“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ
সেখানে সব চুপ,
সেখানে কথা চলে না।
সেই মস্ত চুপকে
বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়।
অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে
বাঁশি বাজে না।”
বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা বললাম, কারণ, এ যে গদ্য নাকি কবিতা তা নিয়ে বিস্তর মত চালাচালি হয়েছে পণ্ডিতদের মধ্যে। বইয়ে টানা গদ্যে ছাপা হয়েছিল এই লাইনগুলি, যাতে দেখলে মনে হয় গদ্য। কিন্তু, পড়তে গিয়ে বোঝা যায় এই অংশটির গঠন গদ্যের, কিন্তু চালটি কবিতার। আমি চারিদিকেই একটু স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি পাঠকদের সামনে। বিন্যাস একটু অদলবদল করে কবিতার মতো করে সাজিয়ে দিয়েছি লাইনগুলি।
নিশ্চিত পাঠকদের অনেকেই কবিতার মতো সাজানো এই লাইনগুলি পড়ে নিশ্চিত ভেবে নিয়েছেন যে, এ তো কবিতাই!
সত্যিই কোনো কোনো লেখার সামনে দাঁড়ালে নির্ণয় করা মুশকিল হয়ে যায় এ গদ্য, নাকি কবিতা? “লিপিকা”র অনেক লেখাই সেরকম। পণ্ডিতদের বললে তাঁরা অবশ্য গদ্য আর কবিতার মধ্যে অনেক পার্থক্য পরপর সাজিয়ে দিতে পারেন। যেমন তাঁরা বলতে পারেন যে, গঠনগত দিক থেকে গদ্য সাধারণত বাক্য, অনুচ্ছেদ এবং ধারাবাহিক বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। কবিতার ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা অপরিহার্য নয়। কবিতা পঙ্ক্তি, স্তবক, বিরতি, পুনরাবৃত্তি, ধ্বনি ও দৃশ্যমান বিন্যাসের সাহায্যে নিজের কাঠামো তৈরি করতে পারে। ফলে, কবিতায় একটি শব্দ বা পঙ্ক্তিও অনেক সময় কবিতাটির পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে পারে। গদ্যে এ কাজ করা প্রায় অসম্ভব। পণ্ডিতেরা এও বলতে পারেন যে, ভাষার ব্যবহারেও গদ্য ও কবিতার পার্থক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গদ্যে ভাষা সাধারণত বক্তব্য, বর্ণনা, বিশ্লেষণ বা কাহিনি নির্মাণের বাহন। কবিতায় কিন্তু অনেক সময় ভাষাই কবিতা। গদ্যের একটি শব্দকে অনেক সময় আরেকটি সমার্থক শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে গদ্যটির শরীর বা অর্থের তেমন বড়ো ক্ষতি হয় না। কবিতার একটি শব্দকে সমার্থক শব্দ দিয়ে পালটে দিলে কিন্তু কখনো-কখনো সেই পঙ্ক্তির সৌন্দর্য মলিন হতে পারে, আক্রান্ত হতে পারে অর্থ। পণ্ডিতেরা এও বলবেন যে, এমনকি গদ্যছন্দে রচিত কবিতার ক্ষেত্রেও ছন্দ ও ধ্বনির ভূমিকা কবিতায় সাধারণত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর পদ্যছন্দের ক্ষেত্রে তো অনেক সময় অনেক কবিতা কেবলমাত্র ছন্দের দোলা আর দুরন্ত অন্ত্যমিলের জন্যই ভালো লেগে যায়। মনেও থাকে। গদ্যে এ কাজটি করা প্রায় অসম্ভব। এভাবে গদ্য এবং কবিতার মধ্যে পার্থক্যের তালিকাটি বাড়ানো যেতেই পারে। সে পথে না হাঁটাই বরং ভালো। কারণ, অনেক সময়ই গদ্য এবং কবিতার এই পার্থক্যগুলি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। গদ্য ও কবিতাকে আলাদা করার জন্য যদি দুইয়ের মধ্যে আমরা বেঁধে দিই বাঁধ তাহলে অনেক সময় এসে বাঁধ হয়ে পড়ে বালির বাঁধ, যদি তুলি দেওয়াল, সে দেওয়ালে এত অসংখ্য ফাঁকফোকর থাকে যে প্রায়ই এধারের জিনিস ওধারে আর ওধারের জিনিস এধারে চলে যায়। গদ্য আর কবিতা তাই অনেকটা একই পাঁচিল দিয়ে আলাদা করে রাখা দুই প্রতিবেশীর ঘরের মতো। এক ঘরের জিনিস কখন যে অন্য ঘরে চলে গেছে ভালো করে ঠাহর না করলে বোঝা যায় না। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে একথা যেমন রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সত্য। ওঁদের গদ্যের অনেক অংশই পড়লে মনে হয় যেন কবিতা পড়ছি। এখানে বলে রাখা ভালো যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দু-জনেই কিন্তু কবিতাও লিখতেন।
