আমাজনের চার অধ্যায়/চৈতালি চ্যাটার্জি 

কালো , আঁধারের মাঝে ;

 

কুচকুচে কালো চারিপাশ, তারই মাঝে কিছু আলোর বিন্দু ফুটে আছে। আমাজনের রাজধানী মানাউসে রাতের বেলায় এসে পৌঁছালাম। দুইপাশের আঁধারকে চিরে আমাদের গাড়ি চলেছে সরু রাস্তায়।  বোঝাই যাচ্ছিল, সকাল হলেই এখানে ঘন জঙ্গল দেখা যাবে। কি জানি, রাতের অন্ধকারে পাশের জঙ্গল থেকে কোন পশু চলে আসবে না তো? সেই যে শুনেছিলাম আমাজনের নিগ্রো নদীর নাম, সেও কি আমাদের খুব কাছেই? একরাশ বিস্ময় কিলিবিল করছে। বাইরে প্যাচেপ্যাচে গরম। রাত কিন্তু বেশি নয়, তখন সাড়ে আটটা বা নটার কাছাকাছি হবে, অথচ এমন আধার  দেখে মনে হবে যেন রাত ১ টা বেজে গেছে। শহর থেকে গেলে বোধহয় এমনই মনে হয়। এয়ারপোর্ট থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে আমরা হোটেলে ঢুকে গেলাম। হোটেলে ঢুকে দেখি  কালো বড় বড় অনেক মুখোশ ঝুলছে দেওয়ালে। আপাতত এখানে এক রাত থাকতে হবে।  আগামীকাল যাব আরও দূরের এক গ্রামে।

পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম শহর ভ্রমণে। প্রথমে যাব বাণিজ্য বন্দর তারপর স্থাণীয় বাজার দোকান ঘুরে নিগ্রো নদীর ধার। পোর্টে যাওয়ার পথে বুঝলাম চারিপাশে জঙ্গল দিয়ে ঘেরা এই রাজধানী। আমরা বেশিরভাগ সময়েই শহরের মধ্যে জঙ্গল দেখে থাকি কিন্তু এটা জঙ্গলের মধ্যের এক শহর যা রাতের অন্ধকারে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায়। সারি সারি বিশালাকার জাহাজ বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে , কিছু  মাল বোঝাই , কিছু যাত্রী পরিবাহী। সাঁওপাওলো থাকতে শুনেছিলাম, ব্রাজিলের জলপথে ব্যবসার মূল বন্দর হল আমাজন নদীর উপর দুটি পোর্ট, তার মধ্যে এই বন্দর একটা, আর একটা আছে পাশের রাজ্য বেলেমে, সেখানেও আমাজনের বিস্তৃতি।
নিগ্রো নদী আর ধুসর নদী, দুই মিলে আমাজন নদীর জন্ম। ৬ কিলোমিটার অব্দি  এই দুই নদীর মিলনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাজারে পসরা বছরের হরেকরমের মাছের। নদীর জলের মতই ধূসর আর কালো রঙের নকশায় সজ্জিত সেখানের মাছগুলোও।  একটার পিঠে আর  একটা করে মাছ রাখা। এমন সব মাছ চার বছর সাঁওপাওলোতে থেকে কখনই দেখিনি। একমাত্র  চিনতে পারলাম কালো আর কালচে শ্যাওলা রঙের তাম্বাকি মাছ,আগে খেয়েছি, খুবই রান্না করি, যা একেবারেই আমাদের কাতলা মাছের আমাজনতুতো ভাই। আর তারপাশেই রাস্তায় বিক্রি করছে ঝুড়ি করে রাখা সব্জি। সবকটা ঝুড়িই ঝুলন্ত। মাছের রাজ্যে এরা খুবই ম্রিয়মান বলেই হয়ত দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে। কি অদ্ভূত! রাস্তার ফুটপাতেও দেখি সেই একই নকশা। সাদা কালো টাইলস ঢেউ খেলে গেছে। অনেক দূর অব্দি চলে গেছে এমন ফুটপাথ। এখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নদী যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা এমন সাজানো দেখেই বোঝা যায়।

শহরের হট্টগোল থেকে অন্য দিকে রয়েছে পন্তে নেগ্রা বিচ।  নিগ্রো নদীর ধারে বালি জমে বিশাল বিচের মত হয়ে গেছে। চারিপাশ একদম বিচের মত করেই সাজানো। আইসক্রিম, স্ন্যাক্সের ছোট ছোট ছাতা লাগানো স্টল ,রঙিন বেলুন, রামধনু রঙের চেয়ার। বিচের ধার দিয়ে রয়েছে সারি সারি গগনচুম্বী ফ্ল্যাট। ঝা চকচকে চারিপাশ। লাইট হাউসের পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখি সমুদ্রের মতই শেষ না দেখতে পাওয়া ব্যাপ্তি নিগ্রো নদীর। বলে না দিলে, এখানে সমুদ্র নদীর পার্থক্য বোঝা যাবে না।  কোন প্রান্ত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধুই  অসম্ভব কালো জল। মনে হচ্ছে, জলের মধ্যে কেউ যেন কালি ফেলে দিয়েছে। এমন অদ্ভূত রঙ , আমি আগে কখনও দেখিনি। নীচের থেকে উপরে উঠলে জলকে আরও কালো দেখাচ্ছিল।এই কালো জলের জন্যই বিচের বালিগুলো আরও বেশি জ্বলজ্বল করছিল। উপর থেকে কালো জলের ব্যাকগ্রাউন্ডে বালির উপর সাদা চেয়ারগুলোকে দেখতে আল্পনার মত লাগছিল
ঘুরতে ঘুরতে নিগ্রো নদীর ধারে কখন যে সন্ধ্যে নেমে এলো, বুঝতেই পারলাম না। এরপরের গন্তব্য ১২০ কিমি দূরের জঙ্গলের মধ্যে এক গ্রাম  মানাকাপুরু। রাতের অন্ধকারেই সেখান গিয়ে পৌঁছাতে হবে। শহর থেকে একটু দূরে যেতেই ফোনের ইন্টারনেট তথা নেটওয়ার্ক সব হাপিশ। মানাকাপুরু গ্রামে হোটেলের নাম আগে থেকেই ড্রাইভারকে বলে রেখেছিলাম।  ভাগ্যিস এদুয়ার্দো ড্রাইভার ছিলেন  স্থাণীয় মানুষ । ঐ চত্বরে আর কতগুলোই বা হোটেল , বাড়ি আছে? যে কটা আছে, স্থানীয় মানুষেরা সবাই সবাইকে চেনেন। গাড়ির জানলা দিয়ে কালো ছায়া দুইপাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে।  কোথায় গিয়ে উঠব কোন ধারণাই নেই। শুধু জানতাম জঙ্গলের মাঝে একটা হোটেলে বুকিং ছিল। প্রায় এক দেড় ঘন্টার পর হাল্কা আলোয় সাজানো একটা বাড়ির গেটে ঢুকে গেল আমাদের গাড়ি। চোখ ছানাবড়া করে হোটেলের নাম দেখে বুঝলাম, ঠিকই এসেছি। আমাদের দেখে ভিতর থেকে এক মহিলা আর এক কম বয়সী ছেলে বেরিয়ে এলেন।  আলাপে বুঝলাম, মহিলাটি এই হোটেলের মালিক আর ছেলেটি তার কর্মী। আমাদের দেখে  ঝটপট ইংরাজিতে কথা বলতে শুরু করলেন, বেশ খানিকদূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, “ এই ঘরেই আপনারা থাকবেন। এখানে ফোন আর লাইটের খুবই সমস্যা। রাত ১০ অব্দি আমরা  রেসেপশনে থাকি। তারপর আমাদের আর পাবেন না। আমাদের এই হোটেলটা একটা বুনো জঙ্গলের মধ্যে। রাত ১০ টার পর ঘর থেকে একদমই বেরবেন না। অন্ধকার হয়ে গেলে যেকোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর কোন পশু বেরিয়ে আসতে পারে। এছাড়াও  আশেপাশে হাঁটলে বুঝে পা ফেলবেন, চারিপাশে প্রচুর গিরিগিটি বা বুনো টিকটিকির উৎপাত। মশা মাছি তো আছেই।  একটু বেরলেই দেখবেন আমাদের হোটেলের মধ্য দিয়েই বয়ে যাচ্ছে জলস্রোত। এই জল আসছে পাশেরই এক ঝর্ণা থেকে। সেটাও দেখে পার হবেন।  এমন এক প্রত্যন্ত জঙ্গলের মাঝে আমাদের হোটেল , তাই আপনাদের সাবধান করে দিচ্ছি।” আমরা শুনে তো হতবাক। কীভাবে এখানে কয়েক রাত কাটাব জানিনা। ঘরের মধ্যে টিমটিমে আলো। খাওয়া দাওয়া থাক, জঙ্গলের অন্যরকম কোন ফলের জুস খেতে চাইলাম। ঘরে বসে হবে না, রিসেপশনে খেতে গেলাম, সেও আবার টিকটিক গিরিগিটি দেখে আস্তে আস্তে চলেছি। হলুদ রঙের গ্লাস ভর্তি ফলের জুস দিল। অসাধারণ তার স্বাদ। অনেকটাই আমের মত। জানলাম, স্থাণীয় ভাষায় এই ফলকে বলে তাপেরেবা। এক রাতেই আমের থেকে বেশি প্রিয় হয়ে গেল এই তাপেরেবা ফল।

