কানুর বিয়ে/সুবর্ণা মণ্ডল

কানুর সেদিন খুব কান চুলকাচ্ছিল। আগের দিনের যে পায়রাটা হাত থেকে ফসকে গিয়ে শুধু একটা পালক রেখে গেল, কানু সেই পালক কানে ঢুকিয়ে আরামে চোখ যেই না বুজেছে অমনি বাপের চিল চিৎকার, “হ্যাঁ নবাব আমার, কানে পালক গুঁজেই থাকো। যা বয়স বাড়ছে এরপর আর মেয়ে জুটবে না কপালে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যা। নবাবপুত্তুরের যা ভুঁড়ি। মেয়ের বাড়ি রাজি হয়েছে তোর কপাল ভালো!”
বাপ অপমান করার কোনো সুযোগ জীবনে কোনোদিন ছাড়েনি। আজই বা ছাড়বে কেন? কানুর বিয়েতে মত নেই। ভুঁড়ি নিয়েই চলা ভার। সঙ্গে আবার বউ। কানুর ভুঁড়ি গোটা গাঁয়ে বিখ্যাত। মাঝে মাঝে গ‌্রামের মেলায় কানুর ডাক পড়ে। কানু খাটিয়ায় শুয়ে থাকে আর বাচ্চারা ওর ভুঁড়ির উপর চড়ে দোল খায়। সে এমন ভুঁড়ি যে খাটিয়ার এক প‌্রান্ত থেকে আরেক প‌্রান্তে বাচ্চা দুলে দুলে ঘুমিয়েই পড়ে। নাগরদোলার প‌্রয়োজনই হয় না। নরম তুলতুলে ভুঁড়ি। কানুর একটু লজ্জা লজ্জা করে ঠিকই। কিন্তু ক্লান্ত বাপ-মা বাচ্চার থেকে খানিক রেহাই পেয়ে পয়সা ভালোই দেয়।

মা এসে কানুর কানে কানে বলে ‘মেয়েটা বেশ সুন্দর রে। ভালো বাড়ি ঘর। আমাদের ক্ষেত খামার আছে। জমি আছে। ছাগল গরু সবই আছে। তোর চিন্তা কি এতো ? বউ এলে বাড়ি কেমন আলো আলো হবে ভাব!”

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে সেদিন। দূরে মাচার মাথার উপর ঘন কালো মেঘ। আর তার সামনের ভেড়ির জলে মেঘ আর বাঁশের মাচার ছায়া – হাওয়ায় দুলে চলেছে। নরম তুলতুলে।
কানুর মনটাও কেমন যেন নরম নরম হল। উদাস হাওয়া। উদাস মন। দিল হ্যাঁ বলে। যা থাকে কপালে। হ্যাঁ বলার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির সামনে বাঁধা ছাগলটা ‘ম্যাঁ’ করে উঠল। কানুর মনটা কেমন কু ডাক দিল, ‘ঠিক করলাম? এই সব বিয়ে-থার ঝক্কি আমার একদম পোশায় না। কোথাও শান্তি থাকবে না। উঠতে বসতে জাগতে ঘুমোতে একজন চোখের সামনে ঘুরঘুর করবে এ এক অস্বস্তির ব্যাপার। তার মধ্যে যদি পিটপিটে হয় তাহলে তো রক্ষা নেই।’

‘হাই তুললে কেন?’ ‘নাক ডাকলে কেন?’ ‘মুখে হাত না দিয়ে হাঁচলে কেন?’ ‘পেছন থেকে জোরে আওয়াজ বেরলো কেন?’ ‘রুমাল ছাড়া কাশলে কেন?’ এই সব কৈফিয়ত দিতে দিতেই না প‌্রাণ যায়। আবার যদি এসে বলে ‘ব্যায়াম করো, শরীর চর্চা করো, পুষ্টিকর খাবার খাও, রোজ হাঁটো। যা ভুঁড়ি তোমার! বাপের বাড়ির লোক দেখে হাসে। পরের জামাই ষষ্ঠীর আগে যদি ভুঁড়ি না কমে তাহলে আর সম্পর্ক থাকবে না।’ ব্যাস, তাহলে তো এমনিতেই ছাড়াছাড়ি অবধারিত। এই সব দুশ্চিন্তা করতে করতে বিয়ের দিন চলে এল। সেদিনটাও ভারি অদ্ভুত। ঝোড়ো হাওয়া, আর হাল্কা বৃষ্টি সকাল থেকে। বাড়ির গায়ে লাগানো কামিনী ফুলের গাছে সেদিন সাদা ফুলে ভরা। যেই না হাওয়ার ঝাপটা দেয়, কুচি কুচি সাদা পাপড়িতে বাড়ির দাওয়া ভরে যায়। ফুলের গন্ধ হাল্কা কানুর নাকে আসে। ইচ্ছা অনিচ্ছা মিলিয়েই কেমন একটা দলা পাকানো মন নিয়ে বিয়ে করতে যায় কানু। তিন গ‌্রাম পেরিয়ে কানুর শ্বশুরবাড়ি। কানু ধীরে ধীরে হবু বউয়ের নাম আওড়ায়। সলাজনয়নী। প‌্রথম দিন নাম শুনে কানুর একটু যেন ভালো ভালো লাগে। নাম যেন জিভে সয়ে যায়, তাই কানু মাঝেমধ্যেই সলাজনয়নী বলে বলে জিভের জড়তা কাটায়। আহা কী সুন্দর নাম। তারপরই কানু যায় দমে। সলাজনয়নীর পাশে কানু ! হে ভগবান ! নামের পেছনে বাপ-মা তার দু মুহূর্তও নষ্ট করেনি। মা বলে, তোর কানগুলো এতো বড়ো বড়ো ছিল যে আর কোনো নাম মাথায় আসেনি। তাই বলে কানু? কানই যখন মাথায় এল তাহলে অন্তত কাঞ্চন তো রাখতে পারত! যাক! আর কী করা।

