুব আনন্দ হয়েছিল । স্কুলের প্রথম তিনজনের মধ্যে রয়েছে সে । সবাই খুশি, দিদা সবাইকে প্রসাদ দিলেন । এতো আনন্দের মধ্যে কেউ তার ভেতরের কান্নাটা বুঝতে পারছিলো না । এত বছর দিদাই তার মা হয়ে সবটা আগলে রাখছিলেন । আইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল ছোটবেলা থেকেই । আইন কলেজে পড়তে এসে দীপার দুজন বন্ধু হলো । সোনম ও কুহেলী । কলেজে পড়তে পড়তে ক্রমশ তার বিপদগুলো নিজেই সামলে নিতে শিখছিল, পারছিল । জেনে নিয়েছিলো নিকটজনদের স্পর্শের চরিত্র, আদর ও লোভের পার্থক্য । জেনেছিল প্রশ্রয়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হুলের ছোবল । দীপার কাছে ছোটমামা ছিলো এক সাক্ষাৎ বিপদ, মহা বিপদ । দিদা বুঝতে পারছিলেন, চিন্তায় তাঁর ঘুম ছুটে গেলেও প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না । কিন্তু দীপা ক্রমশ নিজেকে সামলে নিতে শিখছিলো । এই সময় তার অধিকাংশ সময় কাটত ছোটবেলার বন্ধু গোপার সঙ্গে । বাবা-হারানো গোপা নার্সিং-এর ছাত্রী ।
বাড়ির ভেতর যে চাপ নিয়ে থাকে সেখান থেকে মুক্তি আসে বাইরে বেরুলে । তখন ব্যাক্তিগত বিষাদবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসা সে এক অন্য দীপা । তিন বন্ধু মিলে তখন আনন্দের পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় । ফুচকা খেয়ে তেতুলের টক লাগা হাত বান্ধবীদের ওড়নায় অবলীলায় মুছে নিয়ে অন্যজনের হাতের শালপাতার বাটি থেকে ফুচকা থাবা মেরে মুখে পুরে আনায়াসে গিলে নেওয়ার আনন্দে উদ্দাম হয়ে ওঠে । খোলস ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসা এই দীপাকে বন্ধুরা বুঝতে পারে, সবাই অনন্দের চাদরে জড়িয়ে রাখে ওকে। হ্যাঁ, অনেক অন্ধকার জড়িয়ে খুশির দিকে এগিয়ে যাওয়া দীপা অন্যরকম, সবাই বোঝে শুধু ওই ছেলেটি ছাড়া । চুপ করে দূরে দূরে থাকা কচি গোঁফের লাজুক ভাবের ছেলেটা । হাসতে হাসতে একদিন ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে ফেলে দীপা । ছেলেটি সেই হাত সরিয়ে দেয় না, নিজেও সরে যায় না । চলতে চলতে মুখোমুখি হলেই হেসে ওঠে তারা, চোখ বড়ো বড়ো করে ছেলেটি ওর দিকে তাকিয়ে থাকাটা অনুভব করে দীপা। কয়েকদিনের মধ্যেই মধ্যরাতে একটা মেসেজ আসে – ‘তুমি আমার চণ্ডালিনী, তুমি আমার দেবযানী আমি তোমার কচ’ । দীপা হাসে । কয়েকদিন পরে আবার মধ্যরাতে – ‘ডিয়ার চণ্ডালিনী, তোমার মন ভালো নেই ?’ দীপা প্রথম উত্তর দেয় – ‘মন কি বস্তু ? মৃতের মন থাকে না, বিত্তের ও লোভের মন থাকে’ । এরপর চমকে যায় দীপা – ‘না, তোমার মন নাই, দেখো না তাই মনের মানুষ অপেক্ষায় থাকে । তোমার মন নাই, বব আছে । মুখে তুলে দাও ওই ভারী সুধা ভাণ্ড’ । দীপা এটা ভাবতে পারে না । রাগে, ঘৃণায় উত্তর লেখে – ‘আছে, দেখবে ?’ লিখেই নম্বরটা ব্লক করে দেয়। বাইরে মধ্যরাতের কুকুরেরা প্রবল চিৎকার করছে তখন । কুত্তার চিৎকারে ঘুমোতে পারে না সেই রাতে । বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় । দীপা অন্ধকার খোঁজে । শুক্লপক্ষের চাঁদ যখন চারদিকে মায়া ছড়িয়ে রাখে দীপার তখন খুব ভয় হয় । চাঁদের আলোর ভয় জড়িয়ে চাঁদের মায়ায় দীপা হারিয়ে যায় । তার নাকে আসে শ্মশান চিতার পোড়া মাংসের গন্ধ, সামনে প্রখর জ্যোৎস্নায় জলন্ত চিতাকাঠ থেকে মানুষের উচ্চতাকে ছাপিয়ে আগুনের ফুলকি উড়ছে । জলন্ত চিতা কাঠের ভেতর উপুর হয়ে শুয়ে অর্ধদগ্ধ একটা নারী শরীর । তার পুড়তে থাকা শরীরের থেকে বেড়িয়ে আসা ভারী স্তন, টপটপ করে দেহরস আগুনের উপর পড়ছে, তেজদৃপ্ত হচ্ছে বহ্নিশিখা । আগুনের আলোয় চারদিকের অন্ধকার বৃত্তটা আরও ঘন হয়ে ওঠে । হঠাৎ তার মাটির ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে করে । শ্মশানের কাছেই একটা পুরোনো নিমগাছ । সেখানে বসে চিতার দিকে তাকিয়ে ছিল, এবার গাছের গুড়ির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পরে সে । অন্ধকারে মনে হয় অনেকগুলো বেঁজি তার চারদিকে এসে দাঁড়িয়েছে, ঘিরে ফেলছে । বেঁজিদের ঠোঁটে সাপের রক্ত । অন্ধকার আরো নিবিঢ় হয়ে তাকে গহ্বরের ভেতর গিলে নেয় ।
মানুষের স্মৃতিও একদিন ধীরে ধীরে ফিকে হয়, নতুন রং ও রেখায় সাজানো হয় তার জীবনের চালচিত্র । আইন নিয়ে পড়ার ফাঁকে দীপা সোস্যাল ওয়েলফেয়ার নিয়ে একটা ডিপ্লোমা করে নিয়েছে । দু’বছর হলো জলপাইগুড়ি আদালতে যোগ দিয়েছে সে । ক্রিমিনাল কোর্টে প্র্যাকটিস করছে, এবং এর পাশাপাশি স্থানীয় একটি অনাথ আশ্রমের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে । সন্ধ্যার পর সেখানে, অনাথ মেয়েদের সঙ্গেই সময় কাটে তার । ওকালতি আর অনাথ আশ্রম, নিজেক ব্যাস্ত রাখে দীপা । সিনিয়র অনুপম রায় সন্তানের মতো ভালোবাসেন ওকে । এই অনুপম রায়ই মা’য়ের কেস লড়েছিল ।
আষাঢ়ের প্রথম রবিবার, বৃষ্টিমুখর দিন । রবিবার সকালে সিনিয়রের চেম্বারে আসতে হয় কেসগুলো সাজিয়ে নিতে । কাজের বাইরে সাহিত্য সংস্কৃতির কথাবার্তাও হয় তাদের মধ্যে । এদিনও, কাজের চাপ কম তাই অনুপম রায় তাঁর চেম্বারে বসে দীপাকে মেঘদূত থেকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন । সেই সময় এক বৃদ্ধা এলেন, সঙ্গে বছর কুড়ির একটি মেয়ে । ভালো করে তাকিয়ে দেখা যায় যে তার মুখে ও ঠোঁটে রক্ত জমে থাকার পুরোনো দাগ । বৃদ্ধার আর্জি – মেয়ের স্বামী কিছুদিন হলো ওকে ছেড়ে চলে গেছে, তার আগে নিয়মিত ওর গায়ে হাত তুলত । এখন মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডিভোর্সের মামলা করেছে । ডিভোর্স হলে একা মেয়ে এরপর কি করবে? মেয়েটার সংসার বাঁচান । অভিজ্ঞ উকিল অনুপম রায় বুঝলেন স্পষ্টতই আদালতের বাইরেই ব্যাপারটা মেটাতে চাইছেন এঁরা ।
– বরের ফোন নম্বর আছে ? এখন কোথায় থাকে জানেন?