জুস খেয়ে আশপাশ চক্কর দিতে বেরলাম, অবশ্যই রাত ১০টার আগে ফিরে আসব। সরু জলস্রোত বয়ে যাচ্ছে, তার উপর দিয়ে বানানো ছোট সেতু, সেতুর গায়ে টুনি আলো। এই সেতু পেরলেই কালো জঙ্গল। জঙ্গলে ঢুকে প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধুই ঝি ঝি পোকার আওয়াজ, কখনও বা মনে হচ্ছে বাঁদরের শব্দ। বা কেউ যেন আমাদের মাথায় গাছের উপরে বসে আছে। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধুই কালো আর কালো। খানিকবাদে দেখলাম, চাঁদের আলো এসে পড়েছে গাছের পাতায়। তার মানে আজ পূর্ণিমা, আকাশ ঢাকা গাছে এতক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না। নীচে পাতার উপর জল চিকিমিকি। । পাশেই নিশ্চয়ই কোন জলাশয় আছে। ঘন আঁধারের মাঝে চাঁদকে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। মনে পড়ে গেল, জাকি লোককথার গল্পটা। জাকি ছিল চাঁদের দেবী । তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখে প্রেমে পড়েছিলেন সূর্যের দেবতা গুরারাসি। গুয়ারাসির প্রেমের প্রস্তাবে জাকিও তার প্রেমে পড়ে যায়। পরস্পরের ভালোবাসা সম্পর্ক জোরালো হতে থাকে। এমন সময় আলোর অভাবে গুয়ারাসিকে জোর করে আলাদা করে দেওয়া হয়। সেই বিচ্ছেদে, বিরহে জাকি এতই কাঁদতে থাকে যে, তার চোখের জলের বন্যা থেকেই আমাজন নদীর জন্ম হয়। আজ আমিও জাকিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু ঐ যে মাথার উপরে কারা নড়ছে বুঝতে পারছি না, ভয় তাড়াতাড়ি ঘরেই ঢুকে এলাম। ১০ টা বাজতেই সব টিমটিমে আলোও নিভে গেল। শুয়ে শুয়ে ভাবছি, আমরা এখন একদমই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।  ক্লান্ত চোখে, ঘুমের মধ্যে মনে হল, কেউ যেন দরজার সামনে চলাফেরা করছে। কালো কোন ছায়া সমানে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল।

এসো শ্যামল সুন্দর ;

 

সকালে উঠতেই জঙ্গলের শোভা পেলাম। চারিপাশ শুধুই সবুজ।প্রকৃতির আলোই জঙ্গলের অলঙ্কার। আমাদের হোটেলের মধ্য দিয়েই বয়ে যাচ্ছে সরু জলস্রোত। আরও এক পরিবার এসেছে , তারা ঐ জলে নেমে স্নানে মত্ত। ঝর্ণা থেকে নেমে আসা নিরন্তর বহমান এই জল পানীয় হিসেবেও খাওয়া যায়। ভীষণ পরিষ্কার। আমরাও স্নান করব , ইচ্ছা হল। কিন্তু তার আগে ত্বককে রক্ষা করতে মাখতে হবে দুইরকম ক্রিম। সানস্ক্রিন আর মশা না কামড়ানোর ক্রিম। দুই লেয়ার ক্রিমের পর নামলাম জলে। সবুজে ঘেরা চারিপাশে এমন হাপুশ হুপুশ স্নানের মজাই আলাদা। কিন্তু সে সুখ বেশিক্ষণ রইল না। কুটকুট কামড় শুরু হয়ে গেল, পায়ে মশা কামড়াচ্ছে। জলে সব ক্রিম ধুয়ে গেছে, যার ফলে মশার আক্রমণ থেকে রেহাই নেই। খানিকবাদেই জল থেকে উঠে ঘরে গিয়ে রেডি হয়ে গেলাম। গতকালের ড্রাইভার এদুয়ার্দোকে বলা ছিল, তিনি আজ আমাদের মানাকাপুরু গ্রাম থেকে আরও দূরে অনেক ঝর্ণা দেখাতে নিয়ে যাবেন। আমাজনের জঙ্গলের  ৭০ শতাংশ ব্রাজিলে আছে  , বাকিটা পেরু কলম্বিয়া বলিভিয়া আরও কিছু দেশে ভাগাভাগি। ব্রাজিলের এই অংশটাই একটা গোটা ভারতের আয়তন। তাই কয়েকদিনে ভারত দেখা যেমন সম্ভব নয় তেমনি আমাজন জঙ্গলও সব ঘুরে ফেলা সম্ভব নয়। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে নৌকো করে পৌঁছাতেই প্রায় ১৫ দিন লেগে যায়।

দুপাশে সবুজের সবুজের গালিচার মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা। যেদিকেই তাকাই , শুধু গাছ আর গাছ। কোথাও উঁচু কোথাও নীচু। এদুয়ার্দো বলছিলেন, এখানে দুটো ঋতু, বেশি বৃষ্টির মাস আর কম বৃষ্টির মাস। এখন জুন, এখন ব্রাজিলের দক্ষিণে শীতকাল আর আমাজনে কম বৃষ্টির মাস। এই সময় জঙ্গলের গ্রামে বন্যাও হয় না। গ্রীষ্মকালে এমন অনেক গ্রাম জলের তলায় ঢুকে যায়। কেউ তাদের খোঁজও রাখে না। দেশের সব সরকারই নাকি অভিবাসীদের বরাবর উপেক্ষা করেছে – আক্ষেপ করছিলেন এদুয়ার্দো। ওর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক গল্প শুনতে শুনতে পৌছে গেলাম , এক ঝর্ণার কাছে। অফুরন্ত কালো জলরাশি ঝরে পড়ছে জঙ্গলের মধ্যে। গাছের ছায়ায় জল আরও বেশি কালো দেখাচ্ছিল। দুপাশে সবুজ জঙ্গলের মধ্যে জলের ফেনাকে আরও সাদা লাগছে। এই ঝর্ণার একদম নীচে গিয়ে স্নান করা যায়। উপরে আকাশ ভরে গেছে গাছে, আর শরীরে তখন অনন্ত জলরাশি বয়ে যাচ্ছে। এমন মুহূর্ত জীবনে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এদুয়ার্দো তাড়া দিলেন, আরও দুখানা ঝর্ণা দেখতে যাব আমরা। এই অঞ্চলে ২০০ টারও বেশি ঝর্ণা আছে। সবকটা দেখা সম্ভবই হয় না।
পরের ঝর্ণায় দেখতে যাওয়ার আগে এদুয়ার্দো বললেন, “ এই ঝর্ণা দেখতে পেতে তোমাদের জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা পথ ট্রেক করতে হবে। নীচে একটা নদীও আছে সেখানেও স্নান করতে পারো। তবে ফিরে আসার রাস্তা মনে রেখো। ফোনে তো পাবে না, আমি বাইরেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব”। গাছে ঘেরা সরু রাস্তার মধ্য দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। কত রকমের পাতা, হরেক রঙের । পাতা গুলোর আকৃতি আমি আগে দেখিনি।  পাতার গায়ে সূর্যের আলোর নকশা কেটেছে। গাছ বেশি, আলো কম।  দূরে কোথাও যেন জলরাশির আওয়াজ পাচ্ছি। ক্রমশ গভীরে  যাচ্ছি।  কুড়ি মিনিট গভীর জঙ্গলে হাঁটার পর দেখি আমরা ঝর্ণার মাথায় দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়ে নীচে নামলে আরও ভালো করে দেখা যাবে। আর তারও নীচে বয়ে গেছে কালো জলের নদী। এ এক বিশাল ঝর্ণা।ঝর্ণার জলের উপর সূর্যের আলো পড়ে মনে হচ্ছে কেউ যেন বিয়ার ঢেলে দিয়েছে। কালো বিয়ারের ঠিক যেমন রঙ হয়। আর জলের উপর সাদা ধবধবে ফেনাকে দেখে মনে হবে ক্যাপুচিনো, একটু তুলে খেয়ে নিই। না , এই ঝর্ণার সামনে যাওয়া সম্ভব নয়, তীব্র জলের স্রোত। নীচে নদীতে স্নান সেরে উপরে আসতেই রাস্তা আর চিনতে পারছি না। দেখে মনে হচ্ছে, সবদিক দিয়েই যাওয়া যাবে। কোনটা ঠিক জানি না। খুব ক্ষিদেও পাচ্ছে। তাই বোধহয় মাথাও ঠিক করে কাজ করছে না। ডানদিকের পথ ধরেই চলতে থাকলাম, খানিক যেতেই দেখি এক জলাশয়। তার উপর ভেসে আছে অসংখ্য গোল গোল বিশাল সবুজ  পাতা অনেকটা পদ্ম পাতার মত । এর নাম ভিতোরিয়া রেজিনা। সূর্যের আলো যখন এই সবুজ পাতার পড়ার দৃশ্য দেখলে, চোখ স্নিগ্ধ হয়ে যায়। মনে পড়ে গেল, ভিতোরিয়া রেজিনার সেই প্রচলিত গল্প। নাইয়া নামে ইন্ডিজেনাস এক মেয়ে থাকত এই আমাজনের জঙ্গলে। তার এক প্রেমিক ছিল কিন্তু সেই প্রেমিককে কেউ কখনও দেখেনি। লোকে বলত, নাইয়া প্রতি পূর্ণিমার রাতে তার প্রেমিককে খুঁজতে নদীর ধারে আসত। একদিন  জলের মধ্যে সে তার প্রেমিকের ছায়া দেখে, জলে ঝাঁপ দেয়। আসলে সেটা তার ভ্রম ছিল। নাইয়া ডুবে যায়। তারপর থেকেই প্রেমিককে ফিরে পাওয়ার আশায় নাইয়া ভিতোরিয়া রেজিনার রূপে জলের উপর ভেসে থাকে।
কিন্তু আমাদেরও তো পথের ভ্রম হয়েছে। আমাদেরও কি তবে এই জঙ্গলেই সারা জীবন কাটাতে হবে নাকি? এখানে অনেকটা সময়ও চলে গেল, আশায় আছি এদুয়ার্দো আমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছেন। এই জলাশয়ের রাস্তা ভুল, এই পথ দিয়ে তো আসিনি। গেলাম অন্য দিকে। খানিক যেতেই কিছু গাছ চেনা লাগল। গাছের নীচে গজানো বিষাক্ত মাশরুমও দেখলাম, আসার পথেও দেখেছিলাম। এইবার বোধহয় ঠিক পথেই চলেছি।  গাছ চিনে চিনে ফিরে আসার চেষ্টা চালাচ্ছি। মাঝে মধ্যে পেটও ডাক দিচ্ছে। এই সময় উপলব্ধি করলাম, জীবনের সুরক্ষা আর পেটের জ্বালা মিটে গেলে সব সমস্যাকেই তুচ্ছ বলে মনে হয়। হেঁটেই চলেছি, কত পথিক এইখান দিয়ে এসেছে গিয়েছে এই গাছেরা তার সাক্ষী। আমাদের মত অনেকেই হয়ত রাস্তাও হারিয়ে ফেলেছে, এই গাছেরা সব জানে। এই জঙ্গলে না এলে বোধহয় , গাছকে এমনভাবে ভালোবাসতে পারতাম না। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই অবশেষে আমাদের গাড়ির কাছে এসে পৌছালাম। ভাগ্যি ভালো, ড্রাইভার এদুয়ার্দো গাড়ির মধ্যেই ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে আমাদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প করলাম, বললাম আশেপাশে কোন খাবারের দোকানে নিয়ে যেতে । এদুয়ার্দো বলল, “নিকটবর্তী ৩০ কিমির মধ্যে  কোন খাবারের দোকান নেই। মানাকাপুরু গ্রামের বাজারের মধ্যে কিছু স্টল আছে, সেখানে খাওয়া পেয়ে যাবেন।”  অগত্যা। আর কোন ঝর্ণা নয়, এইবার সেই মানাকাপুরুর গ্রামেই আবার ফিরে যাই। খাওয়া নেই, তার মধ্যে নদীতে স্নান করে, এতটা পথ হাঁটাহাঁটি করে শরীর অসম্ভব দুর্বল লাগছে। চোখ বুজে আসছে। গায়ে কোনই জোর নেই। এমন সময় এদুয়ার্দো গাড়ি থামিয়ে নামলেন। দেখি দুমুঠো ভর্তি  কিসব ফল তার হাতে। বললেন, “এই নাও , খিদে পেয়েছিল বলছিলে যে, গাছের নীচে এই ফলগুলো পড়েছিল, কুড়িয়ে আনলাম। এখানে আমরা এইভাবেই ক্ষিদে মেটাই”। নিজে হাতে নিয়ে দেখি, লাল জামরুল। সাধারণত, আমরা সাদা জামরুল খাই। এমন লাল জামরুল প্রায় দেখিই না। অনেকদিন বাদে জামরুল খাচ্ছি, তাও আবার এমন এই ক্ষিদের মুখে। গাড়ি থেকে নেমেই নিজেই আরও জামরুল কুড়াতে গেলাম। সেখানে দেখি জামরুলের সাথে জামও পড়ে আছে। ঠিক ছোটবেলায় স্কুল ফেরার পথে এইভাবেই জামরুল কুড়িয়ে বাড়ি ঢুকতাম। তখন ঐ জামরুলগুলো খেতাম না, শুধুই কুড়াতে মজা লাগত। কে জানত, আমাজনের জঙ্গলে ঝর্ণা দেখতে এসে এইভাবেই ছোটবেলাকার জামরুল কুড়ানোর স্বাদ পেয়ে যাব। এই জঙ্গলে আরও কত রকমের যে ফল পাওয়া যায়, সেটা ব্রাজিলিয়ানরা নিজেরাও জানে না। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, ফিরে গিয়ে আমাজনের  ফলের উপর লেখা কোন বই কিনব।  যাইহোক, জামরুল তখনকার মত সাময়িক আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করেছিল। আবারও সেই সবুজ গালিচার মাঝ দিয়ে ফিরে আসা। আসার পথে তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যাবে, দূরে বেশ কয়েক জায়গায় গাছের উপর ধোঁয়া দেখছি। এদুয়ার্দো বললেন, এখন কম বৃষ্টির ঋতু, এখন খুব শুষ্ক, তাই গাছের পাতার ঘষা লেগে প্রায়ই আগুন লেগে যায়। অনেক প্রাণী এইভাবে প্রতি বছর মারা যায়, কেউই তাদের কোন খবর রাখে না।
ফিরে এলাম মানাকাপুরু গ্রামের বাজারে।  সেখানের এক স্টল থেকে এদুয়ার্দো আমাদের তাকাকা খেতে বললেন। এই তাকাকা নিয়ে আমি আগেই পড়ে এসেছিলাম। এটা একধরনের পাতা আর চিংড়ি দেওয়া স্যুপ। ঐ পাতা যেমন তেমন নয়। ঐ পাতাকে বলে জাম্বো। এই পাতা দিয়েই এনাস্থেসিয়া করার ওষুধ  বানানো হয়। তাই আমিও এই স্যুপ চেখে দেখতে খুবই উৎসাহী ছিলাম। এক বাটি ভর্তি করে স্যুপ দিল।তার উপরে ভিতোরিয়া রেজিনার মত জাম্বো পাতা ভেসে রয়েছে আর পাশ দিয়ে উঁকি মারছে কিছু কমলা চিংড়ি। নিচে জল টলটল। জাম্বো পাতা মুখে দিতেই, জিভ আমার কেমন যেন ভারি হয়ে গেল। কেমন যেন আঠালো কিছু খাচ্ছি মনে হচ্ছে। চিংড়ির স্বাদ ভুলিয়ে দিয়েছে জাম্বো পাতা। ধীরে ধীরে পুরোটাই খেয়ে নিলাম, প্রথমটা অদ্ভুত স্বাদ লাগলেও, পরে স্বাদটা আর খারাপ লাগল না। না আমি অজ্ঞানও হলাম না। বরং তাকাকা খাওয়ার পর একটু এনার্জি ফিরে পেলাম। টিমেটিমে আলো দেওয়া হোটেলে ফিরে এলাম। সারাদিনটা পাতা দেখে, পাতার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে,পাতাকে ল্যান্ডমার্ক করে, পাতার ছবি তুলে, পাতা খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।