বিয়ে মিটল ঠিকই। কিন্তু অতো লোকের মাঝে কানুর জাবড় কাটতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল। মুখটা যতটা সম্ভব কম নাড়িয়ে জাবড় কাটতে হচ্ছিল। এই ভাবে জাবড় কাটার অভ্যেস নেই কানুর। বাড়িতে তো কোনো সমস্যা নেই। মা বাবা জানে। মা কানুকে বলেছিল ‘প‌্রথম প‌্রথম তোর বাবা আর আমি যা ভয় পেয়েছিলাম। দুধ ছেড়ে যেই না খাবার ধরলি দেখি সবসময় তোর মুখ চলে। সকাল নেই বিকেল নেই রাত নেই তোর মুখের বিশ্রাম নেই। রান্নাঘরে গিয়ে কাচা আলু, শাক, সব্জি সব খেয়ে ফেলতি। কতো মার খেয়েছিস। তাও শিক্ষা নেই। বাড়ির গরু বাছুরের প‌্রায় না খেয়ে মরার জোগাড়। ওদের ভুসি জাবনা তো সব তুই চুরি করে খেয়ে নিতি! ওদিকে মাছ মাংস মুখে তুলতি না। আমি আর তোর বাবা তো ভেবে কুল পাই না। গ‌্রামের ডাক্তার কিছু করতে পারল না। তারপর কলকাতায় গিয়ে হাসপাতালে বড়ো ডাক্তার দেখালাম। তোকে কি একটা মেশিনে ঢুকিয়ে তোর পেটের বুকের ছবি তুলল। তারপর তো তাদের হৈহৈ কাণ্ড। আমাদের ডেকে বলল তোর পাকস্থলীতে নাকি চারটে আলাদা আলাদা খোপ আছে। গরুর মতো। তার মধ্যে একটা আবার বিশাল বড়ো। পরের দিন তোকে নিয়ে বড়ো মিটিং বসবে জানাল। সেদিন রাতেই তোকে নিয়ে আমরা পালিয়ে এলাম। লোক হাসিয়ে কাজ কী ! দুঃখ কি হয়নি। এমন ভালো পড়াশোনায় তুই। তাও শহরে পড়তে পাঠালাম না। বাবা বলে কাজ নেই ওই সবের। কোন সময় ডাক্তারদের কাছে ধরা পড়ে যাবে। তারপর কি না কি হবে। তার থেকে ঘরের ছেলে ঘরেই থাক।’

কানুর সাত পাক ঘোরা আর যজ্ঞের আগুনের ঝাঁঝের মধ্যে এই সব পুরোনো কথা মাথায় ঘুরতে থাকে। মালা বদল আর সিঁদুর দানের একটু ফাঁকে তালে কানু তার বউকে দেখে নেয়। ছোট্ট একটা মুখ। গোল মতো। ছোটখাটো গড়ন। কানুর বেশ পছন্দই হয়। কানুর থেকে মেয়েটির বয়স একটু বেশি। ওদের গ্রামে বর বউয়ের বয়সের ফারাক থাকে বেশ খানিকটা। বর বড়ো। বউ ছোটো। এই নাকি নিয়ম। তা কে বানাল এমন নিয়ম কে জানে। কানুর মা বাবা বয়স নিয়ে একটুও মাথা ঘামায়নি। মেয়েটির মুখখানি এমন মায়া মায়া যে কানুর মা বাবার দেখেই পছন্দ হয়ে যায়। আর বয়স নিয়ে খুঁতখুঁত করলে হয়? তাদের নিজের ছেলের তো চারটে পাকস্থলী।

বিয়ে হয়। রাতের খাওয়া ভালোই হয়। মেয়ের বাড়ি জানে যে জামাই নিরামিষাশী। ভাত ডাল ভাজা শুক্তো ছানার ডালনা মিষ্টি কানু সবই খায়। রাতে মেয়ের বাড়িতেই থাকার নিয়ম। এবার কানুর হয় বিপদ। কানু জাবর কাটবে কী করে? নিজেকেই নিজে দুষতে থাকে কানু। পেটের মতো বুদ্ধিও যেন গরুর পেয়েছে! সে তো জানত যে রাতে এখানেই থাকতে হবে। তাহলে একটু রয়ে সয়ে অল্প করে খায় তো মানুষ, নাকি? কানুর ওই এক স্বভাব। খাবার দেখলে আর রক্ষে নেই। আর কাঁচা সব্জি দেখে যে কী ভাবে লোকসমাজে নিজের লোভ সামলায় তা কানুই জানে। তা এতো যখন বুদ্ধি, কম খেলে কি হত এক রাত? কানুর নিজেরই নিজেকে মারতে ইচ্ছে করে। এদিকে মেয়ের বাড়ির লোকজন তো বেশ আদর আপ্যায়ন করে চলে। জামাই তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে।পেট বড়ো ঠিকই তবে কানুর মুখখানা খুব সুন্দর। বড়ো বড়ো টানা টানা চোখ। আর মুখে সব সময় হাসি।

কানুর মাথায় একটা ফন্দি আসে। তার যতবার জাবর কাটতে হয় সে ততোবার মাঠে ছোটে। ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে যায় আর মনের সুখে জাবর কেটে ফিরে আসে। শ্বশুরবাড়ির লোক ভাবে পেটটা বোধহয় খারাপ হল জামাইয়ের। একটু বাড়াবাড়ি খেয়েছে বলেই হয়ত। বাড়িতে বাথরুম আছে ঠিকই। কিন্তু এতো লোক। কেউ না কেউ বাথরুম আটকে বসে থাকে। তাই কানু ছোটে মাঠে। বউ চিন্তিত মুখে বরের দিকে তাকায় আর নিজের আঁচল মুখে ঢুকিয়ে কামড়ায়। মনে মনে ভাবে পেট রোগা বর জুটল নাকি। পরস্পরকে আড় চোখে দেখে। কানুর সেই সকালের সাদা ফুলগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে যেই একটু আনন্দ হয় অমনি কানুর আধ হজম হওয়া খাবার রুমেন (কানুর পাকস্থলীর সবচেয়ে বড়ো খোপ) থেকে সোজা মুখে ফিরে আসে। ব্যাস। কানু আবার ছোটে মাঠে।

ভোরের দিকে গান বাজনার শেষে কানু কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে দেখে ঘর ফাঁকা। বউ, বউয়ের আত্মীয় স্বজন কেউ নেই ঘরে। উঠতে গিয়ে একটা লাল কাপড়ের টুকরো চোখে পড়ে কানুর। বিছানার কোনায় কাপড়টা পড়ে আছে। কানু দেখে চিনতে পারে। বউয়ের আঁচলের একটা অংশ। কানু লজ্জা লজ্জা করে কাপড়টা তুলে নেয়। কিন্তু কাপড়টা দেখে কানুর চোখে জল আসে। মাঠে বারবার কানুর যাওয়া আসা দেখে, মেয়েটা চিন্তায় নিজের আঁচল দাঁত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। কানু মনে মনে আফসোস করে। ছিঃ ছিঃ এতো বড় একটা সত্যি লুকিয়ে তার বিয়েটা করা উচিত হয়নি। এ যে প‌্রতারণা!