– হ্যা, বার্নিশ ঘাটের কাছে ওদের চাষ জমি আছে, সেখানে ।
মেয়েটির নাম ঝুমা, বরের নাম সুজয় ঘোষ । অনুপম রায় তখনই নম্বর নিয়ে সুজয়কে ফোন করলেন । বিষয়টি বললেন । অন্যদিক থেকে তার অভিযোগের অন্ত নেই । তবুও উকিলের বুদ্ধি ও কথার কাছে পরাস্ত হয়ে সে অনুপম বাবুর সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলতে রাজি হলো । তবে বার্নিশে নয়, তিস্তার পশ্চিমে, সারদাপল্লি চরে ওর লিজের জমি আছে, পরদিন বিকেলে সেখানে থাকবে সে ।
অনুপম বাবু এবং দীপা গাড়ি নিয়ে জুবলি পার্ককে ডানে রেখে তিস্তার বাঁধ ধরে হেঁটে সারদাপল্লীতে পৌঁছোল । সুজয়কে ফোন করে জানাল যে সে চার নম্বর স্পারের মাথায় অপেক্ষা করছে, সেখানে নদীর চরে তাঁর বাথানে সে আছে । আরও কিছুটা হেঁটে স্পারের মাথায় গিয়ে নদীর শুকনো চরে নামতে হলো ।
বিস্তৃত বালুচর জুড়ে সবুজ, মাঝে বিচ্ছিন্ন ভাবে কয়েকটা ছনের কুঁড়ে ঘর । কয়েকটি গরু বাঁধা সেখানে । ওদের দেখে সুজয় এগিয়ে এলো, বললো, ‘একটু বসুন । আমি গরু দুইয়ে আসছি ।’ একটা বাঁশ দিয়ে বানানো বেঞ্চ, সেখানে তাঁরা বসলেন । পাশেই একটা বাদামি দুধেল গরু বাঁধা । বা হাতে একটা অ্যালোমিনিয়ামের বালতি নিয়ে এলো সুজয়, ডানহাতে তেলের ছোট বাটি একটা । দুধের বাটে প্রথমে তেল মেখে নিয়ে তারপর টেনে টেনে দুধ দুইছিলো । সাদা দুধের রেখা সরু হয়ে বালতিতে পড়ছিলো আর সেই ফেনিল দুধের ভেতর থেকে চোঁ চোঁ করে একটা অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিলো । কিছুটা দূরে একই রঙের একটা বাছুর বাঁধা, তার মাথায় সাদা একটা বৃত্ত । বড়ো বড়ো চোখ কিছুটা কুঁচকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে । গরুটিও বাছুরটিকে দেখছে, একই দৃষ্টিতে । দীপার খুব চেনা মনে হয় এই তাকানোটা । মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে । মায়ের কথা মনে পড়ায় খুব কান্না পায় তার । অনুপমবাবু বুঝতে পারে, তাই দীপাকে বলেন, ‘চারপাশটা একটু ঘুরে ফিরে দেখো । পূর্বের দিকে দেখো নদীজলেরও দেখা যাবে, গত বছরও তিস্তা এখান দিয়েই বইতো । এখন তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিস্তৃত চর সবুজ, সেখানে ফসল ফলেছে ।’ দীপা হাটতে হাটতে নদীর বিগত জলচিহ্ন রেখার কাছে চলে যায় । এখানে বালুর রং রূপালি । সেই রূপালি বালুতে পা দিয়ে সে চাপ দেয়, বালু ভিজে ওঠে ।
