গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে রাস্তার বাঁকটা পার হলেই হয়তো পেয়ে যাব ছই দেওয়া গরুর গাড়িটাকে। গরু দুটোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা। বাজছে টুং-টুং, টিং-টিং।

 

চট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ওমা, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। জমাট হিমের দেশে নরম পালকের লেপ আর ভেড়ার লোমের মাখনের মতো নরম-গরম কম্বলের তলায় কুকুর-কুণ্ডলী হয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম। ঘুমোচ্ছিলাম আর স্বপ্ন দেখছিলাম, হাজার আষ্টেক মাইল দূরে বাংলা দেশের গেঁয়ো পথের।

 

টিং-টিং, টুং-টুং। আরে ঘণ্টি বাজে যে আমারই ঘরের ভেতর। তাড়াতাড়ি উঠে ঘরে আলো জ্বেলে দরজা খুলে দিই। সঙ্গে-সঙ্গে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢোকে একটা রোঁয়ালা ভাল্লুক। তার আগাপাশতলা ঝুরো বরফে ঢাকা। যেন ভাল্লুকটা ময়দার কল থেকে বেরিয়ে এসেছে সোজা। ভাগ্যিস চট করে মুখ খানার দিকে আগেই নজর পড়েছে।

 

‘এসো, এসো স্কুয়া। গুড মর্নিং। তা এতো ভোরে? এখনো তো অন্ধকার ভাল করে কাটেনি-‘

 

গুড মর্নিংটা ফিরিয়ে দিয়ে স্কুয়া তার গা থেকে ভাল্লুকের লোমের কোটটা খুলতে থাকে। আমার কথায় কুলকুল করে হেসে বলে, ‘তোমার ভোর যদি হয় বেলা এগারাটায়। রাজ্যিটা তো আর সেই নিয়মে চলবে না-‘

 

‘-বলো কিগো মেয়ে, বেলা এগারোটা।’ তাড়াতাড়ি গিয়ে ড্রয়ারটা টেনে হাত ঘড়িটা দেখি। ওমা! সত্যিই তো। এগারোটা বেজে কাঁটাটা দশ মিনিট ছেড়ে যাচ্ছে। আমতা আমতা করে বলি, ‘তা বেলা এগারোটাতে যদি আকাশটা দেখায় ভোরের মতো আবছা আবছা, আমার দোষটা কোথায়? আমাদের ওদেশে এখন তো বেলা দুপুর। ঠা-ঠা করছে রোদ্দুর। সূয্যি আকাশের মাথায় চড়ব চড়ব করছে। অফিসের বাবুদের টিফিন হব হব। কলেজ-স্কুলের ছেলেদের এক ঝুল পড়া হয়ে গিয়ে, আর একটা পিরিয়ড চলছে। বাড়িতে গিন্নিদের হেঁসেলের কাজকর্ম প্রায় সারা। তাদের এখন বোধ হয় চানের বেলা হয়ে এল’।

 

‘আমাদের এখানেও ওসব ঠিক ঠিকই হচ্ছে তোমাদের দেশের মতো। শুধু ঐ চানটা ছাড়া। এখানে কেউ দিনের বেলা চানের কথা ভাবে না। তাছাড়া এই শীতে রোজ চান? ওঃ অসম্ভব। বলে হপ্তায় একদিন হয় কি না হয়’।

 

তারপর আমাকে জোর তাড়া লাগায় স্কুয়া। ‘নাও নাও, এক্ষুনি তৈরী হয়ে নাও। গ্যানগ্যানের জোর তলব। বুড়ীর কড়া হুকুম, ‘আমার কালোমানিককে যেমন করে পার ধরে এনে দাও।’ তোমাকে এক্ষুনি নিয়ে গিয়ে হাজির না করতে পারলে আমার আর জায়গা নেই ওখানে। বুঝেছ’-

 

‘-তাই নাকি? আমি-‘

 

‘থাক্ থাক্, আর কথা বাড়িও না। পোশাক পরে তৈরী হয়ে নাও-‘

 

তারপর স্কুয়া আপন মনেই গজগজ করে- ‘দিনের পর দিন হোটেলে খোঁজ নিচ্ছি। রোজই শুনি, নেই। কি সাংঘাতিক লোক রে বাবা। আমার গ্যানগ্যানকে কয়েক ঘণ্টাতেই বশ করে এক সপ্তা একদম নিপাত্তা। ভারতবর্ষের লোক শুনেছি জাদু জানে। নিশ্চয় তুমি গ্যানগ্যানকে জাদু করেছ-‘

 

-‘কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি-‘

 

‘এখন কথা রেখে তৈরী হও’ ধমকের সুরে বলে ওঠে স্কুয়া।

 

 

ঐ লক্ষ্মীর মতো শান্ত পরমাসুন্দরী মেয়েটা যে এত ধমক দিতে পারে, না দেখলে আমি বিশ্বাসই করতাম না। পোশাকগুলো নিয়ে আমি সুড়সুড় করে বাথরুমের মধ্যে ঢুকে পড়ি।

 

পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফাঁকা বরফ-পড়া পাহাড়ে-রাস্তায় দুটো ভাল্লুক পাশাপাশি চলতে শুরু করে। একটা কালো আর একটা সাদা। তখন সবে সূয্যি-মামা তার ম্যাড়মেড়ে চোখে একটু একটু উঁকি মারতে শুরু করেছে ঝুরঝুরে বরফের পর্দার আড়াল থেকে।

 

বরফ পড়ার যেন আর কামাই নেই। রাশি রাশি পেঁজা তুলোই বল আর ধপধপে সাদা মল্লিকা ফুলের রাশি রাশি পাপড়িই বল ঝরছে তো ঝরছেই। তাতে পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, (তা গাছপালা বলতে তো ঐ তিন ফুট উঁচু গোটাকতক গাছ। এদেশে বড় গাছ নজরেই পড়ে না), পথ-ঘাট ঘর-বাড়ি, খেত-খামার সব কিছুই সাদা ঝুরো বরফের রাশির তলায় ঢাকা। যেন দুধসাগরে বান ডেকেছে। ফেনায় ফেনায় ঢেকে গেছে সবকিছু।

 

সেই অফুরন্ত ঝরে-পড়া বরফের ঝরকোর ভেতর দিয়ে পাহাড়ের চুড়োয় নজরে পড়ে গ্যানগ্যানের ছোট্ট হাল্কা নীল রঙের বাংলোটা। বলি, ‘স্কুয়া তুমি আমাকে এক স্বপ্নের দেশ থেকে আর এক স্বপ্নের দেশে নিয়ে এলে-‘

 

স্কুয়া বলে, ‘এতক্ষণে বুঝলাম তোমার ওপর গ্যানগ্যানের এত টান কেন? তোমরা দুজনেই বড্ড বেশী স্বপ্ন দেখ-‘

 

বলতে বলতে স্কুয়া আমাকে নিয়ে বাড়িটার দরজা ঠেলে ভেতরে সেঁধিয়ে পড়ল। দেখলাম সেই আগের মতোই আগুন-কাঁদায় বসে চাঁদের মা বুড়ী, বাতেতে থুথুড়ি, গ্যানগ্যান। সামনের টেবিলে তেমনি ভেড়ার লোমের পাঁজ আর চরকা। হাতে লম্বা লম্বা দুটো কাঁটাতে লটকানো পশমের বুনন।