কতদিন সে সত্যি লুকোবে? কেমন করেই বা লুকোবে? একদিন তো সলাজনয়নী জানবে সত্যিটা। ভেবেই কানুর কান্না পায়। তার তো আবার বউ খুব পছন্দ হয়েছে। সলাজনয়নীকে নিয়ে তার কিছু স্বপ্নও জমেছে। সে ঠিক করে যে ভাবেই হোক সে বউকে সুখে রাখবে। তার সঙ্গে ঝগড়া করবে না। তার সব কথা শুনবে। গ‌্রামের ছায়াবাণী সিনেমা হলে ছবি দেখাতে নিয়ে যাবে। ভালো ভালো মিষ্টি খাওয়াবে। মিষ্টির কথা ভাবতেই মাঠে ছুটতে হয়। তবে এবার আর জাবড় কাটতে নয়।

বাড়ি ফিরে কানু বউ নিয়ে একটু গ্রামে বেড়িয়ে আসে। সবাই খুশি। কানু একটু সরল। তাই গ‌্রামের সবাই কানুকে ভালোইবাসে। কানুর মা বাবা সলাজনয়নীর যত্ন আত্তি করে। সবাই খুবই খুশি। শুধু কানুর মনে শান্তি নেই। প‌্রথম রাতে বর বউ আলাদা শোয়। কাল রাত। বউ একা আলাদা একটা ঘরে শুয়ে পড়ে। পরের দিন সকালে সলাজনয়নী আর তার শ্বাশুড়ী কলতলার পাশে উনুনে ভাত রাঁধতে বসে। আম গাছের বিশাল ছায়া পড়ে তার উপর। বেলা বারোটায় সূর্য যখন মাঝ আকাশে, গাছের পাতার ছায়ার ফাঁক দিয়ে আসা রোদের আলোয় উনুনের চারদিক যেন ঝিকমিক করে। সলাজের মুখও সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শ্বাশুড়ী চাল ছড়িয়ে দেয় উনুনের চারপাশে। আর চড়ুই আসে কতো সেই চালের লোভে। সলাজও একটা একটা করে চাল খুঁটে খুঁটে খায় আর উনুনের ধোঁয়ার গন্ধ মুঠো করে নিয়ে নাকে ঠেকায়। কানু দূরে দাঁড়িয়ে দেখে। ভাতের ফ্যান আর উনুনের আঁচের গন্ধ লেগে থাকে নিশ্চই ওই হাতে।

‘কোন ব্যাটায় আমার গামছা চুরি করল।’ বাপের চিল চিৎকারে কানুর ঘোর কাটে। ‘নতুন গামছা। দু দিন হল হাট থেকে আনলাম। এই বাড়িতে কিছু রাখার জো টি নেই। যেমন মা তার তেমন পোলা। চোখগুলো কি হাটে বেচে এসেছ ? গামছা এই বেলা খুঁজে না দিলে রক্ষে রাখব না।’
বরের এই রোজের চিৎকারে অভ্যস্ত মা মুখ তুলেও তাকায় না। কিন্তু সলাজনয়নী ধরফর করে উঠে শ্বশুরের সামনে এসে হাজির হয়, ‘বাবা…, বাবা গো’ মিহি গলায় নতুন বউ ডাক দেয়। কানুর বাবা ততখনাৎ রাগ সামলে নেয়, ‘তোমায় বকিনি মা। এই দুজনকে বকা দিচ্ছি।’
‘বাবা গামছাটা আমি চিবিয়ে চিবিয়ে প‌্রায় খেয়ে ফেলেছি কাল রাতে।’ বলেই টপটপ করে জল পড়ে সলাজনয়নীর চোখ থেকে।
শ্বশুর ব্যস্ত হয়ে বলে ‘আহা মা! বেশ করেছ। বেশ করেছ! কাঁদে না মা।’ কানুর মাকে বলেন ‘মেয়েটাকে কাল একা শুতে দিলে। ভয়ের চোটে গামছা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে !’
মা তো শুনে অবাক ‘ও মা! ভয়ের চোটে গামছা চিবোবে কেন?’
‘তা ভয় পেলে মানুষ কতো কী করে! হেসে ফেলে, কেঁদে ফেলে, কামড়ে দেয়, মারধরও করে। ভয়ে মানুষ সব করতে পারে’ বলে বাবা আরও দু কথা শোনায়। মা মনে মনে ভাবে, ‘কপাল আমার। এতোদিন কাঁচা শাক সব্জি সামলাতাম, এখন দেখি কাপড় চোপড়ও চোখে চোখে রাখতে হবে। এ আবার কেমন ভয়! জন্মে শুনিনি।’

রাতে কানুর ওরকমই ভয় হয়। কী ভাবে রাতটা কাটাবে ভেবেই কানুর গায়ে কাঁটা দেয়। যদি সলাজনয়নী টের পেয়ে যায়। প‌্রথম রাতেই যদি ছেড়ে চলে যায়। ভয়ে চিন্তায় রাতে প‌্রায় কিছুই খায় না কানু। কিন্তু দুপুরের খাবার তো তখনও পেটে। রাতে দুজনে নিজেদের ঘরে যায়। আজ তাদের ফুলশয্যা। খাটের চারপাশে গাঁদা ফুল সাজানো। কানু ফুল খাওয়ার লোভ কোনোরকমে সামলে বউয়ের পাশে গিয়ে বসে। লজ্জা লজ্জা করে বলে, ‘তোমায় আমি সলাজ বলে ডাকতে পারি?’ সলাজনয়নী মাথা নিচু করে হ্যাঁ বলে। একটু একটু করে গল্প যেন জমে ওঠে। কতো কথা— স্কুল, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব। যেন বহুদিনের পুরোনো বন্ধু দুজনে। গল্প করতে করতে কানু এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। ফুল খাওযার কথা মনেও আসে না তার।