অনুপম রায় মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো সুজয়ের অভিযোগ, ঝুমার সংসারে মন নেই, ওর সঙ্গে থাকতে চায় না, এর মধ্যে ওর এক চাচাতো ভাইয়ের কথাও উঠে এলো । তাঁকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটা সমাধান সূত্রে আসা গেলো । জলপাইগুড়ি শহরে নয়, দুজনে বার্ণিশের বাসায় গিয়ে থাকবে । একটু দূর থেকে দীপা শুনছিলো, সুজয় বলছে, সে স্বীকার করে নিলো, ‘আমি গায়ে হাত তুলে অন্যায় করেছি, কিন্তু সংসারটা তো করবো বলেই একদিন বিয়ে করেছিলাম । একটা সন্তান এলেই সব ঠিক হয়ে যেতো । ও তো সেটাই চায় না । ওকে আগে বোঝান ।’ দীপার কানে এসে কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিলো, শব্দগুলো ক্রমশ দ্রুত দূরে সরে সরে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছে দূর থেকে তাকে কেউ অস্পষ্ট উচ্চারণে কিছু বলছে । মনে হলো কেউ বলছে, ‘মেয়েদের ইচ্ছা পতির ইচ্ছার স্রোতে না বইলেই চরা পড়ে যায় নদীতে । সন্তান সেই চরের ফসল হয়ে ভূমির সঙ্গে নদীকে টেনে রাখে । পুরোন দিনের লোকেরা তাই বলতেন – ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে’ ।
একা একা বালুর উপর হাঁটতে হাঁটতে দীপা নদীচরের বুকের চাষ জমির দিকে যায় । পলিমাটি এখানে উজার করে দিয়েছে সবুজ শস্যে। অনেকটা জায়গা জুড়ে সবুজ, লঙ্কা চাষ হয়েছে একদিকে, যেখানে শুধুই বালু সেখানে তরমুজের লতা ছেয়ে আছে । এর মাঝে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কার্জকারণ ছাড়াই তার রাম চণ্ডালের কথা মনে পড়ে । শ্মশান চণ্ডাল রাম একটা মৃতদেহ গোপনে পুড়িয়েছিল । সেই নিয়ে পরে থানা-পুলিশ হয়, ব্যাপারটা আইন আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এই কেসের কারণে রাম আদালতে এলে মাঝে মাঝে এসে দীপার সঙ্গে গল্প করতো । উদ্ভট সেই সব গল্প, যেগুল সে সত্যি ভাবতো । যে মৃতদেহটি সে গোপনে পুড়িয়েছিল সেটি ছিল বিশু মস্তানের বৌয়ের, পোয়াতি ছিল মেয়েটি। পুড়িয়ে ফেলার আগে কয়েকদিন মৃতদেহটি কলাপাতা আর চাটাইয়ে পেঁচানো ছিল । সেই পচা লাশ পোড়ানোর আগে দুই বোতল দেশি মদ সেভেন্টি গিলতে হয়েছিল তাকে । কেরোসিন তেলে চুবিয়ে সেই পচা লাশে আগুন দেওয়ার পর এক আশ্চার্য দৃশ্য দেখেছিলো রাম । লাল গালিচায় চড়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে বিশু মস্তানের পোয়াতি বৌ । মেঘের সঙ্গে ঘসা খেয়ে মাঝে মাঝে দেহটা কাঁপছে, বিদ্যুতের মত ঝলকে উঠছিলো রূপালী আলোর রেখা । রামের ভয় হচ্ছিলো – যদি আকাশ থেকে পড়ে যায় মরাটা ! রামের মুখে তার গল্প শেষ হওয়ার আগেই দীপার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উকিলেরা হো হো করে হেসে ওঠে । দীপার কিন্তু হাসি পায় না । অলৌকিক বিশ্বাসভরা পুঁথি-পাঠহীন রামের চোখের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে চায় আকাশে ভেসে যাওয়া উড়ন্ত লালা কার্পেট । মৃত স্ত্রীরা হয়তো এভাবেই আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হয়ে মেঘের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে বিদ্যুতের আলো মেখে উড়ে যায় বেহস্তের দিকে । রামের বিশ্বাসকে আশেপাশের মানুষগুলো বিশ্বাস করে না । দীপার কাছে এই অশিক্ষিত চণ্ডালের মনে গেঁথে থাকা স্মৃতি তাই বলে মিথ্যা হয়ে যায় না । প্রত্যেকে তাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহ আকাশে ভাসিয়ে দিতে চায়, স্বর্গের দিকে, অন্যদের মতো তারা এটা বিশ্বাস করে ।
তিস্তার পার থেকে তারা ফিরে আসে । হাসপাতালের সামনে এসে দীপা গাড়ি থেকে নেমে গেল । গোপার সঙ্গে দেখা করবে, ওর সেই স্কুলের বন্ধু, এখন হাসপাতালে নার্সের কাজ করে । গোপারও বাবা নেই, ওর যখন বারো বছর তখন ওর বাবা বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হন । গোপা তখন ক্লাস এইটে পড়ে । স্কুল থেকে কলেজ, বি এস সি পাশ করে । এরপর নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা করে এখন সরকারি হাসপাতালের নার্স । গোপা একদিন দীপাকে বলছিলো, ‘আমি প্রায় প্রতিদিন কতো বিষ খাওয়া, পয়জন কেসের রুগীর পরিচর্যা করি । এদের বাঁচিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি । এই পেশেন্টদের যখন দেখি সেই সময় প্রতিবার বাবার কথা মনে হয় । হাসপাতালের সেই বেডটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, যেখানে বাবাকে এনে শোয়ানো হয়েছিল । আমি থাকলে হয়তো বাবাকে মরতে দিতাম না ।’ গোপার দুই চোখ কান্নায় ছলছল করে ওঠে, তাঁর দু’হাত জড়িয়ে কেঁদে ফেলে দীপা । ওর মনে পড়ছিলো জন্মেজয় পুত্র রাজা পরীক্ষিৎ এবং ঋষি কাশ্যপের কথা । তক্ষকের মহাবিষে মৃত্যুপথযাত্রী রাজাকে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে আনার শক্তির, জ্ঞানের প্রয়োগ না করে ঘাতক তক্ষকের অনুরোধে মধ্যপথ থেকে ফিরে যাচ্ছেন ঋষি । দীপার কাছে তখন ন্যায় অন্যায়ের সামাজিক বুনন তছনছ হয়ে যায় । নিজের শরীরে তক্ষকের বিষের জ্বলা অনুভব করে, জীবন-মৃত্যুর শাসন অগ্রাহ্য করে একবার গোত্রের শাসনের টুটি চিপে ধরে জবাব চাইতে ইচ্ছে করে । দীপা অনুভব করে চারদিকে ধু ধু বালুচর, নদীর গরম বালুতে মুখ গুজে পরে আছে সে । নদী বাঁধের শাসনের ফলে একসময়ের বহতা ওই নদী শুকিয়ে জেগে ওঠা এই বালুচর ।
আজ গোপার কাছে দু-দন্ড থাকতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে তাঁর, পিতৃহীন দুই সন্তান । বাবাকে নিয়ে দীপার চিন্তায়, স্বপ্নে, গল্পে কোনো শব্দ নেই । পিতৃহীন দুই সন্তান – একজনের বুক টনটন করছে বাবার জন্য । অন্যজন, জলহীন তিস্তা চরের ভেতর খুঁজে পেতে চাইছে এক চোরা স্রোত, হারানো জল । নদীও হয়তো দুই ধারে জল ও সবুজ শষ্য নিয়ে কোন স্রোতের অপেক্ষায় থাকে । বৃষ্টির অপেক্ষায়…












