 

স্কুয়া বলে, ‘এই নাও তোমার কালো-মানিক, গ্যানগ্যান।’

 

‘কইরে কইরে’ আকুলি বিকুলি করে ওঠে বুড়ী। আমাকে সামনে দেখেই ছড়া কাটে-

 

‘এক পলকেই দিলাম মন

তুমি হলে আপন জন।

তারপরে যে কোথায় গেলে

গ্যানগ্যানেরে একলা ফেলে।

ওগো আমার কালো-মানিক

হেথায় এসে বসো খানিক।

কাটাই কদিন গল্পোতেই

আমার যে আর সময় নেই-‘

 

বেতো পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে এসে বুড়ী আমাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে।

 

‘কোথায় গেছেলে গো, কালোমানিক আমার। কতো দিন তোমাকে দেখিনে। মনে হয় যেন কত বছর-‘ ‘এই তো গেল হপ্তায় তোমার কাছে বসে ধেড়ে দত্তিদের গল্পো শুনে গেলাম। মনে নেই-‘

 

‘এক হপ্তায় কটা দিন? কটা দিনে কটা ঘণ্টা? কটা ঘণ্টায় কতো মিনিট?

 

সময় কাটবে কেমন করে।

যদি তেমন লোকটি না পাই ঘরে।

 

 

দুনিয়াটা আজকাল বড্ড কাজের হয়ে গেছে। এখন দেখি সবাই বড্ড বেশী কাজে ব্যস্ত। এখন কল টিপলে জল। বোতাম টিপলে বিজলী। যতো দেখছি দিন দিন এদের কাজের সাশ্রয় হচ্ছে, তত বেশী এরা কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠছে। কি এত কাজ রে বাবা। অথচ সেকালে। গিন্নীদের কতো কি করতে হোতো। কত্তা তো কাক ডাকবার আগেই নৌকো নিয়ে সুমুদ্দুরে। ফিরতে একপ’র রাত। আর ঘরে কমসে কম গোটা পনেরো নেন্ডি-গেন্ডি, গোটা পাঁচ-ছয় গরু। পালকে পাল শুয়োর আর মুরগী। গোটা কুড়ি ভেড়া। তাদের খেদমত কি কম-‘ গ্যানগ্যান বুড়ী আবার ছড়া কাটে।

 

‘জলায় যাও, কাটো পীট*

বয়ে আনো পীটের ইট।

শুয়োর গরুর জানা দাও

মুর্গী-ভেড়ার পাল চরাও।

যাঁতায় পেষো শুকনো গম

বানাও রুটি গরগরম।

সকাল সন্ধ্যে গাই দোয়াও

মাখন তোল, চীজ বানাও।

চরকা কেটে পোশাক পরো

আর ডজন দেড়েক ছেলেপিলে

খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করো।

 

এই এতো কাজের ভেতরেও কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় আমার মা-ঠাকুমারা আগুন-কাঁদায় বসে নিত্যি গল্পো বলত। আমরাও সেই আগুনের ওমে, গল্পে জমে আস্তে আস্তে ঘুমের মধ্যে ঢুলে পড়তাম। শীতের বড় বড় রাতগুলো কাটত এই গল্পো শুনে শুনে। সেই গল্পো আমিও শুনিয়েছি আমার ছেলেমেয়ে, নাতিপুতিদের। দিনগুলো বড় মিষ্টি ছিল গো কালোমানিক। এখন আর গল্পো শোনাবার লোক পাই না। অনেকদিন পরে যা-ও তোমাকে পেলাম তা তুমিও দেখি ঝাঁকি দর্শন দিয়ে পগার পার-‘

 

গ্যানেগ্যানের কথায় লজ্জা পাই। বলি, ‘গ্যানগ্যান গেল হপ্তায় আসতে পারি নি বলে আমাকে মাফ কর। তোমাদের দেশটা দেখতে এসেছি। এদিক ওদিক ঘুরে না দেখলে তোমার গল্পো তো’ কিছু বুঝব না-‘

 

গ্যানগ্যান বলে, ‘সেটা হক কথা। তবে কি জান, আমার দিনও তো শেষ হয়ে এসেছে। যেকটা দিন আছি গল্পো শুনিয়ে যাই। আর আমার কি ভাগ্যি যে তোমার মতো সাত সুমুদ্দুর তেরো নদী পারের দেশের মনিষ্যিকে পেয়েছি আপনজন। তুমি আমার বলা গল্পোগুলো মনে রেখো। তোমাদের দেশের ফুলের মতো ঢলঢলে শিশুদের এই গল্পো শুনিও। আমার বড্ড সাধ, আমি মরে গিয়েও যেন তোমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মনে বেঁচে থাকি। কি শোনাবে তো-‘

 

‘নিশ্চয়। এই কথা দিলাম। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও তো ঠাকুমাদের বলা রূপকথা শোনবার জন্যে পাগল। আর তোমার বলা এই রূপকথা। এ তো তাদের কাছে জমাটবাঁধা মিষ্টি আইসক্রীম। কোন্ শিশু না ভালবাসবে শুনতে-‘

 

 

 

গ্যানগ্যান একগাল হেসে শুধোয়, ‘তা এতদিনে কোথায় কোথায় গেলে, কি কি দেখলে শোনাও।

 

কফি। এমন সময়, স্কয়া একরাশ টাটকা ভাজা প্যানকেক, চীজ, ওমলেট আর ওটের পরিজ নিয়ে এল। সঙ্গে ধোঁয়াও

 

‘গ্যানগ্যান ওকে খুব শাস্তি দিয়েছি। সটান বিছানা থেকে গ্রেফতার করে এনেছি। সকালের খাওয়াটা পর্যন্ত খেতে দিই নি-‘

 

গ্যানগ্যান আমার দিকে চেয়ে একটু মুচকি হেসে ছড়া কাটল,

 

‘প্যায়দা আমার কেমন জানো?

ধরে আনতে বললে বেঁধে আনো-‘

 

কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বলি, ‘আমাদের দেশ ইন্ডিয়া খুব পুরোন দেশ। এখনও সে দেশে গরুরা গাড়ি টানে। অনেক গ্রামের লোকে বিজলী বাতি কাকে বলে তা জানেও না। এক জায়গা থেকে আর একটা জায়গায় পৌঁছতে যা সময় লাগে, তাতে একজন প্লেনে সারা পৃথিবী ঘুরে আসতে পারে। কিন্তু তোমাদের দেশটা দেখছি আরও পুরোন। যেখানেই যাই দেখি কেমন পুরোন পুরোন গন্ধ। লণ্ডন, এডিনবরাকে দেখে তোমাদের দেশের হদিস মোটেই করা যায় না-‘

 