অনেক রাতে ক্ষিদেতে ঘুম ভাঙে কানুর। তারপর বোঝে ক্ষিদে নয় অন্য কোনো কারণে ঘুমটা ভেঙেছে। ঘর তখন অন্ধকার। গরম বলে পাশের জানলাটা খোলা ছিল। সেখান থেকে বাইরের ল্যাম্প পোস্টের এক ফালি আলো ঘরের এক কোনায় পড়েছে। তাই ঘরের ভিতরটা আবছা আলো আঁধার মতো। কানু একটা হাল্কা শব্দ শুনতে পায়। কুট কুট… কুট কুট…। সে বোঝে এই আওয়াজটাই তার ঘুম ভাঙার কারণ। কানু আস্তে আস্তে পাশ ফেরে। ফিরে দেখে পাশের জায়গা খালি। সলাজ তো নেই সেখানে। কানু উঠে বসে আবছা আলোয় দেখে সলাজ আলমারির গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে। কানুকে দেখেই সে চট করে কি যেন লুকিয়ে ফেলে। কানু বিছানা ছেড়ে নীচে নামে। সলাজের সামনে বসে। দুজন অনেক্ষণ চুপ করে থাকে। আর মাঝেমধ্যে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছু মুহূর্ত।

কানু কিন্তু একবারও জিজ্ঞেস করে না সলাজ তাকে দেখে কী লুকিয়েছে। হয়ত সেই জন্যেই সলাজ নিজে থেকেই লুকোনো কাপড়টা সামনে তুলে ধরে কানুর। আজ একটা সবুজ কাপড়। সারা কাপড়ে অসংখ্য ফুটো। কানুর আগের দিনের সেই লাল কাপড়টার কথা মনে পড়ে। সলাজ আস্তে আস্তে তার ঠোঁট ফাঁক করে তার মুখের ভিতরের দাঁত দেখায় কানুকে। ছুঁচলো। সরু সরু দু সারি দাঁত। সলাজ বলে ‘একবার আঙুল দিয়ে দেখো।’ কানুর গলা শুকিয়ে আসে। হাত অবশ হয়ে যায় কেমন। ভাবে ছুটে পালাবে কিনা ঘর থেকে। এ কাকে বিয়ে করল সে? তার চোখ আবার যায় সলাজের চোখের দিকে। কী কষ্ট সেই দুটো চোখে। চোখের কোনায় টলটল করছে জল। সলাজনয়নী নামটা মনে আসে। আহা কী সুন্দর নাম! কানুর ভয় কমে। সে তার আঙুল দিয়ে সলাজের দাঁত ছোঁয়। কী ধার সে দাঁতে!

সলাজ আস্তে আস্তে বলে ‘কর্তক দন্ত বা কৃন্তক।’ দু চোখ বেয়ে জল পড়ে সলাজের, ‘আমার দাঁতের কোনো শিকড় নেই। মানুষের দাঁতে তো শিকড় থাকে। আমার দাঁত বেড়েই চলে। রোজ। তাই আমাকে শক্ত কিছু চিবিয়ে যেতে হয়। রোজ। কাপড়, পিচবোর্ড, মোটা কাগজ, কাঠ, যা পাই তাই। তা নাহলে দাঁত বাড়তে থাকে। ছোটোবেলায় ডাক্তার জানিয়েছে যে আমার এগুলো ‘ইনসিসর’ । মানে আমার ইঁদুরের মতো দাঁত।’

পেটের মধ্যের রুমেন থেকে কানু নিশ্চিন্তে এবার দুপুরের খাবার মুখে এনে চিবোতে থাকে। আহ ! কী যে আরাম! সলাজকে পান চেবানোর মতো মুখ নাড়াতে নাড়াতে জানায়, ‘রুমেন, রেটিকুলাম, ওমাসাম, আবোমাসম। কী বলো তো?’
সলাজ চেয়ে থাকে। কানু হাসে, ‘কী, পারবে না তো? গরুর পাকস্থলীর চারটে অংশ। লোকে বলে গরুর চারটে পাকস্থলী। সে অবশ্য সঠিক তথ্য নয়। পাকস্থলী একটাই। তার চারটে খোপ আছে বলতে পারো।’

কানু সলাজের আঙুল নিয়ে নিজের নাভির একটু উপরে রেখে বলে ‘এখানে রুমেন।’ তারপর আঙুল গলার ঠিক নিচে নিয়ে আসে ‘এইটা রেটিকুলাম’। তারপর বুকের নিচের দিকে নিয়ে চলে, ‘এটা হল ওমাসাম। আর এই যে আবোমাসম’ বলে সলাজকে নাভির ঠিক নিচে অবস্থিত পাকস্থলীর শেষ অংশটা বোঝায়। বিজ্ঞের মতো কানু সলাজকে শেখায়, ‘আমার হল গরুর বা মোষের পাকস্থলী। খাবার অর্ধেক চিবিয়ে সোজা রুমেনে চালান করে দেই। সেখান থেকে পরে সময় মতো আবার মুখে ফিরিয়ে আনি। তারপর ভালো করে চব্য চোষ্য গিলে নিই।সেখান থেকে খাবারের দীর্ঘ যাত্রা। রেটিকুলাম হয়ে ওমাসাম পেরিয়ে আবোমাসমে পৌছে তারপর তার ছুটি।’

‘ও মা! তাই তোমার অমন ভুঁড়ি?’
‘আর তাই তোমার অমন মুক্তের মতো দাঁত?’
দুজনের সে কি খিলখিল করে হাসি।
বাইরে থেকে আসা ওই এক ফোঁটা হলদে ল্যাম্প পোস্টের আলো ওদের এই অদ্ভুত আনন্দের সাক্ষী রয়ে যায়। তারপর দুজনে নিশ্চিন্তে শুতে যায়।

আরও পড়ুন:

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা। এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা …

পড়ুন

পেরেস্ত্রোইকা/কস্তুরী সেন

অতল, আত্মবিস্মৃত, শেষত শেষ কাকে বলে ? উদ্বেগের পর উদ্বেগ, বিরতির পর পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেলা সাড়ে চারটেয় ধর্মতলা পেরিয়ে যাচ্ছে দুশো একুশ মাঝমাঠ, খাদ্য আন্দোলন, একদিন একদিন শহরে মানুষ পোড়ে, জিতে বেরিয়ে আসে হিমঋতু ‘এই যে ধাইন্যক্ষেত্র তা দ্যাখতে তো পয়সা লাগে না’ দেখতে দেখতে দেখে যাওয়া, মানুষের এলোমেলো ভিড়, সিগনালে আলো নিভে যায় সাবেক …

