মানত করলে মানতের ফল ফলবেই, দিদি।
বসুন , ঠিক করে বসুন। আমি একটু সরে বসি। ভাই একটু জায়গা দিন না। পাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বলি। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বাধ্য হয়ে উঠেছি। লেডিজে তিল ধারণের জায়গা নেই।
যাক, আপনার কৃপায় বসতে পারলাম।
এ বাবা কৃপা কেন। কোথায় যাচ্ছেন?
বাবার আশ্রমে। খুব জাগ্রত বাবা। হরিহর বাবা। জানেননা, এই লাইনের শেষ স্টেশন। তারপর টোটো।
হুঁ , কী বলছিলেন মানত?
আমি কখন উঠেছি আজ বলুন ত?
কখন? খুব ভোরে?
তিনটে। রোজ এমনিই চারটেয় উঠি । আমার সোয়ামির ত কোমর পড়ে গেছে। সেই লোকটাকে তুলে হাগামোতা পরিষ্কার করিয়ে, শ্বশুর শাশুড়ি থেকে সবার রান্না করে, লোকটাকে খাইয়ে, এই টিফিন গুচিয়ে নিয়ে বেরিয়েচি।
কপালে ধ্যাবড়ানো টিপ। হলুদ লাল ছাপার শাড়ি, পায়ে সস্তা , ক্ষয়ে যাওয়া চটি। হাতে ঢাউশ ব্যাগ। জলের বোতল, গলায় একটা চুলে বাঁধার ইলাস্টিক দিয়ে আটকানো ব্যাগের হাতলের সঙ্গে। যাতে উল্টে না পড়ে।
একটা রিলে এমন লাইফ হ্যাক দেখেছি না? কেমন গুলিয়ে যায় সত্য আর রিল। বউটা বলতে থাকে।
মানত করে পটল, উচ্ছে খাওয়া ছেড়েছি। আলুটা ছাড়তে পারলাম না। তাই এমন আলুর মতন চেহারা হয়েছে আমার।
চকচকে স্টিলের গোল টিফিন কৌটো খুলে তেলচিটে লুচিগুলো আলুর দম দিয়ে খায় সে। হাত বাড়িয়ে জানলা দিয়ে বোতলের জলে ধুয়ে নেয় আঙুলের ডগা। পিচপিচ করে শব্দ করে মুখ দিয়ে তারপর। ছোট কৌটো থেকে পান সুপুরি বার করে চিবোয়।
ছেলেপুলের মানত। হরিহর বাবার কাছে। মনে মনে ভাবি। আপনার স্বামীর কোমর পড়ে গেছে। বাচ্চা কীভাবে হবে।
মন পড়া মেয়ে আমার দিকে অপাঙ্গে চেয়ে বলল, যদিও মানতটা আমার মেয়ের জন্য। বারো বছরে বিয়ে দিয়েছিলাম। এখন ষোল। বাচ্চা হয়না কেন কে জানে।
আমার স্মার্টফোনে তখন একটা অর্ধসমাপ্ত প্রবন্ধ। বিষয়, বাংলার মেয়েদের ক্ষমতায়ন। লম্বা ট্রেনজার্নি। যাচ্ছি বিনয় মজুমদারের স্মৃতিবিজড়িত ঠাকুরনগরে। বক্তৃতা দেব। এখন এই ফাঁকে কাজ গোছাচ্ছি। লেখাটা প্রায় হয়ে এসেছে । একটু এডিট করব। এদিকে এ দেখি কথাই থামাতে চায় না।
খানিকক্ষণ নিজের ব্যাগ হাতড়ে সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিল। তারপর ছোট জিপ দেওয়া ব্যাগে টাকা পয়সা গুনে, সে ব্যাগ ব্লাউজের ভেতর চালান করে, আগের কথার ধরতাই ঠিক ধরে নিয়ে বলল, আমার সোয়ামিটা কারখানায় কাজ করত। পিঠে এসে পড়েছিল একটা মালের বস্তা। ওকে হিংসে করত কয়েকটা লোক। হয়ত ইচ্ছে করেই ফেলেছিল। ভাল লোকের তো কদর নেই… মরুক সব কুঠ হয়ে ।
চুপ থাকি। আমার ফোনে অর্ধসমাপ্ত প্রবন্ধটা। বিগত চল্লিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের জন্য নানা রকম স্কিম। প্রচুর নতুন সুযোগ। কাজে নেমেছেন মেয়েরা।
আজ তো ব্যবসাই হবে না, পুরো লস। অন্যদিন আড়ত থেকে সব্জি কিনে , বাগানের অল্পকিছু সব্জি হয়, সেসব নিয়ে গিয়ে গাছতলার মোড়ের বাজারে বসি। ওই বিক্কিরি থেকেই সংসার চলে। তাও তো মেয়েটাকে হাতে অল্প জমিজমা থাকতে তাড়াতাড়ি পার করে দিয়েছি। জামায়ের নামে জমি লিখে দিলাম। আপনার কটি ছেলেপিলে দিদি।
একটিই। মেয়ে।
এ বাবা, কী জঞ্জাল। পার করে দেবেন তাড়াতাড়ি। এখন যা যুগ পড়েছে, কবে না কবে বাড়ি থেকে পালিয়ে বেজাতে কুজাতে ইয়ে করে নেয়। অবশ্য আপনারা তো আবার লেখাপড়া করে ফেলেছেন বিস্তর। বিয়ে টিয়ে দিতে পারবেন না অত তাড়াতাড়ি।
বেশ দৃপ্ত ভাষায় কথা বলেন কিন্তু এই ইনি। চুল উড়োখুড়ো। হাত দিয়ে চুল ঠিক করে নিল। রাবার ব্যান্ড দিয়ে খোঁপাটা আরেকবার কষে বেঁধে নিল।
আমার ফোনে লেখা চলছে গুগল ডকে। বিনীতা ভদ্রের একটা আর্টিকেল ছিল, ডাউনলোড করব। উইমেন ইন ওয়ার্কপ্লেস। এ বিষয়ে অনেক স্ট্যাটিস্টিক্স আছে , ওখান থেকে খানিক তুলে দিলেই এবার কেল্লাফতে। টাওয়ার পাচ্ছি না।
বাচ্চা একটাই? আর নেননি? স্বামী কী করে?
বিপজ্জনক প্রশ্নের উত্তর দিই না।
আজকাল সর্বত্র সব উল্টোচ্ছে-পাল্টাচ্ছে , দেশটা ছারখার হয়ে যাবে। ফাল্গুনমাসে এত গরম কেউ দেখেছে?
সত্যি, এত পুকুর বুজিয়ে বাড়ি হচ্ছে। গাছ কেটে ফেলছে।
আরে তা নয়। গুরুজি কী বলেন জানেন? এই যে ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণকে বিয়ে করছে, জাতিধর্ম মানছে না। এজন্যেই হচ্ছে সব। উচ্ছন্নে যাবে ।
খুঁক খুঁক। আমি ত কায়স্থ। বিয়ে করেছি ব্রাহ্মণকে।
তীরবেগে উঠে দাঁড়াল ঘাঁটা-টিপ। কী? কী বললেন? আপনার বর আপনাকে বিয়ে করে পতিত হয়েছে?
পতিত? হা হা। আমার প্রবন্ধ প্রায় শেষের দিকে ততক্ষণে। বিগত কিছু বছরে শিক্ষার প্রসার, সামাজিক আন্দোলন, বিশেষত বাম ভাবধারায় দীক্ষিত বাংলাকে অনেক দিক থেকে বাকি ভারতের থেকে আলাদা করে দিয়েছে …
হাসছেন? জানেন আপনার কন্যা… কী, মেয়েই তো বললেন, সে সমাজচ্যুত? জীবনে কোনদিন ভাল হবেনা ওর। ব্রাহ্মণ হয়ে কায়স্থ মেয়েকে বিয়ে করেছেন আপনার স্বামী! ছি ছি। অবশ্য কায়স্থ পুরুষ ব্রাহ্মণকে বিয়ে করতে আরো মন্দ হত…
হ্যাঁ হ্যাঁ উল্টোটাও হতেই পারত। এটা অনুলোম অন্যটা তো প্রতিলোম।
সবই তো জানেন দেখছি, তা জেনেশুনে এই মহাপাপটা হতে দিলেন ?
আপনার মেয়েকে যদি ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিবাহ দেন তবে তাও বেঁচে যাবে। কিন্তু না দিলে, ওর সন্তান তো রাক্ষস হবেই…
হ্যাঁ তাই তো দেখছি। এসব আপনাদের হরিহর বাবা না কী যেন তিনি বলেন নাকি?
আপনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন! এই লাইনে ছ থেকে আটখানা বাবার থান আছে। বড় বড় আশ্রম। সবচেয়ে বড় আশ্রম হরিহর বাবার। ভেতরদিকে এসি ঘর। বাগানে সাদা মার্বেল করা। কিছু বোঝেন না , খালি দুপাতা পড়েছেন বলে …
এর ভাষা , ভাবভঙ্গি সবই তো দেখছি নেত্রীসুলভ, খুব জোরালো অবস্থান! আমার অবস্থান এতক্ষণে ফিকে হয়ে আসছে… আমি আস্তে আস্তে ঘামছি… ভাবছি ভুল হয়ে গেছে কোনখানে…
বউটি উঠে দাঁড়িয়েই ক্ষান্ত দিল না। আশেপাশের ভিড় ঠেলে কষ্ট করে, সবার গা ঘষে যত দ্রুত সম্ভব আমার সংসর্গ পরিত্যাগ করল। ঐ পাশের সারিতে, অন্য লোককে বলে কয়ে সামান্য জায়গা পেল পরের স্টেশনে। একবার ঘাড়টা ঘুরিয়ে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে প্রায় ভস্ম করে দিয়ে, পাশের আরেকটি ঘাঁটা টিপ মেয়ের দিকে চেয়ে বলল, আবাস যোজনার টাকা পেয়েছিলে, আগেরবার বলছিলে না?
নাহ, কই আর পেলাম। এখনো চক্কর কাটাচ্ছে পঞ্চায়েত আপিসে তো।
ধুস। তোমাদের সনাতনী সংঘের কাজ কদ্দূর? চাল বিলি হল?
হ্যাঁ, ঘরে ঘরে দিয়ে এসেছি নামধাম জিগেস করে। হলুদ চাল তো? রামমন্দিরের হলুদ চাল। রান্নার হাঁড়িতে একখানা ফেললেই হাঁড়িশুদ্ধু প্রসাদ।
আমি আমার ফোনের দিকে ফিরে যাই। গুগুল ডকে ব্যাক স্পেস টিপে টিপে ডিলিট করে দিচ্ছি সব…






























