এইবার একটি কথা সাহস করে বলে ফেলি। যেহেতু নিজে গদ্য আর কবিতা দুইই লেখার চেষ্টা করে থাকি, তাই মনে হয় গদ্য না পড়েও উত্তম কবিতা লেখা সম্ভব; কেবল কবিতা পড়েই কবিতা লেখার কৃৎকৌশল শিখে ফেলা সম্ভব। কিন্তু কবিতা না পড়ে কিছুতেই উচ্চমানের গদ্য লেখা সম্ভব নয়। জয় গোস্বামীকে একবার একটি সাক্ষাৎকারে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “যদি একটুও বানিয়ে না বলি তবে স্বীকার করতেই হয় — গদ্য, অর্থাৎ যাকে বলে বাংলা গদ্য, তা আমি পড়ি-ই না। কবিতা পড়ি। সব কবিতা”। শুধু এটুকুই নয়। সন্দীপন এটিও বলেছিলেন, “কবিদের সংস্পর্শে এসেই গদ্য লিখতে পেরেছি। শুধু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়লে লিখতে পারতাম না। জীবনানন্দ দাশ পড়ে তবেই গদ্য লিখতে পেরেছি”। কাজেই গদ্য আর কবিতার মধ্যে যদি প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে বেশি উত্তম এই প্রশ্নে, আমি কবিতাকে অল্প একটু বেশি নম্বর দেব। এটিও খেয়াল করে দেখেছি যে, অন্তত বাংলা সাহিত্যে যাঁরা গদ্য ও কবিতা দু-টিই সমান দক্ষতায় লিখতে সক্ষম তাঁদের আমরা সাধারণত ‘কবি’ সম্বোধনই করে থাকি। যেমন রবীন্দ্রনাথ, যেমন জীবনানন্দ। বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে এঁদের মুখ্য পরিচয়টি হয়ে গেছে কিন্তু কবির।
এ লেখায় কবিদের দিকে ঝোল একটু বেশি টেনে নিলাম বটে, কিন্তু একেবারেই ছোটো করতে চাই না গদ্যকারদের। এও সত্য গদ্যকাররা যেমন গদ্যের মধ্যে হামেশাই প্রবেশ করিয়ে দেন কবিতা, তেমনই বিশেষ করে অ্যান্টি পোয়েট্রির ক্ষেত্রে হামেশাই কবিতার শরীরে আসন বিছিয়ে বেশ জাঁকিয়ে বসে পড়ে গদ্য। আসলে ওই যে বললাম, কখনো-কখনো এমন লেখা আমাদের সামনে এসে পড়ে যেটি গদ্য না কবিতা তা নির্ণয় করাই কঠিন হয়ে যায়। সন্দীপন এই সত্যটি বিলক্ষণ জানতেন বলেই মাঝে মাঝেই সন্দীপনীয় দুষ্টুমিও করে গেছেন। এই লেখার শুরুতে পাঠক ঠকানোর যে-খেলাটা আমি খেলেছি, সেই খেলায় আমার শিক্ষাগুরু আসলে সন্দীপনই। অনেকেই জানেন না যে সন্দীপনের প্রয়াণের পর তাঁর কবিতাগুলি নিয়ে “ঈশ্বর ও জ্যোৎস্না” নামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ পায়। এই পুস্তিকায় প্রকাশিত একটি কবিতার নাম ‘ভালোবাসা’। কবিতাটি এইরকম:
ভালোবাসা জেগে উঠলে নির্বুদ্ধি স্তূপাকার হতে থাকে। আজ
সেই পরিত্রাতা নির্বোধ আর নেই, আজ সিংহাসন জুড়ে বসে আছে ভারী ও বৃহৎ
মস্তিষ্ক, হৃদয়ের সাধ্য নেই তাকে নামায়।
আজ কে কার আসনে বসে আছে।
মজার কথাটি হল এই যে, প্রতিক্ষণ প্রকাশিত “সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চাশটি গল্প”-এ এই লেখাটিই ‘কয়েকটি শিরোনামা-২’-এর অংশ হিসেবে প্রকাশিত। হবহু এই লেখাটিই। তবে সেখানে কবিতার এই গঠনটি আর নেই। তাকে ভেঙে সন্দীপন টানা গদ্যের রূপ দিয়ে দিয়েছেন পাঠককে বোঝাতে যে, এইখানে কবিতা উচ্চারণের স্বাদ পাঠক পেলেও একে পড়তে হবে গদ্যের মতোই। আমার ধারণা এই জিনিস জীবনানন্দ দাশও করেছেন। এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন গৌতম মিত্র। গৌতমদা, আপনার থেকে এই বিষয়ে একটি লেখা কি পেতে পারি না আমরা?






























