পড়ুন

তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন। তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান। আমার …

পড়ুন

বৃষ্টির দিন/কালীকৃষ্ণ গুহ

বৃষ্টির দিন ফুরোয় না কারো জীবন থেকে। বৃষ্টির দিনগুলি সব বিরহযাপনের দিন।   বিরহযাপন শেষ হয় না জীবনে।   কারো বিরহ কান্নার জন্ম দেয় কারো কাছে তা শুধু স্মৃতি হয়ে আসে।   এখন বৃষ্টির দিনে শুধু বাইরে তাকিয়ে চারদিকের গাছপালা ভিজতে দেখি। তাদের অনুচ্চারিত আনন্দ দেখতে পাই।   সেদিন একটা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা পাগলকে …

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার !  সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে …

পড়ুন

বৃষ্টি নামচা /অগ্নি রায়

এক   ছোট ছোট চিরকুটে ভরে যাচ্ছে বাদলবেলা। বল্লভপুর, গোবিন্দপুর, মুকুটমণিপুর হয়ে মধুপুরে পৌঁছেও শেষ নয় পথ, এই পুরবাসী তালিকাকে পৌঁছতে হবে একশ আটে! তবেই বৃষ্টি থামবে ঠাকুমার কথামতো। কচিকন্ঠের মিনতি কাকলির কাছে লেবুপাতা আর করমচা ঝরে যায়। বালিকাসংঘের গায়ে জলের ছাঁট আবার ফিরে আসার কথা দিয়ে সরে পরে, এক আশ্চর্য লোকায়ত টোটকার পর।   …

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন কাজ-কাজ-কাজ ধ্যানসম একাগ্র। রান্নাকরার মাঝে বলতে গেলেই কিছু সম্বিত ফিরত যেন! সকলের রাত হয়। তাঁর তো হয় না। সকাল-দুপুর-সন্ধে আঁচলের গিঁটে বেঁধে বিলিয়ে দিতে দিতেই ক্লান্ত একটা দেহ মাঝরাতে বিছানায় হাই পাওয়ারের গ্লাস বালিশের পাশে রেখে দুচোখ জুড়িয়ে এলে একদিন …

পড়ুন

প্রস্তাব/সুমন গুণ 

পাতায় বৃষ্টির শব্দ সাংসারিক, দ্বিপ্রাহরিক। আস্থা ও আশ্বাস থাকে, সমবেত, শুভানুধ্যায়ীর পীড়া ও আরাম থাকে। যথাস্থান থাকে। থাকে মেঘ, অস্পষ্ট ও গূঢ়,  সম্পর্কের অসহায়তার মতো,  চিন্তা ও ক্ষমার মতো, পতনকালীন বজ্র ও বিদ্যুৎভরা নৈশব্দের মতো।   পথেও স্তব্ধতা থাকে দ্রুতগামী; নৈকট্য ও নিশ্চয়তাভরা। কোথাও স্থানাংক আছে, ছাদ আছে, দরজা ও রেলিংঘেরা সুবাতাস আছে,  আছে স্থিতি, …

পড়ুন

পিতা নোহসি/প্রতিভা সরকার

‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’ গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ …

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ …

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি। কতবার কলসপুর যাত্রা শুরুর মুখেই ভেস্তে গিয়েছে। আমি কলসপুরের   কাছাকাছি থেকে ঘুরে এসেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু যেতে পারিনি কেন যে–তা ঠিক ধরতে পারি না। ভেবেছিলাম একবার একাই ঘুরে আসব। কিন্তু শেষে মনে হয়েছে দীপিকা দুঃখ পাবে। লুকিয়ে না যাওয়াই …

পড়ুন

মায়াচাঁদ/অলোক বিশ্বাস

হাসছি বলেই চাঁদ উঠছে নাকি চাঁদ উঠছে বলে হাসছি— কোনো একক মাত্রাকে চায় না মানুষ, নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও। এমনতর সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে বীতশোক সাঁতরে আমি যাবো তাহার নিকটে। চাঁদে বসে গাইব মায়াবাদ, চাঁদে বসে বুনব খামার জমি। আমাদের দাবি অনুযায়ী ভালোবাসা চিরকাল চাঁদের সাপোর্ট পেয়েছে। পুনরায় চাঁদে গিয়ে অপেক্ষা করব তোমার জন্য। আমার রান্নাঘরে, পড়ার ঘরে বাজছে …

পড়ুন

গদ্য বনাম কবিতা/অংশুমান কর

“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।” বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা …

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার প্রাচুর্য আহার, তুলতে গিয়ে দেখি, প্রায় শেষবেলা অঘ্রাণ আভায় একেকটি কালের কাঠামো ভেঙে যায়

পড়ুন

অনন্ত সংলাপ/অর্পিতা কুণ্ডু

আমি: ঢেউ তো প্রোজ্জ্বল, তাতে তুমি বসে আছ শিরোচূড়ামণি। হাটের নাগর তুমি, ভিটায় নিমিত্ত সামগান — তোমাকেই বর্মে বৃত্তে চুপিসাড়ে রোমন্থন করি। যেমত অছিলা পটিয়সী, যে মৃদু চারণভূমি পার করে কাছে আসি, তার কিঞ্চিৎ আদর কোরো। বহুবর্ণ লোক সমাগমে একেলা ফেলো না তাকে রৌদ্র-বাতায়নে। সে: না সখি, না, বাতায়ন-পাশে তোমার শরীর মুক্ত, জনশ্রুতি এই — …

পড়ুন

কাজের ভাষা, মুখের ভাষা/স্বপ্নময় চক্রবর্তী

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, ‘এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় …

পড়ুন

মন্দির দেখা সহজ নয়/শ্রীলা বসু

বেড়ানোর পোকাটা আমার মাথায় এসেছে প্রধানত পৈতৃক সূত্রে। বাবার হাতে ম্যাপ টাইম টেবিল দেখতাম হরদম। গাড়ি চালিয়ে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে নতুন জামাইকে নিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে রাঁচি চললেন তখন একচেখে ভালো দেখেন না। তবু কী ? অন্য চোখ তো আছেই। কিছু বললে বলতেন পতৌদির একচোখে ক্রিকেট খেলার কথা। তবে …