স্কুয়া বলে ওঠে, ‘তা কি করে করবে? লণ্ডন কতো বড়ো শহর! সেখানে লক্ষ লক্ষ লোক। এখানে সব কটা দ্বীপ জড়িয়ে বাসিন্দা কুল্লে বিশ হাজার। ওসব শহরে কতো যানবাহন। রেলওয়ে, বাস, ট্যাক্সি ট্রাম, টিউব-কতো কি! এখানে সেসব আদবেই দেখবে না। যানের মধ্যে নৌকো, দু একটা বাস আর ট্যাক্সি ইদানীং শহরে চালু হয়েছে। ব্যস, ঐ অবধি। আর বাহন হল টাটু-‘

 

গ্যানগ্যান খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলে,

 

‘দেশ তো দেশ আমার দেশ

নেই নড়নচড়ন আছি বেশ-‘

 

এদেশের বেশির ভাগ লোকে অতশত ঘোরাঘুরি, এখান সেখান মোটেই পছন্দ করে না। দরকার কি এতো ব্যস্ত হবার। তোরা তো তবু বাস, টাক্সি দেখছিস এখন। আমরা তো বয়েস কাটিয়ে দিয়েছি ওগুলোকে বাদ দিয়েই। তাতে একটু আধটু অসুবিধে কি হয় নি? হয়েছে বৈকি। তা আমরা সে সব গ্রাহ্যই করি নি। যুদ্ধ মিটে গেল পঁয়তাল্লিশ সালে। আমার বড় ননদের নাতির ছেলে হার্বার্ট যুদ্ধে জাপানীদের হাতে বন্দী হয়েছিল। ছাড়া পেয়ে সে দেশে ফিরে এসে নামল ওয়েলস্-এর বন্দরে। জাপান থেকে তার আসতে লেগেছে ছ সপ্তা। কিন্তু বাড়ি ফাউলাতে তার আর যাওয়া হল না। বেচারার কি অবস্থা বোঝ! ওয়েলস্ থেকে ফাউলা দেখা যায়-হাই লি-লি। মাঝখানে সুমুদ্দুর। পার হবে কি করে? বেচারা রোজ সুমুদ্দুরের পাড়ে বসে ফোঁস ফোঁস করে বড় বড় নিশ্বেস ফেলে বাড়ির কথা ভেবে। এক মাস ঠায় ওয়েলস্ এ বসে রইল গালে হাত দিয়ে। শেষে একটা মাছ ধরা জাহাজ তাকে পার করে দিল। ইয়েলের এক পুরুত একটা সোমবার সকালে হাওয়াই জাহাজে চলে গেল গ্লাসগো। বিকেলে সেখানে বসে সে দিব্যি খানা খেতে লাগল। আর এদিকে তার বৌ একই সঙ্গে বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে বার হয়েছিল মাত্র ষোল মাইল দূরে তার বন্ধুর বাড়ি যাবে বলে। সে পৌঁছল বেস্পতিবার সন্ধেবেলা।

 

এদেশের সব আজব কেতা

সময় গেছে হারিয়ে হেথা।

 

 

বুঝলে না কালোমানিক। তা তুমি কি দেখলে এদেশের তা তো বললে না-‘

 

‘দেখলুম আজব দেশের আজব ভূঁই। খালি পাহাড়, পাহাড়, আর পাহাড়। ছোট পাহাড়, টিলা পাহাড়, মাঝারি পাহাড়, বড় বড় পাহাড়। এখন সব বরফের কম্বল মুড়ি দিয়ে সাদা। ঠাণ্ডাটা খুব জোর কিনা! দেশ তো শুধু ন্যাড়া পাহাড় আর ধু ধু ফাঁকা জলাভূমি-‘

 

গ্যানগ্যান মুখখানা গম্ভীর করে বলে, ওগুলো আসলে পাহাড়ই নয়, সব দত্তি, দত্তি আর দত্তি। ছোট দত্তি, মাঝারি দত্তি, বড় বড় দত্তি। এক সময়ে সব জ্যান্ত ছিল। কোথা থেকে কবে একজন সেন্ট এসে মন্তর-পড়া জল ছিটিয়ে দিয়েছিল তামাম রাজ্যিটাতে। সবকটা এখন পাথর হয়ে আছে। তুমি কি উত্তরের দিকে উল্টে গিয়েছিলে-‘

 

সেখান থেকেই তো গতকাল নাকানিচুবুনি খেতে খেতে ফিরেছি গো গ্যানগ্যান, রাত বারটাতে। ওঃ ওই মাইল চল্লিশ আসতে পুরো দিনটা লাগিয়ে দিল তোমাদের এদেশের ফেরী জাহাজ আর্ল অব-জেটল্যান্ড। আর্ল-এর নামের বাহার দেখে চড়ে বসেছিলাম। চড়েই ঝকমারি। তখন ছেড়েদে-মা কেঁদে বাঁচি। তবে জায়গাটা বড় চমৎকার। নির্জন পাহাড়ে অঞ্চলে মাঝে মাঝে আয়নার মতো কয়েকটা হ্রদ। তার ধারে ধারে এই শীতেও হরেক রকম পাখিদের মেলা। অরোরা বোরিয়ালিসের সিঁদুরে আলোয় জায়গাটা দেখাচ্ছিল বড় অপূর্ব’

 

গ্যানগ্যান তার কফির পাত্রটায় শেষ চুমুক দিয়ে বলে, ‘এবার তোমার কড়ার মতো কাজ করো। ধরো ধরো আমার চরকা ধরো-‘

 

আমি তখুনি চরকা ঘোরাতে লেগে যাই-ঘ্যানর ঘ্যান, ঘ্যানর ঘ্যান। আর গ্যানগ্যান পাঁজ থেকে সুতো টেনে তোলে শূন্যের দিকে ছড়া কাটতে কাটতে-

 

‘ঘোরাও আমার চরকা ঘোরাও

মন ঘুড়িকে শূন্যে ওড়াও

আয়রে নেমে গপোগুলো

ছিষ্টি ছাড়া সর্বভুলো-‘

 

বুড়ী ওপর পানে তাকিয়ে যেন মন্তর ঝেড়ে গল্পো নামায়।

 

‘ঐ উস্টেই তখন দুটো দত্তির প্রচণ্ড উৎপাত। হারমান আর স্যাক্সি-

 

স্যাক্সি আর হারমানে

কিছুতেই না হার মানে।

পাহাড় প্রমাণ গতরগুলো

দাঁতের পাটি পৌষে মূলো।

শুয়োর গরু টাটু ঘোড়া

মিনিটে খায় জোড়া জোড়া

মানুষগুলোর মটকে ঘাড়

একনাগাড়ে সব সাবাড়।

 

ঊনস্টের লোকেরা ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ে। ঘর বাড়ি ছেড়ে, পিতৃপুরুষের ভিটে-ভুঁই ছেড়ে সবাই গরু ভেড়া শুয়োর-টাট্টু নিয়ে পালে পালে, দলে দলে ঊনস্ট ছেড়ে পালায় দুটো দিগধেড়ে দুরন্ত দত্তির ভয়ে। কিছুদিনের ভেতরে ঊনস্ট সাফ-

 

তখন, কাক পক্ষী ডাকে না।

জন মনিষ্যি থাকে না।

গরু ভেড়া চরে না

দত্তিদেরও পেট ভরে না।

ধু ধু করে শুকনো মাঠ

দত্তি দুটো শুকিয়ে কাঠ।

 

তখন কি খাই, কারে খাই-

 