নীলের পরে নীল ;

 

পরের দিন ঠিক হল, বন্যায় ডুবে যাওয়া কিছু দ্বীপপুঞ্জ ঘুরতে যাব। নদীর কাছে গিয়ে নৌকো ভাড়া নিতে হবে। আমরা ছাড়া আর কোন ট্যুরিস্ট নেই। বুঝলাম , এইসব জঙ্গলের গ্রামের মাঝে বেশি কেউ ঘুরতে ভালোবাসে না। তবে আমাজন ঘুরতে না এলে, সমুদ্র পাহাড়ের মত জঙ্গলকেও যে এতটাই ভালোবাসা যায়, তা আগে  উপলব্ধি করতে পারিনি। নৌকা আমাদের দুঘন্টা ঘোরাবে, জলের ভেসে যাওয়া দ্বীপগুলোর একদম ভিতরে ঢুকে দেখব। নীল আকাশের প্রতিফলন পড়েছে জলে উপরে। সেই কালো, ধূসর জল, এখানেই অনেকটাই নীলচে। আমাদের নৌকা সবুজ জঙ্গল ছাড়িয়ে ক্রমেই দ্বীপের দিকে এগিয়ে চলেছে। দ্বীপ বলতে কোন মাটি দেখা যাচ্ছে না, বোঝা যাচ্ছে অনেক লম্বা লম্বা কিছু গাছ ছিল, সেগুলো সবটাই জলের তলায় ডুবে গেছে। আয়নার মত স্বচ্ছ জল, শুকনো গাছের ডালপালা  নৌকার উপর দিয়ে আমাদের মাথায় এসে লাগছে। নীচের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, কি জানি কত বাড়ি ঘর, পশু এই স্বচ্ছ  জলের গভীরে তলিয়ে গেছে।  অপরের দিকে তাকালে নীল আকাশের ফালি ফালি ঝলক গাছের ফাঁক দিয়ে সরে যাচ্ছে। আমাদের নৌকোর রঙ ছিল নীল, তার গা দিয়ে সাদা ঢেউ উথলে পড়ছে। ছবি আঁকতে দিলেও এই দৃশ্যের নিখুঁত বর্ণনা করা যাবে না।

এইখানেই নীল জলের নদীর নীচে এক জায়গায় নেমে  ডলফিন দেখার ব্যবস্থা আছে। ইচ্ছা হল ডলফিন দেখার। গেলাম সেখানে। এখানেও তাও কয়েকজন ট্যুরিস্ট দেখলাম। আসলে এই জায়গাটা খুব গ্রামের মধ্যে নয়, বরং শহর থেকেই বেশি কাছে। সিকিউরিটি গার্ডেরা সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দিচ্ছে। নদীর একদম মধ্যিখানে নীল জলের মাঝে নেমে ডলফিন দেখতে হবে। কেউ কেউ দেখলাম গায়ে সেই দুইরকমের ক্রিম মেখে নিচ্ছে। যারা কয়েকজন নেমে আছে, তারা হাতে কিসব খাবার।  সত্যি ডলফিন এসে তাদের থেকে সেই খাবারগুলো খেতে আসছে। ছুঁচালো মুখ দেখেই তো আমি ভয় পেয়ে গেলাম, খাবার থাক, শুধুই নীল জলে একটু ডুবে চলে আসি। লাইফ জ্যাকেট পরে নামলাম, কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে আমি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি। কি বিপদ, সাঁতার তো তেমন জানি না তার মধ্যে এটা একদম মাঝ নদী। ডলফিন, হাঙর আর কতই না কি আছে! নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছি, জাপটে ধরলাম এক মহিলাকে। সে দেখি খুব সুন্দর করে ভেসে আছে। “আমি ভেসে যাচ্ছি আমাকে বাঁচান” – ইংরাজিতে বললাম, কি জানি সে কি বুঝল। সে খালি বলে যাচ্ছে , আমাকে ছাড়ুন আমার লাগছে। না আমি তো কিছুতেই ছাড়ব না তাকে,ছাড়লেই অনেক দূরে চলে যাবে, সেখানে আর কেউ নেই। ভয়ে আমি তার গলায় টুঁটি টিপে ধরেছি। মহিলাটি দেখি হেসে যাচ্ছে, খুব হাসছে, চিল্লাচ্ছে আর কি ভাষায় কথা বলছে বুঝছি না। আমি পর্তুগিজেও তাকে বোঝালাম, সে দেখি তাও বোঝে না। আমার হয়েছে যত মুশকিল। থাক বাবা নীল জল, থাক বাবা ডলফিন, এখন পারে উঠতে পারলেই আমার শান্তি। দূর থেকে সিকিউরিটি গার্ডকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছে না, সে ভাবছে আমি ডলফিনের আনন্দে দাঁত কেলাচ্ছি। কী করি? মহিলার গলা ছাড়িনি। মনে পড়ে গেল, আমাজনের জলের দেবীর কথা ইয়ারা। তিনি ছিলেন মৎস্যকন্যা। জলের কোন বিপদ হলেই ব্রাজিলিয়ানরা ইয়ারা দেবীকে স্মরণ করে। মনে করা হয়, ইনি  ইন্ডিজেনাসদের দেবী।  ব্রাজিলে খৃষ্টান ধর্মের অধিপত্য থাকলেও,   ইয়ারা দেবীর গুরুত্ব কেউ কমাতে পারেনি। আমি এক হাত তুলে ভীষণ জোরে ‘ইয়ারা, ইয়ারা, বাচাও ইয়ারা’ করে চিৎকার করতে লাগলাম বারংবার। এতক্ষণে সিকিউরিটি গার্ড বুঝলেন, ঐ ইয়ারা নাম শুনেই বোধহয় বুঝলেন। সাঁতার কেটে আমার এক হাত ধরে পারে তুলে নিয়ে এলো। দেখা গেল, আমার লাইফ জ্যাকেটে ছিদ্র ছিল, তাই ওমন হচ্ছিল। এই যাত্রায় সত্যিই ইয়ারা দেবীই আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন।

 

ধূসর নদী এবং বাকিরা ;

 

ফিরে এলাম মানাউস শহরে। আমাজন রাজ্যের রাজধানী। এখানে কয়েকদিন থাকব। মানাকাপুরু গ্রাম থেকে ফিরে এসে একেই বিশাল শহর বলে মনে হচ্ছে। টিমটিমে আলো নয়, অনেক বেশী লোকজন, ইন্টারনেট , বাণিজ্য বন্দর, গমগমে বাজার। মানাউসের কাছেই নৌকো করে একটু গেলেই কালো নদী আর ধূসর নদীর মিলন দেখা যায়। ৬ কিমি ধরে এই দুই নদীর মিলন দেখা যায়। দুই রঙের জল একসাথে মিশালে , ঠিক কোন জায়গাটায় মিশছে আমরা সচরাচর বুঝতে পারিনা। কিন্তু এইক্ষেত্রে তা কীভাবে সম্ভব? তার কারণ হল, দুই নদীর জলের তাপমাত্রা, স্পিড আর উপাদান আলাদা। তাই  দুই জলের প্রথম মিলনটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এঁকে বলে নদীর সঙ্গম। পরে একসাথে অনেকটা মিশে গেলে তাদের আর আলাদা করে বোঝা যায় না। ধূসর নদীর আর এক নাম হল সলিমোয়েস। মাটি গোলা জলের মত রঙ। তবে ধূসর নদীর উপর দেখলাম ভাসমান বাড়ি, স্কুল, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল। এই নদীর উপর ভালোই জনবসতি। দুই ধার দিয়ে প্রচুর গাছ। বোটগুলোও ভীষণ জোরে ছুটে চলেছে। কালো নদী অনেক শান্ত, একাকী। ধূসর নদী অনেক বেশি জনবহুল আর অশান্ত। বোটে করে আমরা যাব  এক আদিবাসীদের গ্রামে।  সেখানে তাদের বাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর খাওয়াদাওয়া করে ফিরে আসব। ধুসর নদীর উপর কচুরিপানায় ভর্তি এক সাঁকোর উপর বোট আমাদের নামিয়ে দিল । সবাই এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসীদের গ্রামে। ঢোকার পথে দুটি ছেলে এলো জলের উপর দিয়ে। সামনে একজনের হাতে ধূসর রঙের একটা শ্লথ আর পিছনের একজনের মাথা গলা বুক ঘাড়, পা হাতে প্যাঁচানো ছাই আর কালো রঙের ছোপ দেওয়া বিশালাকার এক সাপ। এই কি তবে এনাকোন্ডা? ব্রাজিলের সবাই বলে, এখানে  এনাকোন্ডা নামে কোন সাপ নেই। বিশাল যে সাপ আছে তাকে সুকুরি বলে। এই সুকুরি সাপের দৈর্ঘ্য আজ পর্যন্ত কেউ জানে না, শুধুই শোনা কথা আর মানুষের ধারণা। এনাকোন্ডাও তো একটা রূপকথার গল্প।  কিন্তু এই ছেলে দুটো হাতে নিয়ে কি করছে? বুঝলাম, ওরা ছবি তোলার জন্য নিয়ে এসেছে। ছবি তোলার পর কেউ যদি ওদের কিছু পয়সা দেয়। ধূসর রঙের শ্লথের নখ দেখেই ভয় পেয়ে গেলাম। আর ছাই রঙের সুকুরি ? সে দেখি ফণা তুলে এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখছে। দূর থেকেই ভয় পাচ্ছি, তাকে নিয়ে আবার ছবি তোলা! বিবেকানন্দের বাণী শোনার পরেও অত সাহস অবলম্বন করতে পারিনি। এগিয়ে গেলাম গ্রামের দিকে। খড়ের বাড়ি তার নীচে ছোট বড় আদিবাসী মহিলা পুরুষেরা সেজেগুজে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রেডি হয়ে আছে। গাছের পাতা দিয়ে বানানো তাদের জামাকাপড়। গায়ে আঁকিবুঁকি। আমরা সবাই চারিদিকে মাটিতে বসে পড়লাম। বাজনার সাথে গানের সাথে ওদের নিজেদের ভাষায় সবাই মিলে নৃত্য পরিবেশন করল। আড়ম্বরহীন পরিবেশনা, শহুরে সভ্যতা থেকে উপেক্ষিত। বাচ্চারা ট্যুরিস্টদের গালে রঙ করে দিচ্ছে, এঁকে দিলেই কি সবাই আদিবাসী হয়ে যায়? আমি একটু সরে এলাম। গেলাম খাওয়া দাওয়ার দিকে।দেখি  মাচা করে রাখা আগুনের উপর সেঁকা হচ্ছে ছোট ছোট ধূসর রঙের মাছ। অতিথিদের জন্যই বোধহয় আজ অনেক মাছ সেঁকছে ওরা।  পাশেই আর এক ঝুড়িতে ছাই রঙের কিসব রাখা। ভালো করে না দেখেই মুখে দিয়ে দিলাম। তেঁতো লাগল। ভালো করে দেখলাম। পিঁপড়ে ভাজা ছিল। এমন কড়া করে ভেজেছে যে তেঁতো হয়ে গিয়েছে। খড়ের বাড়িঘর দেখতে দেখতে ভিড় থেকে একটু দূরে সরে এসেছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। কোনরকমে ঠাই নিলাম এক চালের নীচে। বাকি আর কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। বৃষ্টি কখন কমবে বুঝতেও পারছি না। এমন বৃষ্টি দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব না, তা কি হয়? শুরু করলাম,” আজ যেমন করে গাইছে আকাশ, তেমনি করে গাও গো ”। গান গাইতে গিয়ে মাঝপথে  মনে হল, বোট যদি আমাদের ছেড়ে চলে যায়, কী হবে? এখানে তো ইয়ারা দেবী কাজে দেবেন না। তাহলে কি জঙ্গলের, জলের রক্ষাকর্তা কোবরা নোরাতোকে ডাকতে হবে? আমাজনে এনাকোন্ডা সাপকেই লোককথায় কোবরা নোরাতো বলে। কিন্তু এই সাপ হলিউড সিনেমার মত অত শয়তান মোটেও না। লোককথায় বলা হয়েছে, কোবরা নোরাতো জঙ্গলের নদীর রক্ষাকর্তা। যারা জঙ্গলের নদীর ক্ষতি করতে আসে, তাদের কোবরা নোরাতো আক্রমণ করে। নদীর নীচে কোন এক গুহায় কোবরা নোরাতো সোনার খনির পাহাড়া দেয়। এমন মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে যদি নোরাতো বা  অন্য কোন সাপ আমাদের পায়ের কাছে চলে আসে? হঠাৎ করেই সাপের ভয় বিচলিত হয়ে গেলাম। ঐ যে সেই ছাই রঙের সাপটাও তো আশেপাশেই আছে। কি জানি সেই জলে নাকি সেই ছেলেটার ঘাড়ে বসে আছে? এখন মনে হচ্ছে, বৃষ্টিটা তাড়াতাড়ি কমে যাক। ৪৫ মিনিট মত সাপের ভয় কাটানোর পর বৃষ্টি একটু কমতেই ছুট লাগাই সেই খড়ের বাড়ির দিকে। সেখানে আদিবাসীরা ছাড়া আর কী নেই। তাদের পর্তুগিজ ভাষায় জিজ্ঞাসা করলে, কিছুই বুঝতে পারে না। হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করি , আমাদের ধূসর রঙের বোট কোথায়? একজন একদিকে হাত দেখালো। হাতে একমুঠো পিঁপড়ে ভাজা তুলে নিয়ে ঐদিকেই ছুট দিলাম। খানিক এদিক ওদিক করার পর দেখলাম আমাদের বোট দাঁড়িয়ে আছে।  চিপসের মত পিঁপড়ে ভাজা খেতে খেতে বোটে উঠলাম, বোটের চালক আমাদের উপর রেগে আছেন, কারণ তারা আমাদের জন্য বৃষ্টির মধ্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন।

ফিরে এলাম শহর থেকে বড় শহরে।  জীবনযাত্রার আকাশপাতাল ফারাক। একই দেশে দুই জগৎ। হাজার সমস্যার মধ্যেও  তারা হাসিমুখে থাকে। গাছেদের মতই ধৈর্যবান। ফিরে আসার পথে আমাজনের ফল আর লোককথার দুটো বই কিনলাম। আমাজনের জঙ্গলের এক চিলতে ঘুরে আসার স্মৃতি আমার চিরকাল মনে থাকবে। ঘুরে আসার পর আমাজনকে আরও বেশি করে  পেতে ইচ্ছে করে, তাকে জানার ইচ্ছাটাও প্রবল বেড়ে গেছে। এমন বিরলতম অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনওই হয়নি।

 

আরও পড়ুন:

চৌষট্টি যোগিনী সমীপে / শর্মিষ্ঠা দাস

ভুবনেশ্বর শহরে এসেছি । আকাশপথে আমাদের দুর্গাপুর থেকে এখন মোটে একঘন্টাও নয় । কাজে অকাজে এ শহরে তো লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে–আমরা এখান থেকে পুরীধামে যাই, চিল্কাতে জলবিহার করি, লিঙ্গেশ্বর মন্দির দর্শন করি –অথচ — যে ‘কিন্তু’ আর ‘অথচ’ আমাকে এবার রথে চাপাল-সারথি বলল–উধার তো কোই যাতা নেহি। বললাম –সেই জন্যেই তো। উচ্চবর্ণের দেব দেবী …