পড়ুন

তোমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম/বর্ণালী কোলে

(১) বিদ্রোহ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে জলকামান আক্রোশ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে মুহুর্মুহু ভীমরুলের মতো কামড় শান্ত হয়ে আসছে মল্লযুদ্ধ ক্ষোভ, অভিযোগ দেখা দিচ্ছে ফাল্গুন রাত্রি আকাশ জুড়ে শ্বেতরঙ্গন (২) যেভাবে বীণা স্পর্শ করে আছে পদ্মকে সেভাবে তুমি আমাকে স্পর্শ কোরো আসছি এখনও তুমি কাজ করছ শুকতারাটি উঠবে এবার শিয়রে তোমার …

পড়ুন

প্রশ্নপদ/অশোক দেব

সব মরুবৃক্ষ কেন শ্রাবণ জাতক? তাদের দেহের জল সেকথা জানে না?   একলা শ্রাবণে বসে এইসব ভাবি বালিমাখা চাঁদ কাল কার ঘরে ছিল?   তাহলে তৃষ্ণার ফুল বিরহ-গন্ধক? আগুনে আগুনে কথা, বিদায় সংগীত?   কে তুমি গাইছ ওগো এমন মাথুর, এমন শ্রাবণে এলে রাধিকাসম্পদ?  

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের আশ্রয় নয়। বিষয়টা নিয়ে আসলে অনেক দিক থেকেই তর্ক হতে পারে। প্রতিযোগীরাও নানা দিক থেকে আলোচনা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের ফলাফল খুব স্পষ্ট হল না। সকলেই মানলেন রবীন্দ্রনাথের গান আশ্রয় হওয়া উচিত। মোশনের সমর্থনে যাঁরা বললেন, তারাও সেটা …

পড়ুন

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে। কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে …

পড়ুন

নোটপ্যাডের নৌকো/মন্দাক্রান্তা সেন

এক বর্ষার দিনে সে আসবে বলে কথা দিয়ে আসেনি।   এই সামান্য বিষয় নিয়ে পদ্য লিখে প্যানপ্যান করা এই বয়সে নিতান্তই ন্যাকামি হয়ে যাবে।‌   নাকের জলে চোখের জলে ছপছপ করছি । কোথা গেলে,‌ সেয়ানা প্রাণাধিক   নোটপ্যাডে নৌকো ভাসাই । নেহাত বালিকা আহা‌ আহা ।   তুমি আসবে বলে আসোনি। বেশ করেছ ।   …

পড়ুন

পুরনো দিন নতুন দিন/শংকর চক্রবর্তী

মনে পড়ে সেইসব রবীন্দ্র-গানের সকাল সূর্যাস্তের থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলেশহীন কোনো সন্ধের পাশে বেজে উঠত জড়োসড়ো একবারও কেউ ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে চায়নি তখন সাদামাটা বিকেলগুলো শুধু এই ষড়যন্ত্রীর শহরে অন্ধকার নামিয়ে রাখত প্রতিদিন সেই সকাল থেকে ছুটে যেত সবাই একে অপরের জামা-প্যান্ট উদোম করে ছুটত তুমি শুধু সারাজীবন অপরাধীর মতো মোমবাতি হাতে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ …

পড়ুন

বিমর্ষ জল ও উড়ন্ত লাল কার্পেট/গৌতম গুহ রায়

খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো …

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে গেছে সুর। মনে হয় নিষ্পত্র গাছগুলিতে একটি একটি করে জেগে উঠছে কচি পাতা। মনে হয় রোদ্দুর হয়ে গেছে আধো আধো কথা বলা শিশু। শীতকাল হলেও পৃথিবীতে কোথাও একটা নিশ্চয়ই শিউলি ফুটে, ঝরে সাদা করে রেখেছে উঠোন …

পড়ুন

সাইলেন্স দিস আপকামিং কল/যশোধরা রায়চৌধুরী

মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি। বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম। এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন? বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের …

পড়ুন

খেলার দৃশ্যান্তর/অনির্বাণ বসু

একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে …

পড়ুন

ফিল্ম শুটিং-এর গল্প/পার্থ মুখোপাধ্যায়      

১৯৮১ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বংশীচন্দ্র গুপ্ত। ‘ শিল্প নির্দেশনায় বংশী সমকক্ষ ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বংশী ছিল এক এবং অদ্বিতীয়।’ তার স্মরণ সভায় শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই রকম বক্তব্যই রেখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ‘পথের পাঁচালী …

পড়ুন

দি লাস্ট মিটিং/সমরজিৎ সিংহ

একটি রাস্তা । তারপর, আবার রাস্তা । তারপর সমাধি । তার উপর চাঁদের ছায়া । দু’একটা পাতা । রাস্তার ওপাশে একটা ভাঙা দোকান । তিনটে চেয়ার । সমাধি থেকে উঠে এসে এই চেয়ারে বসলেন তিনি । টোটেনখাম । চাঁদ তখন পিছলে যাচ্ছে রাস্তার উপর । তিনি তার ভাঙা হাড়ের আঙুলগুলি বের করে কাকে যেন ডাকলেন …

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি সচেতন প্রতিরোধ ছিল প্রগতি, আর মেঘ ডাকলে সূর্যত্রাসে কেঁপে উঠত প্রতিক্রিয়া। রথ দেখতে যাওয়ার মতো তুমি সুদূর করে নিয়েছিলে তোমার দিগন্তরেখা, স্বপ্নের সেই সাদা ঘোড়াটিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত স্ববিরোধে বেরিয়ে পড়েছিলে সাম্রাজ্যবিস্তারে, খুরে খুরে ধুলোর ঝড় তুলে বিলিয়েছিলে কল্যাণ, ফিরে এসেছিলে …

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। জলপ্রপাত অবিরাম দুগাল বেয়ে! কাকে বেছে নেব? শালবনে জ্যোৎস্নাপথ? নাকি রাতের নদীজল? কে হবে সঠিক নির্বাচন? কার করপুট-স্পর্শে শঠতা নেই, কারা কারা আমার বৃত্তে নিরাপদ হবে, সেই সব নির্ভুল নির্বাচন সহজ নাকি? নির্বাচন শব্দটি যে কত অমোঘ …