রেখে ঢেকে খেলে সাত পুরুষের, রাক্ষুসে খাওয়া দুচার দিনের। কিন্তু দত্তিদের তো আর গেলবার সময় সেসব কথা মনে থাকে না।

 

এখন, যতই কর খাই খাই,

রাজ্যেতে আর খাদ্য নাই।

তাই, লিখিবে পড়িবে মরিবে দুঃখে,

মৎস্য মারিবে খাইবে সুখে।

 

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। কিন্তু মৎস্য মারা যায় কি ভাবে।

 

এখন খিদের চোটে পরাণ যায়

মৎস্য মারার কি উপায়।

 

হারমান দুশ্চিন্তায় ছটফট করতে করতে সুমুদ্দুরের পাড়ে ঘোরে। দেখে একটা ভাঙ্গা জাহাজ। কবে কোন দিন ভাসতে ভাসতে এসে ডাঙ্গায় আটকেছিল। চট করে দত্তির মাথায় মতলব এসে যায়। হারমান দত্তি আকাশ ফাটিয়ে হেসে ওঠে- ‘হা-হা-হা-হা। পেয়েছি, পেয়েছি-

 

দত্তির বুদ্ধি নেই নাকি। এবার, স্যাক্সিটাকে দিই ফাঁকি-

 

ঝট করে ভাঙ্গা জাহাজের মাস্তুলটা বাগিয়ে ধরল হারমান। সেটা হল ছিপ। জাহাজের কাছির তাল হল কড়। আর নোঙরটা বঁড়শি। ফাতনা একটা ছোটখাট তক্তা। হারমান দত্তি সুমুদ্দুরের খাড়ি থেকে একটা খোকা সীল মাছ খণ করে ধরে নিয়ে নোঙর-বঁড়শিতে গেঁথে সুমুদ্দুরে ছুড়ে দিলে। তারপর মাস্তুল-ছিপ হাতে নিয়ে গিয়ে বসল সুমুদ্দুরের ধারে একটা উঁচু পাহাড়ের চুড়োয়।

 

বসতে না বসতেই ফাতনা নড়ে চোঁ করে ডুবেছে। আর হারমান দত্তিও কষে মেরেছে এক চড়কটান। ওরে বাপ রে সুমুদ্দুর থেকে হুডুস করে উঠে এল একটা হাতির মতো তিমি মাছ। দেখে হারমান দত্তি মহা খুশী।

 

আর একটা পাহাড়ের চুড়োয় বসেছিল স্যাক্সি গালে হাত দিয়ে। তার কেটলীতে তখন জল ফুটছে টগবগ করে। সে কেটলীও যেমন তেমন নয়। পাহাড়ের চুড়োয় একটা মস্ত বড় খোদল। খোদলটা ভরা আছে ফুটন্ত গরম জলে। অনবরত ফুটছে টগবগ, টগবগ। কিন্তু ফুটন্ত জলে তো আর পেট ভরবে না। শুধু নাড়ি-ভুঁড়িগুলোই সেদ্ধ হবে। গরু কই? ঘোড়া কই। শুয়োর-ভ্যাড়া-মুর্গী কই? নিদেন পক্ষে একটা মাছ-

 

হঠাৎ দেখে হারমান সামনের পাহাড়ের চুড়োয় বসে টেলে তুলেছে এক মস্ত তিমি। জুলজুল করে দেখে স্যান্সি।। পেটের খিদে চতুর্গুণ হয়ে ওঠে। যেন হাজার ডালকুত্তো নাড়ি-ভুঁড়িগুলো ছিঁড়ে খায়।

 

 

এমন সময়-

 

স্যাক্সি ভাই, স্যাক্সি ভাই

তোর কেটলীটা একটু ধার চাই

তাহলে তিমিটা সেদ্ধ করে খাই।

 

এতো বড়ো তিমিটা কাঁচা খাওয়া যাবে না। বড্ড বেশী চর্বি-

 

স্যাক্সি মুখ ভার করে বলে,

 

যদি দাও তিমির অর্ধেক খান

তবে কেটলী দিয়ে রাখব মান।

আর যদি তা না দিতে চাও

ঐ চর্বির ডেলা কাঁচা খাও।

 

শুনেই হারমানের চিত্তির চটে গেছে। সে চেঁচিয়ে ধমকে ওঠে-

 

ওরে ছুঁচো ওরে পাজী

তোর লোভ যে দেখি ছিষ্টিছাড়া।

একি ভূতের কাছে মামদোবাজি

আধখানা তিমি কেটলী ভাড়া?

না হয় নিবি একটা ল্যাজা

কিম্বা নিবি পাখা, তাকি

চাইলি পুরো আধখানা মাছ

মামার বাড়ির আদর নাকি?

 

অন্য পাহাড়ের ওপর থেকে স্যাক্সিও গর্জন করে ওঠে। খিদের চোটে তারও মেজাজ ভাল হবার কথা নয়।

 

ওরে কুত্তামুখো দত্তি যে তুই

আস্ত তিমি একলা খাবি?

পেটের ব্যামো ধরুক তোকে

যমের বাড়ি সটান যাবি-

 

তবে রে, উটমুখো স্যাক্সি। দাঁড়া। আমায় যমের বাড়ি পাঠাবার আগেই তোকে পাঠাই যমের বাড়ি-

 

হারমান যেই তার পাহাড় থেকে নামতে যাবে অমনি-হুস্থস্। হুস্থস্। সুমুদ্দুরে জোয়ার এসে পাহাড়ের তলা ডুবিয়ে দিয়েছে। আর নামা হল না। দত্তিরা ঠিক বেড়ালের মতো। পায়ের পাতা ভিজলে তাদের বড্ড খারাপ লাগে। আর তাদের শক্তি সামর্থ্য সব ঐ দু পায়েই। সেই পা যদি শুনো ডাঙায় থাকে তবে সে শক্তি বড় ভয়ানক। পা ভিজলেই দত্তিরা বিষ হারিয়ে ঢোঁড়া। জলে পা দিতে তাই দত্তিদের মহা আপত্তি।

 

হারমান আর নামতে পারে না। কিন্তু গালাগালি আর হুমকির কামাই নেই দুদিকেই। দুজনেই বড় বড় পাথরের চাঁই তুলে ইঁটের মতো ছুড়ে মারতে লাগল দুজনের দিকে। শেষে হারমান বিষম রাগের চোটে একটা পাথরের চাঁই তুলে সুমুদ্দুরের ওপর গড়িয়ে দিলে। মতলব ওর ওপর একটা পা রেখে টপকে গিয়ে উঠবে স্যাক্সির পাহাড়ে। কিন্তু

 

হারমান এমন চটা চটেছিল যে তাড়াতাড়িতে সেই পাথরটার ওপর পা ঠিক রাখতে পারল না। একটা পা দিয়ে অপর পাটা তুলতেই দুবার টলে গিয়ে সে হুড়মুড় করে পড়ে গেল সুমুদ্দুরের ভেতরে। আর টুপ করে ডুবে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

 

আর তাই না দেখে আর এক পাহাড়ের চুড়োয় স্যাক্সির নাচ। হেসে ফুটিফাটা স্যাক্সি। মনের আনন্দে সে গান

 

ধরল-

 

টুপ করে ডুবে মল হারমান

তিমিটার আমি খাব গোটাখান।

কি মজা কি মজা ট্রালা-লা-লা।

এমন দিন তো রোজ আসে না-

 

বলে সে যেই ধেই ধেই করে নেচে উঠেছে, অমনি হঠাৎ পা ফসকে পাহাড়ের চুড়ো থেকে সুমুদ্দুরের জলে দুড়ুম, ধপাস-

 

ব্যাস্ দুটো দত্তিই খতম। আমার কথাটিও ফুরোল-‘

 

আমি বলি, ‘গ্যানগ্যান ওখানে দুটো পাহাড় দেখে এলাম তাদের নাম হারমানেস আর স্যাক্সাভোর্ড-‘

 

‘হাঁ হাঁ ঐ দুটোই তো ছিল হারমান আর স্যাক্সির আস্তানা।’ আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে ওঠে গ্যানগ্যান। ‘আর পাহাড় দুটোর মাঝখানে সুমুদ্দুরের যে খাড়িটা, যেখানে ঐ স্যাক্সিটা ডুবে মরেছিল, তার নাম কি জান? তার নাম স্যাক্সিস্ বে-স্যাক্সির খাড়ি।’

 

এতোক্ষণ গল্পে জমে গিয়ে লক্ষ্য করি নি আংকল জ্যাক কখন চুপিসাড়ে এসে গ্যানগ্যানের পিছনে একটা চেয়ারে বসে পড়েছিল। ভুস্ করে পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বলে, স্যাক্সনরা যখন এদেশে এসে লুঠতরাজ আর খুনখারাপি চালাত তখন থেকেই এই গল্পোগুলো চালু। নাম শুনেই বুঝতে পারছ ওগুলো হল টিউটন স্যাক্সন নাম-‘

 

গ্যানগ্যান বলে ‘যারা লুঠতরাজ করে আর মানুষ খুন করে তারা দত্তি ছাড়া আর কি? আর সেই দত্তিগুলোও শেষ পর্যন্ত মরে নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে-‘

 

—————————————————–

* লক্ষ কোটি বছর আগে মাটির তলায় শ্যাওলা জমে কয়লা হয়ে গেছে। ওদের বলে পীট। অর্কনে, শেটল্যান্ডে, আইসল্যান্ড অঞ্চলে বাদা ও জলাভূমির তলায় থাকে এই পীট। থান ইঁটের মতো এগুলি কেটে এনে রোদে শুকিয়ে সারা বছর জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করে এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা। কাঠ বা কয়লা এসব অঞ্চলে পাওয়া যায় না, তাই পীটই হল একমাত্র জ্বালানী।

আরও পড়ুন:

গ প্ পো ৫ – কুঁড়ে নিক্কির গল্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।   ‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –   সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- …

পড়ুন

গ প্ পো ৪ – পুঁটে দত্তিদের গপ্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি। স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের …

পড়ুন

পিতা নোহসি/প্রতিভা সরকার

‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’ গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ …

পড়ুন

গ প্ পো ৬ – উপকারী পুঁটে দত্তির গপপো/বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘ম্যাকলাখানরা তো ব্রাউনি পুষত —’ এতক্ষণে কথা বললে আংকল জ্যাক। ‘ও সব ব্রাউনি ফ্রাউনি আমি জানি না —’। মুখ ঝামটা গ্যানগ্যানের। ‘ব্রাউনি হোক, পিক্সি হোক, লেদোকোন আর ট্রোন্ড যাই-ইহোক—এক ফিনরা বাদে ওরা সবাই পুঁটে দত্তি। ট্রো —’ ‘তা ফিনরাও তো পুঁটে। এই এতটুকু —’। বললে আংকল জ্যাক। ‘তা হোক, ফিনরা তো আর ডাঙর নয়। তারা …

পড়ুন

পেরেস্ত্রোইকা/কস্তুরী সেন

অতল, আত্মবিস্মৃত, শেষত শেষ কাকে বলে ? উদ্বেগের পর উদ্বেগ, বিরতির পর পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেলা সাড়ে চারটেয় ধর্মতলা পেরিয়ে যাচ্ছে দুশো একুশ মাঝমাঠ, খাদ্য আন্দোলন, একদিন একদিন শহরে মানুষ পোড়ে, জিতে বেরিয়ে আসে হিমঋতু ‘এই যে ধাইন্যক্ষেত্র তা দ্যাখতে তো পয়সা লাগে না’ দেখতে দেখতে দেখে যাওয়া, মানুষের এলোমেলো ভিড়, সিগনালে আলো নিভে যায় সাবেক …

পড়ুন

কাজের ভাষা, মুখের ভাষা/স্বপ্নময় চক্রবর্তী

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, ‘এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় …

পড়ুন

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা। এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা …

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি   ভেবেছিলাম কোনোদিনই ফিরবে না আর দেখা হয়ে যাবার পর বৃষ্টিপাতের মতন অহেতুক বিপর্যয় এল   যাত্রীহীন ট্রেন এক পাহাড়ি স্টেশনে কিছু অস্পষ্ট ছায়া, টুপি পড়া, উঠে গেলো নির্দিষ্ট কামরায়   নিজেকে যোদ্ধা ভেবে ঢুকে যাই সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাকে যেখানে আমিই …

পড়ুন

দি লাস্ট মিটিং/সমরজিৎ সিংহ

একটি রাস্তা । তারপর, আবার রাস্তা । তারপর সমাধি । তার উপর চাঁদের ছায়া । দু’একটা পাতা । রাস্তার ওপাশে একটা ভাঙা দোকান । তিনটে চেয়ার । সমাধি থেকে উঠে এসে এই চেয়ারে বসলেন তিনি । টোটেনখাম । চাঁদ তখন পিছলে যাচ্ছে রাস্তার উপর । তিনি তার ভাঙা হাড়ের আঙুলগুলি বের করে কাকে যেন ডাকলেন …

পড়ুন

বৃষ্টি তুমি রোদের মধ্যে /বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টি আমি জানি তুমি চরিত্রহীন, কুলটা নও কখনও হবে না মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতন ধূর্ত জাফরি-কাটা যে বারান্দা থেকে তোমায় ছুঁয়েছিলাম, প্রবল খরার মরশুমে সেই জাফরি আমার মাথায় ঘুরত…   শুধুমাত্র ‘বেঁচে’ জীবন কাটানো খুব কঠিন বলে বিকেলবেলার তেজি আগুন রাত্রি নামলে ছাই হয়ে যায় বম্বে থেকে বেঙ্গালুরু পাক্ খেয়ে পাক্ খেতে খেতে তোমায় পাবো …

পড়ুন

খেলার দৃশ্যান্তর/অনির্বাণ বসু

একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে …

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি …

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার হিমঝিম মস্তানা আমি তোমার কুঁকড়ে থাকা পোকা তুমি আমার ফলানা ঢিমকানা   সকাল থেকে রাত্রি আমি তোমার প্রেম বলিনি তবুও , কে খায় ধোঁকা   রাত্রি থেকে দিন তো তুমি আমার সূর্য চাঁদের চাঁদোয়া টাঙায় খোকা   প্রেমের কাছে, প্রেমের …

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি। কতবার কলসপুর যাত্রা শুরুর মুখেই ভেস্তে গিয়েছে। আমি কলসপুরের   কাছাকাছি থেকে ঘুরে এসেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু যেতে পারিনি কেন যে–তা ঠিক ধরতে পারি না। ভেবেছিলাম একবার একাই ঘুরে আসব। কিন্তু শেষে মনে হয়েছে দীপিকা দুঃখ পাবে। লুকিয়ে না যাওয়াই …

পড়ুন

কানুর বিয়ে/সুবর্ণা মণ্ডল

কানুর সেদিন খুব কান চুলকাচ্ছিল। আগের দিনের যে পায়রাটা হাত থেকে ফসকে গিয়ে শুধু একটা পালক রেখে গেল, কানু সেই পালক কানে ঢুকিয়ে আরামে চোখ যেই না বুজেছে অমনি বাপের চিল চিৎকার, “হ্যাঁ নবাব আমার, কানে পালক গুঁজেই থাকো। যা বয়স বাড়ছে এরপর আর মেয়ে জুটবে না কপালে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যা। নবাবপুত্তুরের যা …

পড়ুন

মুষলপর্ব/বেবী সাউ

শূন্যতার রং নিয়ে বড়ো বেশি ভেবে চলো তুমি অথচ জলের কাছে প্রতিদিন শিখে নিই নীল ঘষা রং আমাদের অভিমানগুলো ভেঙে গেছে আজ তার কোনো গতিপথ নেই; সূত্র ভুলে গেলে, বলো, কীভাবে মেলাবে— জীবনের মায়া, ছায়াধ্বনি! সহজ ভেবেছি যতটুকু, কঠিনের আবরণে ঢেকে গেছে রোজ সেই লক্ষ্যভেদ, মাছের নরম চোখ কিংবা জাতিভেদ প্রথা বারবার ফিরে আসে— বারবার …

পড়ুন

বৃষ্টি নামচা /অগ্নি রায়

এক   ছোট ছোট চিরকুটে ভরে যাচ্ছে বাদলবেলা। বল্লভপুর, গোবিন্দপুর, মুকুটমণিপুর হয়ে মধুপুরে পৌঁছেও শেষ নয় পথ, এই পুরবাসী তালিকাকে পৌঁছতে হবে একশ আটে! তবেই বৃষ্টি থামবে ঠাকুমার কথামতো। কচিকন্ঠের মিনতি কাকলির কাছে লেবুপাতা আর করমচা ঝরে যায়। বালিকাসংঘের গায়ে জলের ছাঁট আবার ফিরে আসার কথা দিয়ে সরে পরে, এক আশ্চর্য লোকায়ত টোটকার পর।   …

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই …

পড়ুন

আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;   কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়।  বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে …

পড়ুন

বিমর্ষ জল ও উড়ন্ত লাল কার্পেট/গৌতম গুহ রায়

খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো …

পড়ুন

এ এক ‘অচেনা’ দেশ/পার্থ মুখোপাধ্যায়

আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই।  প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু …

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা আমাকে দেখিয়েছিল। ছোটো বাচ্চা তখন ও। কাজ থেকে ফিরে ভূতকে ওর মা আবিষ্কার করেছিল ওদের ধান সিদ্ধ করা উনুনের ভেতর কালি ঝুলি ছাইমাখা অবস্থায়। ওর মা হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখ দিদি, এ যদি ভূত না হয় তো ভূত কাকে বলবি? …

পড়ুন

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে। কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে …

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে একাই পাহারায় সে হাসির খানিক মুখে সাবলীল উত্তরাধিকার কখনো বা সাজিয়ে নিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো ‘আমি’র মধ্যে কতগুলো দাঁড়টানা কাক কালো এলোমেলো কখনো ভাবিনি অন্ধকার উজাড় হয়ে আসে কোন পথে! কেমন করে রোদ টুকু মরে যায় …

পড়ুন

মায়াচাঁদ/অলোক বিশ্বাস

হাসছি বলেই চাঁদ উঠছে নাকি চাঁদ উঠছে বলে হাসছি— কোনো একক মাত্রাকে চায় না মানুষ, নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও। এমনতর সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে বীতশোক সাঁতরে আমি যাবো তাহার নিকটে। চাঁদে বসে গাইব মায়াবাদ, চাঁদে বসে বুনব খামার জমি। আমাদের দাবি অনুযায়ী ভালোবাসা চিরকাল চাঁদের সাপোর্ট পেয়েছে। পুনরায় চাঁদে গিয়ে অপেক্ষা করব তোমার জন্য। আমার রান্নাঘরে, পড়ার ঘরে বাজছে …

পড়ুন

গুঁড়োমশলা/কাবেরী গোস্বামী

সে এখন একটি অচল পয়সার মতন ফিরেও তাকায় না আর কেউ কারণ, সে আজ শুষ্ক বিবর্ণ পরিত্যক্ত এক যোনি

পড়ুন

তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন। তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান। আমার …

পড়ুন

বৃষ্টির দিন/কালীকৃষ্ণ গুহ

বৃষ্টির দিন ফুরোয় না কারো জীবন থেকে। বৃষ্টির দিনগুলি সব বিরহযাপনের দিন।   বিরহযাপন শেষ হয় না জীবনে।   কারো বিরহ কান্নার জন্ম দেয় কারো কাছে তা শুধু স্মৃতি হয়ে আসে।   এখন বৃষ্টির দিনে শুধু বাইরে তাকিয়ে চারদিকের গাছপালা ভিজতে দেখি। তাদের অনুচ্চারিত আনন্দ দেখতে পাই।   সেদিন একটা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা পাগলকে …

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার !  সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে …

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন কাজ-কাজ-কাজ ধ্যানসম একাগ্র। রান্নাকরার মাঝে বলতে গেলেই কিছু সম্বিত ফিরত যেন! সকলের রাত হয়। তাঁর তো হয় না। সকাল-দুপুর-সন্ধে আঁচলের গিঁটে বেঁধে বিলিয়ে দিতে দিতেই ক্লান্ত একটা দেহ মাঝরাতে বিছানায় হাই পাওয়ারের গ্লাস বালিশের পাশে রেখে দুচোখ জুড়িয়ে এলে একদিন …

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই …

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো বাংলাভাষার দেহত্বকে এই যে উজ্জ্বলবাক্য ঠিকরে পড়ছে বিকেলের প্রায়… চলাচল নিভে আসছে। কিছুপরে সন্ধে নেমে এলে একটি দুটি তারা জ্বলবে তোমার স্পর্শের মতো,নিভে জ্বলে ওঠা আকাশের মাথায় মাথায়…

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন কঠোর তবু অন্ধ ভিখিরির হাত ধ’রে আরেকটি গল্প লেখে, ভাবে— লেখা কিছু জমে থাক আগামীর দিকে   আশা ভাঙে। জাগে শুধু ডুবে যাওয়া পুরোনো বন্দর   শান্ত মানুষের মতো; নির্মোহ ততটা   ভেসে যায়   ততটুকু স্পর্ধা হলে, নাবিক তোমায়   …

পড়ুন

তোমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম/বর্ণালী কোলে

(১) বিদ্রোহ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে জলকামান আক্রোশ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে মুহুর্মুহু ভীমরুলের মতো কামড় শান্ত হয়ে আসছে মল্লযুদ্ধ ক্ষোভ, অভিযোগ দেখা দিচ্ছে ফাল্গুন রাত্রি আকাশ জুড়ে শ্বেতরঙ্গন (২) যেভাবে বীণা স্পর্শ করে আছে পদ্মকে সেভাবে তুমি আমাকে স্পর্শ কোরো আসছি এখনও তুমি কাজ করছ শুকতারাটি উঠবে এবার শিয়রে তোমার …

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের আশ্রয় নয়। বিষয়টা নিয়ে আসলে অনেক দিক থেকেই তর্ক হতে পারে। প্রতিযোগীরাও নানা দিক থেকে আলোচনা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের ফলাফল খুব স্পষ্ট হল না। সকলেই মানলেন রবীন্দ্রনাথের গান আশ্রয় হওয়া উচিত। মোশনের সমর্থনে যাঁরা বললেন, তারাও সেটা …

পড়ুন

এক মেঘলা না থাকা/শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে মা, তুমি ছাদে উঠেছিলে  বালতি ও কাপড় সাবান জলের মধ্যে সূর্য তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি অথচ …

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি সচেতন প্রতিরোধ ছিল প্রগতি, আর মেঘ ডাকলে সূর্যত্রাসে কেঁপে উঠত প্রতিক্রিয়া। রথ দেখতে যাওয়ার মতো তুমি সুদূর করে নিয়েছিলে তোমার দিগন্তরেখা, স্বপ্নের সেই সাদা ঘোড়াটিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত স্ববিরোধে বেরিয়ে পড়েছিলে সাম্রাজ্যবিস্তারে, খুরে খুরে ধুলোর ঝড় তুলে বিলিয়েছিলে কল্যাণ, ফিরে এসেছিলে …

পড়ুন

মন্দির দেখা সহজ নয়/শ্রীলা বসু

বেড়ানোর পোকাটা আমার মাথায় এসেছে প্রধানত পৈতৃক সূত্রে। বাবার হাতে ম্যাপ টাইম টেবিল দেখতাম হরদম। গাড়ি চালিয়ে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে নতুন জামাইকে নিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে রাঁচি চললেন তখন একচেখে ভালো দেখেন না। তবু কী ? অন্য চোখ তো আছেই। কিছু বললে বলতেন পতৌদির একচোখে ক্রিকেট খেলার কথা। তবে …

পড়ুন

গদ্য বনাম কবিতা/অংশুমান কর

“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।” বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা …

পড়ুন

অচেনা দুপুর/সৈয়দ কওসর জামাল

প্রতিবাদ ভুলে থাকি আজ পড়ে থাকি এককোণে, দুরে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে স্থিতভূমি, বেতাল অ-সুরে   কোন সুরে বাজবে সেতার আষাঢ়ে বাজবে কোন মন? জানালার পাশে আজ নয় বিপর্যস্ত কোরো না জীবন   বরং কবিতা লেখো, ভেজো জবুথবু শালিকের মতো, বৃষ্টি এসে সলজ্জ বলুক এসো প্রেম, এসো ইতঃস্তত   একটি কবিতা লিখেছিলে তুমুল বৃষ্টির কোনও …

পড়ুন

অনন্ত সংলাপ/অর্পিতা কুণ্ডু

আমি: ঢেউ তো প্রোজ্জ্বল, তাতে তুমি বসে আছ শিরোচূড়ামণি। হাটের নাগর তুমি, ভিটায় নিমিত্ত সামগান — তোমাকেই বর্মে বৃত্তে চুপিসাড়ে রোমন্থন করি। যেমত অছিলা পটিয়সী, যে মৃদু চারণভূমি পার করে কাছে আসি, তার কিঞ্চিৎ আদর কোরো। বহুবর্ণ লোক সমাগমে একেলা ফেলো না তাকে রৌদ্র-বাতায়নে। সে: না সখি, না, বাতায়ন-পাশে তোমার শরীর মুক্ত, জনশ্রুতি এই — …

পড়ুন

একা মানুষ, পঞ্চাশ অস্তিত্ব/চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ লেখক: রিচার্ড জেনিথ প্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য …

পড়ুন

প্রস্তাব/সুমন গুণ 

পাতায় বৃষ্টির শব্দ সাংসারিক, দ্বিপ্রাহরিক। আস্থা ও আশ্বাস থাকে, সমবেত, শুভানুধ্যায়ীর পীড়া ও আরাম থাকে। যথাস্থান থাকে। থাকে মেঘ, অস্পষ্ট ও গূঢ়,  সম্পর্কের অসহায়তার মতো,  চিন্তা ও ক্ষমার মতো, পতনকালীন বজ্র ও বিদ্যুৎভরা নৈশব্দের মতো।   পথেও স্তব্ধতা থাকে দ্রুতগামী; নৈকট্য ও নিশ্চয়তাভরা। কোথাও স্থানাংক আছে, ছাদ আছে, দরজা ও রেলিংঘেরা সুবাতাস আছে,  আছে স্থিতি, …

পড়ুন

শিশিরকুমার দাশ: খুঁজে ফিরি কর্ণ, কর্ণের সহোদর/মোস্তাক আহমেদ

মৃত্যুলগ্ন পার হয়ে যতবার গিয়েছি নিঃসীমে বিদ্যুতের দীপ হাতে: অন্ধকারে আকাশের বিস্তৃতি অপার বিদ্রোহী ঝড়ের যত উদ্বাহু মেঘেরা আমন্ত্রণ করে আনে অতীতের ঘন অন্ধকার; তবু দেহ ভিজে গেছে শান্তিস্নিগ্ধ হিমে।                                                                                         (মৃত্যুলগ্ন/জন্মলগ্ন)   কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জন্মলগ্ন’। ‘পূর্বমেঘ প্রকাশ ভবন’ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৫৬-তে। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। কী দীপ্ত উচ্চারণ! কয়েক বছর হল দেশ …

পড়ুন

শহর/বিজয় সিংহ

ফেরার আগে যে তুমি অহৈতুকী ছিলে ফেরার পরে যে প্রাক গোধূলিরা অপ্রবাসে ঢোকে ফক্স কে টু, হে আরাধ্য, সেইসব গ্রন্থনায় মায়ুশ মজ্জার থেকে অনুচক্রিকা কুড়াতে পাঠাও স্বপ্নের অতলে নেমে দেখেছি জুবিলি অসহায় ফুটেছিল হেতু তার কোনো বাড়িঘর নেই, লেক মল, পূর্ণদাস রোড নির্মিত আরশিনগরে পড়ে থাকা সংক্রামক লাশ ফেরার আগের রাত্রে নরসিংহমূর্তি দেখিয়েছে ও ফেরার …

পড়ুন

ফুলঝরিয়া/সেবন্তী ঘোষ

এক পিছনে জঙ্গল ।ওই ওপারের রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গল। ক্রমশঃ দুপাশের জঙ্গল উজাড় করে  ফোর লেন হচ্ছে। এখনও পুরোটা খুলে দেয়নি। নবনির্মিত সেই পথের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ফুলঝরিয়া আর পিংকি। বসাটা নতুন নয়, জায়গাটা নতুন। বসার জায়গাটাও ঠিক নতুন নয়, দেখতে নতুন। পিংকি বলে, আগের ঘাসটাই ভালো ছিল রে, গড়িয়ে গেলে কত …

পড়ুন

পিরিত/অভিমন্যু মাহাত

খুব টানটান ছিল বেদনা যত দিন যায় ভুল বাড়ে, প্রবঞ্চনাও বাড়ে স্মৃতিভ্রষ্ট সুতোয় পিরিতের বহি সমস্ত ঋতু জুড়ে বিলাপ শালপাতার আড়ালে আশ্চর্য ঝুমুর এভাবেই একদিন হঠাৎ দর্শন যার তত্ত্ব ও তালাশ ছিল পুরনো সহসা উঁকি মারে নিরুদ্দিষ্ট প্রণয় কিন্তু নাশকতা সামান্য দূরে, আম্রমুকুলের গন্ধে টের পাই অভিমান কেন ভাঙে আজও বুঝিনি… কাল যাব অশোকনগর

পড়ুন

নোটপ্যাডের নৌকো/মন্দাক্রান্তা সেন

এক বর্ষার দিনে সে আসবে বলে কথা দিয়ে আসেনি।   এই সামান্য বিষয় নিয়ে পদ্য লিখে প্যানপ্যান করা এই বয়সে নিতান্তই ন্যাকামি হয়ে যাবে।‌   নাকের জলে চোখের জলে ছপছপ করছি । কোথা গেলে,‌ সেয়ানা প্রাণাধিক   নোটপ্যাডে নৌকো ভাসাই । নেহাত বালিকা আহা‌ আহা ।   তুমি আসবে বলে আসোনি। বেশ করেছ ।   …

পড়ুন

বিস্মৃতপ্রায় লেখক নিরুপমা দেবী/ঈশিতা ভাদুড়ী

অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক। নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক …

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। জলপ্রপাত অবিরাম দুগাল বেয়ে! কাকে বেছে নেব? শালবনে জ্যোৎস্নাপথ? নাকি রাতের নদীজল? কে হবে সঠিক নির্বাচন? কার করপুট-স্পর্শে শঠতা নেই, কারা কারা আমার বৃত্তে নিরাপদ হবে, সেই সব নির্ভুল নির্বাচন সহজ নাকি? নির্বাচন শব্দটি যে কত অমোঘ …

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই। রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের …

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে অবশ করে তোলে। লোকজন কী রকম চোখ টেপে, টিপ্পনী কাটে, সন্ধ্যায় একা বেরোলে খারাপ মেয়ে ভেবে ইশারায় কেউ প্রস্তাবও দেয়। আমার পরিচিত কয়েকজনকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি, তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না, তা নয়, তবে …

পড়ুন

সাইলেন্স দিস আপকামিং কল/যশোধরা রায়চৌধুরী

মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি। বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম। এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন? বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের …

পড়ুন

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে এ শহরে তো লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে–আমরা এখান থেকে পুরীধামে যাই, চিল্কাতে জলবিহার করি, লিঙ্গেশ্বর মন্দির দর্শন করি –অথচ — যে ‘কিন্তু’ আর ‘অথচ’ আমাকে এবার রথে চাপাল-সারথি বলল–উধার তো কোই যাতা নেহি। বললাম –সেই জন্যেই তো। উচ্চবর্ণের দেব দেবী …

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ …

পড়ুন

প্রশ্নপদ/অশোক দেব

সব মরুবৃক্ষ কেন শ্রাবণ জাতক? তাদের দেহের জল সেকথা জানে না?   একলা শ্রাবণে বসে এইসব ভাবি বালিমাখা চাঁদ কাল কার ঘরে ছিল?   তাহলে তৃষ্ণার ফুল বিরহ-গন্ধক? আগুনে আগুনে কথা, বিদায় সংগীত?   কে তুমি গাইছ ওগো এমন মাথুর, এমন শ্রাবণে এলে রাধিকাসম্পদ?  

পড়ুন

প্রেম/রামকিশোর ভট্টাচার্য

প্রতিদিন রামপ্রসাদি মেখে কাপড় কাচতে কাচতে সাবান হয়ে একদিন গলে গিয়েছে মা ৷ অবসাদ পালক জড়িয়ে হঠাৎ জলবায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাবাও , এখন একলা একা সুতির ফুলমাখা কুর্তি মারুবেহাগ দুপুরে দু’হাত নাচিয়ে ঝুলেই থাকে – দিগন্তের বুকে , জোছনার রূপকথা নিয়ে – কচি হাওয়ারাই ঝিরিঝিরি গান শুনিয়ে যায় , রঙের বেলা গড়িয়ে গেলেও নাইলনের …

পড়ুন

ফিল্ম শুটিং-এর গল্প/পার্থ মুখোপাধ্যায়      

১৯৮১ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বংশীচন্দ্র গুপ্ত। ‘ শিল্প নির্দেশনায় বংশী সমকক্ষ ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বংশী ছিল এক এবং অদ্বিতীয়।’ তার স্মরণ সভায় শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই রকম বক্তব্যই রেখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ‘পথের পাঁচালী …

পড়ুন

পুরনো দিন নতুন দিন/শংকর চক্রবর্তী

মনে পড়ে সেইসব রবীন্দ্র-গানের সকাল সূর্যাস্তের থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলেশহীন কোনো সন্ধের পাশে বেজে উঠত জড়োসড়ো একবারও কেউ ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে চায়নি তখন সাদামাটা বিকেলগুলো শুধু এই ষড়যন্ত্রীর শহরে অন্ধকার নামিয়ে রাখত প্রতিদিন সেই সকাল থেকে ছুটে যেত সবাই একে অপরের জামা-প্যান্ট উদোম করে ছুটত তুমি শুধু সারাজীবন অপরাধীর মতো মোমবাতি হাতে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ …

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে গেছে সুর। মনে হয় নিষ্পত্র গাছগুলিতে একটি একটি করে জেগে উঠছে কচি পাতা। মনে হয় রোদ্দুর হয়ে গেছে আধো আধো কথা বলা শিশু। শীতকাল হলেও পৃথিবীতে কোথাও একটা নিশ্চয়ই শিউলি ফুটে, ঝরে সাদা করে রেখেছে উঠোন …

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার প্রাচুর্য আহার, তুলতে গিয়ে দেখি, প্রায় শেষবেলা অঘ্রাণ আভায় একেকটি কালের কাঠামো ভেঙে যায়

পড়ুন

বজ্রসেনি/সার্থক রায় চৌধুরী

নুয়ে পড়া ডাল আর চুঁয়ে পড়া জল, জলের গভীর থেকে মেঘ বহুতল, আকাশ পাগল যেন আত্মহারা এক বৃষ্টি এলো- জানে ভিজল যারা..   জানে? পাগল তবে কার নেশার ঘোরে আঁকে বজ্র, হাওয়ায় ভেজা পালক ওড়ে…

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা