অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক।
নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক অনুশাসনকে মান্যতা দিলেও নিজের মধ্যে প্রতিবাদের জায়গাটা তারা ধরে রেখেছে। তাঁর ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ উপন্যাসে সতীর প্রতিবাদী মনোভাব চরিত্রটিকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছে। সতীকে বিবাহে প্রত্যাখ্যান করেছিল যে বিশ্বেশ্বর, তার উদ্দেশ্যে সতী মৃত্যুপূর্বে লিখেছিল – ‘এই অধম জাতিকেই একদিন তুমি ভালবাসিবে, এ অধম জাতি বুকের মধ্যে কতখানি সমুদ্র লুকাইয়া রাখে, একদিন তাহা মর্মে মর্মে বুঝিবে। সেদিন স্বীকার করিবে, সংসারে সেই স্নেহের আদান-প্রদানই একমাত্র শ্রেষ্ঠ সুখ’।
১৯৫৩ সালে নিরুপমা দেবীর ‘শ্যামলী’ উপন্যাস নিয়ে তৈরি হল ‘শ্যামলী’ নাটক, যে নাটক বাংলা থিয়েটারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ও ‘শ্যামলী’-র সফল চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে। কিন্তু নিরূপমা দেবী আজ বিস্মৃতপ্রায় এক লেখক হয়েই রয়ে গেছেন। যদিও তাঁর লেখা সেই সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
স্বর্ণকুমারী দেবীর উৎসাহে অনেক বাঙালি মেয়েই সেই সময়ে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় পা ফেলতে শুরু করেন। তৎকালীন ‘ভারতী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘প্রবাসী’র মতো সাহিত্য পত্রিকায় এঁদের সাহিত্যকর্মের নিদর্শন রয়ে গিয়েছে। প্রসন্নকুমারী দেবী, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, মানকুমারী, কামিনী রায়, সরলা দেবীরা সাহিত্যসাধিকা হিসেবেই আজও স্বীকৃত। এঁদেরই উত্তরসূরি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ ঘটেছিল নিরুপমার।
বালবিধবা হয়ে নিরুপমার জীবনে যখন বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তখন তাঁর ‘গঙ্গাজল সই’ অনুরূপা দেবী তাঁকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনেন। অনুরূপাদেবীর চিঠিতেই প্রথম উপলব্ধি করলেন নিরুপমা, বৈধব্য মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়। এবং এক আধুনিক মননের জন্ম হয়। বাংলা সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরে মনের জানালাগুলো খুলে দিয়েছিলেন নিরুপমা দেবী, ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন অনন্য এক সাহিত্যিক।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরামর্শে ‘ছায়া’ নামে একটি হাতে লেখা কাগজ প্রকাশ করা হত। নিরুপমা দেবীর অনেক লেখা ছাপা হয়েছিল সেই ‘ছায়া’ পত্রিকায়। নিরুপমার লেখা পাঠকের দরবারে পৌঁছাতে শুরু করলেও বিভিন্ন কারণেই নিজ নামের পরিবর্তে ছদ্মনামের আশ্রয় নিলেন। কখনও শ্রীমতী দেবী আবার কখনও অনুপমা দেবী নামে লিখতে লাগলেন ‘ছায়া’য়। এই পর্বেই হাতেখড়ি হল ছোটগল্পে।
কবিতা লিখতে লিখতে এক দিন নিরুপমা লিখে ফেলেছিলেন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ গল্পটি। প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্ব তার উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। ১৯১৯-২০ সালের ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দিদি’ তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে স্বীকৃত। নিরুপমা দেবীর উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহের মধ্যে ‘দিদি’, ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’, ‘শ্যামলী’, ‘আলেয়া’, ‘বিধিলিপি’, ‘যুগান্তরের কথা’, ‘অনুকর্ষ’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনার প্রধান বিষয় গ্রামীণ জীবন, বিশেষ করে নারী-জীবনের আনন্দ-বেদনা, পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভৃতি। গদ্যশৈলীতে নিরূপমার রচনা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য।
সেইসময় নিরুপমা দেবী খুবই বিখ্যাত হয়েছিলেন, সম্ভবত তাঁর ‘দিদি’ উপন্যাসের কারণে। ‘দিদি’ উপন্যাসে মেসের সহায়িকাকে শিক্ষিতা চরিত্র করে জায়ের ছেলেকে নিজের ছেলের মতন ভালোবাসিয়ে, জায়ে জায়ে ভাব দেখিয়ে, দেওরকে পুত্রের মতন স্নেহ করিয়ে, জায়ের বৈমাত্রেয় ভাইকে পুত্রের মতন ভালোবাসিয়ে নজর কেড়েছিলেন। গল্প বলার দক্ষতা এবং ভাষার জাদু ছিল তাঁর লেখনীতে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে নিরুপমা দেবীর শক্তিশালী এবং মর্মস্পর্শী এই উপন্যাস ‘দিদি’ সমঅধিকারের জন্য লড়াইয়ে নারীদের সংগ্রামগুলিকে তুলে ধরেছে। সেখানে সুরমা নামে একজন বিবাহিত মহিলা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার অন্তরের অস্থিরতা এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠেন। উপন্যাসটি বিধবাদের মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজে তাদের কঠোর বাস্তবতাকেও স্পর্শ করে। নিরুপমা দেবী এই উপন্যাসে সুবিন্যস্তভাবে চরিত্রগুলি উপস্থাপনা করেছিলেন। উপন্যাসটিতে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সন্ধান করেছেন লেখক, যেমন প্রেমের গভীর ঐতিহ্যবাহী বিষয়ের পাশাপাশি তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বৈধব্যের সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে নারীরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। নিরুপমা দেবীর গদ্যশৈলী এবং ভাষা উপন্যাসকে জীবন্ত করে তুলেছে।
‘দিদি’-র পরবর্তী উপন্যাসগুলিতেও নিরুপমা দেবী তাঁর শক্তিশালী ও ধারালো কলমের পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ তৎকালীন বাঙালি মেয়ের বাস্তব দুর্দশার কথা, ‘বিধিলিপি’-তে প্রৌঢ় ব্যক্তির সঙ্গে তরুণীর প্রেম, ‘অনুকর্ষ’-এ গুরুর প্রতি তরুণী শিষ্যার প্রেমকাহিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা অত সহজ ছিল না সেই সময়।
১৯০৪ সালে ‘অনুপমাদেবী’ ছদ্মনামে নিরুপমা দেবী গল্প লিখে কুন্তলীন পুরস্কার পান। ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ভুবনমোহিনী’ স্বর্ণপদক ও ১৯৪৩ সালে ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে। নিরুপমা দেবীর সাহিত্যসঙ্গী ছিলেন অনুরূপা দেবী (গঙ্গাজল সই), ইন্দিরা দেবী (ওপোদিদি), হেমনলিনী দেবী, সুষমা সিংহ।
১৯২৭ সালের পরে দীর্ঘকাল নিরুপমা দেবীর কোনো উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি। তখন তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজ উন্নয়নের কাজে নিজেকে নিমজ্জিত করেছিলেন, আইন অমান্য আন্দোলনে পতাকা কাঁধে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বিপ্লবীদের পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের বাড়িতে লুকিয়েও রেখেছিলেন। নারীশিক্ষার জন্য বন্ধু সুষমা সিংহকে নিয়ে রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ ভিক্ষা করে বহরমপুরে মেয়েদের জন্য শুরু করেছিলেন ‘কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়’। তাঁর কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র বহরমপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মহিলা কংগ্রেসে যোগ দিতে কলকাতার টাউন হলে এসে বিধবা-বিবাহের প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁদের হয়ে স্বর তুলছিলেন। দীর্ঘ ১৩ বছর পরে নিরুপমা দেবী সাহিত্যজগতে ফিরে আসেন ‘যুগান্তরের কথা’ (১৯৪০) ও ১৯৪১ সালে ‘অনুকর্ষ’ – এই দুটি উপন্যাসের মাধ্যমে।
নিরুপমা দেবীর সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে জ্যোতির্ময়ী দেবী লিখেছিলেন, ‘বিধবাদের জগতে সব সময়েই দ্বিধাদ্বন্দ্ব, পরমুখাপেক্ষা, অসাধারণ সঙ্কোচ। চারিদিকেই একটি স্বর্গীয় ব্যক্তি অভিভাবকত্বের স্থান নিতেন। রক্ষণাবেক্ষণ করতেন স্বয়ং নিযুক্ত সমাজপতি ও কর্তৃপক্ষের দল। এ একটি প্রতিদিনের কঠিন দৃষ্টির বিচারশালার জগৎ। তবু সেই জগৎ থেকেই নিরুপমা দেবী নিয়ে এলেন তাঁর সাহিত্যের পসরা। …যেখানে কোনও কিছুরই চমক নেই। …স্নিগ্ধ ভাষায় ঘরোয়া সমাজের ছোট বড় সুখ দুঃখের কাহিনী ও ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাস ও গল্প’।
বাংলা সাহিত্যের আজ যে বিস্তৃতি তার জন্য তৎকালীন মহিলাদের ভূমিকা কিছুমাত্র কম নয়, অথচ সেই সময়ে বাংলা সাহিত্যে মহিলা-সাহিত্যিকদের প্রবেশের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সেই সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাঙালি নারী ও বাংলা সাহিত্য যে অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছে, তাঁর কারণ নারীকে আত্মবিকাশ ও সংস্কারমুক্তির পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন নিরূপমা দেবীর মতন মহীয়সীরা, তাঁদের চিন্তার গতিপ্রকৃতি এবং সাহিত্যকর্মই আমাদের উজ্জ্বল প্রেরণা।






























