পড়ুন

পিরিত/অভিমন্যু মাহাত

খুব টানটান ছিল বেদনা যত দিন যায় ভুল বাড়ে, প্রবঞ্চনাও বাড়ে স্মৃতিভ্রষ্ট সুতোয় পিরিতের বহি সমস্ত ঋতু জুড়ে বিলাপ শালপাতার আড়ালে আশ্চর্য ঝুমুর এভাবেই একদিন হঠাৎ দর্শন যার তত্ত্ব ও তালাশ ছিল পুরনো সহসা উঁকি মারে নিরুদ্দিষ্ট প্রণয় কিন্তু নাশকতা সামান্য দূরে, আম্রমুকুলের গন্ধে টের পাই অভিমান কেন ভাঙে আজও বুঝিনি… কাল যাব অশোকনগর

পড়ুন

এ এক ‘অচেনা’ দেশ/পার্থ মুখোপাধ্যায়

আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই।  প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু …

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন কঠোর তবু অন্ধ ভিখিরির হাত ধ’রে আরেকটি গল্প লেখে, ভাবে— লেখা কিছু জমে থাক আগামীর দিকে   আশা ভাঙে। জাগে শুধু ডুবে যাওয়া পুরোনো বন্দর   শান্ত মানুষের মতো; নির্মোহ ততটা   ভেসে যায়   ততটুকু স্পর্ধা হলে, নাবিক তোমায়   …

পড়ুন

বজ্রসেনি/সার্থক রায় চৌধুরী

নুয়ে পড়া ডাল আর চুঁয়ে পড়া জল, জলের গভীর থেকে মেঘ বহুতল, আকাশ পাগল যেন আত্মহারা এক বৃষ্টি এলো- জানে ভিজল যারা..   জানে? পাগল তবে কার নেশার ঘোরে আঁকে বজ্র, হাওয়ায় ভেজা পালক ওড়ে…

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই। রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের …

পড়ুন

প্রেম/রামকিশোর ভট্টাচার্য

প্রতিদিন রামপ্রসাদি মেখে কাপড় কাচতে কাচতে সাবান হয়ে একদিন গলে গিয়েছে মা ৷ অবসাদ পালক জড়িয়ে হঠাৎ জলবায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাবাও , এখন একলা একা সুতির ফুলমাখা কুর্তি মারুবেহাগ দুপুরে দু’হাত নাচিয়ে ঝুলেই থাকে – দিগন্তের বুকে , জোছনার রূপকথা নিয়ে – কচি হাওয়ারাই ঝিরিঝিরি গান শুনিয়ে যায় , রঙের বেলা গড়িয়ে গেলেও নাইলনের …

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে একাই পাহারায় সে হাসির খানিক মুখে সাবলীল উত্তরাধিকার কখনো বা সাজিয়ে নিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো ‘আমি’র মধ্যে কতগুলো দাঁড়টানা কাক কালো এলোমেলো কখনো ভাবিনি অন্ধকার উজাড় হয়ে আসে কোন পথে! কেমন করে রোদ টুকু মরে যায় …

পড়ুন

বৃষ্টি তুমি রোদের মধ্যে /বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টি আমি জানি তুমি চরিত্রহীন, কুলটা নও কখনও হবে না মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতন ধূর্ত জাফরি-কাটা যে বারান্দা থেকে তোমায় ছুঁয়েছিলাম, প্রবল খরার মরশুমে সেই জাফরি আমার মাথায় ঘুরত…   শুধুমাত্র ‘বেঁচে’ জীবন কাটানো খুব কঠিন বলে বিকেলবেলার তেজি আগুন রাত্রি নামলে ছাই হয়ে যায় বম্বে থেকে বেঙ্গালুরু পাক্ খেয়ে পাক্ খেতে খেতে তোমায় পাবো …

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার হিমঝিম মস্তানা আমি তোমার কুঁকড়ে থাকা পোকা তুমি আমার ফলানা ঢিমকানা   সকাল থেকে রাত্রি আমি তোমার প্রেম বলিনি তবুও , কে খায় ধোঁকা   রাত্রি থেকে দিন তো তুমি আমার সূর্য চাঁদের চাঁদোয়া টাঙায় খোকা   প্রেমের কাছে, প্রেমের …

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই …

পড়ুন

মুষলপর্ব/বেবী সাউ

শূন্যতার রং নিয়ে বড়ো বেশি ভেবে চলো তুমি অথচ জলের কাছে প্রতিদিন শিখে নিই নীল ঘষা রং আমাদের অভিমানগুলো ভেঙে গেছে আজ তার কোনো গতিপথ নেই; সূত্র ভুলে গেলে, বলো, কীভাবে মেলাবে— জীবনের মায়া, ছায়াধ্বনি! সহজ ভেবেছি যতটুকু, কঠিনের আবরণে ঢেকে গেছে রোজ সেই লক্ষ্যভেদ, মাছের নরম চোখ কিংবা জাতিভেদ প্রথা বারবার ফিরে আসে— বারবার …

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো বাংলাভাষার দেহত্বকে এই যে উজ্জ্বলবাক্য ঠিকরে পড়ছে বিকেলের প্রায়… চলাচল নিভে আসছে। কিছুপরে সন্ধে নেমে এলে একটি দুটি তারা জ্বলবে তোমার স্পর্শের মতো,নিভে জ্বলে ওঠা আকাশের মাথায় মাথায়…

পড়ুন

গ প্ পো ৫ – কুঁড়ে নিক্কির গল্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।   ‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –   সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- …

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি   ভেবেছিলাম কোনোদিনই ফিরবে না আর দেখা হয়ে যাবার পর বৃষ্টিপাতের মতন অহেতুক বিপর্যয় এল   যাত্রীহীন ট্রেন এক পাহাড়ি স্টেশনে কিছু অস্পষ্ট ছায়া, টুপি পড়া, উঠে গেলো নির্দিষ্ট কামরায়   নিজেকে যোদ্ধা ভেবে ঢুকে যাই সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাকে যেখানে আমিই …

পড়ুন

একা মানুষ, পঞ্চাশ অস্তিত্ব/চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ লেখক: রিচার্ড জেনিথ প্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য …