পড়ুন

অনন্ত সংলাপ/অর্পিতা কুণ্ডু

আমি: ঢেউ তো প্রোজ্জ্বল, তাতে তুমি বসে আছ শিরোচূড়ামণি। হাটের নাগর তুমি, ভিটায় নিমিত্ত সামগান — তোমাকেই বর্মে বৃত্তে চুপিসাড়ে রোমন্থন করি। যেমত অছিলা পটিয়সী, যে মৃদু চারণভূমি পার করে কাছে আসি, তার কিঞ্চিৎ আদর কোরো। বহুবর্ণ লোক সমাগমে একেলা ফেলো না তাকে রৌদ্র-বাতায়নে। সে: না সখি, না, বাতায়ন-পাশে তোমার শরীর মুক্ত, জনশ্রুতি এই — …

পড়ুন

সাইলেন্স দিস আপকামিং কল/যশোধরা রায়চৌধুরী

মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি। বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম। এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন? বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের …

পড়ুন

পথ রুধে রবীন্দ্রঠাকুর: বাংলা গানে পথ চলা/অভ্র বসু

সম্প্রতি একটি বিতর্কসভায় থাকবার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বিতর্কের বিষয় ছিল: রবীন্দ্রনাথের গান আর বর্তমান প্রজন্মের আশ্রয় নয়। বিষয়টা নিয়ে আসলে অনেক দিক থেকেই তর্ক হতে পারে। প্রতিযোগীরাও নানা দিক থেকে আলোচনা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের ফলাফল খুব স্পষ্ট হল না। সকলেই মানলেন রবীন্দ্রনাথের গান আশ্রয় হওয়া উচিত। মোশনের সমর্থনে যাঁরা বললেন, তারাও সেটা …

পড়ুন

এক মেঘলা না থাকা/শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে মা, তুমি ছাদে উঠেছিলে  বালতি ও কাপড় সাবান জলের মধ্যে সূর্য তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি অথচ …

পড়ুন

গদ্য বনাম কবিতা/অংশুমান কর

“দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।” বলুন দেখি কার লেখা কোন কবিতার পঙ্ক্তি এগুলি? চেনা চেনা মনে হচ্ছে তো? সে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথের “লিপিকা”র একটি লেখার অংশ এটি। নাম “বাঁশি”। লেখা …

পড়ুন

পেরেস্ত্রোইকা/কস্তুরী সেন

অতল, আত্মবিস্মৃত, শেষত শেষ কাকে বলে ? উদ্বেগের পর উদ্বেগ, বিরতির পর পুনরাবৃত্তি নিয়ে বেলা সাড়ে চারটেয় ধর্মতলা পেরিয়ে যাচ্ছে দুশো একুশ মাঝমাঠ, খাদ্য আন্দোলন, একদিন একদিন শহরে মানুষ পোড়ে, জিতে বেরিয়ে আসে হিমঋতু ‘এই যে ধাইন্যক্ষেত্র তা দ্যাখতে তো পয়সা লাগে না’ দেখতে দেখতে দেখে যাওয়া, মানুষের এলোমেলো ভিড়, সিগনালে আলো নিভে যায় সাবেক …

পড়ুন

ঘড়ি বন্ধ ছিল/বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যাবার পর টের পেলাম অনেকগুলো ভুল হয়ে গেছে। মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। জলের বোতল যে ঝোলার মধ্যে থাকে সেটা আনিনি। ঘড়িটা বন্ধ অথচ সেটাই বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা। তাতে সময় দেখাচ্ছে সকাল নটা তিরিশ কিন্তু তিনটে বেজে গেছে। কাজ হলনা আজকেও। তবে আজানের ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলাম এখনও হাতে কিছু সময় বেঁচে …

পড়ুন

গ প্ পো ৩ – ধেড়ে দত্তি স্যাক্সি আর হারমানের গপপো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টিং-টিং, টুং-টুং, এক ছোট্ট ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে? হাতড়াতে থাকি এদিক ওদিক। জঙ্গুলে রাস্তার বাঁকটা পার হলেই হয়তো পেয়ে যাব ছই দেওয়া গরুর গাড়িটাকে। গরু দুটোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা। বাজছে টুং-টুং, টিং-টিং।   চট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ওমা, এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। জমাট হিমের দেশে নরম পালকের লেপ আর ভেড়ার লোমের মাখনের মতো …

পড়ুন

৩/৪ সি, তালতলা লেন / সুমিতা মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ ৩/৪ সি, তালতলা লেন কবিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য আলোচকঃ সুমিতা মুখোপাধ্যায় ৩/৪ সি, তালতলা লেন, হিন্দোল ভট্টাচার্যের এই কবিতাগ্রন্থের রচনাকাল ২০২১ থেকে ’২৩। অতিমারির এক বিষাদভরা কালো সময়। লকডাউন, অতিমারি, অনিবার্য মৃত্যু, নীলপ্লাস্টিক, গনচিতা, আর বুক চাপড়ানো হাহাকার !  সময়ের ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর। প্রলেপ পড়ে না কোন। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাও যেন ভয়ে …

পড়ুন

খন্দকার গলির অন্ধকার / অলোকপর্ণা

ঘুমের ভিতর হেঁটে বেরানো আজও থামলোনি জাহান আরার। জাজিমে গতর এলানো মাত্র সে ঘুমের সাগর পার করে বাণিজ্যে যায়। দোষ অবশ্য তার একার নহে, ঘুম এমনই জটিল ও জালিম যে তার হাত পা ধরে ঘুমের ভূতেরা হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে ফেলে কখনো থানার গ্যারাজে, কখনো দত্তাবাদের মাঠে, কখনো মোরশেদের আস্তাবলে। একবার ঘুরঘুট্টি রজনীতে সে গলা অবধি …

পড়ুন

নামকরণ / ঋজুরেখ চক্রবর্তী

কোনও একদিন তুমি সেই উন্মত্ত কিশোরবেলার নাম রাখতে চেয়েছিলে নিপীড়িত জনতার সরণি। প্রকৃতিতে তখন প্রতিটি সচেতন প্রতিরোধ ছিল প্রগতি, আর মেঘ ডাকলে সূর্যত্রাসে কেঁপে উঠত প্রতিক্রিয়া। রথ দেখতে যাওয়ার মতো তুমি সুদূর করে নিয়েছিলে তোমার দিগন্তরেখা, স্বপ্নের সেই সাদা ঘোড়াটিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত স্ববিরোধে বেরিয়ে পড়েছিলে সাম্রাজ্যবিস্তারে, খুরে খুরে ধুলোর ঝড় তুলে বিলিয়েছিলে কল্যাণ, ফিরে এসেছিলে …

পড়ুন

নির্বাচন / ঈশিতা ভাদুড়ী

কাকে বেছে নেব? অলিভপাতা, নাকি ধুঁতরোফুল? কে না জানে সঠিক নির্বাচন না হলে দু:খ পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। জলপ্রপাত অবিরাম দুগাল বেয়ে! কাকে বেছে নেব? শালবনে জ্যোৎস্নাপথ? নাকি রাতের নদীজল? কে হবে সঠিক নির্বাচন? কার করপুট-স্পর্শে শঠতা নেই, কারা কারা আমার বৃত্তে নিরাপদ হবে, সেই সব নির্ভুল নির্বাচন সহজ নাকি? নির্বাচন শব্দটি যে কত অমোঘ …

পড়ুন

অচেনা দুপুর/সৈয়দ কওসর জামাল

প্রতিবাদ ভুলে থাকি আজ পড়ে থাকি এককোণে, দুরে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে স্থিতভূমি, বেতাল অ-সুরে   কোন সুরে বাজবে সেতার আষাঢ়ে বাজবে কোন মন? জানালার পাশে আজ নয় বিপর্যস্ত কোরো না জীবন   বরং কবিতা লেখো, ভেজো জবুথবু শালিকের মতো, বৃষ্টি এসে সলজ্জ বলুক এসো প্রেম, এসো ইতঃস্তত   একটি কবিতা লিখেছিলে তুমুল বৃষ্টির কোনও …

পড়ুন

শিশিরকুমার দাশ: খুঁজে ফিরি কর্ণ, কর্ণের সহোদর/মোস্তাক আহমেদ

মৃত্যুলগ্ন পার হয়ে যতবার গিয়েছি নিঃসীমে বিদ্যুতের দীপ হাতে: অন্ধকারে আকাশের বিস্তৃতি অপার বিদ্রোহী ঝড়ের যত উদ্বাহু মেঘেরা আমন্ত্রণ করে আনে অতীতের ঘন অন্ধকার; তবু দেহ ভিজে গেছে শান্তিস্নিগ্ধ হিমে।                                                                                         (মৃত্যুলগ্ন/জন্মলগ্ন)   কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জন্মলগ্ন’। ‘পূর্বমেঘ প্রকাশ ভবন’ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৫৬-তে। কুড়ির কাছাকাছি বয়স। কী দীপ্ত উচ্চারণ! কয়েক বছর হল দেশ …

পড়ুন

কানুর বিয়ে/সুবর্ণা মণ্ডল

কানুর সেদিন খুব কান চুলকাচ্ছিল। আগের দিনের যে পায়রাটা হাত থেকে ফসকে গিয়ে শুধু একটা পালক রেখে গেল, কানু সেই পালক কানে ঢুকিয়ে আরামে চোখ যেই না বুজেছে অমনি বাপের চিল চিৎকার, “হ্যাঁ নবাব আমার, কানে পালক গুঁজেই থাকো। যা বয়স বাড়ছে এরপর আর মেয়ে জুটবে না কপালে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যা। নবাবপুত্তুরের যা …

পড়ুন

বিমর্ষ জল ও উড়ন্ত লাল কার্পেট/গৌতম গুহ রায়

খবরটা সরাসরি ওকে দেয়নি কেউ, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়িতে ফিশফিশ করা চাপাস্বরের কথাগুলো তার কানে আসছিল – কীভাবে ওকে খবরটা দেওয়া হবে ? একমাত্র মেয়ে, ওকে তো জানাতেই হবে । ফিশফিশ থেকে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমশ ধ্বনি, শব্দ, কথা হয়ে খবরটা দীপার কানে পৌঁছে যায় । সে সে সরাসরি দিদাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবার কোনো …

পড়ুন

সুন্দর যখন ভয়ংকর / হিন্দোল ভট্টাচার্য

দশ বছর আগের কথা। গেছিলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বলে এক অপরূপ জায়গায়। হিমালয়ের কোলে, এক বিস্তৃত এলাকায় কত রকম ফুলের সমাহার, না দেখলে বোঝা যাবে না। সেখানে এক ঘন্টার বেশি কাউকে থাকতে দেয় না। যাওয়াটাও খুব কঠিন একটা রাস্তা ধরে ট্রেক করেই যেতে হয়। কিন্তু তখন হিমালয় এমন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেনি। হয়তো এই রূপ …

পড়ুন

শহর/বিজয় সিংহ

ফেরার আগে যে তুমি অহৈতুকী ছিলে ফেরার পরে যে প্রাক গোধূলিরা অপ্রবাসে ঢোকে ফক্স কে টু, হে আরাধ্য, সেইসব গ্রন্থনায় মায়ুশ মজ্জার থেকে অনুচক্রিকা কুড়াতে পাঠাও স্বপ্নের অতলে নেমে দেখেছি জুবিলি অসহায় ফুটেছিল হেতু তার কোনো বাড়িঘর নেই, লেক মল, পূর্ণদাস রোড নির্মিত আরশিনগরে পড়ে থাকা সংক্রামক লাশ ফেরার আগের রাত্রে নরসিংহমূর্তি দেখিয়েছে ও ফেরার …

পড়ুন

প্রস্তাব/সুমন গুণ 

পাতায় বৃষ্টির শব্দ সাংসারিক, দ্বিপ্রাহরিক। আস্থা ও আশ্বাস থাকে, সমবেত, শুভানুধ্যায়ীর পীড়া ও আরাম থাকে। যথাস্থান থাকে। থাকে মেঘ, অস্পষ্ট ও গূঢ়,  সম্পর্কের অসহায়তার মতো,  চিন্তা ও ক্ষমার মতো, পতনকালীন বজ্র ও বিদ্যুৎভরা নৈশব্দের মতো।   পথেও স্তব্ধতা থাকে দ্রুতগামী; নৈকট্য ও নিশ্চয়তাভরা। কোথাও স্থানাংক আছে, ছাদ আছে, দরজা ও রেলিংঘেরা সুবাতাস আছে,  আছে স্থিতি, …

পড়ুন

গ প্ পো ৫ – কুঁড়ে নিক্কির গল্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘তা তোমার কৃষ্টাবেলের কি হোলো –’ তাড়া দিল স্কুয়া।   ‘কৃষ্টাবেলের কথা পরে। আরে নিক্কির সে যা দশা–“ বুড়ী গ্যানগ্যান কুলকুলিয়ে হাসির বানে ডোবা। ‘নিক্কি-নিক্কি’ বলে আর বুড়ী হাসে। হাসি যেন আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি চাপা। ‘আরে শোন তাহলে নিক্কির দশাটা –   সে অনেক কাল আগের ঘটনা –। আমার গ্যানগ্যানের শোনা- …

পড়ুন

গুঁড়োমশলা/কাবেরী গোস্বামী

সে এখন একটি অচল পয়সার মতন ফিরেও তাকায় না আর কেউ কারণ, সে আজ শুষ্ক বিবর্ণ পরিত্যক্ত এক যোনি

পড়ুন

কাজের ভাষা, মুখের ভাষা/স্বপ্নময় চক্রবর্তী

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, ‘এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় …

পড়ুন

তৃতীয় চোখের বসুধা / জগন্নাথ দেব মণ্ডল

আকাশ মেঘে ভার।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। শরৎ সকালে বাজারে বিক্রিবাট্টা নেই । দোকানদার, খেটে খাওয়া, দিন আনি দিন খাই মানুষদের রোজগার নেই তেমন। তৈরি বাঁশের মণ্ডপগুলোও টিমটিম করছে জলেডোবা বহুদিনের শ্যাওলাধরা নৌকার মতো। দূর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া পুরাতনী বাংলা গান আবছা ঘষা ঘষা শোনা যাচ্ছে, পুরো শোনা যাচ্ছে না,ইলশেগুঁড়ির তোড়ে বেঁকে ভেঙেচুরে যাচ্ছে গান। আমার …

পড়ুন

এ এক ‘অচেনা’ দেশ/পার্থ মুখোপাধ্যায়

আমরা যখন গতির নেশায় ছুটছি, যখন আমাদের চারপাশ ‘স্মার্ট সিটি’ আর ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার উৎসবে মেতেছে, তখন নিঃশব্দে এক বিশাল সংখ্যক মানুষ আমাদের সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা আমাদেরই বাবা-মা, আমাদেরই ঠাকুরদা-ঠাকুমা। গত কয়েক দশক ধরে যে হাতগুলো এদেশটাকে আগলে রেখেছিল, আজ কিন্তু অদ্ভুত ‘ডিজিটাল অস্পৃশ্যতা’র শিকার সেই হাতগুলোই।  প্রগতিকে আমরা বরণ করেছি ঠিকই, কিন্তু …

পড়ুন

বাবা / মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস

জানলার ধারে রোদ পোহাও তুমি কত দশক… সন্তানের কতগুলো ভুল ভুল কাজের নির্জন সাক্ষী হয়ে একাই পাহারায় সে হাসির খানিক মুখে সাবলীল উত্তরাধিকার কখনো বা সাজিয়ে নিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো ‘আমি’র মধ্যে কতগুলো দাঁড়টানা কাক কালো এলোমেলো কখনো ভাবিনি অন্ধকার উজাড় হয়ে আসে কোন পথে! কেমন করে রোদ টুকু মরে যায় …

পড়ুন

কাঠামো / অর্ণব চৌধুরী

গাছের কোটরে ভাঙাচোরা দেবীমূর্তি আছে পড়ে আঁধার-মিনারে ফুটে ওঠে তার সমাহার নিরিবিলি পথে আমি তার প্রাচুর্য আহার, তুলতে গিয়ে দেখি, প্রায় শেষবেলা অঘ্রাণ আভায় একেকটি কালের কাঠামো ভেঙে যায়

পড়ুন

দি লাস্ট মিটিং/সমরজিৎ সিংহ

একটি রাস্তা । তারপর, আবার রাস্তা । তারপর সমাধি । তার উপর চাঁদের ছায়া । দু’একটা পাতা । রাস্তার ওপাশে একটা ভাঙা দোকান । তিনটে চেয়ার । সমাধি থেকে উঠে এসে এই চেয়ারে বসলেন তিনি । টোটেনখাম । চাঁদ তখন পিছলে যাচ্ছে রাস্তার উপর । তিনি তার ভাঙা হাড়ের আঙুলগুলি বের করে কাকে যেন ডাকলেন …

পড়ুন

মায়াচাঁদ/অলোক বিশ্বাস

হাসছি বলেই চাঁদ উঠছে নাকি চাঁদ উঠছে বলে হাসছি— কোনো একক মাত্রাকে চায় না মানুষ, নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও। এমনতর সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে বীতশোক সাঁতরে আমি যাবো তাহার নিকটে। চাঁদে বসে গাইব মায়াবাদ, চাঁদে বসে বুনব খামার জমি। আমাদের দাবি অনুযায়ী ভালোবাসা চিরকাল চাঁদের সাপোর্ট পেয়েছে। পুনরায় চাঁদে গিয়ে অপেক্ষা করব তোমার জন্য। আমার রান্নাঘরে, পড়ার ঘরে বাজছে …

পড়ুন

প্রশ্নপদ/অশোক দেব

সব মরুবৃক্ষ কেন শ্রাবণ জাতক? তাদের দেহের জল সেকথা জানে না?   একলা শ্রাবণে বসে এইসব ভাবি বালিমাখা চাঁদ কাল কার ঘরে ছিল?   তাহলে তৃষ্ণার ফুল বিরহ-গন্ধক? আগুনে আগুনে কথা, বিদায় সংগীত?   কে তুমি গাইছ ওগো এমন মাথুর, এমন শ্রাবণে এলে রাধিকাসম্পদ?  

পড়ুন

জোয়ার / বেবী সাউ 

যেভাবে জলের কাছে লিখে রাখি ত্যাগসূত্র আদি—   শরীর, গোপন মায়া ধীরে ধীরে নামে কঠিন কঠোর তবু অন্ধ ভিখিরির হাত ধ’রে আরেকটি গল্প লেখে, ভাবে— লেখা কিছু জমে থাক আগামীর দিকে   আশা ভাঙে। জাগে শুধু ডুবে যাওয়া পুরোনো বন্দর   শান্ত মানুষের মতো; নির্মোহ ততটা   ভেসে যায়   ততটুকু স্পর্ধা হলে, নাবিক তোমায়   …

পড়ুন

নোটপ্যাডের নৌকো/মন্দাক্রান্তা সেন

এক বর্ষার দিনে সে আসবে বলে কথা দিয়ে আসেনি।   এই সামান্য বিষয় নিয়ে পদ্য লিখে প্যানপ্যান করা এই বয়সে নিতান্তই ন্যাকামি হয়ে যাবে।‌   নাকের জলে চোখের জলে ছপছপ করছি । কোথা গেলে,‌ সেয়ানা প্রাণাধিক   নোটপ্যাডে নৌকো ভাসাই । নেহাত বালিকা আহা‌ আহা ।   তুমি আসবে বলে আসোনি। বেশ করেছ ।   …

পড়ুন

আমাকে আসলে কেমন দেখায় / নাসরীন জাহান

আমাকে কি খুব উদ্ভট দেখায় ? চক্রাকারে বাসটা মোচড় দিয়ে উঠতেই এমন একটা ভাবনা আমাকে অবশ করে তোলে। লোকজন কী রকম চোখ টেপে, টিপ্পনী কাটে, সন্ধ্যায় একা বেরোলে খারাপ মেয়ে ভেবে ইশারায় কেউ প্রস্তাবও দেয়। আমার পরিচিত কয়েকজনকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি, তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে যে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না, তা নয়, তবে …

পড়ুন

স্পর্শ, স্পর্শাতীত… / সৌরভ মুখোপাধ্যায়

তাহলে আলোর কথা জেনে নেব কাহার সমীপে? তাহলে দুপুরশব্দ,একমনে পাখিটির স্নান? তবে কে জানাবে বলো বাংলাভাষার দেহত্বকে এই যে উজ্জ্বলবাক্য ঠিকরে পড়ছে বিকেলের প্রায়… চলাচল নিভে আসছে। কিছুপরে সন্ধে নেমে এলে একটি দুটি তারা জ্বলবে তোমার স্পর্শের মতো,নিভে জ্বলে ওঠা আকাশের মাথায় মাথায়…

পড়ুন

কালীপুজোয় আকালীপুর / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সঙ্গে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর আশেপাশের ছুটিতে মহারাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান প্রসিদ্ধ আকালীপুর ভদ্রপুর। এখানে স্বমহিমায় বিরাজমানা মহারাজার প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত জাগ্রত সর্পাসনে অধিষ্ঠিতা গুহ্যকালী। এখানেই ছিল নন্দকুমারের দ্বিতীয় রাজধানী। নলহাটি থানার লোহাপুর স্টেশন থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে এই …

পড়ুন

পুরনো দিন নতুন দিন/শংকর চক্রবর্তী

মনে পড়ে সেইসব রবীন্দ্র-গানের সকাল সূর্যাস্তের থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলেশহীন কোনো সন্ধের পাশে বেজে উঠত জড়োসড়ো একবারও কেউ ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে চায়নি তখন সাদামাটা বিকেলগুলো শুধু এই ষড়যন্ত্রীর শহরে অন্ধকার নামিয়ে রাখত প্রতিদিন সেই সকাল থেকে ছুটে যেত সবাই একে অপরের জামা-প্যান্ট উদোম করে ছুটত তুমি শুধু সারাজীবন অপরাধীর মতো মোমবাতি হাতে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ …

পড়ুন

বিস্মৃতপ্রায় লেখক নিরুপমা দেবী/ঈশিতা ভাদুড়ী

অনুরূপা দেবীর সমসাময়িক লেখক নিরুপমা দেবীর (১৮৮৩-১৯৫১) গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবন থেকে বর্ণিত হয়েছে। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েদের বেঁচে থাকা, তাদের সুখ- দুঃখ, অপ্রাপ্তির ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। সেসব কাহিনি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নিরুপমা দেবীর বিশেষ পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে ছোট গল্প, কবিতাও লিখেছেন অনেক। নিরুপমা দেবীর নারীচরিত্র অবশ্য কিছুটা স্বতন্ত্র, সামাজিক …

পড়ুন

মুষলপর্ব/বেবী সাউ

শূন্যতার রং নিয়ে বড়ো বেশি ভেবে চলো তুমি অথচ জলের কাছে প্রতিদিন শিখে নিই নীল ঘষা রং আমাদের অভিমানগুলো ভেঙে গেছে আজ তার কোনো গতিপথ নেই; সূত্র ভুলে গেলে, বলো, কীভাবে মেলাবে— জীবনের মায়া, ছায়াধ্বনি! সহজ ভেবেছি যতটুকু, কঠিনের আবরণে ঢেকে গেছে রোজ সেই লক্ষ্যভেদ, মাছের নরম চোখ কিংবা জাতিভেদ প্রথা বারবার ফিরে আসে— বারবার …

পড়ুন

ফুলঝরিয়া/সেবন্তী ঘোষ

এক পিছনে জঙ্গল ।ওই ওপারের রাস্তা পেরিয়ে আবার জঙ্গল। ক্রমশঃ দুপাশের জঙ্গল উজাড় করে  ফোর লেন হচ্ছে। এখনও পুরোটা খুলে দেয়নি। নবনির্মিত সেই পথের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে ফুলঝরিয়া আর পিংকি। বসাটা নতুন নয়, জায়গাটা নতুন। বসার জায়গাটাও ঠিক নতুন নয়, দেখতে নতুন। পিংকি বলে, আগের ঘাসটাই ভালো ছিল রে, গড়িয়ে গেলে কত …

পড়ুন

দিনলিপি/প্রবালকুমার বসু

ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথা মনে পড়ে কথা দিয়ে না রাখতে পারার মতন অনর্থক গ্লানি   ভেবেছিলাম কোনোদিনই ফিরবে না আর দেখা হয়ে যাবার পর বৃষ্টিপাতের মতন অহেতুক বিপর্যয় এল   যাত্রীহীন ট্রেন এক পাহাড়ি স্টেশনে কিছু অস্পষ্ট ছায়া, টুপি পড়া, উঠে গেলো নির্দিষ্ট কামরায়   নিজেকে যোদ্ধা ভেবে ঢুকে যাই সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাকে যেখানে আমিই …

পড়ুন

গ প্ পো ৪ – পুঁটে দত্তিদের গপ্পো/ বোধিসত্ব মৈত্রেয়

টাটকা-ঝরা ঝুরো বরফের রাশ ঠেলে এগুচ্ছি আমি আর স্কুয়া। ধু ধু ফাঁকা রাজ্যিটা ভরা অরোরার আলোয়। উত্তরের সারা আকাশটা জুড়ে ঘি-রঙা আলোর বান। তাতে তামাম বরফের দেশটা একেবারে রূপোর পাতে মোড়া রূপকথার রাজ্যি। স্কুয়া বললে, ‘সাবধানে হাঁটো। এবার পায়ের তলার বরফ আর তেমন ঝুরো নয়। একটু জমাট বাঁধা শক্ত। এখন আমরা পাহাড়ে চড়ছি। শক্ত বরফের …

পড়ুন

খেলার দৃশ্যান্তর/অনির্বাণ বসু

একতলা ক্লাবঘর। ন্যাড়া ছাদ। কাঠের দরজা। কোলাপ্সিবল। লাল মেঝেয় কালো বর্ডার। পলেস্তরা-খসা দেয়াল হালকা ঈষৎ। মাঝের বড়ো দেয়ালে এলইডি টিভি। পিছন দিয়ে কেবলের কালো তার; টিকির মাফিক। খেলার সরঞ্জাম অন্যদিকে। ব্লাডার বেরোনো হাঁ-মুখ ফুটবল, তেজি উইকেট, নড়বড়ে হাতলওয়ালা কমদামি ডিউস ব্যাট, পোকায় কাটা প্যাড-গ্লাভ্স্, নরম দড়ির ফুটিফাটা জাল। কোনো-একসময় এই ক্লাবের সামনের ফাঁকা জমিতে সন্ধে …

পড়ুন

মা সম্পর্কিত / প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

কাকভোরে ঘুম ভাঙত। না, বোধহয় ভাঙাতেই হত। কয়েকটা চুড়ি-বালা-টুংটাং আওয়াজ- রান্নাঘর, পুজোঘর, উঠোন, শিউলিতলাজুড়ে সারাদিন কাজ-কাজ-কাজ ধ্যানসম একাগ্র। রান্নাকরার মাঝে বলতে গেলেই কিছু সম্বিত ফিরত যেন! সকলের রাত হয়। তাঁর তো হয় না। সকাল-দুপুর-সন্ধে আঁচলের গিঁটে বেঁধে বিলিয়ে দিতে দিতেই ক্লান্ত একটা দেহ মাঝরাতে বিছানায় হাই পাওয়ারের গ্লাস বালিশের পাশে রেখে দুচোখ জুড়িয়ে এলে একদিন …

পড়ুন

বৃষ্টি তুমি রোদের মধ্যে /বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃষ্টি আমি জানি তুমি চরিত্রহীন, কুলটা নও কখনও হবে না মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতন ধূর্ত জাফরি-কাটা যে বারান্দা থেকে তোমায় ছুঁয়েছিলাম, প্রবল খরার মরশুমে সেই জাফরি আমার মাথায় ঘুরত…   শুধুমাত্র ‘বেঁচে’ জীবন কাটানো খুব কঠিন বলে বিকেলবেলার তেজি আগুন রাত্রি নামলে ছাই হয়ে যায় বম্বে থেকে বেঙ্গালুরু পাক্ খেয়ে পাক্ খেতে খেতে তোমায় পাবো …

পড়ুন

গ প্ পো ২ – ধেড়ে দত্তি আর গুণীন অ্যাডামের গপপো / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

সে অনে-ক অনে-ক দিন আগেকার কথা। তখন সুমুদ্দুরের জল এরকম নোনা নয়। বেশ মিষ্টি জল। তখন এ তল্লাটটায় শহর বাজার কিছুই নেই। নেই ইলেকট্রিকের বাতি। এখন যত ফাঁকা দেখছ এ রাজ্যিটাকে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি ফাঁকা। জনমনিষ্যি অনে-ক অনে-ক কম। পাহাড় আর ছড়ানো মেঠো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় যতো ভূত-প্রেত জিন-পরী দত্তি-দানারা। সুযোগ পেলেই …

পড়ুন

প্রেম/রামকিশোর ভট্টাচার্য

প্রতিদিন রামপ্রসাদি মেখে কাপড় কাচতে কাচতে সাবান হয়ে একদিন গলে গিয়েছে মা ৷ অবসাদ পালক জড়িয়ে হঠাৎ জলবায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাবাও , এখন একলা একা সুতির ফুলমাখা কুর্তি মারুবেহাগ দুপুরে দু’হাত নাচিয়ে ঝুলেই থাকে – দিগন্তের বুকে , জোছনার রূপকথা নিয়ে – কচি হাওয়ারাই ঝিরিঝিরি গান শুনিয়ে যায় , রঙের বেলা গড়িয়ে গেলেও নাইলনের …

পড়ুন

মন্দির দেখা সহজ নয়/শ্রীলা বসু

বেড়ানোর পোকাটা আমার মাথায় এসেছে প্রধানত পৈতৃক সূত্রে। বাবার হাতে ম্যাপ টাইম টেবিল দেখতাম হরদম। গাড়ি চালিয়ে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে নতুন জামাইকে নিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে রাঁচি চললেন তখন একচেখে ভালো দেখেন না। তবু কী ? অন্য চোখ তো আছেই। কিছু বললে বলতেন পতৌদির একচোখে ক্রিকেট খেলার কথা। তবে …

পড়ুন

কলসপুর যাইনি / অমর মিত্র

অনেকবার  দীপিকাকে বলেছি, কলসপুর নিয়ে যাব। বলতে গেলে সেই বিয়ের পর থেকে। আমাদের যাওয়া হয়নি। কতবার কলসপুর যাত্রা শুরুর মুখেই ভেস্তে গিয়েছে। আমি কলসপুরের   কাছাকাছি থেকে ঘুরে এসেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু যেতে পারিনি কেন যে–তা ঠিক ধরতে পারি না। ভেবেছিলাম একবার একাই ঘুরে আসব। কিন্তু শেষে মনে হয়েছে দীপিকা দুঃখ পাবে। লুকিয়ে না যাওয়াই …

পড়ুন

অঙ্ক / তৃপ্তি সান্ত্রা

শচীনদার বউ উষা বৌদি মায়া আর মীরাকে দেখে খুব খুশী হলেন। কতদিন পরে এলে। কেমন সুন্দর আছো তোমরা ৬৮-৭০ বছর বয়সে কেমন হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ। আমায় দেখো না হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গেছে… কি যে কষ্ট… রুমু, মানে ময়ূখের বউ, আমার বৌমা তো খুবই ভালো হয়েছে। চলে যাচ্ছে তাই। রুমু যে খুব টিপটাপ, অল্প সময়ের …

পড়ুন

প্রেম বলিনি/যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি তোমার ছোট্টবেলার বোকা তুমি আমার আনন্দ জিমখানা আমি তোমার তাসের হাতের পোকার তুমি আমার হিমঝিম মস্তানা আমি তোমার কুঁকড়ে থাকা পোকা তুমি আমার ফলানা ঢিমকানা   সকাল থেকে রাত্রি আমি তোমার প্রেম বলিনি তবুও , কে খায় ধোঁকা   রাত্রি থেকে দিন তো তুমি আমার সূর্য চাঁদের চাঁদোয়া টাঙায় খোকা   প্রেমের কাছে, প্রেমের …

পড়ুন

বাঁশি / অংশুমান কর 

বাঁশি যখন বেজে যায় তখন কী যে হয় এই পৃথিবীতে! মনে হয় এক শূন্য মাঠের মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে গেছে সুর। মনে হয় নিষ্পত্র গাছগুলিতে একটি একটি করে জেগে উঠছে কচি পাতা। মনে হয় রোদ্দুর হয়ে গেছে আধো আধো কথা বলা শিশু। শীতকাল হলেও পৃথিবীতে কোথাও একটা নিশ্চয়ই শিউলি ফুটে, ঝরে সাদা করে রেখেছে উঠোন …

পড়ুন

গ প্ পো ৬ – উপকারী পুঁটে দত্তির গপপো/বোধিসত্ব মৈত্রেয়

‘ম্যাকলাখানরা তো ব্রাউনি পুষত —’ এতক্ষণে কথা বললে আংকল জ্যাক। ‘ও সব ব্রাউনি ফ্রাউনি আমি জানি না —’। মুখ ঝামটা গ্যানগ্যানের। ‘ব্রাউনি হোক, পিক্সি হোক, লেদোকোন আর ট্রোন্ড যাই-ইহোক—এক ফিনরা বাদে ওরা সবাই পুঁটে দত্তি। ট্রো —’ ‘তা ফিনরাও তো পুঁটে। এই এতটুকু —’। বললে আংকল জ্যাক। ‘তা হোক, ফিনরা তো আর ডাঙর নয়। তারা …

পড়ুন

ফিল্ম শুটিং-এর গল্প/পার্থ মুখোপাধ্যায়      

১৯৮১ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বংশীচন্দ্র গুপ্ত। ‘ শিল্প নির্দেশনায় বংশী সমকক্ষ ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বংশী ছিল এক এবং অদ্বিতীয়।’ তার স্মরণ সভায় শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই রকম বক্তব্যই রেখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ‘পথের পাঁচালী …

পড়ুন

পিরিত/অভিমন্যু মাহাত

খুব টানটান ছিল বেদনা যত দিন যায় ভুল বাড়ে, প্রবঞ্চনাও বাড়ে স্মৃতিভ্রষ্ট সুতোয় পিরিতের বহি সমস্ত ঋতু জুড়ে বিলাপ শালপাতার আড়ালে আশ্চর্য ঝুমুর এভাবেই একদিন হঠাৎ দর্শন যার তত্ত্ব ও তালাশ ছিল পুরনো সহসা উঁকি মারে নিরুদ্দিষ্ট প্রণয় কিন্তু নাশকতা সামান্য দূরে, আম্রমুকুলের গন্ধে টের পাই অভিমান কেন ভাঙে আজও বুঝিনি… কাল যাব অশোকনগর

পড়ুন

গ প্ পো ১ – গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম / বোধিসত্ব মৈত্রেয়

গ্যানগ্যানের দেখা পেলুম সেই সাত-সুমুদ্দুর তেরো নদীর পারের দেশে। সে বড় আজব দেশ। সে দেশের সব সাদা। রাশি রাশি বরফ পড়ে মাঠ-ঘাট সাদা। বছরে আটটা মাস তুমি মাটির রং দেখতে পাবে না। পাবে না কোথাও একরত্তি সবুজের ছোঁওয়া। জনমনিষ্যি সব সাদা। এমন কি কাক পক্ষীটি পর্যন্ত ধবধবে সাদা। এমনিতে দেশটাতে লোকজন বড় কম। শহর-বাজারে যা …

পড়ুন

তোমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম/বর্ণালী কোলে

(১) বিদ্রোহ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে জলকামান আক্রোশ শান্ত হয়ে আসছে, শান্ত হয়ে আসছে মুহুর্মুহু ভীমরুলের মতো কামড় শান্ত হয়ে আসছে মল্লযুদ্ধ ক্ষোভ, অভিযোগ দেখা দিচ্ছে ফাল্গুন রাত্রি আকাশ জুড়ে শ্বেতরঙ্গন (২) যেভাবে বীণা স্পর্শ করে আছে পদ্মকে সেভাবে তুমি আমাকে স্পর্শ কোরো আসছি এখনও তুমি কাজ করছ শুকতারাটি উঠবে এবার শিয়রে তোমার …

পড়ুন

পিতা নোহসি/প্রতিভা সরকার

‘এই রানি, তোর বাবা সবসময় আমার বুকের দিকে তাকায়া তাকায়া কথা কয় ক্যান রে? বুড়াটা আর কিছু চিনে না, নাকি! ’ গৌরীর বুক উদ্ধত, মুখে চাপা হাসি, সারা শরীরে এমন একটা ভাব, যেন সে জানে কারণটা, কিন্তু তবুও শুনতে চাইছে বেচারা রানির মুখ থেকে। এইভাবে কি বছরের পর বছর ফেল করে এক ক্লাসে থাকার শোধ …

পড়ুন

ভূতপূর্ব ভূত / অহনা বিশ্বাস

ভূতের নাম যে ভূত -গোটা গ্রাম সে কথা জানে। একবার রাস্তা থেকে ডেকে ওর মা আমাকে দেখিয়েছিল। ছোটো বাচ্চা তখন ও। কাজ থেকে ফিরে ভূতকে ওর মা আবিষ্কার করেছিল ওদের ধান সিদ্ধ করা উনুনের ভেতর কালি ঝুলি ছাইমাখা অবস্থায়। ওর মা হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখ দিদি, এ যদি ভূত না হয় তো ভূত কাকে বলবি? …

পড়ুন

বৃষ্টির দিন/কালীকৃষ্ণ গুহ

বৃষ্টির দিন ফুরোয় না কারো জীবন থেকে। বৃষ্টির দিনগুলি সব বিরহযাপনের দিন।   বিরহযাপন শেষ হয় না জীবনে।   কারো বিরহ কান্নার জন্ম দেয় কারো কাছে তা শুধু স্মৃতি হয়ে আসে।   এখন বৃষ্টির দিনে শুধু বাইরে তাকিয়ে চারদিকের গাছপালা ভিজতে দেখি। তাদের অনুচ্চারিত আনন্দ দেখতে পাই।   সেদিন একটা ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা পাগলকে …

পড়ুন

একা মানুষ, পঞ্চাশ অস্তিত্ব/চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

বইয়ের নামঃ পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ লেখক: রিচার্ড জেনিথ প্রকাশক: পেঙ্গুইন বুকস আলোচকঃ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় রিচার্ড জেনিথ রচিত “পেসোয়া অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল লাইফ” বইটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বর্ণিল ব্যক্তিত্ব ফার্নান্দো পেসোয়ার জীবনের একটি মহাকাব্যিক দলিল। ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮–১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর পর্তুগিজ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আধুনিকতাবাদী পথিকৃৎ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য …

পড়ুন

বৃষ্টি নামচা /অগ্নি রায়

এক   ছোট ছোট চিরকুটে ভরে যাচ্ছে বাদলবেলা। বল্লভপুর, গোবিন্দপুর, মুকুটমণিপুর হয়ে মধুপুরে পৌঁছেও শেষ নয় পথ, এই পুরবাসী তালিকাকে পৌঁছতে হবে একশ আটে! তবেই বৃষ্টি থামবে ঠাকুমার কথামতো। কচিকন্ঠের মিনতি কাকলির কাছে লেবুপাতা আর করমচা ঝরে যায়। বালিকাসংঘের গায়ে জলের ছাঁট আবার ফিরে আসার কথা দিয়ে সরে পরে, এক আশ্চর্য লোকায়ত টোটকার পর।   …

পড়ুন

বজ্রসেনি/সার্থক রায় চৌধুরী

নুয়ে পড়া ডাল আর চুঁয়ে পড়া জল, জলের গভীর থেকে মেঘ বহুতল, আকাশ পাগল যেন আত্মহারা এক বৃষ্টি এলো- জানে ভিজল যারা..   জানে? পাগল তবে কার নেশার ঘোরে আঁকে বজ্র, হাওয়ায় ভেজা পালক ওড়ে…

পড়ুন

আপনার লেখা প্রকাশ করার জন্য

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ এবং অন্যান্য লেখা