পড়ুন

গ প্ পো ৬ – উপকারী পুঁটে দত্তির গপপো/বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘ম্যাকলাখানরা তো ব্রাউনি পুষত —’ এতক্ষণে কথা বললে আংকল জ্যাক। ‘ও সব ব্রাউনি ফ্রাউনি আমি জানি না —’। মুখ ঝামটা গ্যানগ্যানের। ‘ব্রাউনি হোক, পিক্সি হোক, লেদোকোন আর ট্রোন্ড যাই-ইহোক—এক ফিনরা বাদে ওরা সবাই পুঁটে দত্তি। ট্রো —’ ‘তা ফিনরাও তো পুঁটে। এই এতটুকু —’। বললে আংকল জ্যাক। ‘তা হোক, ফিনরা তো আর ডাঙর নয়। তারা …

পড়ুন

গ প্ পো ৪ – পুঁটে দত্তিদের গপ্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি। স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের …

পড়ুন

বিস্মৃতপ্রায় লেখক নিরুপমা দেবী/ঈশিতা ভাদুড়ী

অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক। নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক …

পড়ুন

গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে রাস্তার বাঁকটা পার হলেই হয়তো পেয়ে যাব ছই দেওয়া গরুর গাড়িটাকে। গরু দুটোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা। বাজছে টুং-টুং, টিং-টিং।   চট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ওমা, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। জমাট হিমের দেশে নরম পালকের লেপ আর ভেড়ার লোমের মাখনের মতো …

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি …

পড়ুন

ফুলঝরিয়া/সেবন্তী ঘোষ

এক পিছনে জঙ্গল ।ওই ওপারের রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গল। ক্রমশঃ দুপাশের জঙ্গল উজাড় করে  ফোর লেন হচ্ছে। এখনও পুরোটা খুলে দেয়নি। নবনির্মিত সেই পথের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ফুলঝরিয়া আর পিংকি। বসাটা নতুন নয়, জায়গাটা নতুন। বসার জায়গাটাও ঠিক নতুন নয়, দেখতে নতুন। পিংকি বলে, আগের ঘাসটাই ভালো ছিল রে, গড়িয়ে গেলে কত …

পড়ুন

এক মেঘলা না থাকা/শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে মা, তুমি ছাদে উঠেছিলে  বালতি ও কাপড় সাবান জলের মধ্যে সূর্য তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি অথচ …

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা আমাকে দেখিয়েছিল। ছোটো বাচ্চা তখন ও। কাজ থেকে ফিরে ভূতকে ওর মা আবিষ্কার করেছিল ওদের ধান সিদ্ধ করা উনুনের ভেতর কালি ঝুলি ছাইমাখা অবস্থায়। ওর মা হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখ দিদি, এ যদি ভূত না হয় তো ভূত কাকে বলবি? …

পড়ুন

গুঁড়োমশলা/কাবেরী গোস্বামী

সে এখন একটি অচল পয়সার মতন ফিরেও তাকায় না আর কেউ কারণ, সে আজ শুষ্ক বিবর্ণ পরিত্যক্ত এক যোনি

পড়ুন

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে এ শহরে তো লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে–আমরা এখান থেকে পুরীধামে যাই, চিল্কাতে জলবিহার করি, লিঙ্গেশ্বর মন্দির দর্শন করি –অথচ — যে ‘কিন্তু’ আর ‘অথচ’ আমাকে এবার রথে চাপাল-সারথি বলল–উধার তো কোই যাতা নেহি। বললাম –সেই জন্যেই তো। উচ্চবর্ণের দেব দেবী …

পড়ুন

আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;   কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়।  বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে …

পড়ুন

শহর/বিজয় সিংহ

ফেরার আগে যে তুমি অহৈতুকী ছিলে ফেরার পরে যে প্রাক গোধূলিরা অপ্রবাসে ঢোকে ফক্স কে টু, হে আরাধ্য, সেইসব গ্রন্থনায় মায়ুশ মজ্জার থেকে অনুচক্রিকা কুড়াতে পাঠাও স্বপ্নের অতলে নেমে দেখেছি জুবিলি অসহায় ফুটেছিল হেতু তার কোনো বাড়িঘর নেই, লেক মল, পূর্ণদাস রোড নির্মিত আরশিনগরে পড়ে থাকা সংক্রামক লাশ ফেরার আগের রাত্রে নরসিংহমূর্তি দেখিয়েছে ও ফেরার …

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে অবশ করে তোলে। লোকজন কী রকম চোখ টেপে, টিপ্পনী কাটে, সন্ধ্যায় একা বেরোলে খারাপ মেয়ে ভেবে ইশারায় কেউ প্রস্তাবও দেয়। আমার পরিচিত কয়েকজনকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি, তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না, তা নয়, তবে …

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই …

পড়ুন

শিশিরকুমার দাশ: খুঁজে ফিরি কর্ণ, কর্ণের সহোদর/মোস্তাক আহমেদ

মৃত্যুলগ্ন পার হয়ে যতবার গিয়েছি নিঃসীমে বিদ্যুতের দীপ হাতে: অন্ধকারে আকাশের বিস্তৃতি অপার বিদ্রোহী ঝড়ের যত উদ্বাহু মেঘেরা আমন্ত্রণ করে আনে অতীতের ঘন অন্ধকার; তবু দেহ ভিজে গেছে শান্তিস্নিগ্ধ হিমে।                                                                                         (মৃত্যুলগ্ন/জন্মলগ্ন)   কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জন্মলগ্ন’। ‘পূর্বমেঘ প্রকাশ ভবন’ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৫৬-তে। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। কী দীপ্ত উচ্চারণ! কয়েক বছর হল দেশ …

পড়ুন

অচেনা দুপুর/সৈয়দ কওসর জামাল

প্রতিবাদ ভুলে থাকি আজ পড়ে থাকি এককোণে, দুরে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে স্থিতভূমি, বেতাল অ-সুরে   কোন সুরে বাজবে সেতার আষাঢ়ে বাজবে কোন মন? জানালার পাশে আজ নয় বিপর্যস্ত কোরো না জীবন   বরং কবিতা লেখো, ভেজো জবুথবু শালিকের মতো, বৃষ্টি এসে সলজ্জ বলুক এসো প্রেম, এসো ইতঃস্তত   একটি কবিতা লিখেছিলে তুমুল বৃষ্টির কোনও …

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা